আপেক্ষিকতাবাদ প্রসঙ্গে

0
(0)

১৯০৫ সালে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ এবং ১৯১৬ সালে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ প্রকাশিত হয়। বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ দ্রুত গতির বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয় এবং সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের মূল আলােচ্য বিষয় মাধ্যাকর্ষণ।

এই দুটি তত্ত্বের মাধ্যমে আইনস্টাইন গ্যালিলিও-নিউ টনভিত্তিক পদার্থবিদ্যার তরঙ্গসংকুল সরােবরকে প্রবাহিনী স্রোতস্বিনীতে পরিণত করেছেন। ভৌতজগৎ সম্পর্কে আমাদের ধারণায় বিপ্লব এনেছেন।
বিজ্ঞানীদের মধ্যে আপেক্ষিকতাবাদ নিয়ে অসংখ্য জিজ্ঞাসা ও সন্দেহ ছিল। কিন্তু আপেক্ষিকতাবাদের সিদ্ধান্ত ও অনুসিদ্ধান্ত গুলি সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যতিরেকে হয়নি। এই দুটি তত্ত্বের আলােকে আমরা মহাবিশ্বকে জেনেছি। বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদরা খুঁজে পেয়েছেন। বিজ্ঞানের নতুন নতুন বিষয়। বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ প্রসঙ্গে এ নিবন্ধে এসবেরই সহজ, সংক্ষিপ্ত আলােচনা।

বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদে বস্তুর ভর তার বেগের উপর নির্ভরশীল। গতিশীল বস্তুর ভর গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যায়। কিন্তু বেগ আলাের বেগের কাছাকাছি না হলে বস্তুর ভর-বৃদ্ধি এতই নগণ্য যে তা পরিমাপ
করা কঠিন।

নিউটনের সাবেকী পদার্থ বিজ্ঞানে ধরা যাক সেকেন্ডে এক মিটার গতিবেগ বাড়াতে x নিউটন বল প্রয়ােগ করতে হবে। সেকেন্ডে ১০০ মিটার গতিবেগে চলমান বস্তুতে ঐ পরিমাণ বল প্রয়ােগ করলে এর গতিবেগ হবে সেকেন্ডে ১০১ মিটার। ঐ একই বলে সেকেন্ডে ২৭ কোটি মিটার গতিবেগ বিশিষ্ট বস্তুর গতিবেগ দৗড়াবে সেকেন্ডে ২৭ কোটি ১ মিটার। না, ভুলহল।

এখনে নিউটনের বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। সেকেন্ডে ২৭ কোটি মিটার থেকে ২৭ কোটি ১ মিটার গতিবেগ দিতে উল্লিখিত বলের চেয়ে অনেক বেশি বল লাগবে। কারণ এক্ষেত্রে বস্তুর গতিশক্তি তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি। এই অতিরিক্ত শক্তি থেকে বস্তুর ভর যেন বেড়ে যাবে।

বর্ধিত ভরের জন্য গতিবেগ বাড়াতে বেশি বল লাগবে। বেগের সাথে ভর বৃদ্ধি সংক্রান্ত পরীক্ষা প্রথম করেন বুচারার। তিনি পরীক্ষার সাহায্যে দেখান ইলেকট্রনের চার্জও ভরের অনুপাত ইলেকট্রনের
বেগের উপর নির্ভরশীল। কণায়ক যন্ত্র বা সাইকোটুনে মৌলকণাকে আলাের বেগের কাছাকাছি বেগ দেওয়া সম্ভব।

এক্ষেত্রে কণার ভর বৃদ্ধি পরিমাপ করার জন্য বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদের সাহায্য নেওয়া হয়। বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদে গতিশীল বস্তু তার গতির দিকে সঙ্কুচিত হবে। তার দৈর্ঘ্য কমে যাবে। আবার গতিশীল ঘড়ির বেগ বাড়লে ক্রমশ তার কাটা ধীর গতিতে চলবে। আলাের গতিবেগ অপরিবর্তনীয় হওয়ায়
গতিশীল পর্যবেক্ষক স্থির কোনও পর্যবেক্ষকের তুলনায় ক্ষুদ্রতর দৈর্ঘ্যের দণ্ড
দিয়ে আলাের গতিবেগ মাপবে আর তখন তা মাপতে আলােকে কম দূরত্ব
অতিক্রম করতে হবে। মন্দীভূত ঘড়িতে তা মাপতে বেশি সময় লাগবে।

স্থির ও গতিশীল দুই পর্যবেক্ষকই ভাববে তার নিজের দণ্ড ও ঘড়ি সাধারণ মাপই নির্দেশ করছে। ফলে উভয়ের কাছে আলাের গতিবেগ হবে সেকেন্ডে৩ লক্ষ কিলােমিটার। দুজনই ধরে নেবে যে সাবেকী নিয়ম
অনুযায়ী তারা দৈর্ঘ্য ও সময় পরিমাপ করছে। পর্যবেক্ষক যদি স্থির হয়। তবে তার কাছে একটি স্থির দণ্ডের মাপও স্থির ঘড়ির সময় আইনস্টাইনের ভাষায় সাধারণত সঠিক মাপ দেখাবে। ঐ দণ্ড ও ঘড়ি যদি স্থির পর্যবেক্ষকের তুলনায় দ্রুত গতিতে চলে তবে যথাক্রমে তাদের দৈর্ঘ্য ও সময় হবে আপেক্ষিক।

আপেক্ষিক দৈর্ঘ্য সব সময় সঠিক দৈর্ঘ্যের চেয়ে ছােট হবে। আপেক্ষিক সময় হবে সঠিক সময়ের চেয়ে কম। তােমার হাত ঘড়িতে
যেসময় দেখছ তা সঠিক সময়; তােমার আপেক্ষিকে দ্রুতগামী কোন লােকের
হাত ঘড়ির সময় তােমার কাছে হবে আপেক্ষিক সময়। কিন্তু ঐ লােকের
কাছে তা সঠিক সময় মনে হবে। তােমার হাতে দণ্ডটির দৈর্ঘ্য সঠিক দৈর্ঘ্য,
দ্রুতগামী লােকের হাতের দণ্ডের দৈর্ঘ্য তােমার কাছে মনে হবে আপেক্ষিক
মাপের। কিন্তু তার নিজের মনে হবে সঠিক মাপের।কারণ দ্রুতগামী লােকের দৃষ্টিতে তার মনে হচ্ছে সে স্থির আছে, তুমিই গতিশীল।

‘দৈর্ঘ্য সংকোচন’ ও ‘কাল প্রসারণ’ বিষয়গুলি নানা পরীক্ষায় নিখুঁতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। উচ্চ শক্তির কণা পদার্থবিজ্ঞানে কাল প্রসারণের সাক্ষ্য বহন করে মিউঅন কণা। বায়ুমণ্ডলের উপরের দিকের বায়ুকণার সাথে মহাজাগতিক রশ্মির সংঘাতে মিউঅন কণা উৎপাদন করা যায়। তাদের জীবকাল খুব কম। ওপরের বায়ুমণ্ডলে সৃষ্ট মিউঅন কণা এরকম জীবৎকাল নিয়ে বায়ুমণ্ডল থেকে পৃথিবী পৃষ্ঠে আসার আগেই ক্ষয় পেয়ে অন্য কণায় রূপান্তরিত হওয়ার কথা। অথচ কার্যত তা ঘটে না। এরকম প্রচুর মিউঅন কণা পৃথিবীতে ধরা পড়ে।

মহাজাগতিক রশ্মিতে সৃষ্ট মিউঅনের জীবৎকাল পরীক্ষাগারে তৈরি মিউঅনের জীবৎকালের প্রায়
সাত গুণ বেশী। এর কারণ হল মহাজাগতিক রশ্মিতে তৈরি মিউঅন কণার গতি বেগ পরীক্ষাগারে তৈরি মিউঅনের চেয়ে অনেক বেশি। মহাজাগতিক রশ্মিতে তৈরি মিউঅন কণার গতিবেগ আলাের গতিবেগের ৯৯ শতাংশ। এই গতিবেগের ক্ষেত্রে কাল প্রসারণ নজরে পড়ার মত। আমাদের দৃষ্টিতে মহাজাগতির রশ্মিতে সৃষ্ট মিউঅন কণার গতিবেগ বেশি মনে হলেও তাদের কাছে তাদের জীবৎকালের মান সঠিক অর্থাৎ আমাদের পরীক্ষাগারের মিউঅনের সমান।

ইউরেনিয়াম ২৩৫-এর প্রতি নিউক্লিয়াস বিভাজনে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ইলেকট্রন ভােল্ট শক্তি পাওয়া যায়। এটি হচ্ছে আইনস্টাইনের ভর ও শক্তির তুল্যতা (Equivalence of mass and energy)-র সূত্র E = mc2
মেনেই। তারকার অভ্যন্তরে চারটি প্রােটন জুড়ে গিয়ে একটি করে হিলিয়াম
পরমাণুর নিউক্লিয়াস সৃষ্টি হয়।

এক্ষেত্রে যে তাপ উৎপন্ন হয় তাও ঐ সূত্র মেনেই হয়। আবার E পরিমাণ শক্তিকে আলাের দ্রুতির বর্গ(C) দিয়ে ভাগ করলে ঐ শক্তির তুল্যভর পাওয়া যাবে। গবেষণাগারে উচ্চশক্তির একটি ফোটন থেকে সৃষ্টি হয়েছে একটি ইলেকট্রন ও একটি পজিট্রন।

পজিট্রনের ভর, আয়তন, চার্জের পরিমাণ ঠিক ইলেকট্রনের মতাে কিন্তু পজিট্রনের চার্জ পজিটিভ, ইলেকট্রনের নেগেটিভ। প্রকৃতিতে যদি কোন পজিট্রন কণিকার সঙ্গে ইলেকট্রন কণিকার সংঘর্ষ হয় তাহলে দুটি কণিকাই বিলুপ্ত হয়ে শক্তির ফোটনে পরিণত হবে।

আপেক্ষিকতাবাদ থেকে পাওয়া আরেকটি বৈপ্লবিক ধারণায় আসি। ধরা যাক কোন পর্যবেক্ষক দুটি ঘটনা একই সঙ্গে ঘটতে দেখছে। অন্য পর্যবেক্ষক ঘটনা দুটিকে আগে পরে ঘটতে দেখবে। এটা নির্ভর করবে ঐ
দ্বিতীয় পর্যবেক্ষকের আপেক্ষিক গতির উপর। আগে’, ‘পরে’, ‘একসঙ্গে’—এই কথাগুলির বিশেষ কোন অর্থ নেই। এক নির্দেশ কাঠামােতে যা একসঙ্গে অন্য কোন নির্দেশ কাঠামােতে তা আগে’ অথবা পরে।

আপেক্ষিকতাবাদে সবচেয়ে গােলমেলে ও চমকপ্রদ ব্যাপারটি হচ্ছে সময় সম্পর্কিত ধারণা। নিউটনের মতে পরম, শাশ্বত এবং গাণিতিক সময়ের প্রকৃতি এমন যে এ আপনা হতে বাইরের কোন কিছুর সাথে
সম্পর্কযুক্ত না হয়ে সমভাবে বয়ে চলে। ঘড়ির একটি সেকেন্ড সময়ে বিশ্বের বয়স এক সেকেন্ড বাড়ে।

বিশ্বের সর্বত্রই এক সেকেন্ড সময় অতিবাহিত হয়। আইনস্টাইনের মতে এই সিদ্ধান্ত ভুল। সময় সব
পর্যবেক্ষকের কাছে অনপেক্ষভাবে সর্বত্র প্রবাহিত হয় না।

নিউটনের মতে দেশ ও কাল দুটি পৃথক সত্ত্বা। আইনস্টাইনের মতে দেশ ও কাল পৃথক নয়, কোন বস্তুর অস্তিত্ব কোথাও থাকলে তা কোন সময় আছে তা জানতে হয়। আবার কোন সময় তার অবস্থান আছে
বললেই হয় না, কোথায় আছে তা বলতে হয়। আপেক্ষিকতাবাদে তাই দেশ ও কাল নয়, অবিচ্ছিন্ন দেশ কাল একটি অনন্য সত্ত্বা। দেশকাল অবিচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হয়, মধ্যে কোন ছেদ থাকেনা। এভাবেই আপেক্ষিকতাবাদ বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের চিরাচরিত ধারণায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। আপেক্ষিকতাবাদের আলােয় আমরা জগৎকে নতুন ভাবে জেনেছি।

গােবিন্দ দাস

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক এর নভেম্বর -ডিসেম্বর ২০০৫ সঙ্কগ্যা থেকে সংগৃহীত।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

রাধানাথ সিকদার প্রথম ভারতীয় বিজ্ঞানী

0 (0) ‘ইনি ডিরােজিও-বৃক্ষের একটি উৎকৃষ্ট ফল’ মন্তব্য রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’ গ্রন্থের খ্যাতনামা লেখক শিবনাথ শাস্ত্রীর। জন্ম ১৮১৩। আমরা কি তাঁকে স্মরণে ও শ্রদ্ধায় বরণ করে নিতে প্রস্তুত। রাধানাথ সিকদার। আধুনিক ভারতের প্রথম গণিতজ্ঞে-বিজ্ঞানী। ১৮০২, সালে ব্রিটিশরা এদেশে কর্নেল ল্যামটন-এর অধীনে স্থাপন করেন গ্রেট ট্রিগােনােমেট্রিক্যাল সার্ভে (জি টি […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: