জৈব ঘড়ি, জৈব কম্পাস

0
(0)

উদাহরণ ১ –

পায়রা,হাঁস, মুরগী সহ প্রায় সবরকম পাখি এবং পশুরা রাত্রের প্রতি প্রহর জোরে বা আস্তে ডেকে ওঠে সময় জানান দেয়। শীতের রাতে শেয়াল ডাকে সময় মেপে প্রতি প্রহরে। জঙ্গলে জলের উৎস গুলােতে বন্যজন্তুরা জলপান করতে আসে তাদের নির্দিষ্ট সময়ে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বিবর্তনের মাধ্যমে এবং
অভিযােজনের মাধ্যমে তাদের সময় নির্দিষ্ট হয়েছে।

তৃণভােজী ও মাংসাশী প্রত্যেকের আলাদা আলাদা সময় রয়েছে। আবার মাংসাশী প্রাণীদের মধ্যে হিংস্রতা
এবং শক্তির নিরিখে সবল এবং দুর্বল জন্তুদের সময় আলাদা। বাঘ যখন জল খেতে আসে তখন
লেপার্ড কিংবা শেয়ালরা আসেনা। প্রকৃতিগত ভাবেই প্রত্যেকের সময় নির্দিষ্ট রয়েছে।

উদাহরণ ২-

সাইবেরিয়া সহ পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে বিশেষতঃ শীত প্রধান অঞ্চল গুলাে থেকে পরিযায়ী পাখিরা উষ্ণ অঞ্চল গুলােতে আসে। তারা সেখানে বাসা তৈরী করে, ডিমপাড়ে এবং বাচ্চা বড় হবার পর আবার ফিরে যায়।কিছুকিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় বাবা এবং মা পাখি আগেই চলে যায় আর বাচ্চা সম্পূর্ণভাবে আকাশে ওড়ার উপযুক্ত হলে তবেই যাত্রা শুরু করে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে যে যাত্রাপথ অচেনা
হওয়া সত্ত্বেও তারা ঠিকঠিক পথ চিনে বাবা মায়ের দলের সাথে মিলিত হয়।

উদাহরণ ৩-

আমি একদিন পড়ন্ত বিকেলে সাইকেল চেপে গ্রাম দেখতে বেরিয়েছি। যেতে ভুল করে চেনা পথ ছেড়ে কিছুটা যাবার পর পথ হারিয়ে ফেললাম। যেখানে পৌছলাম সেটা একটা পরিত্যক্ত বাড়ী। তারপর আর রাস্তাই নেই। এদিকে অন্ধকার হয়ে এল। সেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে মেঠোপথের অস্পষ্ট রেখা ধরে চলতে শুরু করলাম।

রাস্তায় জনপ্রাণী নেই যে জিজ্ঞেস করব। এই অবস্থায় আন্দাজে এবং শহরের দিকের আকাশে আলাের আভাস লক্ষ্য করে রাত ৮টায় একটা জায়গায় এসে দেখলাম সেটা একটা ছােট বাজার এবং আমার চেনা
জায়গা।

সেখান থেকে ৪৫ মিনিট সাইকেল চালিয়ে বাড়ীতে পৌঁছলাম। প্রকৃতির সৃষ্টি এই জীবজগতে অবিরত ঘটে চলা অজস্র আশ্চর্যজনক ঘটনার মতাে এটাও একটা ঘটনা যে পাখি পশু এবং কীটপতঙ্গরা সময় মেপে কাজ গুলাে করে।কিন্তু কিভাবে? ধরাযাক, বাঘ যখন জল খেতেগ এল তখন ভুল করে নেকড়ে কি হায়না চলে এল সেখানে। কারণ শিকার ধরার ক্ষেত্রে এরা পরস্পর পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। সুযােগ পেলেই এরা একে অন্যের কাছ থেকে শিকার কেড়ে বা চুরি করে খায়। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না।

সেরকম প্রতি প্রহরে অর্থাৎ প্রায় ৩ ঘন্টা পর শেয়াল, পায়রা, ভাল্লুক, পেঁচা ডেকে ওঠে। ওরা এটা করতে পারে কারণ এদের মস্তিষ্কে সময় মেপে সেইকাজ গুলাে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা রয়েছে। যাকে আমরা জৈব ঘড়ি বলতে পারি। এককোষী প্রাণী থেকে কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের মাধ্যমে এই জৈবঘড়ি বিকশিত হয়েছে ভাবলে অবাক লাগে।

ঠিক তেমনই অজানা অচেনা পথেগিয়ে সঠিক জায়গায় পৌছনাে, যেমন পরিযায়ী পাখিরা করে থাকে তাকে আমরা জৈব কম্পাস বলতে পারি।অবশ্য কম্পাস বলতে আমরা যেযন্ত্র বুঝি এটা নয়। আকাশের
গ্রহ নক্ষত্রদের আলােকসজ্জা, বিভিন্ন সময়ে আকাশে তাদের অবস্থান ইত্যাদি যুগ যুগান্ত ধরে তাদের পরিক্রমণে সহায়তা করছে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এদের শরীরের বিশেষ গন্ধ (ফেরােমন), এদের ডাক বা
আওয়াজ অনুসরণকারী সেই প্রজাতির প্রাণীদের জন্য সংকেত হিসাবে কাজ করে। যেমন বিশেষ এক ধরণের প্রজাপতি তাদের জীবনের একটা পর্যায়ে প্রায় ১০ হাজার কিমি পথ পাড়ি দিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছয়। সেখানে পর্যাপ্ত খাবার খায় বংশবিস্তার কবে আবার ফিরে আসে আগের জায়গায়।

সেই সুদীর্ঘ যাত্রাপথে পথ প্রদর্শক হিসাবে একটা প্রজাপতি সবার আগে গিয়ে সঠিক জায়গা খুঁজে নেয়। তার শরীর নিসৃত ফেরােমন এর গন্ধ অনুসরণ করে বা প্রজাপতিরা সেখানে পৌঁছয়। আবার গভীর সমুদ্রে বিচরণকারী তিমি প্রতি বছর প্রায় ১৫ হাজার কিমি সমুদ্র সাঁতরে অপেক্ষাকৃত উষ্ণ অঞ্চলে পৌঁছয়। সেখানে পর্যাপ্ত খাবার খায়, বাচ্চাদেয়, তারপর সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ফিরে আসে।

জীব জগতের অন্যান্য প্রাণীদের মতােই সময়জ্ঞাপক এবং দিক নির্দেশক ব্যবস্থা আমাদের অর্থাৎ মানুষের মধ্যে রয়েছে। আমাদের শরীরের বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক উপাদান, স্নায়ুতন্ত্র এবং সর্বোপরি আমাদের মস্তিষ্কে এই ব্যবস্থা রয়েছে।

আমাদের পূর্বপুরুষরা যখন থেকে যাযাবরের জীবন ছেড়ে স্থায়ী বসতি গড়ে তােলা শুরু করল তখন থেকে আমাদের দিক নির্ণায়ক ক্ষমতা হ্রাস পেতে শুরু করল। এখন তাে আমরা ভােরবেলা আর বিকেলবেলা ছাড়া দিক নির্ণয় করতে পারি না। সেরকম ঘড়ি আবিষ্কারের পর থেকে আমাদের সহজাত সময় জ্ঞাপক ব্যবস্থাও ধীরে ধীরে লােপ পেতে বসেছে। এলার্ম ছাড়া সকালে ঘুম ভাঙে না। ব্রেক ফাস্টের টেবিলে বা পড়তে বসার পরও ঘুমের রেশ থেকে যায়। রাত ১২টা ১টার সময় বড় বাথরুম পায়, ভাের তিনটে চারটের সময় ক্ষিদে পায়, যচ্ছেতাই অবস্থা।

অবশ্য সহজাত এবং স্বয়ংক্রিয় এই ব্যবস্থাগুলােকে আমরা অনুশীলনের মাধ্যমে ব্যবহারযােগ্য এবং চাঙ্গা করতে পারি। প্রথমে আমাদের জৈবঘড়ির কথাই বলি। মনােবিজ্ঞানের পরিভাষায় একটা কথা আছে যার নাম ‘অটোসাজেশন’। অর্থাৎ ক্রমাগত কোন একটা বিষয়ে মনে মনে আউড়ে গেলে সে বিষয়ে মস্তিষ্কে একটা ধারণা তৈরি হয়।

Ruled by the biological clock | IRENE CASELLAS | Features | Catalonia Today

পরবর্তী সময়ে মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয় ভাবে শরীরের নির্দিষ্ট অঙ্গপ্রত্যঙ্গে নির্দেশ  পাঠায় এবং আমাদের শরীরে সেই মতাে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া ঘটে।আমি এবং আমার মতাে অনেক লােক আছেন যাঁরা যত সমস্যাই থাকুক না কেন শােয়ার সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়েন এবং রাতে যত দেরী করে ঘুমােত যান না কেন ভােরবেলা নির্দিষ্ট সময়েই ঘুম থেকে ওঠেন।

“শােবার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ব’ এবং সকালে এতটার সময় ঘুম থেকে উঠব’ কথাগুলাে যদি মনে হয় ক্রমাগত আওড়ানাে যায় তবে এক সময় মস্তিষ্ক সেই মতাে আমাদের ঘুম পাড়িয়ে দেবে
অথবা নির্দিষ্ট সময়ে জাগিয়ে দেবে। এই ‘অটোসাজেশন’ এর প্রভাবে মানুষ অসাধ্য সাধন করতে পারে। এবিষয়ে পরে আলােচনা করা যাবে।

সােজাকথায় সময়মতাে যাবতীয় কাজ আমরা কোনরকম অ্যালার্ম ছাড়াই করতে পারি। তার জন্য অনুশীলন করতে হবে। মস্তিষ্কে নির্দেশ পাঠাতে হবে। শরীর যদি অসুস্থ থাকে তবে এই ব্যবস্থা সাময়িক বাধা পেতে পারে। কোনরকম নেশা থাকলে আমাদের জৈবঘড়ি ‘স্লো ফাস্ট’ হবে। শােবার আগের দুই ঘন্টার মধ্যে টিভি দেখলে বা চা কফি পান করলে জৈবঘড়ি কাজ করবেনা।

জৈবকম্পাস বা সহজাত দিক নির্দেশক ব্যবস্থাকে পুর্নব্যবহারযােগ্য করতে হলে প্রভৃতি পর্যবেক্ষণ জরুরী। বিশেষ করে ঋতু পরিবর্তনের খুঁটিনাটি এবং অবশ্যই আকাশ পর্যবেক্ষণ। সূর্য প্রতিদিন পূর্বদিকে ওঠে এবং পশ্চিমে অস্ত যায়। ভূপৃষ্ঠে স্থিরবস্তুর যে ছায়া পড়ে তা কোনদিনই একরকম হয় না। মাটিতে পোঁতা একটা কাঠির ছায়া গতকাল দুপুর একটা চল্লিশ মিনিটে যে বিন্দুতে ছিল আজ সেখানে থাকবে না।
আগামীকাল আরাে একটু সরবে যদিও সময়টা একই। আকাশের তারা গুলােকেও রাতের এক এক সময়ে এক এক জায়গায় দেখা যায়। কখনাে তাকে সন্ধ্যের আকাশে দেখি আবার কখনাে বা শেষ রাতের
আকাশে। নভেম্বর ডিসেম্বর মাসে রাত আটটা-নটার সময় পূর্বদিকে মুখ করে মাথা সােজা রেখে চোখের ভুরু বরাবর আকাশের দিকে তাকালে কালপুরুষ নক্ষত্র গুলিকে শুয়ে থাকতে দেখি। ধ্রুবতারা উত্তরদিক নির্দেশ করে এটা সবারই জানা। ছােট কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে পৃথিবীর সবচেয়ে বড়াে প্রাণী নীল তিমি পর্যন্ত আকাশের এই আলােকসজ্জাকে লক্ষ্য করে পরিক্রমণ করে। কারাে পরিক্রমণ পথ পনেরাে ফুট আর কারাে পনেরাে হাজার কিমি। আকাশের জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর বিন্যাস ছাড়াও আঞ্চলিক কিছু বিষয়ও দিক নির্ণয়ে সহায়ক হয়। শহর থেকে অনেক দূরে কোন গ্রামের রাতের আকাশের একপ্রান্তের আলাের আভাস জানান দেয় যে সেদিক শহর রয়েছে।

প্রকৃতি প্রদত্ত জৈবঘড়ি এবং জৈব কম্পাস সঠিক অনুশীলন এবং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পূর্ণব্যবহার যােগ্য করে আমরা আমাদের য দৈনন্দিন কাজ গুলােকে সঠিক সময়ে করতে পারি।

লেখকঃ-শংকর নারায়ণ দাস

কোচবিহার বিজ্ঞান চেতনা ফোরাম

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক এর জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি ২০১২ থেকে সংগৃহীত।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

কৃষ্ণপদার্থ

0 (0) ‘বিপুল এ পৃথিবীর কতটুকু জানি’ ? কবির এই আক্ষেপ যথার্থই সত্যি। এ বিশ্বচরাচরের হাঁড়ির খবর অধিকাংশই এখনাে অজানা।পৃথিবী ছাড়িয়ে মহাবিশ্বের কথা ভাবলে তাে কথাই নেই। গ্রহ,নক্ষত্র, ছায়াপথ এসব মহাজাগতিক বস্তু নিয়েই এ মহাবিশ্ব। কিভাবে সৃষ্টি হল এসব মহাজাগতিক বস্তুর মান বিশ্বব্রহ্মান্ডের তাই নিয়েই গড়ে উঠেছে ‘সৃষ্টিতত্ত্ব’ বা কসমােলজি […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: