বাংলার সাদা বাঘ

poribes news 1
5
(1)

‘এক ছিল মােটা কেঁদো বাঘ,
গায়ে তার কালাে কালাে দাগ।”
রবি ঠাকুরের এই ছড়া ছােটবেলায় প্রায় সব বাঙালিই পড়েছে। আর পড়ে স্বচক্ষে বাঘ দেখার আগেই বাঘের একটা কাল্পনিক চেহারা মনে এঁকে নিয়েছে। তাছাড়া, দাদু-ঠাকুমার মুখে বাঘের গল্প শােনেনি এমন হতভাগ্য বাঙালির সংখ্যা কিন্তু ইদানিং কালে অনেক বেড়ে গেলেও অদূর অতীতে যৌথ পরিবারিক ব্যবস্থায় এমন বাঙালি ছিল খুব কম।

ছবি-ছড়া-গল্পে যে জন্তুটির সবচেয়ে বেশি উপস্থিতি, যে হল বাঘ, আর বাঘ মানেই সুন্দরবনের বাঘ। বিরাট লম্বা চেহারা, হলুদের ওপর কালাে ডােরাকাটা গা। লম্বা লেজ, তীক্ষ্ম দাঁত, ভয়ঙ্কর শক্তি আর হিংস্র ।
ছােটবেলায় আলিপুর চিড়িয়াখানায় গিয়ে অবাক হয়ে দেখেছিলাম সাদা রঙের বাঘ ‘চাদনি’। পরে ওড়িশার বাঘ নন্দন কাননেও দেখেছি। সবই সুন্দরবনের রয়্যালবেঙ্গল টাইগারের মতাে, কেবল গায়ের রঙ ছাড়া। হলুদের বদলে সাদা, কালাে ডােরা ঠিকই আছে, তােমরাও হয়ত এমন সাদা বাঘ চিড়িখানায় দেখেছাে।বর্তমানে সাদা বাঘ চত্তগ্রাম চিড়িয়াখানায় আছে।

Online Study: বেঙ্গল টাইগার আর সাদা-কালো ডোরা বাঘের রঙ এর সাথে genetics এর  সম্পর্ক।
সাদা বাঘ

সাদা বাঘ এলাে কোথা থেকে? কী এদের বিশেষত্ব? কেনই বা এদের শুধু চিড়িয়াখানাতেই দেখতে পাই?
জঙ্গলের প্রাকৃতিক পরিবেশে কি সাদা বাঘ আছে? এমন অসংখ্য প্রশ্ন নিশ্চয়ই তােমাদের মনেও জাগে।
তােমাদের কৌতুহল মেটাতেই আজ বাংলার সাদা বাঘের গল্প!

বাংলার সাদা বাঘ আবিষ্কারঃ-

তখন ভারতে চলছে ব্রিটিশরাজ। ব্রিটিশ করদ রাজ্য রেওয়া-র রাজা ছিলেন শিকারপ্রিয় গুলাব সিং। তার সুযােগ্য পুত্র মহারাজা মার্তন্ড সিং তার বন্ধু যােধপুরের মহারাজা অজিত সিং-কে সাথে নিয়ে ১৯৫১ সালে।
জঙ্গলে বাঘ শিকারে যান। হঠাৎই তার নজরে পড়ে একটা সাদা বাঘিনী।
মার্তণ্ড সিং অব্যর্থ নিশানায় গুলি ছুঁড়ে সাদা বাঘিনিটিকে হত্যা করেন।

একটু পরেই লক্ষ্য করেন কাছেই রয়েছে বাঘিনিটির চারটি বাচ্চা। অবাক কান্ড, বাচ্চাগুলাের তিনটের রঙ হলুদ, আর একটার রঙ সাদা। নির্দয় মার্তন্ড সিং হলুদ বাচ্চাগুলােকে এক এক করে গুলি করে মারেন। তারপর বন্ধু অজিত সিং-কে অনুরােধ করেন সাদা বাচ্চাটিকে গুলি করার জন্য।

অজিত সিং করুনাবশতঃ গুলি করতে অসম্মত হন। এই সুযােগে সাদা বাচ্চাটি পালায়। খোঁজ খোঁজ, শেষে হদিশ মিলন পাথরের একটা বড় ফাটলে। কিন্তু ভয়ে সে বেরােয় না। শেষে একটা খাঁচা এনে দরজা খুলে, আর ভেতরে জল রেখে ফাটলের মুখে রাখা হল, কয়েক ঘন্টা অপেক্ষার পর তৃষ্ণার্ত বাঘ শাবকটি জল পান করতে খাঁচায় ঢুকতেই বন্দি। এরপর বাঘের বাচ্চাটিকে মহারাজা মান্ড সিং গােবিন্দগড়ে তার অব্যবহৃত প্রাসাদে নিয়ে আসেন।মহারাজা ওই সাদা বাঘ শাকটির নাম দেন মােহন।
আর আজ বিশ্বের যেখানে যতগুলাে বাংলার সাদা বাঘ রয়েছে তারা সবই ওই মােহনের বংশধর।

আকার, আর স্বভাব চরিত্র ২-৩ বছরের মধ্যেই বাংলার বাঘ তার পূর্ণ আকৃতি পায়। পুরুষ বাঘের ওজন হয় প্রায় ২০০-২৩০ কেজি, আর লম্বা হয় প্রায় ৩ মিটার। স্ত্রী বাঘের ওজন হয় ১৩০-১৭০ কেজি
এবং লম্বায় প্রায় ২.৫ মিটার।

যদিও বলা হয় সাদা বাঘ, তবে প্রকৃত সাদা নয়, সাদা বাঘ বলতে আসে সাইবেরিয়ার বাঘকেই বােঝায়, বাংলার সাদা বাঘ আসলে চিনচিলা বাঘ। মানুষের ক্ষেত্রে শ্বেতি হলে যেমন হয় ব্যাপারটি অনেকটা
সেরকম। তাই বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই বাঘকে সঠিক ভাবে বলা যেতে পারে চিনচিলা অ্যালবিনিস্টিক  বাঘ।

সাদা জমির কালাে ডােরাকাটা গা। এই ডােরাদাগ দুটো বাঘের ক্ষেত্রে কখনাে হুবহু এক হয় না, যেমনটি
দু’জন মানুষের আঙুলের ছাপও  এক হয় না। আরও মজার ব্যাপার, কালাে ডােরার ক্ষেত্রে শুধু লােমই কালাে রঙের হয় না, ওই লােমের নিচে ত্বক-ও কালাে রঙের হয়। তাছাড়া ওদের দু’কানের পেছনে কালাের
মাঝে এমন একটা সাদা দাগ থাকে যে পেছন থেকে দেখলে চোখ বলে মনে হবে।

বাংলার সাদা বাঘের চোখের রঙ হয় নীলাভ, আর নাক ও পায়ের থাবার প্যাডের রঙ হয় গােলাপ। এরফলে বাংলার সাদা বাঘকে দেখতেও অপূর্ব লাগে।

দেখা গেছে, হলুদ বাঘের চেয়ে বাংলার সাদা বাঘ অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পায়, এরা সাঁতারে খুব পটু, তবে গাছে উঠতে তত দড় নয়। এরা খুব এরা খুব দ্রুত দৌড়ােতে না পারলেও গতিবেগ স্থির রেখে অনেকক্ষণ
দৌড়ােতে পারে। ফলে তাড়া করে শিকার ধরতে খুব সমস্যা হয় না।

প্রজনন ঋতু আর মা-শিশু ছাড়া এই বাঘেরা একা একাই থাকে। এদের দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি হয় খুব প্রখর। এরা সাধারণত দিনের বেলা জিরিয়ে নিয়ে গােধুলি লগ্নে শিকারের সন্ধানে বেরােয়। এরা মূলত বুনাে মহিষ, ছাগল, হরিণ ও বুনাে শুয়ােরকে খাদ্য হিসাবে শিকার করে। এক একবারে এরা প্রায় ৪০ পাউন্ড মাংস খায়। শিকার ধরার জন্য এদের নখ ও দাত হয় খুব ধারালােও তীক্ষ্ম। এদের দাঁতের সংখ্যা ৩০টি, আর দাঁতগুলাে গড়ে ২.৫-৩ ইঞ্চি লম্বা। খাবারের সন্ধান ছাড়া এরা মােটেই ঘােরাফেরা করে না। ভীষণই ঘুমকাতুরে এরা। দিনে ১৬-১৮ ঘন্টা ঘুমনাে চাই-ই।

বাঘ সাদা হওয়ার চাবিকাঠি —

হলুদ রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার থেকে বাংলার সাদা বাঘ সৃষ্টির মূলে রয়েছে একটি প্রচ্ছন্ন জিন। সুদূর অতীতে হলুদ রঙের জন্য দায়ী প্রকট জিনের মিউটেশন এর ফলে সাদার জন্য দায়ী প্রচ্ছন্ন জিনটির উদ্ভব হয়।
কোনাে বাঘ যদি বাবার কাছ থেকে একটি প্রচ্ছন্ন জিন এবং মায়ের কাছ থেকেও ওই প্রচ্ছন্ন জিনটি পায় তাহলে তার রং সাদা হবে। তবে প্রাকৃতিক পরিবেশে এমন ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম, কারণ হলুদ রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের জিন পপুলেশনে সাজার জন্য দায়ী প্রচ্ছন্ন জিনটির উপস্থিতির হার অতি সামান্য।

তাই হিসেব বলছে, প্রতি দশ হাজার বাঘ জন্মালে তাদের মধ্যে মাত্র একটি সাদা বাঘ হতে পারে। আর ১০০
বছরের মধ্যে প্রভাবে বড় জোর ১০/১২টি সাদা বাঘ জন্মাতে পারে।

আরও অদ্ভুত ব্যাপার, পৃথিবীতে একমাত্র রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের জিন পপুলেশনে এই ধরণের মিউটেশন ঘটেছে। পৃথিবীর বাকি চারটি বাঘের প্রজাতিতে এঘটনা এখনও ঘটেনি।

বাংলার সাদা বাঘের ভবিষ্যৎ

সম্ভবত :ভারত তাে বটেই, পৃথিবীর কোনও অরণ্যে বাংলার সাদা বাঘ আর নেই। আ.সি.এন বাংলার সাদা বাঘকে বিলুপ্ত প্রজাতি হিসেবে ঘােষণা করেছে। বেসরকারী তথ্যে জানা যায় ১৯৫৮ সালে বিহারের
জঙ্গলে পৃথিবীর শেষ বাংলার সাদা বাঘকে হত্যা করা হয়।

বিবর্তনের নিয়মে বাংলার সাদা বাঘ প্রাকৃতিক নির্বাচনে বাতিলেরম তালিতায় চলে গেছে। মিউটেশনের মাধ্যমে হলুদ রঙের জন্য দায়ী জিন থেকে সাদা রঙের জন্য দায়ী জিনের উদ্ভব হলেও সাদার জিনটি প্রতিকূল ভেদ সম্পন্ন  হওয়ায় সাদা বাঘেরা প্রকৃতিতে সুযােগ-সুবিধা পায়নি, বরং অসুবিধায় পড়েছে।

ভারতীয় আরণ্যক পরিবেশে হলুদ বাঘেরা নিজেদেরকে মিশিয়ে নিয়ে শিকারও শিকারীর দৃষ্টিকে ফাকি দিতে পারে, কিন্তু সাদা বাঘের সে সুবিধা নেই, সে সহজেই শিকার ও শিকারীর দৃষ্টিগােচর হয় এই প্রতিকূলতাই বিবর্তনে নিয়মে বাংলার সাদা বাঘকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে।

অজি গােটা পৃথিবীতে বিভিন্ন চিড়িয়াখানা মিলিয়ে প্রায় ৫০০টি বাংলার সাদা বাঘ রয়েছে। কিন্তু এদের কেউই বুন্য নয়। সবই অন্ত: প্রজননের মাধ্যমে সৃষ্ট ‘মােহন’-এর উত্তরসূরি। এদের জিন ভান্ডার অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে গেছে ক্রমাগত অন্ত: প্রজননের (Inbreeding) ফলে। তাই সাদা বাঘেরা বর্তমানে নানা রকম শারীরিক সমস্যায় ভুগছে, যেমন ক্ষীন দৃষ্টি, রােগ প্রতিরােধ ক্ষমতা হ্রাস, অ্যানাস্থেসিয়া সহনক্ষমতা হ্রাস, বৃক্কের কর্মক্ষমতা হ্রাস, মেরুদন্ডের বক্রতা, প্রজনন ক্ষমতাহ্রাস ইত্যাদি। সুতরাং আগামী দিনে এইভাবে অন্ত:প্রজননের মাধ্যমে সাদা বাঘকে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্ঠা আদৌ উচিত কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শেষে, আর একটা আশাজনক সংবাদ দিই, ‘মােহন’-এর উত্তরসূরী সাদা বাঘিনী সীমা’ কে ১৯৭৯ সালের ২৯ আগষ্ট কানপুর চিড়িয়াখানায় আনা হয়। ওখানে আগে ‘মােহন’-এক চতুর্থ প্রজন্মের বাঘ ‘বাদল’।
‘বাদল’-এর অবশ্য রঙ ছিল হলুদ। সীমা ও বাদলের মধ্যে প্রজননের লক্ষ্যে বিজ্ঞানীরা উদ্যোগ নিলেও সফল হতে পারেননি।

এইসময় করবেট জাতীয় উদ্যান থেকে ধৃত মানুষ খেকো ভয়ানক হিংস্র বাঘ ‘শেরু’-কে বন্দি করে কানপুর চিড়িয়াখানায় আনা হয় এবং সীমা’-র সঙ্গে রাখা হয়। সীমা ও শেরুর মধ্যে প্রজনন সফল হয় এবং তাদের তিনটি বাচ্চা হয়। অবাক কান্ড! তিনটে বাচ্চার মধ্যে একটা সাদা।

যদি শেরুর দেহে হলুদ রঙের জন্য দায়ী জিনটি এক জোড়া থাকত তবে মেন্ডেলিয় নিয়মানুযায়ী সব বাচ্চারই হলুদ হওয়ার কথা। কিন্তু একটা সাদা বাচ্চার জন্ম বুঝিয়ে দিয়েছে শেরুর দেহে হলুদ ও সাদা
রঙের জন্য দায়ী জিন একটা করে রয়েছে।

অর্থাৎ সাদা বাচ্চাটি (ওর নাম দেওয়া হয় জহর) সীমার কাছ থেকে একটা সাদার জিন ও শেরুর কাছ
থেকে একটা সাদার জিন পেয়েছে। এই ঘটনা নিশ্চিত ভাবেই প্রমাণ করছে যে করবেট জাতীয় উদ্যানে সাদা বাঘেদের জিন ভান্ডারে সাদা রঙের জন্য দায়ী জিনটি এখনও কিছুটা বর্তমান। যদি তাই-ই হয়, তবে
অদূর ভবিষ্যতে করবেট জাতীয় উদ্যানে প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট সাদা বাঘ দেখা যেতেই পারে। তখন কিন্তু অধুনা ‘বিলুপ্ত’ বাংলার সাদা বাঘের কাহিনী নতুন করে লিখতে হবে।

সৌম্যকান্তি জানা

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক এর নভেম্বর-ডিসেম্বর / ২০১১ থেকে সংগৃহীত।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

One thought on “বাংলার সাদা বাঘ

Leave a Reply

Next Post

জৈব ঘড়ি, জৈব কম্পাস

5 (1) উদাহরণ ১ – পায়রা,হাঁস, মুরগী সহ প্রায় সবরকম পাখি এবং পশুরা রাত্রের প্রতি প্রহর জোরে বা আস্তে ডেকে ওঠে সময় জানান দেয়। শীতের রাতে শেয়াল ডাকে সময় মেপে প্রতি প্রহরে। জঙ্গলে জলের উৎস গুলােতে বন্যজন্তুরা জলপান করতে আসে তাদের নির্দিষ্ট সময়ে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বিবর্তনের মাধ্যমে এবং […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: