চকোলেট ও রসায়ন

poribes news
5
(2)

চকোলেট এর ইতিহাস

সময়টা ১৫০২ চতুর্থবারের জন্য সমুদ্রযাত্রা শেষ করে কলম্বাসের নাবিকরা ইউরোপ ফিরে আসার সময় বিশেষ এক ধরণের ফল সাথে করে নিয়ে এলেন যা ইউরােপবার্সী আগে কখনাে দেখেনি, কোকোয়াবিনস। গেজে যাওয়া এই কোকোয়াবিনস শুকিয়ে যে গাঢ় রঙের বিশেষ পদার্থ পাওয়া গেল তার সাথে চিনি, ভ্যানিলা, দুধ ও নানা রকম সুগন্ধি পদার্থ মিশিয়ে স্প্যানীয়রা তৈরী করলেন এক নতুন ধরণে পানীয়। যাকে আধুনিক চকোলেটের প্রাথমিক সংস্করণ বলা যেতে পারে।

অ্যাজটেক সম্রাট মন্টেজুমা তাে এই তরলের নাম দিয়েছিলেন ‘ঐশ্বরিক পানীয়’কারণ এর প্রভাবে সহজেই কান্তি দূর হতাে। এই কোকোয়া বিক্স থেকে তৈরী পানীয়র হদিস কিন্তু প্রাচীন মায়া সভ্যতাতেও পাওয়া যায়।

ঐতিহাসিক গণ মায়ান লিপিতে এমন উল্লেখও লক্ষ্য করেছেন যে নিত্য পানীয় ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক
উৎসবে এর ব্যবহার ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

চকোলেট কিভাবে তৈরি হয়

তবে স্পেনীয়রা প্রথম চকোলেট তৈরী করার পরও কয়েক শতক ধরে চকোলেট কিন্তু কেবল পানীয়
হিসাবেই গ্রহণ করা হত। প্রথম কঠিন চকোলেটের হদিস পাওয়া যায় অষ্টাদশ শতকের ফ্রান্সে, যেখানে
চিনির দানা সদৃশ চকোলেট সহজ ব্রেকফাস্ট হিসাবে ব্যবহৃত হত।

চকোলেটে উপস্থিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক পদার্থটি হল থিওব্রোমিন।৫০ গ্রামের একটি গাঢ় চকোলেট বারে প্রায় ২৫০মিলিগ্রাম থিওব্রোমিন থাকে। থিওব্রোমিন যাকে রাসায়নিক দিক থেকে ক্যাফিন এর নিকটাত্মীয় বলা যেতে পারে। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র উদ্দিপককারী এই রাসায়নিকটির উপস্থিতির জন্যই রাত জাগার সময় সৈন্যদের কার্যকরী খাবারের তালিকায় চকলেটের ব্যবহার দীর্ঘ দিনের। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকান সরকার তাে চকোলেটকে Cacao হিসাবেই দেশের সেনাদের সরবরাহ করত।

তবে যে কোকোয়া গাছে (Theobroma) শুটি থেকে চকোলেটের প্রধান উপাদান কোকোয়া পাউডার তৈরী হয় সেই চিরহরিৎ গাছটিকে পাওয়া যায় প্রধানতঃ দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন নদী উপত্যকা ও কেন্দ্রীয় আমেরিকার ক্রান্তিয় অঞ্চলে।

কোকায় গাছে ফল
কোকোয় গাছে্র ফল

অতীতে এখানকার অধিবাসীদের কাছে এই কোকোয় এত মহার্ঘ বস্তু ছিল যে তারা বিনিময় মাধ্যম হিসাবে টাকা-পয়সার মতন এই কোকোয়া বীজ ব্যবহার করত। যদিও কোকোয়ার প্রাথমিক প্রাপ্তিস্থান আমেরিকা , তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী এখন পৃথিবীর উৎপাদিত মােট কোকোয়ার তিন চতুর্থাংশ আসে প্রধানতঃ পশ্চিম আফ্রিকা এবং ব্রাজিল থেকে।

চকলেট তৈরির পদ্ধতি
চকোলেট তৈরির পদ্ধতি

১৮২৮ সালে আমস্টারডামের ভ্যান হাউটন পরিবার আরও ভাল ও সুস্বাদু চকোলেট-পানীয় তৈরীর চেষ্টায় স্কু- প্রেষ পদ্ধতির সাহায্যে কোকোয়া বীন্স গুলাে পিষে কোকোয়া বাটার আলাদা করতে সমর্থ হন। সেই বাটার কোকোয়া পাউডারের সাথে মিশে যে মসৃণ নরম আঠালাে পিন্ড তৈরী হলো দেখা গেল তা চিনি শােষণ করে নিতে পারে। এবার চকোলেট আর পানীয় রইলাে না, পাওয়া গেল গাঢ় রঙিন কঠিন অথচ নরম সুস্বাদু চকোলেট।

রসজ্ঞদের মতে চকলেটের সঠিক স্বাদ পেতে হলে একে খালি পেটে খেতে হয়। তবে একেবারেই তাড়াহুড়াে করা যাবেনা। প্রথমে মুখে পুড়ে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করতে হবে এর প্রাথমিক সুবাস পাবার জন্য। তারপর বার কয়েক চিবিয়ে মুখের উপরের অংশে শেষ অবধি আটকে রাখতে হবে চকোলেটের পুরাে আস্বাদ ও সুবাস পেতে হলে।

চকোলেট এর উপকারিতা ও অপকারিতা

চকলেট স্নায়ু উদ্দিপককারী পদার্থ হিসাবে থিয়ােরােমিন ও ক্যাফিন মােটামুটিভাবে ১০ঃ১ অনুপাতে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে চকোলেট খেলে যে ভাল লাগার অনুভূতি হয় তার পেছনে দায়ী এই থিয়ােব্রোমিন ও
ফিনাইলাইথাইল অ্যামিন নামক দুটি পদার্থ যা আসে কোকোয়া পাউডার থেকে।

তবে আমাদের ক্ষেত্রে ভাল লাগার অনুভূতি জাগালেও কয়েকটি পােষ্য বিশেষ করে বিড়াল ও কুকুরের ক্ষেত্রে এই থিওব্রোমিনের প্রভাব মারাত্মক। পদার্থটির স্বল্প মাত্রাও এইসব পােয্যদের ভীষণ রকম বমি ও ডায়ারিয়ার কারণ হতে পারে। এমনকি মাত্র ৫০ গ্রাম পরিমান ডার্ক চকলেটে থাকা থিওব্রোমিনই একটি ছােট কুকুরের মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট বলে ধরা যেতে পারে।

ডার্ক চকলেটে কোকোয়া পাউডারের পরিমান সবচেয়ে বেশী (শতকরা ৩৫ ভাগের বেশী)। মিল্ক চকোলেটে এই পরিমান শতকরা ২০ থেকে ৩০ ভাগের মধ্যে হলেও সাদা চকোলেটে কেবল কোকোয়া বাটার থাকে, যার উপাদান স্টিয়ারিক অ্যাসিড, প্যামিটিক অ্যাসিড, প্রভৃতি কতগুলাে সম্পৃক্ত ফ্যাটি
অ্যাসিড থেকে উৎপন্ন ট্রাইগ্লিসারাইড। কোনও কোকোয়া পাউডার এতে ব্যবহৃত হয়না।

যদিও অনেক ক্ষেত্রেই চকোলেটকে আরাে সুদৃশ্য ও মােলায়েম করার জন্য লেসিথিন নামক হলদে বাদামী রঙের একরকম ফ্যাটজাত পদার্থ যােগ করা হয়। কখনও বা গাঢ় চকোলেটের উপর সাদা ছােপ দেখা যায়, যাকে চকোলেট ব্রুম বলে। এর কারণ আসলে দুর্বল সংরক্ষণের কারণে চকোলেটের মধ্যেকার শর্করা ও ফ্যাটের আলাদা হয়ে যাওয়া।

তবে এই ঘটনার ফলে চকোলেটের খাদ্যগুন কিছু নষ্ট হয় না এবং তা নিরাপদে গ্রহণ করা যায়।
এবার দেখা যাক সুস্বাদু এই খাবারটি আমাদের স্বাস্থের পক্ষে ঠিক কতটা নিরাপদ। যদিও পরিমিত পরিমান চকোলেট (বিশেষতঃ ডার্ক ভ্যারাইটি) আমাদের দেহের পক্ষে তেমন ক্ষতিকর কিছু নয় তবে একে কিন্তু আবার পুষ্টিকর খাবারও বলা যায় না।

৩০ গ্রাম কঠিন চকোলেটে থাকে প্রায় ২ থেকে ৩ গ্রাম প্রােটিন ও শতকরা ৫৯ ভাগ শর্করা যা থেকে প্রায় ১৫০ ক্যালােরি শক্তি পাওয়া যায়। যদিও কোকোয়াবী যথেষ্ট পরিমানে ভিটামিন বি এবং ভিটামিন ই সমৃদ্ধ, কিন্তু আধুনিক প্রক্রিয়াজাত চকোলেটে এই ভিটামিন প্রায় কিছুই থাকে না বললেই চলে।

চকোলেট বেশী বা কম মিষ্টি যাই হােক এতে মােটামুটি ভাবে ৪০ থেকে ৫৩ শতাংশ ফ্যাট বা কোকোয়া বাটার থাকে। তবে দুপ্রকার চকোলেটেই কোকোয়া পাউডার থেকে ক্রোমিয়াম, আয়রণ, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস এবং পটাশিয়ামের মত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মৌল পাওয়া গেলেও ফ্যাট ও অপরিমিত ক্যালােরির উপস্থিতির জন্য চকোলেট কিন্তু এইসব মৌলের উৎস হিসাবে একদম অনুপযুক্ত।

তবে জরুরী প্রয়ােজনের খাবার হিসাবে চকোলেট কিন্তু সত্যিই কার্যকরী। যদিও কোকোয়া পাউডারে
যথেষ্ট মাত্রায় অক্সালেট থাকায় কিডনিতে স্টোন হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়। বেশীমাত্রায় ফ্যাট এবং শর্করার উপস্থিতির জন্য দীর্ঘদিন থেকে চকোলেটকে উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, মােটা হওয়া ও নানা রকম করােনারি আর্টারি ডিজিস (হৃদয় ঘটিত অসুখ) এর অন্যতম প্রধান শত্ৰু হিসাবে আমরা জেনে এসেছি।

কিন্তু ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকান ডায়েটিক অ্যাসােসিয়েশনের জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বিজ্ঞানীরা চকলেটের কিছু উপকারী পদার্থের সন্ধান দিয়েছেন যা ডার্ক চকোলেটে প্রধানতঃ কোকোয়া পাউডার থেকে আসে। তারা চকোলেটে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফ্ল্যাভােনয়েড (উদ্ভিদজাত বিশেষ ধরণের পলি ফেনলীয় যৌগ যা মানুষের খাবারের তালিকায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ) এর সন্ধান পেয়েছেন যেগুলির রােগ প্রতিরােধকারী অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ধর্ম রয়েছে।

তাছাড়া ২০১৬ -র জুন মাসের মেডিক্যাল নিউজ টুডে তে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে জোসেফ নডভিস্ট ও আধুনিক গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে চকোলেটের অনেক গুলি সম্ভাব্য উপকারী দিকের কথা বলেছেন। দেহের কোলেস্টেরল মাত্রা কমানাে থেকে শুরু করে হার্টের অসুখ, এমনকি স্বাভাবিক বৌদ্ধিক বিকাশেও নাকি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ডার্ক ভ্যারাইটির নানা রকম চকোলেট। কিন্তু আমেরিকান জার্নাল অফ কিনিক্যাল নিউট্রিশন এ প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী আবার চকোলেট দেহের হাড়ের ঘনত্ব ও শক্তির হ্রাস ঘটায়।
তবে আধুনিক গবেষণা চকোলেটে উপস্থিত বিভিন্ন পদার্থের নানারকম উপকারী প্রভাবের সন্ধান দিয়ে থাকলেও আমাদের মত দেশের কারখানায় প্রক্রিয়াজাত খাবার হিসাবে উৎপন্ন চকোলেটের কার্যকরী গুনাগুন নিয়ে আমরা নিঃসন্দেহ থাকতে পারবাে কিনা এ প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়।

চকোলেট দিবস

তবে যাইহোক  চকলেট খাওয়ার  আনন্দ আরও বেশী করে উপভোগ করার জন্য 7 ই জুলাই চকলেট দিবস(World Chocolate Day 7th July) পালন করা হয়।

ডঃ অমিতাভ চক্রবর্তী

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক পত্রিকা থেকে সংগৃহীত।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 2

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

তেজস্ক্রিয়তার অ আ ক খ

5 (2) তেজস্ক্রিয়তা ও তেজস্ক্রিয় দূষণ প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম ভাবে সৃষ্ট যে সমস্ত পদার্থ স্বাভাবিক ভাবে অনবরত শক্তির বিকিরণে অন্য কোনাে নতুন পদার্থে পরিণত হয় তাদেরকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ বলে। বস্তুর যে ধর্ম এর জন্য দায়ী তাকে তেজস্ক্রিয়তা (Radioactivity) বলে। আর এই সমস্ত তেজস্ক্রিয় পদার্থের অবাধ ও অদূরদর্শী ব্যবহারের ফলে পরিবেশে […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: