তেজস্ক্রিয়তার অ আ ক খ

poribes news
2.7
(7)

তেজস্ক্রিয়তা ও তেজস্ক্রিয় দূষণ

প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম ভাবে সৃষ্ট যে সমস্ত পদার্থ স্বাভাবিক ভাবে অনবরত শক্তির বিকিরণে অন্য কোনাে নতুন পদার্থে পরিণত হয় তাদেরকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ বলে

বস্তুর যে ধর্ম এর জন্য দায়ী তাকে তেজস্ক্রিয়তা (Radioactivity) বলে। আর এই সমস্ত তেজস্ক্রিয়
পদার্থের অবাধ ও অদূরদর্শী ব্যবহারের ফলে পরিবেশে তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে যে দূষণ ঘটে তাকে তেজস্ক্রিয় দূষণ বলে।

পারমানবিক বােমা তৈরিতে এবং বিকল্প শক্তির উৎস হিসাবে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যন্টে প্রচুর পরিমাণে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ব্যবহত হয়। সামান্য অদূরদর্শিতায় কিংবা দুর্ঘটনায় (যেমন জাপানের দাউচি) বায়ুতে
এদের মাত্রাধিক্য ঘটে এবং সেই সব তেজস্ক্রিয় আইসােটোপ গুলি অনবরত তেজস্ক্রিয় বিকিরণ
ঘটিয়ে পরিবেশকে আরও দূষিত করে তােলে।

তেজস্ক্রিয় দূষণ কারা ঘটায়

প্রকৃতি ও মানুষ উভয়ই দায়ী এই দূষণের জন্য। গত শতাব্দীর শেষে মেরী কুরী যখন তেজস্ক্রিয়
পদার্থ রেডিয়াম আবিষ্কার করলেন তখন থেকে পারমানবিক বােমা তৈরীর আগে পর্যন্ত প্রকৃতিতে
তেজস্ক্রিয় পদার্থ ও তার তেজস্ক্রিয় আইসােটোপের পরিমাণ ছিল, খুবই সামান্য। তার থেকে পরিবেশের ক্ষতির আশঙ্কা ছিল সামান্য। কিন্তু আজ বিকল্প শক্তির নামে ব্যাপক হারে বেড়েছে পরমাণু চুল্লি ফলে প্রকৃতি, জমছে হাজার হাজান টা তেজস্ক্রিয় আইসােটোপ, বাড়ছে তেজস্ক্রিয় দৃষণ। যাই হােক
তেজস্ক্রিয় দূষণের প্রধান উৎসগুলি হলঃ-

উৎস তেজস্ক্রিয় পদার্থ
১। প্রাকৃতিক বায়ু জল সমুদ্র মহাজাগতিক রশ্মি, কার্বন ১৪,
হাইড্রোজেন ৩ (ট্রাইটিয়াম) রেডন ২২২,
রেডিয়াম-২২৬, রেডিয়াম-২২৮ইত্যাদি
ইউরেনিয়াম-২৩৫, বেরিয়াম ১৪২, ক্রিপটন-৯১।
২। মনুষ্য সৃষ্টআকবিকের প্রক্রিয়াকরণ প্লুটোনিয়াম, ইউরেনিয়াম-২৩৮,থোরিয়াম-২৩০,

রেডিয়াম-২২৬, লেড-২১০

৩। পারমানবিক  চুল্লি ইউরেনিয়াম-২৩৮, ২৩৫, বেরিয়াম-১৪২,

ল্যান্থনিয়াম-১৪২, প্লটোনিয়াম-২৩৯

৪। পারমানবিক বিশ্বেরণ চিকিৎসাবিজ্ঞানে
তেজস্ক্রিয় ট্রেসার
প্রটোনিয়াম-২৩৯, ইউরেনিয়াম-২৩৫, ২৩৮,
স্ট্রনসিয়াম-৯০, সিজিয়াম-১৩৭
কার্বন-১৪, আয়ােডিন-১২৫

তেজস্ক্রিয় বিকিরণ

পরিবেশে তেজস্ক্রিয় দূষণের পরিমান নির্ভর করে দূষক পদার্থের অর্ধাযুব উপর এবং কোন ধরনের তেজস্ক্রিয় রশ্মি নির্গত হয় তার উপর। সাধারণত তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে তিন ধরনের রশ্মি বিকিরন ঘটে।
এই রশ্মির ভেদন ক্ষমতার উপর জীবদেহের ক্ষতি নির্ভর করে।

Radioactivity

১) আলফা রশ্মি ঃ-

এটি ধনাত্মক আধান যুক্ত কণা দিয়ে গঠিত। এর ভেদন ক্ষমতা কম, ফলে মানুষের ক্ষেত্রে ক্ষতির পরিমানও কম। প্লুটোনিয়াম আলফা কণা বিকিরণ করে।

২ )বিটা রশ্মি ঃ-

ঋনাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রন কণার স্রোত হল বিটা রশ্মি। এর ভেদন ক্ষমতা আফা এবং এক্স (X) রশ্মির তুলনায় বেশি অর্থাৎ জীবদেহের পক্ষে তুলনামূলক বেশি ক্ষতিকর।

৩) গামা রশ্মি ঃ-

গামা রশ্মি নিস্তরিত অর্থাৎ আধানবিহীন এনে দেন খমতা সর্বাধিক।তাই এই রশ্মি জীবদেহের পক্ষে সর্বাপেক্ষা ক্ষতিকর।

কিভাবে মাপবো ?

সাধারনত রেস (Roentgen Equivalent Man) একক দিয়ে তেজস্ক্রিয় বিকিরনকে পরিমাপ করা হয়। এই রেম বুঝতে হলে প্রথমে রঞ্জন কাকে বলে তা ব্যাখ্যা করা প্রয়ােজন।রঞ্জন এককের সাহায্যে এক্স (X) অথবা গামা রশ্মি যারা আধান বিহীন কণা তাদের আয়নায়িত হবার ক্ষমতাকে বােঝায়। আর এই রঞ্জন রশ্মি (X) যে পরিমান নির্দিষ্ট প্রভাব মানুষের উপর ফেলে সেই পরিমান প্রভাব উৎপন্ন করতে যে পরিমান তেজস্ক্রিয়তা বা তেজস্ক্রিয় বিকিরন প্রয়ােজন তাকে এক রেম বলে।

এটি প্রায় ১০০ আর্গ/গ্রাম এর সমান। তেজস্ক্রিয় দূষণ পরিমাপের
একককে পিকোকুরী বলে। কখনাে কখনাে কুরী বা মিলিকুরি কথাটি ব্যবহৃত হয়। তেজস্ক্রিয় মৌল স্বাভাবিক ভাবে বিভিন্ন কণা বা রশ্মি।
(আলফা, বিটা, গামা) বিকিরন করতে করতে নতুন মৌলে পরিনত হয়। এক্ষেত্রে তেজস্ক্রিয় পদার্থ যে হারে ভাঙ্গে তাকে কুরী বলে। এক কুরী তেজস্ক্রিয়তা বলতে বােঝায় যে পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ প্রতি সেকেন্ডে
3.7X(10)-10বার ভাঙ্গে আর প্রতি সেকেন্ডে 3.7X(10)-² বার ভাঙ্গলে তাকে পিকোকুরী বলে।

তেজস্ক্রিয়তার  নিরাপদ মাত্রা

মানুষের উপর তেজস্ক্রিয়তার সর্বাধিক অনুমােদন মাত্রা নিয়ে গবেষণা করে ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন রেডিওলজিক্যাল প্রােটেকশান নামে এক আন্তর্জাতিক সংস্থা। এদের মতে পরমাণু শিল্পের কর্মীদের জন্য
তেজস্ক্রিয় বিকিরণের অনুমােদন মাত্রা প্রতি সপ্তাহে সর্বোচ্চ ০.৩ রেম, যারা প্রত্যক্ষ প্রকটের মধ্যে থাকে (Direct Exposers) তাদের ক্ষেত্রে মান সপ্তাহে মাত্র ০.১ রেম অর্থাৎ সম্পূর্ণ জীবৎ দশায় ২০০ রেম। অবশ্য

এই সাধারণ মানেরও অনেক হেরফের আছে।

১) গর্ভস্থ ভুন ও শিশুর ক্ষেত্রে ঃ সর্বোচ্চ বছরে ০.৩ রেম।

২) ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বছরে ০.৫ রেম।

৩) সাধারণ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২ রেম।

৪) মানবশরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতঙ্গের সীমা আবার একটু অন্যরকম।

৫) চোখের লেন্সঃ৫০ রেম (বছরে)
সাধারণ মানুষ যাদের প্রত্যক্ষ প্রকট অবস্থার (DirectExposers) মধ্য দিয়ে যেতে হয় না অর্থাৎ যারা কেবলমাত্র অপ্রত্যক্ষ বিকিরণের। শিকার তাদের সহনশীল মাত্রা কিন্তু আরও কম—বছরে সর্বোচ্চ ০.১
বেম।

তেজস্ক্রিয়তা কিভাবে সংক্রমিত হয়

মানুষের শরীরে তেজস্ক্রিয় সংক্রমন দু’ভাবে হতে পারে—প্রত্যক্ষ (Direct Exposers) এবং পরোক্ষ (Indirect Exposers) প্রত্যক্ষ ভাবে বাতাসে ভেসে বেড়ানাে তেজস্ক্রিয় পদার্থের কণা এবং তেজস্ক্রিয় গ্যাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে ঢােকে। তাছাড়া অনেক সময় দেহ কোষে সরাসরি বিকিরণ ঘটাতে পারে।

খাদ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে তেজস্ক্রিয় সংক্রমণ ঘটলে তাকে অপ্রত্যক্ষ প্রকট (Exposers) বলে। পারমানবিক প্ল্যান্ট কারখানা প্রভৃতি জায়গায় অসর্তক হস্তান্তর এর কারণে মৃত্তিকা ও জল সংক্রমিত হয়। এরপর
মৃত্তিকা ও জলে বসবাসকারী সমস্ত জীবকূলে প্রবেশ করে এবং কালক্রমে খাদ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়।

কি ক্ষতি করে

শুধুমাত্র পেশাগত কারণে (তেজস্ক্রিয় আকরিক প্রক্রিয়াকরন, নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট, পরীক্ষাগারে গবেষণা ইত্যাদি) নয়, অন্যান্য পরিবেশগত কারণে, মানুষ তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হয়। তাছাড়া বিভিন্ন
আকস্মিক দুর্ঘটনায় মানুষের উপর অ্যাকিউট তেজস্ক্রিয় প্রভাব পড়তে পারে। কোষীয় স্তরে তেজস্ক্রিয় দূষণের প্রভাব সবচেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর।

 

তেজস্ক্রিয় বিকিরণে আক্রান্ত ব্যক্তির দেহকোষ এবং জনন কোষে ক্রোমােজোমের অবাঞ্ছিত এবং স্থায়ী পরিবর্তন ঘটতে পারে—একে মিউটেশন বলে। ফলে ক্যানসার ও নানারকম শারীরিক অস্বাভাবিকতা
দেখা যায়। এগুলি বংশ পরম্পরায় বাহিত হয়। এছাড়াও তেজস্ক্রিয়

দূষণের কতগুলি ক্রনিক প্রভাব লক্ষনীয়, যথা—

১) ফুসফুস এবং যকৃতের আলসার যার পরিনতিতে ক্যানসার ও ফাইব্রোসিস রােগের প্রার্দুভাব;

২) রক্তাল্পতা (অ্যানিমিয়া) ও লিউকোমিয়া (ব্লাড ক্যানসার);

৩) মহিলাদের ক্ষেত্রে জরায়ুর ক্যানসার;

৪) গর্ভনিক্ষেপ ও গর্ভক্রটি কিংবা মৃত শিশুর জন্ম;

৫) স্নায়বিক বৈকল্য এবং স্মৃতি বিভ্রম;

৬) বন্ধ্যাত্ব ও থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা;

৭) বিভিন্ন অস্থিরােগ যথা নেফ্রোসিস এবং অস্থি ক্যানসার;

৮) ত্বকের অসংশােধনযােগ্য পরিবর্তন যথা অ্যাট্রফি, ইরাইথিমা এবং রঞ্জকের পরিবর্তন ইত্যাদি।

লেখক : ডঃ চন্দন সুরভি দাস

অধ্যাপক, টাকি সরকারি মহাবিদ্যালয়

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক এর জুলাই- আগষ্ট ২০১২থেকে সংগৃহীত।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 2.7 / 5. Vote count: 7

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

সর্প বিজ্ঞানী অবনীভূষণ ঘােষ

2.7 (7) একদা প্রখ্যাত সাহিত্যিক পরিমল গােস্বামী মন্তব্য করেছিলেনঃ ” যদি সাপ বিষয়ে ছাত্রদের শিক্ষিত করা প্রয়ােজন হয়ে থাকে এবং সে প্রয়ােজন আমার মতে জরুরি, তা হলে সর্প বিশেষজ্ঞ অবনীভূষণ ঘােষের সরল ভাষার ছাত্রপাঠ্য বই ‘সাপের কথা’ পাঠ্য নির্দিষ্ট হয় না কেন? অজ্ঞ লেখকরা এ বই থেকে টুকেও লিখতে পারেন […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: