গাছের পাতায় ডিম পাড়া মাছ কোপিলা আরনােলডি

0
(0)

শ্ৰীমান কোপিলা (Copella arnoldi) থাকে দক্ষিণ আমেরিকায়। আমাজন ও তার শাখানদীতে সুখে শান্তিতেই আছে। খাচ্ছে-দাচ্ছে, নদীতে সাঁতার কাটছে, আর প্রজনন ঋতু এলে শ্ৰীমতী কোপিনার সঙ্গে সংসার ধর্ম পালন করছে। তবে ভয় যে একেবারে নেই তা নয়। শত্রুর আক্রমণে মাঝে মধ্যে কপাৎ-কোঁৎ হয়ে তাদের পেটে চালান হয়ে যায়। এমন দুর্ঘটনা তাে একটু আধটু ঘটতেই পারে। অতভয় করলে কি চলে?

তাহলে তাে বেঁচে থাকাই দায়। মানুষ তাে অত বুদ্ধিমান জীব। তাদের কি দুর্ঘটনা ঘটে না ? আর দুর্ঘটনা মানেই তাে চিৎপটাং। যাইহােক, অতসত ভেবে লাভ নেই। বেঁচে থাকতে হলে ওসব মেনে নিতে হয়।

স্থানীয় লােকেরা এই মাছকে ‘কোপিলা আরনােলডি’ বলে না, বলে ‘চ্যারাসিন’। যে নামেই ডাকা হােক না কেন, এরা নিজেদের খুব বুদ্ধিমান বলে মনে করে। হাসি পাচ্ছে? তা পেতে পারে। মাছের আবার বুদ্ধি কিসের ? উহু বাবা, অত আন্ডার এস্টিমেট করা ঠিক নয়। এরা কোথায় থাকে তা তাে জানা আছে। ভয়াল আমাজন নদীতে। কত শত্ৰু ওঁত পেতে বসে আছে। তাদের চোখে ধুলাে দিয়ে বেঁচে থাকা কি চাট্টিখানি কথা? আমি-তুমি কি পারতাম?

দুদিন পরেই ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি বলে পালানাের পথ খুঁজতে হত। কোপিনাদের বুদ্ধির দৌড় এখনই কী দেখলেন? আসল চমক অপেক্ষা করে আছে যখন ওদের সন্তান লালন-পালনের কথা বলব।

কোপিলা আরনােলডি
কোপিলা আরনােলডি

 

ভবঘুরেদের ঘর সংসার থাকে না। শ্রীমান কোপিলারা তাে আর ভবঘুরে নয়? প্রকৃতির নিয়ম মেনেই তারা সংসার ধর্ম পালন করে। তাই সময় হলেই তাদের বেরিয়ে পড়তে হয় পাত্রীর খোঁজে। এদের সমাজে অবশ্য শ্রীমতীরাই পাত্র নির্বাচন করে। তাই শ্ৰীমতীদের মন জয় করার জন্য শ্রীমানদের অনেক
কসরৎ শিখতে হয়।

প্রয়ােজনে নাচ গানও একটু-আধটু করতে হয়। জানা তাে নেই কোন শ্ৰীমতী কী পছন্দ করে ? যাইহােক, দেখাশােনা, মন দেয়া-নেয়ার পর শ্রীমতী চলল শ্রীমানের সঙ্গে ঘর বাঁধতে। শ্রীমান কি আগে থেকেই
সুন্দর একটি বাসা বানিয়ে রেখে চলে? মােটেই না। খেটে খুটে ঘরদোর বানানাে শ্ৰীমান কোপিলাদের ধাতে নেই। এরা মনে করে ওগুলাে পন্ডশ্রম। কদিনের ঘর সংসার, তার জন্য কে অত খাটে? শ্ৰীমতীরা এতে মনে কিছু করে না।

তখন তারা প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। শ্রীমান যেখানে নিয়ে যাবে সেখানেই সে থাকতে রাজী। আন্দাজ করুন তাে, কোথায় নিয়ে যেতে পারে? শ্রীমতীকে নিয়ে শ্রীমান এমন জায়গায় চলে যায় যেখানে কোনাে গাছের পাতা বা ডাল জলের থেকে মাত্র এককী দুই ইঞ্চিউপরে ঝলছে। জলের নীচে এত জায়গা থাকতে দুজনে এখানে এল কেন? ঘরবাড়ি বানানাে হয় নি। শ্রীমতী ডিম পাড়বে কোথায় ? ছেলেমেয়েদের নিরাপদ রাখতে হবে তাে?

এখানেই তাে কোপিলাদের বুদ্ধির চমক। ঐ যে জলের ঠিক উপরেই গাছের পাতাটা মৃদু হাওয়ায় ধীরে ধীরে দুলছে ওটাই তাে হবে শ্রীমতীর ডিম পাড়ার জায়গা। কচিকাঁচারাও ওখানে নিরাপদে থাকতে পারবে। জলের শত্রুরা ওদের নাগালই পাবে না। জলের নীচ থেকে ফ্যালফ্যাল করে দেখবে আর লালা ঝড়াবে।কিছুই করতে পারবে না। কেমন বুদ্ধির প্যাচ করেছি বল ?

ডিম পাড়ার কায়দাটাও বেশ মজার। দুজন দুজনকে পাখনা নিম্নে সাপটে ধরে দে-লাফ। হুস করে জলের উপর উঠে পাতাটার উপর গিয়ে পড়ে। হাত- পা তাে নেই ? পাখনা দিয়েই ঝটপাট করে কোনাে মতে পাতাটাকে আকড়ে ধরার চেষ্টা করে। সেই ফাকেই কাজ সেরে ফেলে। পাতার উপর এক দম্বল ডিম পাড়ে।

কোপিলা আরনােলডি, গাছের পাতায় ডিম পারে
কোপিলা আরনােলডি, গাছের পাতায় ডিম পাড়ে

তারপর আবার ঝপাৎ করে জলে। একবারে হয় না। বারকয়েক লাফ মারতে হয়। প্রতিবারই শ্ৰীমতী পাতাটার উপর কিছু না কিছু ডিম পাড়ে। পাতায় আটকে ডিমগুলাে ঝুলতে থাকে জলের উপর। যেন দোলনায় দোল খেতে খেতে ঘুমোচ্ছে, ছেলেপুলরা। দুশমনরা ঘুরপাক খেতে খেতে জলের নীচ থেকে দেখে যাচ্ছে। যদি দু-একটা টুপটাপজলে এসে পড়ে। বৃথাই চেয়ে থাকা। পাতায় সেঁটে আটকে আছে। ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

ডিম তাে পাড়া হল। ডিম ফুটে বাচ্চা বের না হওয়া পর্যন্ততাদের দেখাশােনা তাে করতে হবে যাতে ডিমগুলাে নষ্ট না হয়ে যায়। তাই বাবা-মার দায়িত্ব এখন অনেক। বয়েই গেছে শ্রীমতীর এই দায়িত্ব নিতে। ডিমপাড়া শেষ, তারও কাজ শেষ। এবার ঘর-সংসার নিলে একা সামলাক। কোপিনা শ্রীমিনর কিন্তু
এ নিয়ে ঝগড়াঝাটি করে না। বাচ্চা বড় করার সময় দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে। শ্ৰীমতীদের ছুটি দিয়ে দেয়। শ্ৰীমতীরাও আর অপেক্ষা করেনা-দে – চম্পট।

শত্রুর হাত থেকে তো ডিমগুলাে চলে। কিন্তু আমাজনের গরম হাওয়ায় সেগুলাে যে শুকিয়ে আমসি হয়ে যাবে ?ম্যায়না? শ্রীমানের সেদিকে সজাগ দৃষ্টি। মাঝে মধ্যেই পাতার নীচে এসে ল্যাজের ঝাপটার জল ছিটিয়ে ডিমগুলাে ভিজিয়ে দেয়। মাত্র তিন দিনের ব্যাপার তাে?বাবা হয়ে মা-হারা সন্তানদের জন্য এইটুকু কষ্ট স্বীকার করতে পারবে না?
শিশু কোপিনরা জন্মেই মনে করে তারা বড় হয়ে গেছে। বাবার শাসনে থাকা, নৈবচ। তাই ডিমের খোলস ছেড়ে টুপটাপ জলে পড়েই বাবাকে বলে- ড্যাড, টা টা বাই বাই।

লেখকঃকমল বিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

লেখটি বিজ্ঞান অন্বেষক এর নভেম্বর – ডিসেম্বর ২০১৪ থেকে সংগৃহীত।

 

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

'তাইওয়ান' করোনা যুদ্ধ জয় করেছে শুধু হাতিয়ার "মাস্ক" দিয়ে

0 (0) এক নীরব যোদ্ধার কাহিনী,সে ব্রিটেন নয় ! আমেরিকা নয় !সে হল তাইওয়ান। তাই তো  সেই ঘাসের উপর শিশির বিন্দুর মতো সেও উপেক্ষিত আজ । কিন্তু সেই দেশ নিজো উদ্যোগে জয় করেছে করোনা ,বিগত বেশ কিছু দিনে কোনো নতুন সংক্রমণের খবর নেই l অথচ তারা এই করোনার আবহে সামান্য […]
ফেস কভার
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: