দেশীয় ছােট মাছ

5
(1)

প্রকীতর আশীর্বাদে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চল একবিশাল পরিমাণ জল সম্পদের অধিকারী। এ রাজ্য বিভিন্ন ধরণের উর্বর অন্তদেশীয় মিঠা বা স্বাদু জলাশয়ে সমৃদ্ধ, যেমন খাল, বিল, বাওড়, ঝিল, নদী, দিঘি পুকুর, অশ্বক্ষুরাকৃতি জলাভূমি, ডােবা, নয়ানজুলি, জলমগ্ন ধানজমি এবং অনন্য এই সকল প্রাকৃতিক উষ্ণ অঞ্চলীয় জলাশয় গুলিতে (লবনাক্ত তারমান সর্বাধিক ০.৫গ্রাম প্রতি লিটার) স্বাভাবিকভাবে লালিত পালিত হয়ে বেড়ে ওঠে বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছ বা চুনো মাছ।

গ্রাম বাংলার সভ্যতা সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা, পরম্পরা এবং ঐতিহ্যের জড়িত এবং তা এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে প্রােটিন সমৃদ্ধ খাদ্যপ্রাপ্তি ও যথাযথ পুষ্টি যােগান দেওয়ার বিষয়ে সুনিশ্চিতকরণ,
স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রসঙ্গে এই সনাতনী দেশীয় জলজসম্পদ অর্থাৎ মৎস্যভান্ডার একবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় মাছ একটি আবশ্যকীয় উপাদান। স্থির জলাশয়গুলির আদিবাসিন্দা বিভিন্ন প্রজাতির ছােটো ও মাঝারী আকারের মাছগুলি শুধুমাত্র উন্নতমানের সহজপাচ্য দেহসার প্রােটিনের উৎস হিসেবেই নয়, আমাদের শরীরে প্রয়ােজন পর্যাপ্ত পরিমাণ খনিজ পদার্থ যেমন ক্যালসিয়াম , আয়রণ, জিঙ্ক, আয়ােডিন, ফসফরাস এবং ভিটামিনের (A, D, E) নির্ভরযােগ্য উৎস হিসেবেও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

মৎস্যবিজ্ঞানীরা এমন মাছগুলিকে ‘Small Indigenous Fishes’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, সম্প্রতি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কৃত্রিম পদ্ধতিতে এইগুলির প্রণোদিত প্রজনন,বীজ উৎপাদন এবং পুকুরে অপরিণত দশগুলির প্রতিপালন এবং বাজারজাত অবস্থায় আনয়ন বিষয়ক সাফল্যমণ্ডিত পদ্ধতি প্রাণীউদ্ভাবন প্রাসঙ্গে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন।

পশ্চিমবঙ্গের পাহাড়ী অঞ্চলের শীতল জলাশয়, রাজ্যের মধ্য ও দক্ষিণ সমতল গাঙ্গেয়ভূমিতে এবং অন্যান্য অঞ্চলে বিভিন্ন নদী, উপনদী, খাল এবং স্থির জলাশয়সমূহ -সবকিছু মিলিয়ে রাজ্যে মােট
২৩৯ প্রজাতির মিঠা/স্বাদু জলের মাছ পাওয়া যায়।

আমাদের ভারতবর্ষে মােট ৭৬৫ প্রজাতির মিঠা/স্বাদু জলের মাছ পাওয়া যায়, এর মধ্যে মােট ৪৫০টি প্রজাতির মাছকে ‘Small Indigenous Species’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যেইগুলি নদী, নালা এবং ঘরােয়া স্রোতহীন/স্থির জলাশয়গুলিতে পাওয়া যায়, ছােট ও মাঝারী আকারের এবং পরিণত অবস্থায় দৈর্ঘ্যে ২৫-২৬ সেমি এর চাইতে বড় হয়না।

পশ্চিমবঙ্গ জীববৈচিত্র্য পর্ষদ থেকে প্রকাশিত ‘বাংলার মাছ’ নামক একটি পুস্তিকাতে পশ্চিমবঙ্গের পাহাড়ী অঞ্চলকে বাদ দিয়ে উত্তর-মধ্য ও দক্ষিণের জেলাগুলিতে মূলত উষ্ণ এবং মিঠা স্থির জলাশয় গুলিতে বসবাসকারী মােট ৪৪টি স্বদেশীয় মাছের শারীরিক বৈশিষ্ট্য, স্বভাব এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট সূচক তথ্য সুন্দরভাবে উপস্থাপিত করা হয়েছে। পাবদা, শিঙি , কই, ফলুই, তিতপুঁটি, সরপুটি, ন্যাদস, মৌরলা, দেশী ট্যাংড়া, কাকলেশ, রাইখর, পাঁকাল, শােল, ল্যাটা, বেলে, খােলসে, চাঁদা, চ্যালা এবং আরও অনেকে যেগুলির সঙ্গে আমরা তেমনভাবে পরিচিত নই-নদীর বড় বড় ক্যাটফিস এবং রুই কাতলার মতাে
এইগুলিও এখন বাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে, চাহিদাও উদ্ধমুখী এবং এইগুলির পুষ্টিগুণ রুই কাতলার চাইতে কিছু কম নয়।

দেশীয় ছােট মাছ
দেশীয় ছােট মাছ

পূর্ণ ভারতে এবং উত্তরপূর্ব ভারতে মোট ২১৬টি প্রতি Small Indigenous species’ এর খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। এমন মাছগুলির মধ্যে কই, শিঙি, মাগুর, শেল বায়ব শাসকার্য চালাতেপারে। এদের পুষ্টিগুন বা খাদ্যগুন নদীর বড় শুড়ওয়ালা ক্যাটফি ও রুই-কাতলা সহ অন্যান্য পােনা (কার্প গোত্রীয় মাছ) মাছের
চাইতে নিঃসন্দেহে অনেক বেশী।

এছাড়া এই মাছগুলির বাড় বৃদ্ধির হার প্রাথমিক পর্যায়ে রুই-কাতলা-মৃগেল মাছের চাইতে বেশী হয়। প্রত্যন্ত গ্রামে বহু দরিদ্র মানুষের বিভিন্ন প্রকার ডাল এবং শাকসব্জি ক্রয় করবার সামর্থ্য নেই-তারা স্থানীয় বিল , ঝিল অথবা শাখানদী থেকে এই সকল দেশীয় মাছ সংগ্রহ করে নিয়ে এবং রান্না করে খেয়ে শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির যোগান দেন।

এইভাবে শিশু, স্কুল পড়ুয়া এবং বয়স্ক মানুষজন অপুষ্টিজনিত অসুখের কবল থেকে মুক্তি পান। মৎসবিজ্ঞানীরা এমন মাছগুলিকে নামাঙ্কিত করেছেন ‘Rich food for poor man’।

লেখকঃ সুব্রত ঘােষ

ফিসারি ফিল্ড অ্যাসিসট্যান্ট, কুশমভি ব্লক।

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক এর মার্চ-এপ্রিল 2016 থেকে সংগৃহীত।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

পরিবেশ আন্দোলন ও পাখি বাঁচানাের আন্দোলনের কথা পর্ব ১

5 (1) ১৯৭২ এর জুন মাসে আন্তর্জাতিক শহর স্টকহােমে মানব পরিবেশ সম্মেলন গােটা বিশ্বের কাছে বিশ্ব পরিবেশ আন্দোলন হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে। স্টকহােম বা রিও ডি জেনেরিও সম্মেলনে পৃথিবীর প্রায় সবকটি দেশেরই রাষ্ট্রনায়করাই অংশগ্রহণ করেছিলেন। উক্ত সম্মেলনে একটি সনদ প্রকাশিত হয়েছিল, যার ২৬টি অনুচ্ছেদের প্রত্যেকটিই মানুষের জীবন-জীবিকা ও সুস্থ ভাবে […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: