সাপের টুকিটাকি

poribes news
5
(1)

সাপ

সাপ (Snake) পৃথিবীর বিচিত্রতম জীব। মাত্র দু’ অক্ষর দিয়ে তৈরি ‘সাপ’ কথাটি উচ্চারণের সাথে সাথে সাধারণত আমাদের সারা দেহ শিউরে ওঠে। অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী এই প্রাণীটি এতটাই ভীতি
সৃষ্টিকারী হিসেবে পরিচিত অন্তত বেশীরভাগ ক্ষেত্রে।

যদিও সাপ প্রাণীটি ভীষণ নিরীহ এবং শীতলাক্ত যুক্ত। এরা অল্পতেই পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং মানুষসহ অন্যান্য শিকারী প্রাণীদের শিকার হয়ে ওঠে। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় আমাদের দেশেই মানুষ মারা যান সর্পাঘাত জনিত প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষ কারণে। অথচ পৃথিবীতে নির্বিষ সাপের সংখ্যাই তাকে (শতকরা ৮৫ ভাগ) বেশি, বিষধর সাপের তুলনায়।

সাপ কামড়ানাের ঘটনার মধ্যে দুই তৃতীয়াংশেই ঘটে নির্বিষ সাপ থেকে। একটি সমীক্ষা বলছে, বিষাক্ত সাপে কামড়ালেও প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে সেরকম কোন বিষক্রিয়া হয় না। একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, যে প্রতি ১০টি কেউটে কামড়ানাে রােগীর মধ্যে মারা যাবার সম্ভাবনা মাত্র ১ জনের।

অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলেও সত্য, যে ভারতে গড়ে প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষে সাপ জনিত কারণে প্রতিবছর প্রায় ২৫,০০০ মানুষ মারা যান। এক্ষেত্রে, বেশিরভাগ মৃত্যুই হয় ভুল চিকিৎসা, কুসংস্কার ও সাধারণ মানুষের সাপ সম্পর্কে সঠিক ধ্যানধারণা না থাকায় । অথচ পৃথিবীতে অষ্ট্রেলিয়া মহাদেশেই সবচেয়ে বেশি পরিমাণে বিষধর সাপের বাস হলেও সেখানে মৃত্যু সংখ্যা অনেক কম।

জীব জগতে সাপের অবস্থান

সাপ সরীসৃপ শ্রেণীর অন্তগর্ত একটি প্রাণী। এই প্রাণীরা তাদের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের জন্য সরীসৃপ শ্রেণীর অন্যান্য সদস্যদের কাছ থেকে নিজেকে কিছুটা সরিয়ে রেখে একটি নির্দিষ্ট বিভাগ গঠন করতে সক্ষম হয়েছে।

সরীসৃপ (Reptilia) শ্রেণীর অন্তর্গত স্কোয়ামাটা (squamata)’ বর্গের অধীন ‘অফিডিয়া (Ophidia) উপবর্গের প্রাণী হচ্ছে এই সাপ।

সাপের সাধারণ শ্রেণীবিভাগ সাপকে সাধারণভাবে দু’ভাগে ভাগ করা হয়। যথা—বিষধর সাপ
নির্বিষ সাপ। বিষধর সাপ আবার দু’রকম— ক্ষীণবিষযুক্ত (যেমন- লাউডগা, কালনাগিনী, মেটেলি সাপ প্রভৃতি) ও উগ্রবিষযুক্ত।

উগ্রবিষযুক্ত সাপ আবার দু’ধরনের হয়– ফণাধর (কেউটে, গােখরাে/গােমা,শঙ্খচূড়) ও ফনাবিহীন (কালাচ, শাঁখামুটি,চন্দ্রবােড়া প্রভৃতি)।

সাপের অতীত ও বর্তমান

সাপ উভচর প্রাণীর পরবর্তী অন্ততঃ ১০ কোটি বছর পরে কার্বোনিফেরাস যুগে আবির্ভূত হয়। পরবর্তীকালে মেসােজোইক যুগে পরিপূর্ণরূপে আত্মপ্রকাশ করে। এই যুগকেই সরীসৃপদের স্বর্ণযুগ বলে।
প্রাচীনকাল থেকে কি ধর্মীয় কি রাজনৈতিক প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই সাপ

আমাদের সমাজ জীবনে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।  ‘পুরান, কোরান, বাইবেল, ইলিয়াড, ওডিসি সর্বত্রই সাপের উল্লেখ আছে। রামায়ণ, মহাভারত’,আধুনিক যুগের ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যেও সাপের অসংখ্য কাহিনীর কথা উল্লেখ রয়েছে। বিভিন্ন লেখক, কবির কল্পকাহিনী, কবিতা প্রভৃতিতেও সাপের যথেষ্ট পরিচিতির উল্লেখ আছে।

এই মুহূর্তে গােটা বিশ্বে প্রায় ৬০০০ প্রজাতির সরীসৃপ বেঁচে রয়েছে যার মধ্যে প্রায় ২৯০০ প্রজাতির সাপই রয়েছে – ১৮টি পরিবারের সদস্য হিসেবে। এর মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় ৩০০ প্রজাতির
সাপের দেখা মেলে।

অতীতে সরীসৃপ জাতীয় প্রাণীর মধ্যে কেবলমাত্র ডাইনােসররাই ছিল দীর্ঘাকার, বিশালাকার, বর্তমান পৃথিবীতে সরীসৃপদের মধ্যে সাপ দীর্ঘদেহী।

সাপ সম্বন্ধীয় কিছু উল্লেখযােগ্য তথ্য

পৃথিবীর দীর্ঘতম সাপ – গ্রীন অ্যানাকোন্ডা যা দক্ষিণ আমেরিকার ত্রিনিদাদ থেকে শুরু করে প্যারাগুয়ে পর্যন্ত পাওয়া যায় বিশেষ করে ভেনিজুয়েলা, মেক্সিকো প্রভৃতি দেশে। দৈর্ঘ্যে গড়ে প্রায় ৩৫ ফুটের ওপরে হয়। পুরানাে রিপাের্টে ৪৯ ফুট এমনকি ৮২ ফুট দৈর্ঘ্যেরও উল্লেখ রয়েছে।

ভারতের দীর্ঘতম সাপ ও পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের দীর্ঘতম সাপ হচ্ছে ভারতীয় অজগর বা Python molutus যার গড় দৈর্ঘ্য ৩০-৩২ ফুট হয়।

সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম সাপ ঃ পুঁয়ে সাপ / সাপ (Leptotyphlops spp) যার দৈর্ঘ্য ৮-১০ ইঞ্চির বেশি হয় না।

পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা বিষধর সাপ ও পেনিনসুলার টাইগারসাপ (Pen- insular Tiger Snake-Notechis scutatus) যা অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্র নিকটবর্তী অঞ্চলে পাওয়া যায়।

বিষধর সামুদ্রিক সাপঃ হাইড্রোফিস বেকবেকি(Hydrophis bechbeichei)

ভারতের সর্বাপেক্ষা বিষাক্ত সাপঃ শঙ্খচুড় বা কিং কোবরা (King Cobra)

যে দেশে / দ্বীপে একটিও সাপ নেই : হাওয়াই দ্বীপ (Hawai Island)

সাপের গড় আয়ু ঃ প্রজাতিভেদে ভিন্ন। তবে, সাধারণত ১০ থেকে ২০ বছর এরা বাঁচে।

যে সাপ ডিম পারে না বা সরাসরি বাচ্চা প্রসব করে চন্দ্রবােড়া, বালিবােড়া প্রভৃতি।

সাপের খাদ্য 

এরা সাধারণত অতিক্ষুদ্র পিপড়ের ডিম থেকে শুরু করে গরু মােষের বাচ্চা হরিণ এমনকি চিতা বাঘ, বণ্য শুকর পর্যন্ত খেতে পছন্দ করে।

গর্তবাসী ছোট ছােট অন্ধ সাপেরা (পুঁয়ে সাপ প্রভৃতি) প্রধানত পিপড়ে ও অন্যান্য পােকা-মাকড়ের ডিম খায়। এছাড়া উই, পিপড়ে, কেঁচো প্রভৃতি খেতেও এরা পটু। জলঢ়েড়া, মেটেলি প্রভৃতিরা প্রধানত মাছ, ব্যাঙাচি ও ছােট ছােট ব্যাঙ খায়। চন্দ্রবােড়া, দাঁড়াশ প্রভৃতি সাপ সাধারণত কীটপতঙ্গ, কাকড়া, কঁকড়া বিছা, ব্যাঙ, টিকটিকি, গিরগিটি, পাখি ও ডিম,ইদুর প্রভৃতি খায়।

শঙ্খচূড় ও শঙ্খিনী/শাঁখামুটি প্রধানত সাপই খায়। আবার, কিছু সাপ আছে যারা শুধুমাত্র বিষধর সাপ খায় (আমেরিকার সাপ)। অবশ্য চন্দ্রবােড়া অনেক সময় নিজের বাচ্চাকে খেয়ে নেয়।

একনজরে বাংলার সাপ

বাংলাতে অজস্র প্রজাতির সাপ পাওয়া যায়, যার মধ্যে নির্বিষ ও বিষধর উভয়ই রয়েছে। নিচে তালিকা আকারে এদের সাধারণ বাংলা, সাধারণ সম্ভাব্য ইংরাজী নাম ও বিজ্ঞানসম্মত নাম দেওয়া হল
মুসুরানা প্রজাতির

নির্বিষ সাপ

সাধারণ বাংলা নাম  সাধারণ ইংরাজী নাম বিজ্ঞানসম্মত নাম
পুঁয়ে  সাপ Blind Snake Typhlops braminus
হেলে সাপ  Buff Stripped keel back Natrix stolata
ঢোঁড়া সাপ  Checkered Keel back Natrix piscator
বেত আঁচড়া  Bronze back Tree Snake Ahactulla grandocullis
তিনদাগী সাপ Copper headed Trinket Snake Coelognathus radiatus
ঘরচিতি Common wolf Snake Olygodon venustus
বালিবোড়া Blunt failed Sand Boa Elyx conicus
তুতুর Rough Scaled Sand Boa  Elyx joni
দাড়াশ Rat Snake Plyas mulosus
ভারতীয় অজগর  indian Python Python molutus
মেন্টেলি  Indian Egg Eater Elachistodon westermanni

সামান্য বিযযুক্ত সাপ

 

সাধারণ বাংলা নাম  সাধারণ ইংরাজী নাম বিজ্ঞানসম্মত নাম
• লাউডগা Vine Snake Dryophis nasutus
কালনাগিনী Flying Snake Chrysopelea ornata
• গাংমেটে Dog Faced water Snake Cereberas phynchops

উগ্ৰ বিযযুক্ত সাপ

সাধারণ বাংলা নাম  সাধারণ ইংরাজী নাম বিজ্ঞানসম্মত নাম
• শঙ্খচূড় King Cobra Ophiophagus hannah
• গোখরো Common Cobra Naja naja
• কেউটে Indian Cobra Naja naja kaouthia
• কালাচ Common Krait  Bungarus caeruleus
• শাখামুটি/শঙ্খিনী Banded Krait Bungarus fasciatus
•  চন্দ্রবোড়া  Russel’s viper  Vipera russein
• গেছোবোড়া Pit Viper Green tree vipet Trimetesurus gfamineus

 

উগ্ৰ বিযযুক্ত সাপ

সাপ মাত্রই ‘বিষাক্ত’ বা ‘ক্ষতিকারক’ এই ধারণা যেমন ভুল, আবার সাম্প্রতিককালে এও প্রমাণিত যে বিষ বা ‘Venom’ সমস্ত সাপেরই থাকে কম আর বেশি। ফারাক এক জায়গায় তা হল – তথাকথিত বিষাক্ত সাপে অধিক মাত্রায় বিষের এবং বিষপাত (Fang) এর উপস্থিতি তাদেরকে ভয়ঙ্কর করে তুলেছে -বলতে গেলে এরাই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিষপাত (Fang) ও বিষ
বিষপাত (Fang) ও বিষ

 

বলাবাহুল্য, যে সমস্ত সাপে খুব অল্পমাত্রায় বিষ থাকে এবং যাদের বিষ নিষ্ক্রমণের জন্য কোনরকম বিষদাঁত’ থাকেনা তাদেরকেই আমরা ‘নির্বিষ সাপ হিসেবে ধরি… যারা কখনই ক্ষতি করে না।

সাপের ‘বিষ’ আদতে উৎসেচক সমেত দুই বা ততােধিক প্রােটিনের মিশ্রণ । অম্লধর্মী এই বিয়ে ভারী আণবিক গুরুত্বের উৎসেচক ও প্রােটিন অণুর সাথে কিছু পরিমাণে তামা (Cu), গন্ধক (S), দস্তা (Zn), অ্যান্টিমনি (Sb), আর্সেনিক (As) প্রভৃতি মৌল উপস্থিত।

উৎসেচক গুলাের মধ্যে প্রধানত প্রােটিনেজ, হায়ালুরােনিডেজ, ট্রান্স অ্যামিনেজ, অ্যাসিড ফসফাটেজ, এক্সেপেপটাইডেজ প্রভৃতি উপস্থিত।

এছাড়া এর মধ্যে কিছু অধিবিষ (Toxin) উপস্থিত যথা —নিউরােটক্সিন, হিমােটক্সিন, মায়ােটক্সিন
ইত্যাদি। এই অধিবিষ গুলােই লাল রক্ত কনিকা গুলােকে নষ্ট করে ফলে। রক্তের শ্বাসবায়ু (O2ও CO2) পরিবহন ক্ষমতা বিনষ্ট হয় –ফলস্বরূপ,শাসকষ্টে রােগী মারা যান।

অন্যদিকে, স্নায়ুতন্ত্রের ওপর কাজকরে, একে অকেজো করে তােলে।

উপরিউক্ত ধর্মের ওপর নির্ভর করে, সাপের বিষকে দুভাগে ভাগ করা হয়। যথা –

♦   হিমােটক্সিক (Haemotoxic)

♦  নিউরােটক্সিক (Neurotoxic)

ভাইপার জাতীয় সাপের বিষ হিমােটক্সিক প্রকৃতির, অপরপক্ষে গােক্ষুর বা কোবরা জাতীয় সাপের বিষ নিউরােটক্সিক যা স্নায়বিকতন্ত্রের উপর কাজ করে ভাইপার জাতীয় সাপের বিষ (চন্দ্রবােড়া, গেছােবােড়া প্রভৃতি) রক্ত সংবহন তন্ত্রের ওপর কাজ করে।

সাধারণতভাবে, সাপের বিষ সাপের খাদ্য পাচনে সাহায্য করে। উচ্চ আণবিক গুরুত্ব সম্পন্ন প্রােটিন সমৃদ্ধ ‘বিষ’কে আমাদের খাদ্যের প্রােটিন ভঙ্গক উৎসেচক হিসেবে ব্যবহার করাই যায় — শর্ত হচ্ছে আমাদের খাদ্যনালীতে কোন ক্ষত রাখা চলবে না।

ঋতুভেদে বিয়ের সান্দ্রতা (Viscocity) হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে এর তীব্রতারও হেরফের হয়। প্রাণীভেদে
প্রতিরােধ ক্ষমতা আবার বিভিন্নরকম। বিড়াল, ব্যাঙ প্রভৃতি বেশিমাত্রায় বিষ সহ্য করতে পারে। বেজি মানুষের চাইতে অন্তত ১০ গুণ বেশি বিষ সহ্য করতে পারে।

সাপের বিষ সম্পর্কে আর একটি উল্লেখযােগ্য বিষয় হল পর্যাপ্ত পরিমাণে বিষ ঢালতে না পারলে তেমন মারাত্মক বিষক্রিয়া হয় না। এই বিষ ঢালতেও সাপেদের প্রয়ােজনীয় অনুকূল পরিবেশ দরকার
যা সবসময় পাওয়া যায় না।

 নির্বিষ ও বিষধর সাপের ক্ষত চিহ্নের পার্থক্য

নির্বিষ কিংবা বিষধর সাপে কামড় দিলে ক্ষতস্থানের চিহ্ন দেখে সহজেই বােঝা যাবে যে, সাপটি বিষধর না নির্বিষ এবং সেই বুঝে প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।

নির্বিষ সাপের ক্ষেত্রে নির্বিষ সাপে কামড়ালে ক্ষতস্থানে অতিক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কতকগুলি দাঁতের সারি সমান্তরালভাবে পাওয়া যায়। স্থানটি সহজে ফুলে ওঠে না।

 

নির্বিষ ও বিষাক্ত সাপের কামড়ের ক্ষতচিহ্ন
নির্বিষ ও বিষাক্ত সাপের কামড়ের ক্ষতচিহ্ন

 

বিষধর সাপের ক্ষেত্রে : বিষাক্ত সাপে কামড়ালে ক্ষতস্থানটি তৎক্ষণাৎ, ফুলে উঠবে। ক্ষতস্থানে এক বা দুটি বড় বড় ক্ষত চিহ্ন থাকবে, রক্ত ঝড়বে। সাথে আনুষঙ্গিক উপসর্গ তাে থাকবেই। দাঁতের কোন সমান্তরাল সারি পাওয়া যায় না। দুটি চিহ্নের মাঝখানে মােটামুটি ১ ইঞ্চি ফারাক থাকে।
এটা খুব সত্য যে আজও সাধারণ মানুষ বিশেষ করে গ্রামীন এলাকায় বসবাসকারী মানুষ অজ্ঞানতার বশবর্তী হয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা (চিকিৎসা) গ্রহণ করতে পারেন না। নির্ভর করতে হয় ঝাড়ফুক, তুক্তা প্রভৃতির উপর। পরিণতিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মৃত্যু ঘটে।

সাপে কামড়ালে নিম্নলিখিত বিষয়গুলাের প্রতি নজর দেওয়া দরকার

• সর্পাহত রােগীকে নড়তে চড়তে দেওয়া উচিৎ নয়। ক্রমাগত সাহস দিয়ে যেতে হবে।

• যত দ্রুত সম্ভব একটা হালকা বাঁধন দিতে হবে, হাতে কামড়ালে বাহু্ক মাঝখানে, পায়ে কামড়ালে উরুর যত ওপরে সম্ভব।
মনে রাখতে হবে, বাঁধন দেওয়াটা খুব বেশি বিজ্ঞানসম্মত নয়, কারণ, বাঁধন দিলেও বিষ রক্তের সাথে বেশ ভালাে বেগেই মিশে যায়। অনেক ক্ষেত্রে, উল্টে ফলই হয়। শক্ত বাঁধনের জন্য দেহ কোষে অক্সিজেন
সরবরাহ কমে যায় ফলে বিষ রক্তে বেশি মেশার সুযােগ পায়। এছাড়া ‘গ্যাংগ্রিন’ হয়ে জায়গাটিতে পচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বাঁধন দেওয়াটা। শুধুমাত্র মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে রােগীকে শক্তি জোগায় মাত্র।

• বাঁধন দিলেও ২০ মিনিট অন্তর ২-৩ মিনিটের জন্য খুলে দিতে হবে। আবার, কোনমতেই দেড় ঘণ্টার বেশি রাখা চলবে না ।

• কামড়ানাে জায়গাটা কখনই কাটা, চেরা উচিৎ নয়।

• ক্ষতস্থান থেকে বিষ টেনে আনার রীতি সােনালী ও রুপােলী পর্দায় মাঝে মধ্যে ভেসে উঠলেও বাস্তবে এই পদ্ধতি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

• কামড়ানাে জায়গাটা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মুছে হাল্কা ব্যান্ডেজ বাঁধা যেতে পারে। তারপরই বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে রােগীকে নিকটবর্তী কোন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বা হাসপাতালে (যেখানে অ্যান্টিভেনিন মজুত আছে) নিয়ে যেতে হবে।

সাপ সংরক্ষণ করাটা কেন জরুরী

সাপের গুরুত্ব মানবজীবনে অপরিসীম। পরােক্ষ এবং প্রত্যক্ষভাবে সাপ আমাদের এবং প্রতিটি জীবের নানানভাবে উপকারে আসে। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে এদের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

সাপের বিষ থেকে ওষুধ তৈরি

 

সাপের বিষ থেকে ওষুধ তৈরী হয়
সাপের বিষ থেকে ওষুধ তৈরী হয়

♦ সাপের বিষ থেকে জীবনদায়ী ‘অ্যান্টিভেনিন’ নামক ওষুধ তৈরি হয়। এর সাহায্যে সাপে কাটা (বিষধর) রােগীকে বাঁচানাে হয়।

♦ সাপে কাটা রােগীর একমাত্র ওষুধ এই ‘অ্যান্টিভেনিন’ ভারতে হফকিন্স ইন্সটিটিউট, মুম্বাই এবং কাসুলি কেন্দ্রীয় গবেষণা সংস্থায় বর্তমানে তৈরি হয়।

♦ বেঙ্গল কেমিক্যাল, কলকাতা সহ আরও তিনটি ইউনিট এখন বন্ধ আছে; তার কারণ, যে নিয়ম মেনে এই ওষুধ তৈরির কথা সেই নিয়ম মানা হচ্ছিল না দেখে ভারতের ‘ওষুধ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (Drug control of
India) এটিকে আপাতত বন্ধ রেখেছে।

♦ উল্লেখ্য, যে সহনমাত্রার বিষ ঘােড়ার দেহে ঢুকিয়ে, ঘােড়ার দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি করা হয়। এরপর
নির্দিষ্ট দিনের ব্যবধানে ঘােড়ার রক্তের ‘সিরাম’ সংগ্রহ করে লায়ােফিলাইজড় পদ্ধতিতে শুকিয়ে পাউডার আকারে এই অ্যান্টিভেনিন তৈরি হচ্ছে এখন। এই পাউডারকে ৫ বছর পর্যন্ত ‘হিম তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা যায়।

সহনমাত্রার বিষ ঘােড়ার দেহে ঢুকিয়ে, ঘােড়ার দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি করা হয়।
সহনমাত্রার বিষ ঘােড়ার দেহে ঢুকিয়ে, ঘােড়ার দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি করা হয়।

 

তবে, চাহিদা ও যােগানের মধ্যে বিস্তর ফারাক দূর করতে এখনই সুনির্দিষ্ট নির্ধারিত নিয়ম মেনে বন্ধ ইউনিট গুলাে চালু করা দরকার।

♦ সাপের বিষ থেকে পেশি-সংক্রান্ত বিভিন্ন রােগের ওষুধ, বেদনানাশক বিভিন্ন ওষুধ, স্নায়বিক কুষ্ঠরােগের বিশেষ ওষুধ তৈরি হয়। হিমােফিলিয়া রােগীর ক্ষতস্থান থেকে রক্তপাত বন্ধ করার জন্য চন্দ্রবােড়া
জাতীয় সাপের বিষ ব্যবহৃত হয়।

♦  শুধু তাইনয়, রেটিনা, জরায়ুর রক্তক্ষরণ, দাঁতের গােড়া থেকে রক্তক্ষরণ বন্ধেও সাপের বিষ ব্যবহৃত হয়। কলেরা, টিউমার নিরাময়েও এর ভূমিকা উল্লেখযােগ্য।

সাপের বিষের ওষুধ Antivenom সম্বন্ধে উল্লেখযােগ্য তথ্য

♦ ভারতে প্রথম গােক্ষুর/গােমা (Cobra) জাতীয় সাপের

অ্যান্টিভেনিন
অ্যান্টিভেনিন

তৈরি করা সম্ভব হয় ১৯০৪ সালে।
১৯৪০ সাল পর্যন্ত শুধুমাত্র গােক্ষুর/ গােমা এবং চন্দ্রবােড়ারই অ্যান্টিভেনিন তৈরি হতাে আমাদের
দেশে।

 

♦ বর্তমানে ‘Poly valent Antivenom’তৈরি করা হয় যাতে Big Four’ অর্থাৎ প্রধান চারটে সাপের বিষ ব্যবহৃত হয়(গােঙুরের সবকটি প্রজাতি, কালাচ, চন্দ্রবােড়া এবং করাতের মত আঁশযুক্ত বােড়া সাপ) কারণ,
ভারতে শতকরা ৯০ ভাগ সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটে এই সাপগুলাে থেকেই।

♦ তবে এটাও ঠিক যে, ভারতে এখনও পর্যন্ত শঙ্খিনি, অন্যান্য করেত সাপ, শঙ্খচূড়, । সামুদ্রিক সাপ, প্রবাল সাপ প্রভৃতির কোন অ্যান্টিভেনিন তৈরি হয় না।

ইঁদুর পেস্ট দমনে সাপ

কৃষিক্ষেত্রে ইঁদুর একটি অত্যন্ত ক্ষতিকারক ‘জীব’ যাকে পেস্ট হিসেবে ধরা হয়। এর নিয়ন্ত্রণ করার বহু চেষ্টা করা সত্ত্বেও, এর বাড়বাড়ন্ত কমছেনা। ফলস্বরূপ, পরােক্ষে এবং প্রত্যক্ষভাবে আমাদের
ফসলের ক্ষতি করে। চাষী ভাইদের রাতের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে।

পৃথিবীতে উৎপন্ন খাদ্যশস্যের অন্তত ১০ শতাংশ নষ্ট করে এই ইদুর।এই ইদুর নিয়ন্ত্রন করে সাপ।
পৃথিবীতে উৎপন্ন খাদ্যশস্যের অন্তত ১০ শতাংশ নষ্ট করে এই ইদুর।এই ইদুর নিয়ন্ত্রন করে সাপ।

গুদামজাত শস্যও এরা ব্যাপক পরিমাণে ধ্বংস করছে। এছাড়া অন্যান্য ভয়ানক রােগ (যেমন- প্লেগ) তাে ছড়াচ্ছেই এই ইঁদুর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে ১৮৯৮ সালে থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এদেশে ‘প্লেগে আক্রান্ত হয়ে আনুমানিক ২,৪৭,০১৫ জন মানুষ মারা গেছেন।

ভারতে গড়ে প্রতিবছর ৭৫০০-৮০০০ কোটি টাকার বেশি খাদ্যশস্য নষ্ট করে এই ইঁদুর। সমীক্ষা বলছে, সারা পৃথিবীতে উৎপন্ন খাদ্যশস্যের অন্তত ১০ শতাংশ নষ্ট করে এই ইদুর।

এই ইদুরকেই খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে আমাদের খাদ্যের নিশ্চিত যােগান দিতে নীরবে সাহায্য করে যাচ্ছে এই সাপ।

সেই হিসেব ধরলে, ইঁদুর থেকে মানব সমাজের যা ক্ষয়ক্ষতি হয় (ফসল ধ্বংস ও মৃত্যু-বিভিন্ন মহামারী রােগের বাহক হিসেবে) তার চাইতে প্রতিবছর অনেক কম। ক্ষতি করে সাপে (সাপের কামড়ে
মৃত্যুজনিত কারণে)।

অন্যান্য প্রয়ােজনে সাপ

প্রতিবছর ভারত থেকে প্রচুর সাপ ও সাপের চামড়া বিদেশে সরকারীভাবে রপ্তানী করা হয় যার
বিনিময়ে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। অর্জন করা যায়। সাপের চামড়া দিয়ে প্রচুর শৌখিন রকমারি দ্রব্য
তৈরি হয়।

বেদে এবং সাপুড়িয়া বা সাপের ওপর নির্ভর নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করে (যদিও মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এখন আর সেরকমভাবে সাপেদের নিয়ে এরা সম্পূর্ণরূপে জীবিকা অর্জন করতে পারছে না)।

ভারতে বহু প্রাচীন আদিবাসী জনগােষ্ঠী (ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চল, মধ্য প্রদেশের আদিম গােষ্ঠী) সাপকে মাংস হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। মহারাষ্ট্র, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্নাটক, তামিলনাড়ুতে ইরুলা’জনগােষ্ঠী
এদের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।

ভারতের প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে সাপের চর্বি ব্যবহারের উল্লেখ আছে এবং অনেক অঞ্চলে ব্যথা- বেদনা নাশক হিসেবে এখনও সাপের তেল ব্যবহৃত হয়।

ভারতের বাইরে, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে, যেমন-মায়ানমার, চিন, কোরিয়া,
হংকং, থাইল্যান্ড এবং আমেরিকায় সাপের মাংস খুবই জনপ্রিয়।

আমেরিকা সহ ইউরােপের আরও অন্যান্য দেশে ক্ষুধা উদ্রেককারী হিসেবে সাপের মাংস ব্যবহৃত
হয়।

সর্বোপরি, সাপ বাস্তুতন্ত্রের অন্যতম সদস্য, খাদ্যশৃঙ্খলের মধ্য দিয়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায়
রাখতে সাহায্য করে। বহুপ্রাণী যেমন- ময়ূর, চিল, ঈগল, পেঁচা খাদ্যের ব্যাপারে এদের উপর
নির্ভরশীল।

আবার, অনেক সাপের খাদ্যই হল সাপ।

ডঃ রাজা রাউত

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক থেকে সংগৃহীত।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

HIV বা এইডস

5 (1) আমাদের মতো দেশে AIDS মানে, একটা রোগ যার বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মিথটা অনেকবেশি ! HIV আক্রান্ত মানুষ মানেই কেমনটা অস্পৃশ্য বিষয় কেউ সেই বিষয় নিয়ে কথা বলবে না । আসলে আমাদের অজ্ঞতাই HIV আর যৌনতা বিষয়টিকে মিলিয়ে এক করে দিয়েছে ; আমরা মানতেই চাই না যে,এটাও একটা সাধারণ […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: