হেপাটাইটিস

5
(2)

হেপাটাইটিস

প্রতি বছর ২৮ শে জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালিত হয়, যার উদ্দেশ্য হল বিশ্ব জুড়ে হেপাটাইটিস রোগ-নির্ণয় ও চিকিৎসার মাধ্যমে প্রতিরোধ এবং সচেতনতা গড়ে তোলা । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পৃথিবীব্যাপী ভাইরাস ঘটিত হেপাটাইটিস নির্মূল করার, যে কর্মসূচি (২০৩০-এর মধ্যে ) গৃহীত হয়েছে ; সেই সংকল্প সফল করতে এই বিশেষ দিবসের কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে । এই কর্মসূচির ফলে নতুন করে হেপাটাইটিসের সংক্রমণ ৯০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং হেপাটাইটিসের ফলে মৃত্যুর হারও ৬৫ শতাংশ কমেছে ।

হেপাটাইটিস কি?

 হেপাটাইটিস বলতে যকৃতের প্রদাহ অর্থাৎ ফুলে যাওয়াকে বোঝায় ।হেপাটাইটিস হলো ভাইরাস ঘটিত সংক্রমনের ফলে হওয়া, যকৃতের একটি রোগ। হেপাটাইটিস কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু উপসর্গসহ বা সম্পূর্ণ উপসর্গহীনও হতে পারে । তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে জন্ডিস, অ্যানরেক্সিয়া অর্থাৎ ক্ষুধমান্দ্ , ক্লান্তি, বমি বমি ভাব ও অসুস্থতাবোধ ইত্যাদি হলো হেপাটাইটিসের সাধারণ উপসর্গ।

যকৃতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল, রক্তে লোহিত কণিকার আয়ু শেষ হলে, তার অন্তর্গত বিলিরুবিনকে দেহ থেকে নিষ্কাশিত করা। হেপাটাইটিস ভাইরাসের ফলে যকৃতের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়। ফলে রক্তে বিলিরুবিনের পরিমাণ বেড়ে যায়। এতে দেহ হলদেটে হয়ে পড়ে।এই জন্য একে পান্ডু রোগও বলা হয় ।

হেপাটাইটিসের কারণ

লিভারে প্রধানত ভাইরাসের সংক্রমণের ফলেই এই রোগ হয়। রোগের কারণ রূপে মোট পাঁচটি ভাইরাস, যাথাক্রমে হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি, ই-কে চিহ্নিত করা গেছে ।

• হেপাটাইটিস এ এবং ই সংক্রামিত হয় খাদ্য এবং পানীয়ের,আক্রান্তের মল মূত্র, জলের মাধ্যমে।

• হেপাটাইটিস বি, সি, ডি সংক্রামিত হয় মূলত, অসুরক্ষিত যৌন সংসর্গ, দেহ তরল ,ব্লাড ট্রান্সফিউশন এবং একাধিক বার ব্যবহৃত একই ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ, ব্যবহারের মাধ্যমে।

হেপাটাইটিস-কিভাবে-ছড়ায়
হেপাটাইটিস কিভাবে ছড়ায়

• এছাড়াও শরীরে ট্যাটু আঁকার সময়েও সতর্কতার অভাবে এই ভাইরাস দেহে প্রবেশ করতে পারে।

• সংক্রামিত মায়ের দেহ থেকে সদ্যজাত শিশুরও সংক্রমণ হতে পারে ।

• এছাড়াও হেপাটাইটিস এনাপ্লাজমা, নোকার্ডিয়া এই জাতীয় নানা ধরণের ব্যাকটেরিয়ার কারণেও সংক্রমণ হতে পারে।

• বিভিন্ন নেশার বস্তু, মাদক সেবন ,মদ্যপানের মাধ্যমে শরীরে অতিরিক্ত অ্যালকোহলের কারনে হেপাটাইটিস হতে পারে ।

• অটো ইমিউন অবস্থা অর্থাৎ লুপাস এরিথম্যাটোসাস, দেহ নিজেই লিভারের অ্যান্টিজেন তৈরী করতে পারে যা হেপাটাইটিস সৃষ্টি করে ।

 

হেপাটাইটিসের রোগলক্ষণ :

• হেপাটাইটিস রোগের প্রাথমিক উপসর্গ হিসেবে সাধারণ

• চোখ , চামড়া,জিহ্বা হলুদ হয়ে যাওয়া

• জ্বরে ঠান্ডায় কাঁপুনি

• খিদে না পাওয়া

• ক্লান্তি

hepatitis-silent-killer
Hepatitis

• জ্বরজ্বর ভাব

• শরীরে ব্যথা

• পেশী ও গাঁটের ব্যথা

• উচ্চ তাপমাত্রা অর্থাৎ ৩৮ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেট তারও বেশী তাপমাত্রা

• সারাক্ষনের এক অসুস্থ বোধ

• মাথা ব্যথা

ইত্যাদি রোগ লক্ষণ দেখা যায় ।

দীর্ঘমেয়াদী হেপাটাইটিসের লক্ষণের : পরবর্তী স্তরে অবশ্য জন্ডিস, চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া, তীব্র জ্বর, অস্থিসন্ধিতে যন্ত্রণা, গাঢ় বর্ণের প্রস্রাব, হহালকা ধূসর বর্ণের মল, বমি বমি ভাব ও বমি, গা চুলকানি, পেট ব্যথা, গায়ের রং ফ্যাকাশে হওয়া ইত্যাদির মতো রোগলক্ষণ দেখা দেয় । এছাড়াও অহেতুক ক্লান্ত বোধ,হতাশা বা বিষণ্নতা, স্থায়ী অসুস্থতার সাধারণ অনুভূতি প্রভৃতিও পরিলক্ষিত হয় ।

হেপাটাইটিসের প্রকারভেদ 

ভাইরাসের সংক্রমণের ফলে হেপাটাইটিস সাধারণত পাঁচ প্রকারের হয় ।

হেপাটাইটিস্ এ

হেপাটাইটিস বি

হেপাটাইটিস সি

হেপাটাইটিস ডি

হেপাটাইটিস্ ই

এছাড়াও দুটি বিশেষ প্রকার রয়ে ছে । যা আনুষঙ্গিক কারণে হয় ।

 

হেপাটাইটিস্ এ

হেপাটাইটিস – এ রোগটির কারণ হল হেপাটাইটিস্ এ (HAV) ভাইরাস। এটি সবচেয়ে পরিচিত হেপাটাইটিস্ রোগ।

হেপাটাইটিস্ এ কিভাবে ছড়ায়

এটি সাধারণত সেইসব জায়গায় দেখা যায় যেখানে স্যানিটেশন ও বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা খুব খারাপ। সাধারণত দূষিত খাদ্য ও জল-আহারের,আক্রান্তের মল-মূত্রের মাধ্যমে এর সংক্রমণ ঘটে। এটি স্বল্পমেয়াদি রোগ, যার রোগ লক্ষণ সাধারণত তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে চলে যায়।

হেপাটাইটিস্ এ প্রতিরোধের উপায়

বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যাবস্থা, স্যানিটেশন ও বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা ঠিক করলেই হেপাটাইটিস্ এ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

টিকাকরনের মাধ্যমেও হেপাটাইটিস এ প্রতিরোধ করা যায়। সংক্রমণের সম্ভাব্য স্থানগুলোতে যেমন; ভারতীয় উপমহাদেশ, আফ্রিকা, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, দূরপ্রাচ্য এবং পূর্ব ইউরোপে যারা ভ্রমন করেন, তাদেরকে ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস রোগের টিকা নেওয়ার ফলে কিন্তু রোগের সম্ভবনা অনেকটাই কমানো যেতে পারে ।

হেপাটাইটিস বি

হেপাটাইটিস্ বি রোগটির কারণ হল হেপাটাইটিস্ বি (HBV) ভাইরাস।

হেপাটাইটিস্ বি কিভাবে ছড়ায়

রক্ত ও বীর্য এবং যোনি তরলের মত শারীরিক তরলের মাধ্যমে আক্রান্ত-এর থেকে এটি সংক্রমিত হয়। এটি সাধারণত অসুরক্ষিত যৌন মিলন ,এক ইনজেকশনের সিরিঞ্জ-এর একাধিকবার ব্যবহার, রক্ত সঞ্চারণ ইত্যাদির মাধ্যমে, সংক্রমিত হয়। ড্রাগ ব্যবহারকারীদের মধ্যে এটি সাধারানত বেশি মাত্রায় ঘটে। এই রোগটি সাধারণত ভারতবর্ষ, মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকায় হয়ে থাকে।

সারা পৃথিবীতে প্রায় 350 মিলিয়ান লোক এই ভাইরাসে আক্রান্ত ।  অল্প সংখ্যক মানুষের মধ্যে অবশ্য এর সংক্রমণ দীর্ঘমেয়াদী হয়, যাকে বলা হয় দীর্ঘমেয়াদী (ক্রনিক ) হেপাটাইটিস বি।

হেপাটাইটিস বি’র টিকা পাওয়া যায়।

ড্রাগ ব্যবহারকারী ও ঝুঁকিসম্পন্ন অঞ্চলে যেখানে রোগের প্রকোপ রয়েছে সেই সব অঞ্চলে, যাঁরা বসবাস করেন তাঁদেরকে বাধ্যতামূলক ভাবে টিকাকরণ করানো উচিত ।

বিভিন্ন ধরনের ভাইরাল হেপাটাইটিসের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক হল হেপাটাইটিস বি এবং সি। কারণ এই দু’ধরনের ভাইরাস থেকে সংক্রমণ হলে সেটা থেকে, ক্রনিক হেপাটাইটিস পর্যন্ত হতে পারে। যা পুরোপুরি নিরাময় করা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না।

ক্রনিক হেপাটাইটিস থেকে লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যানসার হওয়ারও আশঙ্কা দেখা যায় । সঠিক সময়ে ধরা পড়লে কিন্তু হেপাটাইটিস বি নিরাময় করা সম্ভব, কিন্তু সমস্যার সৃষ্টি হয় , উপসর্গ ঠিক সময়ে ধরা না পড়ার ফলে । চিকিৎসা দেরিতে শুরু হলে সমস্যা জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং রোগ নিরাময় না হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে ।

হেপাটাইটিস বি-এর সংক্রমণকে দু- ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- অ্যাকিউট বা তীব্র সংক্রমণ এবং ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ।

কোনও রোগী যখন প্রথম বার হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত হন, তখন সেটিকে অ্যাকিউট হেপাটাইটিস বলে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে বলা যায়, প্রায় ৯০ শতাংশ আক্রান্ত মানুষ ওষুধের দ্বারাই সংক্রমণ মুকক্ত হয়ে যান । এ ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে হেপাটাইটিস বি-এর অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, যা তাকে পুনরায় সংক্রমণ হওয়ার থেকে রক্ষা করে।

কিন্তু হেপাটাইটিস ভাইরাসটিই যদি দীর্ঘমেয়াদি অর্থাৎ ছ’মাসেরও বেশি সময় ধরে রক্তে থাকে,বলাই বাহুল্য সেটা ক্রনিকে পরিণত হয় । হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সাধারণত ৫-১০ শতাংশ রোগী ক্রনিক হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

ক্রনিক হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে অনেক সময়ে যকৃত ভীষণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।অনেক সময়েই অ্যাকিউট হেপাটাইটিস ধরা পড়ে ন, ফলে যখন রোগ নির্ণয় করা হয়, তখন দেখা যায়, সেটি ক্রনিকে পরিণত হয়েছে ইতিমধ্যেই ।

অনেকের আবার লিভার সিরোসিস হওয়ার পরেও ধরা পড়ে। তবে যদি চিকিৎসা হয়, সেক্ষেত্রে রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা যায় এবং নিরাময়ও সম্ভব হয় ।

কিন্তু চিন্তার বিষয়টি হলো, ক্রনিক হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে হেপাটোসেলুলার কার্সিনোমা অর্থাৎ যকৃত-এর ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা থাকে । হেপাটাইটিস সি হলেও লিভার ক্যানসার হওয়ার ভয় থেকে যায় ।

হেপাটাইটিস বি নিরাময়ের উপায় :

হেপাটাইটিস বি ধরা পড়লে অনতিবিলম্বে চিকিৎসা শুরু করা প্রয়োজন। অ্যাকিউট হেপাটাইটিসও ওষুধ এবং ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব । নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করে দেখতে হবে যে, হেপাটাইটিস বি-এর রিপোর্ট নেগেটিভ হয়েছে অর্থাৎ রক্তে ভাইরাস (HBV) অনুপস্থিত ।

এছাড়াও পুরোপুরি সুস্থ হলেও, সংযত জীবন যাপন ও চিকিৎসকের পরার্মশ মেনে চলতে হবে।
ক্রনিক হেপাটাইটিসের চিকিৎসা নিয়মিত চালিয়ে যেতে হবে । সেই সঙ্গে রোগীর সম্পূর্ণ বিশ্রাম এবং রোগীর পথ্যতে নজর দিতে হবে।

হেপাটাইটিস বি-এর টিকাকরন

হেপাটাইটিস বি-এর টিকাকরন হয়ে থাকলে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় থাকে না বললেই ।

হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে টিকার প্রথমে তিনটি ডোজ় এক মাস অন্তর দিতে হয়।

চতুর্থ টিকা দিতে হয় প্রথম ডোজ়ের ঠিক এক বছর পরে।

পাঁচ বছর পরে নিতে হয় বুস্টার ডোজ়।

এর ফলে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের বিপক্ষে অ্যান্টিবডি গড়ে ওঠে শরীরে।

টিকা নেওয়া থাকলে পরবর্তীতে যে কোনও বয়সেই এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা খুব একটা থাকে না ।

হেপাটাইটিস সি

হেপাটাইটিস্ সি রোগটির কারণ হল হেপাটাইটিস্ সি (HCV) ভাইরাস।

হেপাটাইটিস্ সি কিভাবে ছড়ায়

এটি সাধারণত রক্তে ও সংক্রামিত ব্যক্তির লালারস, বীর্য বা যোনি তরলে পাওয়া যায় এবং সেখান থেকেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে । এটি যেহেতু রক্তে পাওয়া যায় তাই আক্রান্ত ব্যাক্তির রক্ত থেকে রক্ত সঞ্চারনের মাধ্যমে এই রোগটি ছড়ায়।

এই রোগের লক্ষণগুলো অনেকটা সাধারণ জ্বর বা ফ্লুয়ের মতো, ফলত ; অনেকে সাধারণ জ্বরের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। অনেক রোগীই নিজে থেকে এই সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারেন এবং ভাইরাসমুক্ত হয়ে ওঠেন।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভাইরাসটি দীর্ঘ বেশ কয়েক বছর থেকে যেতে পারে, সেক্ষেত্রে একে বলা হয় দীর্ঘমেয়াদী হেপাটাইটিস সি।

দীর্ঘমেয়াদী হেপাটাইটিস সি-তে যাঁরা ভুগছেন তাঁরা অ্যান্টিভাইরাল কিছু মেডিক্যাল ড্রাগ নিতে পারেন, কিন্তু সেক্ষেত্রে বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে ।

হেপাটাইটিস সি-এর নির্দিষ্ট কোন টিকা এখনও পাওয়া যায় না । বর্তমানে মার্কিনযুক্ত রাষ্ট্রে 2.7 থেকে 3.9 মিলিয়ান মানুষ হেপাটাইটিস সি রোগে ভুগছেন ।

হেপাটাইটিস ডি

হেপাটাইটিস্ ডি রোগটির কারণ হল হেপাটাইটিস্ ডি (HDV) ভাইরাস। এদের ডেল্টা হেপাটাইটিসও বলা হয় l একমাত্র যাঁদের হেপাটাইটিস্ বি হয়েছে তাঁদের মধ্যে এটিও একই সঙ্গে, দেখা দিতে পারে। একমাত্র হেপাটাইটিস বি-এর সঙ্গে হেপাটাইটিস্ ডি ভাইরাসও আক্রান্ত রোগীর, দেহের মধ্যে বাঁচতে পারে। আমেরিকার এই রোগ প্রচুর সংখ্যায় দেখা যায় !

হেপাটাইটিস্ ই

হেপাটাইটিস্ ই রোগটির কারণ হল হেপাটাইটিস ই(HCV ) ভাইরাস। এটি হল স্বল্পস্থায়ী ও এর তীব্রতা কম। এক্ষেত্রে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির সংক্রমণ কম। এটি জল বাহিত হেপাটাইটিস, আক্রান্তের মল মূত্র থেকে রোগ ছড়ায়, জল থেকেও কন্টামিনেশন হয় l এই তৃতীয় বিশ্বের রোগ ,মধ্য প্রাচ্য ,আফ্রিকায় বেশি মাত্রায় দেখা যায় l

এছাড়াও কয়েকটি প্রকার হেপাটাইটিস :

অটোইমিউন হেপাটাইটিস

এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদী রোগ নয়। এক্ষেত্রে অনাক্রম্যতাতন্ত্র নিজেই যকৃতের ক্ষতিকারক অ্যান্টিজেন তৈরী করে,দেহের ক্ষতি করে যেমন, শ্বেত রক্ত কণিকা যকৃতের মধ্যে আক্রমনণ ঘটায়। এরফলে যকৃতের কর্মক্ষমতাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

এই রোগটির সঠিক কারণ নির্দিষ্ট করে, এখনও পর্যন্ত জানা যায়নি। এর উপসর্গগুলোর মধ্যে পড়ে ক্লান্তি, লোয়ার অ্যাবডোমেনে ব্যথা,দেহের অস্থি সন্ধিতে ব্যথা, জন্ডিস- এর প্রভাব প্রকট হতে থাকে চোখ ও চামড়ায় হলুদাভ বর্ণ ধারণ ও সিরোসিস ।

স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ ক্রমশ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যকৃতের প্রদাহ ও ফোলা কমাতে পারে এবং রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের মধ্যে এই রোগটি প্রায় তিনগুন বেশি মাত্রায় দেখা যায় l

অ্যালকোহলজনিত হেপাটাইটিস

প্রচুর পরিমাণে মদ্যপান করলে এই রোগ হতে পারে । অতিরিক্ত পরিমাণে মদ্যপানের ফলে যকৃত ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আস্তে আস্তে হেপাটাইটিস রোগের আকার ধারণ করে ।এই হেপাটাইটিসের কোনো উপসর্গ দেখা যায় না, কেবল রক্ত পরীক্ষার দ্বারাই রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হয় । অ্যালকোহলজনিত হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হওয়া সত্বেও কোনো ব্যক্তি যদি মদ্যপান চালিয়ে যায় তবে , মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে ! সিরোসিস ও যকৃতের ক্রিয়া সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ হয়ে যেতে পারে ।

সংক্রমণের ইনকিউবেশান পিরিয়ড 

অনেক সময়েই দীর্ঘ দিন এই রোগের কোনো রূপ উপসর্গই প্রকাশ পায় না। সংক্রমণের পরে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে ৩০ থেকে ১৮০ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে ।

তীব্রতা অনুসারে দুধরণের হেপাটাইটিস দেখা যায় :তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী ( অর্থাৎ অ্যাকিউট এবং ক্রনিক) তীব্র হেপাটাইটিস কোনো কোনো, ৬ মাসেরও কম স্থায়ী হয়, অন্য দিকে দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস দীর্ঘ দিন ধরে চলতে থাকে। মূলত হেপাটাইটিস ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে এই রোগটি হয় , কিন্তু এছাড়াও জীবন যাপন যেমন বিভিন্ন প্রকার নেশা ,ধূমপান , অ্যালকোহল, নির্দিষ্ট কিছু মেডিক্যাল ড্রাগ অর্থাৎ ওষুধ, ইত্যাদির কারণে এই রোগটি হতে পারে ।

হেপাটাইটিস রোগ নির্ণয় :

হেপাটাইটিস রোগ নির্ণয় বায়োকেমিক্যাল মূল্যায়নের মাধ্যমে করা হয়ে থাকে।রক্ত পরীক্ষার মাধমেই এটি সম্পাদিত হয় ।

প্রাথমিকভাবে ল্যাবরেটরিতে বিলিরুবিন, ক্ষারযুক্ত এমিনোট্রান্সফেরাস (এ এল টি), এ্যাসপার্টেট এমিনোট্রান্সফেরাস (এ এস টি), ফসফেটেজ, প্রোথ্রম্বিন সময়, টোটাল প্রোটিন, অ্যালবুমিন ইত্যাদি পরীক্ষা করা হয়।

অ্যান্টি-এইচ সি ভি এর মাধ্যমে হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি, ই ভাইরাসের উপস্থিতি নির্ণয় করা হয়। এছাড়াও এল এফ টি,অর্থাৎ লিভার ফাঙ্কশন টেস্ট এবং উল্ট্রাসাউন্ড (USG) -এর মাধমেও রোগ নির্ণয় করা যায় l

যকৃতের বায়োস্পির মাধ্যমেও রোগ নির্ণয় করা যায়।

হেপাটাইটিস হলে কী খাবেন ?

হেপাটাইটিস  হলে বাইরের খাবার এবং বাড়ির অতিরিক্ত তেলমশলা যুক্ত খাবার খাওয়া চলবে না।

সাধারণ ঘরোয়া খাবার খেতে হবে ।

এই সময়ে বেশি করে ফল, সবজি খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে।

যতটা সম্ভব কম মশলাযুক্ত খাবার খাওয়া উচিত ।

সাধারণত রোগীদের প্রোটিন জাতীয় খাবারে অনীহা আসে,যেহেতু লিভার আক্রান্ত হয় তাই পরিপাক পক্রিয়া বেশ ক্ষতিগ্রস্থ হয় । তাই সহজপাচ্য অর্থাৎ সহজে হজম হয়, এমন খাবার খাদ্য তালিকায় রাখা উচিত।

শরবত নিয়মিত খাওয়া যেতে পারে এবং এতে উপকার পাওয়া যায়।

এই সময়ে শরীরকে যতটা সম্ভব ঠান্ডা রাখতে হবে,সেকারণে আখের রস, ডাবের জল, মৌরি-মিছরি ভেজানো জল প্রভৃতি রোগীকে খাওয়ানো যেতে পারে ।

হেপাটাইটিসের চিকিৎসা :

টিকাকরণ : টিকাকরনই রোগ প্রতিরোধের প্রাথমিক এবং প্রধান উপায় l
হেপাটাইটিস এ : জন্মের পর থেকে অর্থাৎ ১-১৮ বছর পর্যন্ত পর্যায়ক্রমিক টিকাকরণ । শিশুদের জন্য ২ বা ৩ মাত্রার টিকা রয়েছে । প্রাপ্তবয়স্কদের প্রয়োজন বুস্টার ডোজ । টিকার কার্যকারিতা ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত বা আরো অধিক সময় কার্যকরী থাকে ।

হেপাটাইটিস বি : হেপাটাইটিস বি-এর টিকা ১৫ বছর বা এরও বেশি সময় পর্যন্ত রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা রাখে। রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের প্রস্তাব অনুযায়ী ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত যে কেউ এই টিকা নিতে পারেন এবং যে সমস্ত প্রাপ্তবয়স্করা সংক্রমণের সম্মুখীন হয়েছেন বা সংক্রমণের সম্ভবনা রয়েছে তাঁরাও টিকা নিতে পারেন। পরিপূর্ণ সুরক্ষার জন্য ছয় থেকে বারো মাস ধরে তিনটে ইঞ্জেকশন নেওয়া প্রয়োজন।

হেপাটাইটিস থেকে বাঁচতে আমরা কি করতে পারি ? 

 নিজের ব্যাক্তিগত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে, বাথরুম যাওয়ার পর ও খাওয়ার আগে ভালো করে হাত ধুতে হবে । খাবার জিনিসপত্র ঠিক করে ধুতে হবে, পানীয় জলের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে ।

রক্ত সঞ্চারনের ক্ষেত্রে বেশি করে নিরাপদ হতে হবে এবং সতর্কতা বজায় রাখতে হবে l

সুরক্ষিত যৌন জীবন যাপন করতে হবে, কন্ডোম ব্যবহার করা উচিত ।

  একই সিরিঞ্জ একাধিকবার ব্যবহার করা চলবে না ।

সংক্রমিত ব্যক্তির দাঁত মাজার ব্রাশ, দাড়ি কাটার রেজার ও নখ কাটার যন্ত্র ব্যবহার করবেন না।

নেশা আসক্তি এবং মদ্যপান বর্জন করতে হবে । অ্যালকোহল বিরত থাকা উচিত ।

আনুষঙ্গিক রোগ লক্ষণ থেকে উপশম পেতে বিশ্রাম, সঠিক পথ্য এবং উপযুক্ত ওষুধ গ্রহণ।

বেশিরভাগ মানুষ যাঁদের হেপাটাইটিস এ ও ই হয়েছে তাঁরা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকে সেরে উঠেছেন। হেপাটাইটিস বি বা সি, অথবা ডি সংক্রমণ যকৃতের কার্যকারিতা সম্পূর্ণ নষ্ট করে দিলে যকৃতের প্রতিস্থাপন প্রয়োজন হয় ।

 টিকাকরন এবং সার্বিক সচেতনা বৃদ্ধির চেষ্টা করতে হবে ।

এক নজরে কিছু কথা 

৯০ শতাংশ নতুন হেপাটাইটিস বি সংক্রমণ শৈশবকালে মা থেকে শিশুর মধ্যে সংক্রমিত হয়।
যাঁরা ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক সেবন করেন, ট্যাটু বা আকুপাংচার করান, হোমো সেক্সচুয়াল মানুষেরা, যাঁদের সঙ্গীর হেপাটাইটিস বি রয়েছে এবং স্বাস্থ্য সেবা কর্মীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা থাকে l

হেপাটাইটিস বি এবং সি – এর ফলে ভাইরাস ঘটিত হেপাটাইটিসে পৃথিবীব্যাপী আক্রান্ত মানুষের প্রায় ৯৬ শতাংশ মানুষ মারা যান। অপরপক্ষে , হেপাটাইটিস বি এবং সি-এর সংক্রমণ নির্ণয় এবং চিকিৎসা শুরু হতে বিলম্ব হলে, ৬০% ক্ষেত্রে সেটা লিভার ক্যানসারে পরিণত হয়।

সারা বিশ্ব জুড়ে ৩২৫ মিলিয়ন মানুষ হেপাটাইটিস বি এবং সি -তে আক্রান্ত, যার ফলে প্রতি বছর ১.৪ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়।

জাতীয় ভাইরাল হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি

২০১৮ সালে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসে ভারত সরকারের স্বাস্থ্য এবং পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের দ্বারা জাতীয় ভাইরাস ঘটিত হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি চালু হয়।

ভারতে ভাইরাস ঘটিত হেপাটাইটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য এটি একটি উদ্যোগ। এই কর্মসূচির লক্ষ্য হল ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশে সংক্রমণজনিত হেপাটাইটিস নির্মূল করার উদ্দেশ্যে কাজ করে।

হেপাটাইটিস দিবস ও তার তাৎপর্য

নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী বারুচ স্যামুয়েল ব্লুমবার্গের হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের আবিষ্কার করেন, এই রোগ নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করেন এবং এই ভাইরাসের জন্য টিকাকরণ শুরু করেন। চিকিৎসাবিদ্যায় তাঁর এই অবদানকে স্বীকৃতি জানাতে ২৮ শে জুলাই অর্থাৎ তাঁর জন্মদিনে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালন করা হয় ।

• প্রতি বছর এই দিনটির একটি করেে থিম বা বার্তা থাকে, এই বছর বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের থিম বা মূল বার্তা হল, হেপাটাইটিস নির্মূলকরণে চিকিৎসা খাতে বিনিয়োগ করুন। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী হেপাটাইটিস নির্মূল লক্ষ্য অর্জনের জন্য চিকিৎসা ও গবেষণা এবং টিকাকরন, এছাড়াও প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিষয়ে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করা হয়েছে।

পরিশেষে একটাই কথা বলার শুধু মাত্রই চিকিৎসা বিজ্ঞানের মাধ্যমেই , হেপাটাইটিসের প্রতিরোধ, নির্ণয়, চিকিৎসা এমনকি সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব।

সৌভিক রায়

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 2

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

ধূমপান সুখ টান না বিষপান

5 (2) ধূমপান থেকে কত কী ধ্বংস হচ্ছে। চোখের আড়ালে সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে কেন ধূমপান তথা সুখটান থেকে বিরত থাকা দরকার, তার জন্য এ রচনা। ধূমপান বলতে আমি তামাক (গড়গড়া, হুঁকা), চুরুট, সিগারেট, বিড়ি প্রভৃতির ধোঁয়া সেবনকেই বুঝি। একটি সিগারেট খেলে ২৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ নষ্ট করে দেয়। তিরিশটি […]
ধূমপান-ক্ষতিকর
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: