বিপদ থেকে রক্ষা- মনোবিজ্ঞানের আলোকে

যুদ্ধ-বিমান

সারা ইউরােপ জুড়ে বিশ্বযুদ্ধের তাজ। দুর্ধর্ষ জার্মান ফৌজ বেলজিয়াম ও ফ্রান্সের ওপর আক্রমণ শানাচ্ছে। জলে, স্থলে,আকাশে ইংরেজ আর ফরাসী সেনাও মরণপণ লড়াইয়ে শত্রুর ওপর পাল্টা আঘাত হানছে। সেনাবাহিনীতে যােগ দিতে দেশের অন্যান্য যুবকের সাথে কেমব্রিজের মেধাবী ছাত্র রােনাল্ড
নিকসনেরও ডাক পড়ল। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া ছেড়ে রয়েল এয়ার ফোর্সে নাম লেখালেন। স্বল্পকালের মধ্যেই দক্ষ ও দুঃসাহসী পাইলট হিসেবে নিকসন বিমান বাহিনীতে সুনাম কুড়ােলেন।

গােপন বার্তা এল, জার্মানের দখলে থাকা একটি বেলজিয়াম যুদ্ধঘাঁটিতে শত্রুপক্ষ হামলার জন্য প্রস্তুত হয়েছে, মজুত করেছে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র। নির্দেশ এল অনতিবিলম্বে ওই ঘাঁটির ওপর আক্রমণ হানতে হবে। সাথে সাথে কয়েকটি বােমারু বিমান দুরন্ত বেগে আকাশে উড়ল। একটি বিমানের চালক নিকসন।

বেলজিয়ামের আকাশে ঢােকার আগেই গােপন ঘাঁটি থেকে উড়ে একদল জার্মান ফাইটার বিমান। আচমকা নিকসনের নজরে পড়ল জার্মান ফাইটারগুলাে ক্ষিপ্রবেগে তাঁকে ঘেরাও করার জন্য ধাওয়া করেছে।

নিকসন প্রমাদ গুনলেন। এমনই এক মানসিক বিপর্যয়কর অবস্থায় নিকসেনর চোখের সামনে আকাশ
জুড়ে ভেসে উঠল এক দৃশ্য। তুষারাবৃত এক পর্বত, সূর্যের আলােয় ঝলমল করছে, আর সেই পর্বতের গুহা থেকে উজ্জ্বল আলােকধারা নির্গত হচ্ছে।

সেই আলাের তরঙ্গে ডুবে যাচ্ছে নিকসনের চেতনা। ক্ষণপরেই এক দিব্যভাবাবেশে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন তিনি।জ্ঞান ফিরে আসলে দেখেন বিমানের ককপিটে বসে নয়, রয়েছেন লডনের একটি সামরিক হাসপাতালে।

তাঁর বিমানটি ইংল্যান্ডে এক বিমানঘাঁটিতে নামলে দেখা যায়, পাইলট নিকসন মূৰ্ছিত অবস্থায় ঢলে পড়ে আছেন। সেখান থেকে উদ্ধার করে আহত নিকনের তাড়াতাড়ি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আনা হয়।

ঐশ্বরিক শক্তিই তাঁকে শত্রু থেকে রক্ষা করেছে মনে করে নিকসন ভাবাপ্লুত হলেন।ঈশ্বরের অপার
করুনা তাঁর ওপর বর্ষিত হয়েছে ভেবে ভক্তি, শ্রদ্ধায়, আনন্দে নিকসেনর মনপ্রাণ ভরে গেল।

অন্তরে অনুভব করলেন কে যেন অস্ফুটস্বরে বলে উঠছে, ‘হিমালয় দেখেছ তুমি সেদিন অলৌকিক দর্শনের মধ্যে। পবিত্র হিমালয়ের গুহায় থাকেন যে যােগী ঋষি, তাঁদের কৃপা তুমি পেয়েছ। সেই কৃপাই সেদিন তােমাকে অনিবার্য মৃত্যু থেকে উদ্ধার করেছে। ঘটনা নিকসনের জীবনের মােড় ঘুরিয়ে দিল।আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভের তীব্র বাসনায় ভারতে পাড়ি দিলেন। সাধারণ জীবনে সন্ন্যাস লাভের পর রােনাল্ড নিকসন হলেন বৈষ্ণব সাধক কৃষ্ণপ্রেম।

ইংল্যান্ডের এক ধর্মপরায়ণ, গোঁড়া, রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত পরিবারে নিকসনের জন্ম। পারিবারিক সংস্কারের প্রভাবে শৈশব থেকেই প্রতিষ্ঠানিক ধর্মের প্রতি পরমবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন।কলেজে পড়াশােনা করার সময় ধর্ম ও দর্শন সম্পর্কে আগ্রহ ও কৌতুহল বাড়ে। এই সময়ে খ্রিষ্টধর্ম, বৌদ্ধদর্শন ও থিয়ােসফির ওপর কিছুকিছু বইপত্র পড়ে ফেলেন।

ভারতবর্যের ধর্ম ও দর্শনতাকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করেছিল। ১ম বিশ্বযুদ্ধের কারণে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর পড়াশােনায় ইতি টেনে ফৌজে যােগ দিতে বাধ্য হলেন। কিন্তু মন থেকে মুছে গেলনা আধ্যাত্মিক জগতের প্রতি তাঁর অদম্য আকর্ষণ।

যুদ্ধের ভয়াবহ পরিবেশ, হত্যা, রক্তপাত তার মস্তিষ্ক কোষকে আচ্ছন্ন করেছিল। ১ম বিশ্বযুদ্ধের সময়
বেশ কিছু সৈনিক যুদ্ধক্ষেত্রে মস্তিষ্ক কোষের সহনশীলতা হারিয়ে মানসিক রােগাক্রান্ত হয়ে পড়েছিল বলে জানা যায়। নিকসনও এদের ব্যতিক্রম ছিলেন না।

গভীর ধর্মীয় সংস্কার, ভারতের সাধুসন্তের ‘অলৌকিক ক্ষমতার প্রতি অগাধ বিশ্বাস, শত্রু বিমানের মুখােমুখি সঙ্কটকালীন মুহূর্তে চরম মানসিক উদ্বেগ, মৃত্যুভয়, ভারতের আধ্যাত্ম জগতের রহস্যময় তার প্রতি দুর্নিবার টান নিকসেনর মধ্যে অলীক দর্শনাভূতির সৃষ্টি করেছিল।

হ্যালুসিনেশন
হ্যালুসিনেশন

মনােবিজ্ঞানীদের মতে বাস্তবে যা নেই তার অনুভূতি লাভ করাকেই ‘হ্যালুসিনেশন’ বলে, বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে ‘অলীক প্রত্যক্ষ’।

অলীক দর্শণের এই দৃষ্টটি শঙ্করনাথ রায়ের ‘ভারতের সাধক’ গ্রন্থের সুলভ সংস্করণের একাদশ খন্ডে আছে। হলিউডের অ্যাকশন প্যাথ্রিলারের ঢঙে যুদ্ধকালীন বিমান আক্রমণের বর্ণনায় গ্রন্থকার যতটাই উৎসাহী, নিকসনের বেঁচে ফিরে আসার কারণ অনুসন্ধানে ততটাই নিস্পৃহ।

আসলে ঘটনাটিকে রহস্যাবৃত রেখে অলৌকিকতার মােড়কে পরিবেশন করতে চেয়েছিলেন। তাই
শত্রু বিমানের হামলা এড়িয়ে কীভাবে নিকসন মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে এলেন তার যুক্তিসম্মত উত্তর দেননি; এব্যাপারে তাঁর সদিচ্ছা বা আন্তরিকতা কোনােটাই ছিল না, বরঞ্চ তিনি নিকসনের জীবন সঙ্কট থেকে উদ্ধার পাওয়ার কারণ হিসেবে এক অজানা দৈবশক্তিকেই মহিমান্বিত করেছেন।

শঙ্কর বাবুর মতে, নিকসনের অলৌকিক দর্শনই সেই ঐশ্বরিক সত্তার প্রমাণ। যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে অবাস্তব ঘটনাকে প্রমাণ ছাড়া মানা যায়না। অলৌকিক কথাটির আভিধানিক অর্থ লৌকিক নয়, ইহলােকে সম্ভব নয়, মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

যা লৌকিক নয় তা তাে লৌকিক জগতে ঘটতেই পারে না। অর্থাৎ অলৌকিক বলে কিছু নেই। চালকহীন বিমানের স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওড়া এবং নিরাপদে অবতরণ অসম্ভব। শত্রু পক্ষের বিমানের আচমকা হামলায় নিকসন যে মানসিক জটিলতার শিকার হয়েছিলেন মনােবিজ্ঞানের ভাষায় ট্রানসিয়েট সাইক্রিয়াটিক ইমার্জেন্সিস বা আকস্মিক মানসিক সঙ্কটপূর্ণ অবস্থা।

এই সঙ্কটকালীন অবস্থায় পড়লে প্রথমে বিপদের মুখােমুখি হয়ে একটা সচকিত, ভয়মিশ্রিত সজাগ ভাব আসে। তারপর বিপদাপন্ন মানুষটি শরীরমনের সর্বশক্তি প্রয়ােগ করে উপস্থিত বিপদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করেন।

অতিরিক্ত মানসিক চাপে তাঁর স্থানকাল-পাত্র সম্বন্ধে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। তাঁর স্মৃতিবৈকল্য ঘটতে পারে এবং একটা ঘােরের ভাব তাঁকে আচ্ছন্ন করে। এই অবস্থায় সে সম্পূর্ণভাবে পরনির্ভরশীল হতে চায় এবং যন্ত্রচালিতের মত ব্যবহার করে।

নিকসনও খুব সম্ভব এমনই মানসিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিলেন। কিন্তু এই আচ্ছন্ন অবস্থাতেও অনুমান করা যায় যে, আত্মরক্ষার প্রবৃত্তিজনিত আবেগ তাঁর বিমানচালনার পরাবর্তকে সক্রিয় রেখেছিল। পুলিশের গাড়ির তাড়া খেয়ে অপরাধী যেমন প্রচন্ড গতিতে গাড়ি চালিয়েও দূর্ঘটনা এড়িয়ে পালিয়ে যেতে পারে তেমনি প্রবল উত্তেজনার আবেশেও একজন দক্ষ বৈমানিকের ‘রিফ্লেক্স’ বিমানের ওপর নিকনের নিয়ন্ত্রণ হারাতে দেয়নি।

জার্মান ফৌজের চোখে ধুলাে দিয়ে নিকসন নিজেই নিরাপদে স্বদেশের এরোড্রামে বিমান অবতরণ
করাতে পেরেছিলেন, এমনটা মনে করাই যুক্তিসঙ্গত। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার পরমুহুর্তেই হয়ত তিনি জ্ঞান হারিয়েছিলেন।

কারণ শত্রুর ফাইটার বিমানের সঙ্গে পাল্লা দিতে দিতে প্রচন্ড মানসিক চাপ,ভয়,উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগ তাঁর মস্তিষ্কের কোষ কোযে যে অতিপীড়ন সৃষ্টি করেছিল তারফলেই তিনি অচৈতন্য হয়ে পড়েন। সঙ্কটকালীন মুহুর্তে মৃত্যু ভয়ের প্রবল প্রক্ষোভ বা আবেগ সঞ্চারিত হওয়ায় তাঁর মস্তিষ্ক কোযের সহনশীলতা স্বাভাবিক ক্ষমতার চেয়ে অনেকগুন বেড়ে গিয়েছিল।

তাই বিমান চালাতে চালাতে তিনি অজ্ঞান হননি৷ বিপদমুক্ত হওয়ার পর ভয়ের প্রক্ষোভ প্রশমিত হয় এবং মস্তিষ্ককোষ তখন আর উত্তেজনার জোরাল অভিঘাত সহ্য করতে না পারায় নিকসনের সংজ্ঞা লােপ পায়।

বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার পর সংজ্ঞা হারানাে মােটেই অসম্ভব নয়। বাস্তব জীবনে এমন অনেক ঘটনার কথা জানা যায় যে, দূর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কবল থেকে ফিরে এসে অনেকেই চেতনা হারিয়ে
ফেলেন।

ঘটনায় অনুমান করা যায় যে, শত্রু বিমান যখন আকাশে ধাওয়া করেছিল তখন নয়, নিকসনের অলীক প্রত্যক্ষ হয়েছিল বিমান অবতরেণর পর সংজ্ঞা হারাবার ঠিক পূর্বমুহুর্তে। এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি এই কারণে যে, চেতনা হারানাের আগে উত্তেজনা মাত্রাতিরিক্ত হওয়ার দরুন মস্তিষ্কের সন্নিহিত
কোষগুলাের দ্রুত নিস্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল।

এই নিস্তেজনা যখন প্যারাডক্সিক্যাল ফেজ এ পৌঁছায় তখনই নিসনের কাছে কল্পনার হিমালয়
পর্বত/পর্বতমালা বাস্তব বলে প্রতীয়মান হয়। জ্ঞান ফিরে আসার পর আকস্মিক মানসিক সঙ্কটপূর্ণ অবস্থার ফলে তাঁর স্মৃতিশক্তি দূর্বল হয়ে পড়েছিল।

সম্ভবত সেকারণেই ঘটনাক্রম পরম্পরার সূত্র হারিয়ে ফেলে আকাশে ভড়ানাের সময়েই তাঁর দিব্যদর্শণের অভিজ্ঞতা হয়েছিল বলে নিকলন মনে করেন। তাঁর ধর্ম বিশ্বাস তাঁকে আরও বেশি করে এই ধারণার দিকে ঠেলে দেয়।

স্মৃতি বৈকল্যের ফলে কেমন করে তিনি শত্রু পক্ষের বিমানকে ফাঁকি দিয়ে স্বদেশের বিমান ঘাঁটিতে
নিরাপদে প্রত্যাবর্তন করেন সেকথাও ভুলে গিয়েছিলেন। আর তাই ঐশ্বরিক শক্তিই তাঁকে রক্ষা করেছে, এমন ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হন।

জার্মান মনােবিদ ভার্নিস এর সেন্টাল থিয়েরি বা কেন্দ্রীয় তত্ত্ব অনুসারে হ্যালুসিনেশনের জন্য মস্তিষ্কের কোষ বিশেষের উত্তেজনা দায়ী। কৃত্রিমভাবে মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্নায়ুকেন্দ্রে বৈদ্যুতিক শক্তির ব্যবহারে উত্তেজনা ও নিস্তেজনা তৈরি করে নানা ধরণের অলীক প্রত্যক্ষ ঘটানাে সম্ভব।

সুইজারল্যান্ডের মনোবিজ্ঞানী ডঃ ওয়াল্টার হেজ, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ জে ডেলগাডেও
মিচিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ জেমস ও মস্তিষ্কে তড়িৎ প্রবাহ পাঠিয়ে প্রেম, ঘৃণা, ভয়, উদ্বেগ, আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি করাতে পেরেছেন। একইভাবে কৃত্রিম উত্তেজনার সাহায্যে কাল্পনিক ঈশ্বর দর্শন এবং ঈশ্বরের বাণী শােনার মত অনুভূতি সৃষ্টি করাতে পেরেছেন।

লেখক-তপন চন্দ

(সংক্ষিপ্ত; কৃতজ্ঞতা ও ঋণস্বীকার-মাননীয় রাজেশ দত্ত)
জেলা-আলিপুরদুয়য়ার

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক থেকে সংগৃহীত।

Leave a Reply

%d bloggers like this: