মৌমাছি ও মধু

মধু

মধু কি

মৌমাছি ডানায় গুন গুন শব্দ আমাদের সবার পরিচিত। দূর দূরান্ত থেকে ফুলের মকরন্দ (Nector)
সংগ্রহ করে আনে এবং বাসায় এনে উগরে ডানার দ্বারা বাতাস করে মধু (Honey)তে পরিণত করে। যা
আমরা মধু হিসাবে খাই। মধু চটচটে, স্বাদেমিষ্টি, গাঢ় বাদামি রং,সুগন্ধ যুক্ত।

মৌমাছি ফুলের মকরন্দ সংগ্রহ করে বাসায় আনে শীতকালেন তাদের নিজেদের খাওয়ার জন্য। কিন্তু
ওই মধু আমরা খাই।

মধুতে কি আছে ?

মধু বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায়

ক্যালরি ৩১৯ গ্রাম

ফ্যাট ০.২ গ্রাম

স্টার্চ ৭৯.৫ গ্রাম

ক্যালসিয়াম ০.৫ মিগ্রা

ফসফরাস ১৬ মিগ্রা

আয়রণ ০.৯ মিগ্রা

ভিটামিন সি ০.৪ মিগ্রা,

বি১২-০.০৪ মিগ্রা,

নিয়াসিন-০.০২ মিগ্রী।

মৌমাছি ৫ লক্ষ ফুলের মকর সংগ্রহ করে এক কিলোগ্রাম মধু উৎপন্ন করে।

তারা যতবার উড়ে তা হিসাবে চারবার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করার মত। একটি মৌচাকে (যা শ্রমিক মৌমাছিরা তৈরীকরে) প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক মৌমাছি থাকে। শ্রমিক মৌমাছিরা বিভিন্ন স্থানের ফুল থেকে মকরন্দ সংগ্রহ করে।

সংগ্রহ করার দিক দর্শন, দূরত্ব প্রভৃতি সূর্যের অবস্থান অনুযায়ী কোমর দুলিয়ে শ্রমিক মৌমাছি পরস্পর পরস্পরকে জানায়।

মৌমাছির নাচ

১৯৪৬ সালে কার্ল ফন ফ্রিৎস মৌমাছিদের ভাষা সম্পর্কে আবিষ্কার করেন। ফ্রিৎস লক্ষ্য করেন যে মৌমাছিরা মকর সংগ্রহ করে চাকে ফিরে দুরকমের নাচ নাচে।

একটি নাম দেন, গােল নাচ আর একটির নাম দেন, ল্যাজনাড়া নাচ।

গােল নাচের অর্থ হল যে সেই নাচিয়ে মকরন্দ সন্ধান দিয়েছে অন্য মৌমাছিদের।

Waggle dance - Wikipedia

ল্যাজনাড়া নাচের অর্থ হল কোথায় মকরন্দ পাওয়া যাবে।

গােলনাচ দূরত্বের নির্দেশ দেয় মকরন্দ ৪০- ৫০ মিটারের মধ্যে পাওয়া যাবে। ল্যাজনাড়া নাচ নির্দেশ দেয় একশ মিটারের থেকেও আরও দূরে।

গােলনাচে এক জায়গায় থেকে ফিরে প্রথমে এক দিকেও পরে অপর দিকে নাচে। ল্যাজ নাড়ানাচে বাংলার চার বা ইংরেজি আটের মতাে ভঙ্গিতে।

এখানে  ‘কবি নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্যর’ একটি ছড়া উল্লেখ করা যেতে পারে।

“মৌমাছি, মৌমাছি,
কোথা যাও নাচিনাচি।
দাঁড়াও না একবার ভাই।”

এখনকার দিনে অনেকে বাড়িতে বাক্স মধ্যে মৌমাছি পালন করেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই ফুলের অপ্রতুলতা হেতু চিনির দ্রবণ কাছাকাছি রাখেন। ওই জল মৌমাছি খায় ফুলের মকরন্দের পরিবর্তে। এর ফলে যে মধু পাওয়া যায়, কৃত্রিম মধু, প্রাকৃতিক নয়, প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপন্ন হলেও। এই ভেজালের
যুগে মধুর বিশুদ্ধতা নিয়ে নানা জনের নানান প্রশ্ন। মধুটা মােটামুটি মধু কিনা তা জানার জন্য একটি সহজ ছােট্ট পরীক্ষা বাড়িতে বসে সকলেই করতে পারেন।

খাটি মধু চেনার উপায়

  একটি কাঁচের গ্লাসে একগ্লাস জল নিয়ে তাতে এক ফোঁটা মধু ফেলে দিন।

  যদি ওই মধুর ফোঁটা গ্লাসের তলদেশ পর্যন্ত ওই অবস্থায় পৌঁছায় ও অবিকৃত থাকে তবে সেটা ভাল মধু।

♦  কিন্তু যদি ওই মধুর ফোঁটা গ্লাসের তলদেশ পর্যন্ত না পৌঁছায় তাহলে তা ভেজাল যুক্ত।

খাটি-মধু-চেনার-উপায়
খাটি-মধু-চেনার-উপায়

  তাছাড়াও মধুতে চিনি গােলা জল বা ইনভার্ট সুগার অনেক সময় মেশান হয়। তা ধরার জন্য একটা কাঠিতে মধু লাগিয়ে আগুনে ধরতে হবে এবং যদি জ্বলে ওঠে তবে মধুতে ভেজাল মেশান নাই বুঝতে হবে।

  আর যদি আগুন না ধরে চড়চড় করে তাহলে চিনি গােলা জল মেশান আছে।

  ইনভার্ট সুগার মধুতে মেশান আছে কিনা তা জানার জন্য একটা পাত্রে কিছুটা মধু নিয়ে তাতে কিছুটা ইথার দ্রাবক মিশিয়ে পাত্রটা খােলা অবস্থায় রেখে দিলে কিছুক্ষণ পরে ইথার উড়ে যাবে এবং পাত্রে একটি অধঃক্ষেপ পড়ে থাকবে। এরপর তাতে কয়েক ফোঁটা হাইড্রোকেরিক অ্যাসিড যুক্ত রেসরসিনল দিয়ে মিশ্রণের রং লাল হয় তাহলে মধুতে ইনভার্ট সুগার আছে।

♦  একবিংশ শতকে বিজ্ঞান উন্নত। তাই কৃষি ক্ষেত্রে সবুজ বিপ্লবে ঢালাও কীটনাশক ব্যবহার ও অ্যান্টিবায়ােটিক ব্যবহার। কীটনাশক সমস্ত বাস্তুতন্ত্র দূষিত করে দিয়েছে। তাই মধুর মধ্যে কীটনাশকের অবশেষ।

মধুতে অ্যান্টিবায়ােটিক

সে প্রকৃত বা অপ্রকৃত যাই হােক না কেন। বর্তমানে মধুতেও অ্যান্টিবায়ােটিক। এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠিত গবেষনাগার The center for Science and Environment (C.S.E.) নানা কোম্পানির মধুতে অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যান্টিবায়ােটিক পেয়েছেন।

এই সংস্থার বক্তব্য সরকারি খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক ভারতে যে মধু ব্যবহার হয়, তার দিকে অন্ধ ভাবে, এই অ্যান্টিবায়ােটিকের উপস্থিতি এড়িয়ে চলেন কিন্তু বিদেশে যে মধু পাঠানাে হয় তার দিকে সজাগ
দৃষ্টি দেন।

এই C.S.E. এর তথ্য অনুযায়ী যে সমস্ত অ্যান্টিবায়ােটিক মধুতে পাওয়া যায় তা উল্লেখ করা হল Oxytetracycline, Ampicillin, Enrofloxacin, Erythromycin, ciprofloxacin,
Chloramphenicol (Source : Centre for Science and Environment) প্রভৃতি।

এই সকল অ্যান্টিবায়ােটিক আমাদের খাদ্যনালিতে সামান্য পরিমাণে পোঁছে ওই খানের ব্যাকটেরিয়া গুলিতে ওষুধ প্রতিরােধক্ষম গড়ে তােলে যার ফলে অ্যান্টিবায়ােটিক আমাদের রােগ চিকিৎসার প্রয়ােজনে সেবনে রােগ সারতে চায় না।

মধুতে যে অ্যান্টিবায়ােটিক পাওয়া যায় তার পরিমাপ হল ০৩.৭ মাইক্রোগ্রাম থেকে ২৫০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি কিলােগ্রামে।

সর্বোচ্চপরিমাণ ২০ গ্রাম মধুতে’০৫ মাইক্রোগ্রাম অ্যান্টিবায়োটিক আছে।

আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় মধুর উপকারি গুন

মধু নানা প্রকার ওষুধে ব্যবহৃত হয়।

♦  হােমিওপ্যাথে মৌমাছির বিষ থেকে Apis ওষুধ তৈরি হয়।

♦  আচার্য কেন্ট বলেন প্রাচীন মহিলাগণ সদ্যোজাত শিশুর প্রস্রাব না হলে দু-একটি মৌমাছি জলে সেদ্ধ করে সেই জল শিশুকে খেতে দিতেন।

♦  পাতিলেবুর রসের সঙ্গে মধু অল্প উষ্ণ জলে মিশিয়ে সকালে খালি পেটে খেলে স্থূলকায় ব্যক্তির দৈহিক ওজন কমে।

  দুর্বল শরীরে দু-চামচ মধু গরম দুধে মিশিয়ে সকালে বা রাত্রে শােয়ার আগে খেলে ওজন ও শক্তি বৃদ্ধি পায়।

  কাশি ও সর্দির জন্য সম পরিমাণ টাটকা তুলসি পাতার রস ও আদার রস মধুর সঙ্গে মিশিয়ে খেতে হয়।

  রক্তে ইউরিক অ্যাসিডকে কমিয়ে গাঁটের বাত রােগ ও পেশির বাত রােগের ক্ষেত্রেমধু উপকারি।

  দেহে কোথাও পুড়ে যাওয়া, ফোলা ও যন্ত্রণা কমাতে মধু উপকারী।

কাননকুমার প্রামাণিক

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক থেকে সংগৃহীত।

Leave a Reply

%d bloggers like this: