মানস জাতীয় উদ্যানের গল্প – মালায়ান জায়েন্ট স্কুইরেল ও ক্যাপড লেঙ্গুর

Samrat Sarkar

মানস অভয়ারণ্যের অনেক গল্প। এই গল্প এক মালায়ান জায়েন্ট স্কুইরেল ও এক ক্যাপড্‌ ল্যাঙ্গুরের। উঠে এসেছে তাদের অনন্য কিছু স্বভাব, যা সাধারন ভাবে আমাদের দৃষ্টির বাইরে থেকে যায়। তারা কি সুক্ষ নিয়মে তাদের নিজঃস্ব দুনিয়ায় ঘুরে বেড়ায়, বেঁচে থাকে পূর্ব-হিমালয়ের পাদদেশের এই স্বর্গে। এই মানসে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  
4.4
(9)
মানস-অভয়ারন্যে-ক্যাপড-লেঙ্গুর-এর দাপাদাপি
আকাশপথে ক্যাপড লেঙ্গুরের লাফ, মানস অভয়ারণ্যে

জঙ্গল এক নিরন্তর গল্পের উৎসমুখ। তার প্রতিটি বন্যপ্রাণ সেই গল্পগুলোর চরিত্র। আমাদের শুধু চাক্ষুষ করার অপেক্ষা। কিছু কিছু গল্পে খুব রংচং থাকে। যেমন ধরুন একটি সিলভার ব্রেস্টেড ব্রডবিল তার  পার্টনারের উদ্দেশ্যে দারুন একটা নাচ নেচে ফেললো। এবং নাচ শেষে মেটিং পর্যন্ত আপনি দেখে ফেললেন।কিছু গল্পে হাই-ভোল্টেজ অ্যাকশনথাকে। যেমন আপনার চোখের সামনে হয়তো রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার বিদ্যুৎ বেগে ছুটে কোনো হরিণ মেরে ফেললো।

আবার আপনি নিজেই কখনো সেইসব গল্পের শরিক হয়ে ওঠেন। ঠিক যখন আচমকাই আপনার জিপসী দুটো মত্ত হাতির লড়াইয়ের মাঝখানে পড়ে গেলো। না সামনে এগনো যায় না পিছনে। লড়াইটা চলছিলো একান্তই হাতি দুটোর মধ্যে। হঠাৎ আপনি তৃতীয় চরিত্র হয়ে উঠলেন। রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত। আর এইসব মুহূর্তগুলোর জন্যই সেই জঙ্গলটা – সেইসব জঙ্গলের দিন আপনার স্মৃতিতে আমৃত্যু অমলীন হয়ে থাকে।জঙ্গলে আবার কিছু গল্প থাকে যে গল্পের মধ্যে এত থ্রিলার, এতো রোমান্স থাকেনা।

চরিত্রগুলো এত ডাকসাইটেও নয়। গল্পের প্লটও খুব ম্যাড়মেড়ে আর ক্ষণিকের। ভালো করে খেয়াল না করলে হয়তো অগোচরেই থেকে যায়। যেরকম এই পৃথিবীর বেশিরভাগ জঙ্গলের গল্প থেকে গেছে অগোচরে। আবছায়ায়। তাই তো জঙ্গলে এতো রহস্য। আমার প্রিয় মানসের দ্বিতীয় রকমের গল্প প্রচুর আছে।

সেদিন মাথাংগুড়ি বনবাংলোতে দুপুরের খাবার খাওয়ার কথা। আমার স্ত্রী-পুত্র ক্লান্ত। খুব ক্লান্ত আর বিরক্ত। গত তিন দিন ধরে জঙ্গলে চরকিপাক দিচ্ছি। ‘ফুল ডে’ সাফারি। শরীর আর দিচ্ছে না। সাধারনত সারাদিনের জন্য জঙ্গলে ঢুকলে পর্যটকেরা মাথাংগুড়ি বাংলোতেই মধ্যাহ্ন ভোজন সারেন। কারণ ছোটোখাটো প্রাতঃরাশ লজ থেকে সঙ্গে করে নিয়ে আসলেও দুপুরের খাবার বয়ে বেড়ানো সম্ভব নয়। মাথাংগুড়ি ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

ভোরবেলা জঙ্গলে ঢোকার আগে ওয়াকিটকিতে মধ্যাহ্নভোজনের কথা বলে রাখতে হয়। প্রবেশদ্বার থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত ভুটান সীমান্তে না আছে মোবাইল নেটওয়ার্ক না আছে চটজলদি খাবারের ব্যাবস্থা। বাংলোর কর্মীরা একটা আন্দাজ করে সপ্তাহের রেশন বাইরে থেকে কিনে ভেতরে ঢুকে যান। অনেক সময় আগে থেকে বলে রাখলেও খাবার পাওয়া যায়না। অনুমান কি আর সব সময় মেলে?অনেকবার সে অভিজ্ঞতাও হয়েছে আমার। একবারতো রান্নাঘরে লেপার্ড ঢুকে পড়ায় রান্নাই হলো না। তাঁকে বার করতেই বিকেল হয়ে গেলো।

তো যা বলছিলাম, সেদিন বাংলোতে বলে রেখেছি। আমার পাঁচটা মিল। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। হঠাৎ করে দুটো স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা এসে পড়েছে। হৈ-হল্লা, চিৎকার, জঙ্গলের দ্বিপ্রাহরিক স্তব্ধতা ভেঙে খান খান। তাদের শিক্ষামূলক ভ্রমণ। তারা ছোট ছোট ছাত্রছাত্রী। রান্নাঘরে বলা হলো তাদের খাবারের ব্যবস্থা করে তবে ট্যুরিস্টদের ডেকে নেওয়া হবে। বন্ধু ড্রাইভার বিকু (ভালো নাম বিকু বিশ্বকর্মা) আর আমি কোনোমতে পুত্র আর স্ত্রীর ভাতের ব্যবস্থা করলাম। ওরা থেকে গেলো বাংলোর বিশাল বড় লনে। আমি আর বিকু বন্দুকধারী গার্ডকে নিয়ে নদীর দিকে নেমে গেলাম। নদীর জলে মুখ ধুয়ে ওপারে মানে পানবারি রেঞ্জের দিকে চোখ চলে গেলো। ওপারে ধু ধু ঘাসজমি। ফেব্রুয়ারির মানস। রোদ্দুর ঝলমল করছে। এক দৈত্য মাকড়ষা জাল বুনে শিকারের অপেক্ষায়।

দৈত্য-মাকড়ষা
এক দৈত্য মাকড়ষা জাল বুনে শিকারের অপেক্ষায়

বিকু বারবার বলছে লোয়ার বাংলোর দিকে যতটা পারা যায় হেঁটে আসতে। সে নিজেও যাবে। বিকু প্রচন্ড ভালো জঙ্গল চেনে। ভালোবাসে। কিছুদিন আগেও পাহাড়ের নীচের এই ‘লোয়ার বাংলো’টা ছিল না। ছিল শুধু সেই পুরনো কাঠের বাংলোটা – পাহাড়ের ওপরে।

মাথাংগুড়ি বাংলোর বিশ্বজোড়া নামডাক। সবাই বলে মাথাংগুড়িতে রাত্রিবাস না করলে মানস দেখার মজা নেই। সত্যিই তাই। আমার মতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, অবস্থান সব দিক দিয়ে ভারতবর্ষের অন্যতম সেরা বনবাংলো মাথাংগুড়ি। তাই ট্যুরিস্টের চাপ খুব বেশি। পর্যটকেরা বারবার ফিরে আসেন। রাত্রিবাস করতে চান। সরকারের রেভিনিউ আসে। সেই সাথে নতুন বাংলো তৈরির ভাবনা মাথায় আসে। আরো পর্যটক ধরতে হবে, রাখতে হবে, আরো রেভিনিউ লাগবে যে। অতয়েব পাহাড়ের নিচে নতুন বাড়ি তৈরি হয় দ্রুত। দ্বিগুণ লোক রাত্রে থেকে যায়। কোলাহল বাড়ে। জঙ্গলের নিস্তদ্ধতা নষ্ট হয়। বন্যপ্রাণ বিরক্ত হয়। বাঘ বা বিড়াল পরিবারের প্রানীরা বাংলো চত্তরে আগের মত নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ায় না। অন্যদিকে ক্যাপড্‌ লেঙ্গুরগুলো (Capped Langur)খাবারের লোভে বাংলোর চারপাশে ঘুরতে থাকে। তাদের সহজাত খাদ্যাভ্যাস ভুলে ডাইনিং-এর উচ্ছিষ্ট কেক-বিস্কুট, ট্যুরিষ্টদের ছুঁড়ে দেওয়া কমলালেবুর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। শোনা যাচ্ছে পাহাড়ের আরো ওপরে আরেকটা বাংলো নাকি তৈরি হবে। এইতো আমাদের নীতিনির্ধারকদের জঙ্গল বিষয়ক ভাবনার নমুনা।

মানসে আমিবহুবার গেছি। কিন্তু মাত্র একবার, এক রাত্রের জন্য থেকেছি মাথাংগুড়ি বাংলোতে। প্রতিবার গিয়ে দেখে এসেছি। থাকিনি। যদিও সেই রাত্রের স্মৃতি আমার মনের মণিকোঠায় উজ্জ্বল। রাত্রের মাথাংগুড়ি অন্যরকম– অসহ্য রকমের সুন্দর। আর অসহ্য সুন্দরের কাছে একবারই যেতে হয়। বারবার গেলে সয়ে যায়। মলিন হয়ে যায়।

লোয়ার বাংলোর দিকটা আজ ফাঁকা। কোলাহল এসে পৌঁছোয় না। চারপাশ ভাল করে দেখে নিয়ে গার্ড সাহেব রাইফেলটা রেখে সিঁড়িতে ধপাস করে বসে পড়লেন। আমার কাছে বিস্কুট ছিল। তাঁর হাতে দিয়ে বিকু আর আমি লনের একটু দূরে দাঁড়ালাম। পাতা ঝরার সময় এখন। শিমূল গাছে ফুল এসে গেছে। আকাশ  ততক্ষণ ধোঁয়াটে মেঘে ঢাকা।

OLYMPUS DIGITAL CAMERA
লোয়ার বাংলোর দিকটা আজ ফাঁকা

 

ক্যাপড লেঙ্গুরের একটা বড় দল সামনের গাছগুলোতে। তারা নিজেদের মধ্যে ব্যাস্ত। হঠাৎ চোখ পড়ল দুটো মালায়ান জায়েন্ট স্কুইরেলের দিকে। ক্যাপড লেঙ্গুরের দলটার থেকে কিছুটা দুরেই ছিল তারা। একে অপরকে অনুসরণ করছিলো এগাছ ওগাছ করে। গায়ের রং দুজনের স্পষ্টতই আলাদা। আগে থেকে যে স্কুইরেলটা সেখানে ছিলো সেটির পেছনের পা আর পিঠের কাছে গাঢ় বাদামী ছোপ বেশি আছে। চেহারায় সে একটু বড়। তাকে অনুসরণ করতে যে এলো তার গায়ের রং কালচে এবং চেহারায় ছোট। গায়ের রঙের এই পার্থক্য মালায়ান জায়েন্ট স্কুইরেলদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। গায়ের লোমে মেলানিন ডিপোজিশনের ওপর নির্ভর করে। তারপর রঙচঙে আর বড় স্কুইরেলটিকে কালো স্কুইরেলটা অনুসরণ করতে শুরু করে। এর দুটো সাম্ভাব্য কারণ হতে পারে।

প্রথমত, ব্রিডিং মরসুমে তারা একে অন্যকে অনুসরণ করে, চেজ করে, যেটা ফোরপ্লে-র অঙ্গ। তখন ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি। মার্চ থেকে প্রজনন শুরু হয়ে যায়। এত দূর থেকে বোঝা সম্ভব নয় কে স্ত্রী আর কে পুরুষ। বহু চেষ্টা করেও কোনো স্কুইরেলেরই স্তনগ্রন্থীদেখতে পাইনি। তবে দুজনেই কি পুরুষ? তাও তো নিশ্চিত নয়!এখানেই উঠে আসে দ্বিতীয় সাম্ভাব্য কারণ। রঙচঙেটি আগে থেকেই সেখানে ছিল। অর্থাৎ ধরে নেওয়া যেতে পারে সে ওই এলাকার ডমিন্যান্ট। আর কালোটি ইন্টুরডার।

MGS 2
আগে থেকে যে স্কুইরেলটা সেখানে ছিলো সেটির পেছনের পা আর পিঠের কাছে গাঢ় বাদামী ছোপ বেশি আছে। চেহারায় সে একটু বড়। তাকে অনুসরণ করতে যে এলো তার গায়ের রং কালচে এবং চেহারায় ছোট

 

Ludek J Dobroruka নামে এক গবেষক ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তৎকালীন চেকস্লোভাকিয়ার দুটি চিড়িয়াখানায় মালায়ান জায়ান্ট স্কুইরেলদের গভীরভাবে পর্যবেক্ষন করেছিলেন। তিনি লিখছেন একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আগে থেকে যে ছিল সে ডমিন্যান্ট হিসেবে ব্যাবহার (Behave) করে। পরে কেউ সেখানে পৌঁছলে তার ভঙ্গি থাকে আত্মসমর্পনের (Submission)। সে অনুপ্রবেশকারী (Intruder)।

যদি ডমিন্যান্টটি পুরুষ হয় তবে তাকে অনুসরন করতে দেখা যায় অনুপ্রবেশকারীকে। ঠিক যে রকম ভাবে প্রজননের সময় প্রথাগত অনুসরন করে। অনেক সময় ডমিন্যান্ট পুরুষটি অনুপ্রবেশকারীকে আঁকড়ে ধরে আলিঙ্গন (clasp) করে এবং প্রথাগত সঙ্গমের ভঙ্গিমা (ritualized copulatory behaviour) করে।গবেষক R H Horwichতার বই The ontogeny of social behaviour in the Grey squirrel (Sciurus carolinensis)-এ লিখছেন, গ্রে স্কুইররেলও এই পরিস্থিতিতে ঠিক একই ভাবে সঙ্গমের ভঙ্গিমা (precocial sexual play) অনুকরন করতে থাকে।

Ludek J Dobroruka আরো পর্যবেক্ষন করেছেন অনুপ্রবেশকারীর ভঙ্গিমাটি ঠিক কেমন হয় তার উপর। তারা একটু কুঁকড়ে, ঝুঁকে, সামনের পা দুটো কিঞ্চিৎ গুটিয়ে থাকে। এবার সঙ্গের ছবিটি খেয়াল করুন। সামনের রঙচঙেটি যদি ডমিন্যান্ট পুরুষ হয় তবে তার মাথা উঁচু, দৃপ্ত পদসঞ্চার, লেজের লোম এবং লেজ খাড়া হয়ে রয়েছে। আর পেছনের অনুসরনকারীর মাথা নীচু, সামনের পা সেভাবে স্ট্রেচড্‌ নয় এবং লেজটি নীচু।

একটু পরেই আমি অনেকটা নিশ্চিত হই যে পেছনের কালো স্কুইরেলটি অনুপ্রবেশকারী। এই ছবিতে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে পেছনের কালোটি সামনের পা দুটো গুটিয়ে বুকের কাছে রাখছে বেশিরভাগ সময়। অর্থাৎ আত্মসমর্পনের ভঙ্গি। কিন্তু রঙচঙে ডমিন্যান্টটি তার সামনের পা শরীরের দুদিকে বিস্তৃত করে ঝুলিয়া রেখেছে।

MGS 3
রঙচঙে ডমিন্যান্টটি তার সামনের পা শরীরের দুদিকে বিস্তৃত করে ঝুলিয়া রেখেছে

 

পর্যবেক্ষনের আনন্দ এখানেই শেষ হয়ে যায়না। কিছুক্ষন পরে দেখি রঙচঙেটি গাছে ডালের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় চোখ বুঁজে ঘ্রান নেওয়ার চেষ্টা করলো।

MGS 4
রঙচঙেটি গাছে ডালের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় চোখ বুঁজে ঘ্রান নেওয়ার চেষ্টা করলো

 

ঠিক পর মুহূর্তেই তার শরীরের Anogenital অংশগাছের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় চেপে ধরে মুহূর্তের জন্য ঘষে নিলো। ছবিতে ভালো করে খেয়াল করলেই দেখা যাবে লেজের গোড়ার দিকটা একটু তুলে ধরে, পিঠটাকে বেঁকিয়ে শরীরের genital অংশকে গাছের গুঁড়ির একটি উঁচু জায়গায় সজোরে চেপে ধরেছে।

জায়ান্ট-স্কুইরেল
জায়ান্ট-স্কুইরেল শরীরের genital অংশকে গাছের গুঁড়ির একটি উঁচু জায়গায় সজোরে চেপে ধরেছে

গবেষক Ludek J Dobroruka লিখেছেন “Scent marking is frequently seen amongst the Sciuridae (5). In giant squirrels urine marking is very common and conspicuous in both sexes. The anogenital area is pressed to the branch and the animal moves slowly forward as it urinates (Fig. 4). The squirrels may gnaw certain areas, leaving small patches bare of bark, a pattern reminiscent of marking in the Grey squirrel Sciurus carolinensis (12). These bare patches are darker than the rest of the branch and rather sticky. The marking points are often checked olfactorally and the urine marks are always renewed. Not only are they impregnated with urine, but they are also marked by rubbing the cheek glands against them.”

 

প্রায় একই রকম স্বভাব আমি লক্ষ্য করেছিলাম বছর তিনেক আগে এই মানসেই। খেয়াল করুন স্কুইরেলটি গুঁড়িটির ওপর যেখানে রয়েছে তার ঠিক  সামনে সে গাছের ছাল তুলে নিজস্ব এরিয়া মার্কিং করেছে।

Marking 1
গাছের ছাল তুলে নিজস্ব এরিয়া মার্কিং করেছে

 

আমি গবেষক Dobroruka-র গবেষণাপত্রটি আগেই পড়েছিলাম খুঁটিয়ে। যেহেতু জায়ান্ট স্কুইরেলদের আমার খুব পছন্দ। তাই ওদের নিয়ে জানতে ভালো লাগে। ওদের দেখতে দেখতে খেয়ালই ছিলো না যে বিকু আমাকে অনেকক্ষন থেকে বলছে ক্যাপড লেঙ্গুরের একটা বাচ্চা খুব কাছে বসে আছে। চোখ ফেরাতেই দেখি বাচ্চাটি খুব কৌতূহল নিয়ে জায়ান্ট স্কুইরেলদেরই দেখছে।

ক্যাপড-লেঙ্গুর-বাচ্চাটি-খুব-কৌতূহ -নিয়ে-জায়ান্ট-স্কুইরেলদেরই-দেখছে
ক্যাপড লেঙ্গুর বাচ্চাটি খুব কৌতূহল নিয়ে জায়ান্ট স্কুইরেলদেরই দেখছে

 

আচমকাই একটা ঘটনা ঘটে গেলো। অনুপ্রবেশকারী কালো স্কুইরেলটি মুখোমুখি হয়ে গেলো ক্যাপড লেঙ্গুরের বাচ্চাটির। প্রথমে সব ঠিক ছিলো। হঠাৎই জঙ্গলের শান্ত নিরিবিলি গল্পে উত্তেজনার পারদ চড়ে গেলো। স্কুইরেলটি স্থির হয়ে আর লেঙ্গুরটি তার দিকে আক্রমনের ভঙ্গিতে তাকিয়ে। যেন এই মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়।

CL & MGS 2
স্কুইরেলটি স্থির হয়ে আর ক্যাপড লেঙ্গুরটি তার দিকে আক্রমনের ভঙ্গিতে তাকিয়ে

মানসে তারা দুজনেই অস্তিত্তের সংকটের মধ্যে রয়েছে। তারা দুজনেই গাছে গাছে জীবন কাটানো স্তন্যপায়ী। তাদের খাদ্য তালিকায় প্রচুর মিল। তবে লেঙ্গুরের খাদ্যতালিকায় ছোট মেরুদন্ডী প্রাণী আছে। পৃথিবীর সমস্ত প্রাইমেট– ক্যাপুচিন, বেবুন, শিম্পাঞ্জী – ছোট মেরুদন্ডী প্রাণী মেরে খায়। কিন্তু সে তো বাচ্চা। তাদের কখনো লড়তে দেখিনি। তবু আজ যদি লড়াই বেধে যায়?

বেশ কয়েক বছর আগে পড়া একটা ঘটনা মনে পড়ে। এক ভারতীয় গবেষক, H S Sushma ২০০১ সালে তামিলনাড়ুর ইন্দিরা গান্ধী ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি থেকে রিপোর্ট করেছিলেন, এক পূর্ণ-বয়স্ক লায়ন টেইল্ড ম্যাকাক (lion-tailed Macaque) তাড়া করে ধরে ফেলে এক বাচ্চা (sub-adult) ইন্ডিয়ান জায়েন্ট স্কুইরেলকে। আধমরা করে গাছের ওপরে নিয়ে যায় এবং দেহের চামড়া ছাড়িয়ে খেতে শুরু করে। লায়ন টেইল্ড ম্যাকাক-দের ক্ষেত্রে সেটাই ছিলো প্রথম রিপোর্ট যেখানে তারা প্রায় দু কেজির ইন্ডিয়ান জায়েন্ট স্কুইরেলকে ধাওয়া করে শিকার করছে। যেখানে ইন্ডিয়ান জায়েন্ট স্কুইরেল অনেক বেশি দ্রুত যেকোনো হনুমানদের থেকে। এখানেও যদি সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়! আমি উত্তেজনায় উদ্বেগে ক্যামেরা থেকে চোখ সরিয়ে নিই। বারবার ভাবছিলাম স্কুইরেলটা তো অ্যালার্ম কল দেয়নি। তাহলে তো সব ঠিক থাকার কথা।

সব ঠিক ছিলো তারপর।তারা দুজনেই নিজের জায়গায় সরে গেছিলো অতঃপর। এক অযাচিত লড়াই হতে গিয়েও হলো না। এক অদ্ভুত শান্তি। দেখি লেঙ্গুরের বাচ্চাটাকে তার মা হাত ধরেছে। শান্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে। যেন আস্বস্ত করছে – কিছু হয়নি, কিছু হয়নি!!

ক্যাপড-লেঙ্গুর
মা ক্যাপড-লেঙ্গুর যেন বাচ্চা ক্যাপড-লেঙ্গুরকে আস্বস্ত করছে – কিছু হয়নি, কিছু হয়নি!!

 

আর স্কুইরেল দুটো দিব্যি আগের মত এগাছ সেগাছ….করে দূরে পা গুটিয়ে বসে। আবার পর্যবেক্ষণের আনন্দে ডুবে যাই। কি আশ্চর্য! এবার তো দুজনেই সামনের পা দুটো গুটিয়ে বসে আছে! দুজনেই কি এখন তবে আত্মসমর্পনের মুডে? হতে পারে তারা দুজনেই এখন অন্যের এলাকায়! কারন Dobroruka লক্ষ্য করেছেন  স্কুইরেলদুটি ডমিন্যান্ট আর সাবমিসিভ স্বভাব দেখায় শুধু মাত্র চিহ্নিত করা ও নিজের খাওয়ার জায়গায়। তাই ডমিন্যান্ট আর সাবমিসিভ-এর র‍্যাংকিং এলাকা অনুযায়ী পরিবর্তনশীল। তবে কি প্রথমে আমি রঙচঙেটিকে যেখানে দেখি সেটাই ওর নিজস্ব চিহ্নিত করা এলাকা? প্রশ্ন আর খুঁজে ফেরার আনন্দে মশগুল হয়ে পড়ি।মানস আবার ফিরে যায় ফেব্রুয়ারির পাখির ডাকে। গল্পের চরিত্রগুলো নিজেদের পৃথিবীতে থিতু হয়। পেছনে ফিরে দেখি স্ত্রী-পুত্র দুজনেই ডাকতে এসে অপেক্ষা করছে। আমাদের তিনজনের খাওয়া না হলে কিচেন বন্ধ করা যাচ্ছে না যে!

MGS 6

লেখা ও ছবি – সম্রাট সরকার

ইমেল –samratswagata11@gmail.com

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.4 / 5. Vote count: 9

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

হেপাটাইটিস এর খাওয়া দাওয়া

4.4 (9)   যেকোনো রোগের ক্ষেত্রেই আহার একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, হেপাটাইটিসের মতো রোগের ক্ষেত্রেও পথ্যই হলো নিরাময়ের নেপথ্য কারিগর । ওষুধের পরেও খাবার অনেকটা কাজ করে, তাই সবার আগে জানতে হবে কোনটা খেতে হবে আর কোনটা খেতে হবে না ! আসলে খাবারই হলো আমাদের সবচেয়ে বড়ো বন্ধু আবার […]
হেপাতাইতিস-এর-খাবার
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: