ফ্ল্যাট বাড়িতে বসবাসকারীর স্বাস্থ্য সমস্যা

ফ্ল্যাট বাড়িতে-বসবাসকারীর-স্বাস্থ্য-সমস্যা

আধুনিক ফ্ল্যাট বাড়ি আর আমাদের আরাম-আয়াসের জীবন- যাপন, এই দুই অভ্যাসের যুগলবন্দিতে তৈরি হচ্ছে ইনডাের পলিউশন, ডেকে আনছে ভয়ানক স্বাস্থ্য সমস্যা।ঠিকমতাে ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা না থাকার কারণে আধুনিক ফ্ল্যাটবাড়ির ঘরগুলােও অনেক সময় হয়ে উঠছে ইনডাের পলিউশনের
প্রধান কারণ। এর ফলে দেখা দিচ্ছে নানা ধরণের রােগ, বিজ্ঞানীদের পরিচিত ভাষায় যা পরিচিত সিক বিল্ডিং সিনড্রোম (Sick Building Syndrome) নামে।

বিভিন্ন রাসায়নিক উপস্থিতির কারণে ইনডাের পলিউশন এবং স্বাস্থ্যের ওপর তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া নিয়ে
আজ গােটা বিশ্ব চিন্তিত। আলােচনা, গবেষণার আলাের বৃত্তে রয়েছে প্রধান তিনটি বিষয় – সিক বিল্ডিং
সিনড্রোম ( বা Sick House Syndrome), মাল্টি কেমিক্যালস সেনসিটিভিটিস (Multi Chemicals Sensitivities) এবং মাইকোটক্সিকোসিস (Mycotoxi- cosis)। সারা বিশ্বেই গত শতকে যখন শহর বাড়ছিল, চারদিকে যত্রতত্র গজিয়ে উঠছিল ফ্ল্যাট – দশ বাই দশ ফুটের দুই কামরা বা তিন কামরার
ফ্ল্যাট বাড়িতে আমরা যখন সীমাবদ্ধ জীবনযাপন পর্ব শুরু করলাম, গ্রামের খোলামেলা বাড়ি থেকে এই ‘কৌটো’ গুলােতেই যখন অভ্যস্ত হয়ে পড়তে থাকলাম-তখনই দেখা দিল নানা সমস্যা।

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন  ফ্লাটবাড়িতে বসবাসকারী লােকজনদের মধ্যে টিউবারকিউলােসিস সংক্রমণের ঘটনা  হার অনেক বেশি।

জাপানের চার-পাঁচটি বিখ্যাত দেশিয় গবেষণা সংস্থার যৌথ উদ্যোগে যে গবেষণা চালান হয়, তাতে উঠে এসেছে ভয়ংকর তথ্য। এতে দেখা গেছে অতিরিক্ত ইনডাের পলিউশনের কারণে সিকবিল্ডিং সিনড্রোম হয়। জাপানের স্বাস্থ্য ও শ্রম মন্ত্রকের কড়া আইনকানুন থাকা সত্ত্বেও এবং তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মেনে চলা সত্ত্বেও আজও ঘরে ঘরে সিক বিল্ডিং সিনড্রোম-এর প্রকোপ বাড়ছে বই, কমছেনা।

‘মাল্টিকেমিক্যালস সেনসিটিভিটিস’ জাতীয় শারীরিক সমস্যা একটা গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসমস্যা হয়ে উঠছে, যার কারণের পেছনে রয়েছে ঘরের বাতাসে বিভিন্ন দূষিত যৌগের ও রাসায়নিকের উপস্থিতি।

বিজ্ঞানীরা চিন্তিত কারণ খুব কম পরিমাণেও যদি ঘরের বাতাসে এই ধরণের দূষক রাসায়নিকগুলাে থাকে, তবে তাই যথেষ্ট ‘মন্টি কেমিক্যালস সেনসিটিভিটিস’ তৈরির পক্ষে। তাই, আজকাল সিকসিনড্রোম আর মাল্টি কেমিক্যালস সেনসিটিভিটিস সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমেরিকা, ইউরােপ, জাপানসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই ইনডাের কেমিক্যালস পলিউশন নিয়ন্ত্রণে তৈরি হয়েছে একগুচ্ছ আইন কানুন। এই আইন মোতাবেক যেসব বিল্ডিং মেটিরিয়ালস থেকে বেশি পরিমাণে
ফর্মালডিহাইড নিঃসৃত হয় তাদের বাড়ি বা ফ্ল্যাট তৈরিতে ব্যবহার করা যাবে না। যদিও আমাদের দেশে এমন আইন নেই।

সিক বিল্ডিং সিনড্রোমের কারণ ও সিকবিল্ডিং সিনড্রোমের পেছনে নানা কারণ রয়েছে, রয়েছেনানা দুষকের ক্রিয়া বিক্রিয়া। এই দূষকগুলাের প্রত্যেকটি নিয়ে আগেই আলােচনা করা হয়েছে।

এখানে সংক্ষেপে বলা হল ঠিক কোন কোন ফ্যাক্টর এই রােগগুলাে ডেকে আনে।

১) অতিরিক্ত আর্দতা-স্যাতসেতে ভিজে ভাব আর বেশি আদ্রর্তার কারণে ঘরের মধ্যে মােল্ড বেশি করে জন্মায়। এগুলাে আলাভি ও রেসপিরেটরি সিস্টেমের নানা রােগ তৈরি করে। এছাড়াও বেশি আঠার
জন্য আমাদের নাকের ভেতর শুকিয়ে যেতে পারে, শুকনাে ত্বকে দেখা গিয়ে চুলকানি, র‍্যাশ জাতীয় সমস্যা।
২) ঘরের আপনার ঘরের তাপমাত্রা যদি বেশি হয়, তবে তা আমাদের  পক্ষে ভালাে নয়। ছােট ঘরে ঠিকমতাে বাতাস চলাচল না

৩) পাটিকুলেট মেটাল, এইগুলাে তৈরি হয় ঘরেরই নানা আসবাব থেকে বা শহরের বাতাস থেকে ঘরে ঢুকে পড়ে। রেসপিরেটরি ট্র্যাকের ক্ষতি করে।

৪) নানা গ্যাস – গ্যাস স্টোভ, ফায়ার প্লেস বা কেরােসিন তেলের দহনে নানা ধরণের গ্যাস, যেমন-তৈরি হয়, যা পরবর্তীকালে ডেকে আনে অ্যাজমা বা হাঁপানির মতাে কষ্টদায়ক রােগ।

৫) জীবজ দূষক ঃ- মােল্ড জাতীয় দৃষক যারা মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে খুব মারাত্মক।

৬) রাসায়নিক ফ্যাক্টরঃ- এরা দুই ধরণের-উদ্বায়ী জৈব যৌগ (যেমন- ফর্ম্যালডিহাইড) ও অর্ধ উদ্বায়ী জৈব যৌগ (যেমন- পেস্টিসাইড, থালেট এস্টার প্রভৃতি)। এদের উপস্থিতিতে শ্বসনতন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্র উভয়ের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয় ও নানা রােগ দেখা দেয়।

ফ্ল্যাট-বাড়িতে-বসবাসকারীর-স্বাস্থ্য-সমস্যা
ফ্ল্যাট-বাড়িতে-বসবাসকারীর-স্বাস্থ্য-সমস্যা

ক্ষতি কতটা?

সিক বিল্ডিং সিনড্রোম এর উপসর্গগুলাে পরবর্তীকালে ডেকেআনে স্থায়ী কিছু রােগ। সিকবিল্ডিং সিনড্রোম বা সিকহাউজ সিনড্রোমে যেসব উপসর্গ দেখা দেয়, তার তালিকা নেহাত ছােটনয়, এখানে কয়েকটির
উল্লেখ করা হল-

১) চোখের নানা সমস্যা, যেমন-শুকনাে হয়ে যাওয়া, ক্লান্ত চোখ, চোখের মধ্যে চুলকানি ইত্যাদি।

২) একটুতেই ক্লান্তি বােধ করা, ঘুমঘুম ভাব।

৩)মাথাব্যাথা

৪) টেনশন

৫) নার্ভাসনেস

৬) ঘাড়ে, পিঠে ব্যথা, শক্ত হয়ে যাওয়া

৭) নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া বা নাক দিয়ে জল পড়া

৮) সাইনাস

৯) ঠোঁট শুকিয়ে যাওয়া

১০) হাঁচি

১১) ভুলে যাওয়ার সমস্যা, কোন কিছুতে মনােযােগ দিতে সমস্যা।

১২)কাশি

১৩)শুকনাে ত্বক, চুলকান

১৪) মনখারাপ লাগা, ডিপ্রেশন

১৫) মাথাঘােরা

১৬) বুকে কষ্ট, দম বন্ধ হয়ে আসা

১৭) বমিবমি ভাব, পেট খারাপ

১৮) শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি ইত্যাদি।

এই উপসর্গ গুলাের প্রত্যেকটিই মানুষের বসবাসের সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থাৎ ইনডোের পলিউশন যেখানে বেশি সেই ধরণের বাড়িতে বা ঘরে দেখা দেয়। রােগী বাড়ি বা ঘর থেকে দূরে থাকলে চলে যায়, আবার ঘরে ফেরার পর তা দেখা দেয়।

বিপদ কাদের বেশি ?

সিক বিল্ডিং সিনড্রোম শিকার হতে পারেন সবাই।স্বভাবতই যারা বেশিক্ষণ এই ধরণের বাড়িতে কাটান, তাদেরই বেশি হবে। বিশেষ করে বাচ্চা, মহিলা আর বৃদ্ধদের। স্কুল থেকেও বাচ্চাদের সিক বিল্ডিং সিনড্রোম হতে পারে।

বিশেষ করে ফর্মালডিহাইড ও টলুইন এর কারণে। গরমের সময় ফর্মালডিহাইডের নিঃসরণের মাত্রা বাড়ে।

টলুইন থাকে রঙে-রঙ কে পাতলা করতে (মিথাইল বেনজিন) এটি ব্যবহৃত হয়। এই কারণেই বিজ্ঞানীরা
বলছেন স্কুলের ভেতর এই ধরণের বিপদ এড়াতে স্কুল বাড়ির রঙ, রেনােভেশন সবকিছুই গরমের ছুটিতে করা উচিত।

গরমের এই সময়টাতে বেশির ভাগ ফর্মালডিহাইড বা অন্যান্য উদ্বায়ী জৈব যৌগগুলাে দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে
যেতে পারে, ফলে লম্বা গরমের ছুটির পর বাচ্চারা যখন স্কুলে আসে, তখন এইসব রাসায়নিক প্রভাব অনেকটাই প্রশমিত হয়ে যায়। একই ভাবে, ফ্ল্যাট বা বাড়ি ঘর রঙ করার বা রেনােভেশন করার অন্ততঃপক্ষে দুইমাস বাদে সেই ঘর বসবাসের উপযুক্ত হয় আর আপনি কিছুটা এড়াতে পারেন সিকবিন্ডিং
সিনড্রোম।

লেখকঃ-ড. সােমা বসু

লেখটি বিজ্ঞান অন্বেষক থেকে সংগৃহীত।

Leave a Reply

%d bloggers like this: