দাঁতের ব্যথা কমানোর বৈজ্ঞানিক উপায়

4.3
(6)

দাঁত নাকি মানুষের চেয়েও অপরাধপ্রবণ । সারা জীবনে অনেক পাপ কাজ করে। পাঁঠা চিবোয়, মুরগির ঠ্যাং ভাঙে, মাছের জীবন নাশ করে। দাঁতের সব কাজই হলো নাশকতামূলক। একটাও গঠনমূলক কাজের দৃষ্টান্ত নেই। সারা জীবন খিঁচিয়ে গেল, চিবিয়ে গেল, কামড়ে গেল। পাপের বেতন কী? মৃত্যু। তাই মানুষের আগেই তার দাঁত পড়ে। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের লেখা বড়মামা সিরিজ থেকে । পড়েই আশা করি বুঝতে পারছেন যে, আজ দাঁত নিয়ে কথা বার্তা হবে ।

দাঁত মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মুখে অবস্থিত পৌষ্টিক তন্ত্রের একটি অঙ্গ বিশেষ । এটি খাদ্য পরিপাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অধিকাংশ প্রাণীর মতোই মানুষের দেহেরও কঠিনতম অঙ্গ হচ্ছে দাঁত ।

জীবন দশায় মানুষের দু-বার দাঁত ওঠে । প্রথমে দুধের দাঁত এবং পরে স্থায়ী দাঁত ; তাই মানুষের দাঁত কে ডাইফিওদন্ট দাঁত বলা হয় । আরেকভাবে বলা যায় আমরা থেকোডন্ট দাঁতের অধিকারী,কারণ আমাদের দাঁত মাড়ির মধ্যে প্রোথিত থাকে ।

মানুষের বিভিন্ন প্রকার দাঁত থাকে,তাই আমরা হেটেরোডন্ট প্রাণী । মানুষের মোট দাঁতের সংখ্যা ৩২ টি ।

দাঁতের-প্রকারভেদ
দাঁতের-প্রকারভেদ

কাজ অনুযায়ী দাঁত চার প্রকারের হয়ে থাকে । যথাঃ

• পোষক বা মোলার : এটি খাদ্যকে চিবিয়ে পিষে ফেলার কাজে ব্যবহৃত হয় । ডেন্টাল ফর্মুলাতে এর সংখ্যা তিনটি ।
• পোষক বা প্রি-মোলার : এই প্রকার মোলার দাঁতের মতই, কিন্তু আকারে ছোট, এবং অনেক সময় এদেরকে বাইকাস্পিডও বলা হয় । ডেন্টাল ফর্মুলা অনুযায়ী এর সংখ্যা দুটি ।

• কৃন্তক বা ক্যানাইন : এটি খাদ্য কে ছিঁড়ে ফেলার কাজে ব্যবহৃত হয় । একে কাস্পিড দাঁতও বলা হয়ে থাকে । ডেন্টাল ফর্মুলা অনুযায়ী এর সংখ্যা দুটো ।

•ছেদক দন্ত বা ইন্সিসর : এটি খাদ্য কে ছেদনের কাজে ব্যবহৃত হয় । এর সংখ্যা একটি ।

ডেন্টাল ফর্মুলা : উপরের ও নীচের চোয়াল কে দুটি অংশে ভাগ করে, প্রতিটি অংশে 8টি করে দাঁত হিসেবে করে যে পরিসংখ্যান তৈরী করা হয়,তাঁকে ডেন্টাল ফর্মুলা বলা হয়ে থাকে ।

দাঁতের গঠন :

ক্রাউন বা মুকুট : এটি দাঁতের মাড়ির ওপরে থাকা অংশ এবং এই অংশটিই দৃশ্যমান ।

দাতের-গঠন
দাতের-গঠন

 

রুট বা শিকড়: দাঁতের এই অংশটি যা মাড়ি এবং চোয়ালের শক্ত হাড় দিয়ে আবৃত থাকে । শিকড়ের সংখ্যা এক থেকে চার পর্যন্ত হয়ে থাকে ।

নেক : দাঁতের মুকুট ও শিকড়ের সংযোগস্থলকে নেক বলা হয় । এটিও সাধারণত মাড়ি দিয়ে আবৃত থাকে।

এনামেল : এটি দাঁতের একেবারে বাইরের শক্ত আবরণ, যা ক্যালসিয়াম ও ফস‌ফেট দ্বারা গঠিত ।

ডেন্টিন : এটি ভিতরের স্তর, যা দাঁতের অধিকাংশ স্থান জুড়ে রয়েছে ।

ডেন্টাল পাল্প : এটি দাঁতের ভিতরের অংশ। এখানে স্নায়ু ও রক্তবাহী নালিকা অবস্থান করে ।

সিমেন্ট : দাঁতের মূলের চারিদিকে অবস্থিত পাতলা স্তর বিশেষ । অস্থির ন্যায় আবরণটি দাঁতকে চোয়ালের সাথে সংযুক্ত করে রাখে ।

এছাড়াও, দাঁতের সিমেন্ট ও চোয়ালের মাঝখানে যে সূক্ষ ফাঁকা থাকে, সেখানে অগণিত অতিসূক্ষ তন্তুসদৃশ লিগামেন্ট থাকে যাকে পেরিওডন্টাল টিস্যু বলে। দাঁতকে চোয়ালের হাড়ের সাথে যুক্ত রাখাই এর প্রধান কাজ।

আক্কেল দাঁত :

এই দাঁতই আপনাকে বলে দেবে আপনার আক্কেল হয়েছে কি না !
মানুষের মুখগহ্বরের ওপরের ও নিচের চোয়ালের সবচেয়ে পেছনে বা শেষে উভয় দিকে একটি করে মোট চারটি দাঁত ওঠে আর এই দাঁতগুলোকে আক্কেল বা উইসডম টিথ বলে।

আক্কেল-দাঁত
আক্কেল-দাঁত

 

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ত্রিরিশ বছর বয়সের মধ্যে এই দাঁত উঠে থাকে । কথনো এই দাঁত আংশিকভাবে ওঠে, অনেকের ক্ষেত্রে মাড়ির নিচেই থেকে যায়।

যখন আক্কেল দাঁত ওঠে তখন প্রচণ্ড ব্যথা হয়। ব্যথায় মুখের ভেতরসহ গালও ফুলে যায়।

মানুষের ক্ষেত্রে দুধ দাঁতগুলো পড়ে যাওয়ার পর ফাঁকা জায়গায় স্থায়ী দাঁতগুলো আসতে থাকে। অর্থাৎ স্থায়ী দাঁতগুলোর জন্য ফাঁকা জায়গা থাকে; কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আক্কেল দাঁতের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না।

আক্কেল দাঁত তখন আংশিকভাবে এবং আঁকাবাঁকা হয়ে ওঠে, কখনো উঠতেই পারে না; মাড়ির নিচে লুকিয়ে থাকে।

আক্কেল দাঁতের মাড়ির নিচে খাবার জমে ব্যাকটেরিয়া জন্মায় এবং মাড়িতে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে পেরিকরোনাইটিস বলে। এই সংক্রমণের ফলে তীব্র ব্যথা হয়, মাড়ি ও গাল ফুলে যায়। মুখ খুলতে অসুবিধা হয়। এতে আক্কেল দাঁত ও তার পাশের দাঁত দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গজদাঁত :

এটি সকলের ক্ষেত্রে দেখা যায় না, কোনো কোনো মানুষের ক্ষেত্রে এই দাঁত ওঠে । উপরের চোয়াল থেকে অস্থায়ী দাঁতের পাশ দিয়ে অর্থাৎ ঠোঁটের দুপাশে যে বাড়তি দাঁত বের হয় , তাকে গজ দাঁত শাখাদন্ত বলা হয় ।যেকোনো বয়সেই এই দাঁত বের হতে পারে ।

গজদাঁত
গজদাঁত

দাঁতের সমস্যা :

•  দাঁতের ক্ষয় নিয়ে দুশ্চিন্তার অন্ত নেই!এটাই দাঁতের মূল রোগ !

•  প্রতিদিন অন্তত দু’বার দাঁত ব্রাশ করা জরুরী, এই কথাটা আমরা সকলেই জানি। আমরা অনেকেই দিনে দু’বার দাঁত ব্রাশ করি এবং ঘরের ছোটো শিশুদের দাঁতের যত্ন নিতে শিখিয়ে থাকি। কিন্তু এই সব সত্ত্বেও নানা কারণে দাঁত ও মাড়িতে ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণের ফলে অকালে দাঁতের ক্ষয়, মাড়িতে ব্যথা ইত্যাদি সমস্যা হয়ে থাকে ।

•  খাবার চিবানো আর কামড়ে খাওয়ার জন্যই দাঁত । বোতলের মুখ খোলা কিংবা প্যাকেট ছেঁড়ার হাতিয়ার হিসেবে দাঁত ব্যবহার কখনোই নয় । অতিরিক্ত শক্ত খাবার, শক্ত হাড় বেশি কামড়াবেন না । দাঁতের বাইরের আবরণ অর্থাৎ এনামেল নষ্ট হতে পারে, দাঁতে সূক্ষ্ম ফাটল দেখা দিতে পারে । বরফ বা ক্যান্ডি কামড়ে খাবেন না, এই ঘটনাও দাঁতের ক্ষতি ডেকে আনতে পারে ।

দাঁতের সমস্যার কারণ : 

খাদ্য তালিকায় প্রয়োজনীয় খনিজ মৌলের অভাব , ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি-এর অভাব ইত্যাদি কারণে দাঁত ক্ষয়ের সমস্যা হয় । যেমনঃ ক্যালসিয়ামের অভাব জনিত দাঁতের ক্ষয়, ভিটামিন ডি এর অভাবে দাঁত ও মাড়ির বিভিন্ন রোগ ।

হরমোনের ভারসাম্যহীনতা দাঁতের সমস্যার অন্যতম একটি কারণ । প্যারাথাইরয়েড হরমোনের অভাবে ক্যালসিয়ামের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয় ।

অনেক সময় খাদ্যদ্রব্য জমে এবং না পরিষ্কার করার ফলে এই সমস্যার সৃষ্টি হয় । কিছু জেনেটিক্যাল সমস্যাও থাকে ।

তেল-মশলাযুক্ত খাবারের অভ্যাস, অ্যালকোহল পানের অভ্যাস, অতিরিক্ত চা-কফি কিংবা ধূমপান বা পান, তামাক, গুটকাজাতীয় জিনিস চিবানোর অভ্যাস থাকলে দাঁতে দাগ পড়ার পাশাপাশি অন্যান্য সমস্যার আশঙ্কা অনেক বেশি ।

এই সব অভ্যাস আশু, নিয়ন্ত্রণ করুন। আর এ জাতীয় খাদ্য-পানীয় গ্রহণ করার, পরপরই দাঁত পরিষ্কার করুন । বোতলজাত প্রায় সব পানীয়ই ‘কার্বনেট’ করা থাকে, এসব পানীয় পান করা বন্ধ করে বা যতটা সম্ভব কমিয়ে দাঁতে ক্ষতিকারক অ্যাসিডের প্রভাব কমান । কারণ এরা দাঁতের এনামেলের নষ্ট করে দাঁত ক্ষয় করে ফেলে ।

দাঁতের ক্ষয় :

ক্ষয় যা গহ্বর হিসাবে দাঁতে অবস্থান করে। দাঁতের ক্ষয় হলো বিশ্বব্যাপী একটি সার্বজনীন । গহ্বরগুলির কারণ হলো ব্যাকটেরিয়া যা সমস্ত মানুষের মুখে স্বাভাবিকভাবেই থাকে । ব্যাকটিরিয়া আমাদের ডায়েটের চিনি ব্যবহার করে একটি অ্যাসিড তৈরি করে যা দাঁতে ছিদ্র তৈরি করে । যাকে গর্ত, দাঁতের ক্ষয় বা গহ্বর বলা হয় । এই কারণেই চিনি এত মারাত্মক !

দাঁতের-ক্ষয়
দাঁতের-ক্ষয়

ব্যাকটেরিয়া গহ্বর সৃষ্টি করে , এবং দাঁতের গভীরে সুড়ঙ্গ করতে থাকে । গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে গহ্বরটি টিপিং পয়েন্টে না আসা পর্যন্ত আমরা সংবেদনশীলতা বোধ করতে শুরু করি না । টিপিং পয়েন্টটি দেখা দেয় যখন ব্যাকটিরিয়া পুরোপুরি অভ্যন্তরে পৌঁছেছে এবং একটি সংক্রমণ ঘটায় ।স্নায়ুও রক্তবাহ পর্যন্ত পৌঁছে যায় ।

ক্ষয়ের প্রথম লক্ষণটি হলো সংবেদনশীলতা ! যখন গরম বা ঠান্ডা জল পান অথবা কোনো কিছু খাওয়া হয় তখন স্নায়বিক অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি হয় । যা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং কয়েক মাস বা বছরের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় ।

দাঁতের ব্যথা কমানোর উপায়

অতএব দাঁত থাকতেই দাঁতের মর্ম বুঝুন আর দাঁতের যত্ন নিন। জেনে ফেলি দাঁতের ক্ষয় রোধ করার কয়েকটি সহজ উপায়…

১) পুষ্টিকর ও যথার্থ ডায়েট : খাদ্য তালিকায় রাখুন ভিটামিন ও মিনারেল সমৃদ্ধ খাবার। এসব খাবারে থাকা ফ্যাটে দ্রবণীয় প্রকৃতির ভিটামিন দাঁতের ক্ষয় রোধে করে । শাকসবজির পাশাপাশি ফল,গোটা গরমমশলা, নারকেল তেল, বাদাম ইত্যাদি উপাদান খাদ্য তালিকায় রাখুন ।

২) টুথপেস্ট নির্বাচন : রাসায়নিক উপাদান কম থাকে এমন টুথপেস্ট ব্যবহার করুন। বাজার চলতি ভেষজ উপাদানে তৈরি প্রচুর আয়ুর্বেদিক টুথপেস্ট আছে । উপাদান গুলি পড়ে নিয়ে, দাঁতের ক্ষয় রোধ করতে নিয়মিত ব্যবহার করুন ।

৩) দাঁত নিয়মিত পরিষ্কার : রাতে খাওয়ার পর এবং সকালে খাওয়ার পর দাঁত ব্রাশ করুন। এক্ষেত্রে নরম টুথব্রাশ ব্যবহার করাই ভাল,যাতে দাঁত এবং মাড়িতে আঘাত না লাগে । দাঁত ব্রাশ করার সময় জিহ্বা পরিষ্কার করুন ।

৪) মিষ্টি জাতীয় খাবার থেকে সচেতন : যে কোনও রকম মিষ্টি জাতীয় খাবারকে , আপনার টিমে নেওয়া চলবে না ! তাহলেই জিতে যাবে শত্রু ! মিষ্টি প্রীতি কে দিতে হবে ইতি, শুধু খাবার তালিকা থেকে নয় ! মন থেকেও । WHO – এর মতে মিষ্টি জাতীয় খাবার দাঁতের ক্ষয়ের পরিমান বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।

দাঁত পরিষ্কারে টুথব্রাশ :

মুখের সুস্থতা অনেকাংশেই মুখ পরিষ্কার রাখার উপর নির্ভরশীল । মুখ পরিষ্কার রাখার ফলে দাঁতের ক্ষয়রোগ, গিংগিভিটিজ, পিরিওডন্টাল রোগ, হ্যালিটোসিস বা মুখের দুর্গন্ধ এবং অন্যান্য রোগ সমস্যা থেকে রক্ষা পাওয়া যায় ।

টুথব্রাশ-বির্বতন
টুথব্রাশ-বির্বতন

তবে এ জন্য ব্যক্তিগত পর্যায়েই সচেতনতা প্রয়োজন। সচেতনভাবে দাঁত ব্রাশ করার পাশাপাশি নিয়মিত দন্তচিকিৎসকের মাধ্যমে দাঁত পরিষ্কার করলে দাঁতের ক্যালকুলাস বা টারটার এবং দাঁতে অবস্থানরত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া নির্মূল হয়। পেশাদারীভাবে দাঁতের পরিষ্কারের জন্য টুথ স্কেলিং করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির প্রয়োগ দেখা যায়।

দাঁত পরিষ্কার রাখার উদ্দেশ্যই হচ্ছে দাঁতের আবরণে ও ফাঁকা জায়গায় থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াকে দূরে রাখা । প্রতিদিন খাদ্য গ্রহণের পর সকালে এবং রাতে দু’বার নিয়মিতভাবে দাঁত ব্রাশ করতে হবে। এর ফলে দাঁতের গঠন সুন্দর এবং মজবুত হবে ।

ক্ষয় এবং ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার থেকে রক্ষা পাবে।প্রতি তিন মাস অন্তর টুথব্রাশ পরিবর্তন করতে হবে। সম্ভব হলে এর আগেই টুথব্রাশ পরিবর্তন করা যেতে পারে। উন্নত জিনিস নির্মিত ব্রাশ ব্যবহার করতে হবে এবং লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে ব্রাশটি নরম হয় ।

ফুলে মুখের ভিতরে কোনো রকম আঘাত এড়ানো সম্ভব হবে l দাঁত মাজার সময় জোরে জোরে ব্রাশ ব্যবহার করলেই দাঁত বেশি পরিষ্কার হবে, ভাবনাটা নিতান্তই ভ্রান্ত ! জোরে ব্রাশ করলে, উল্টে বিপদ ! দাঁতের এনামেলের ক্ষতি হতে পারে। কেবল সামনে-পেছনে ব্রাশ না টেনে ব্রাশটা মাড়ির সাপেক্ষে ৪৫ ডিগ্রি কোণে রেখে দাঁত মাজতে হবে ।

আর অবশ্যই দুই-তিন মাস পর পর ব্রাশ পরিবর্তন করুন কারণ ব্রাশের ফাইবারগুলো বেঁকে যাওয়ার পরও তা ব্যবহার করতে থাকলে মাড়ির ক্ষতি হতে পারে।

প্রতি ছয় মাস পরপর দন্তচিকিৎসকের সুপারিশ গ্রহণ করতে হবে।ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট বা মাউথওয়াশ ব্যবহার করা উচিত, যা দাঁতকে আরো সুরক্ষা করবে।আয়ুর্বেদিক টুথপেস্ট ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক l

মাউথওয়াশ :

মাউথওয়াশ ব্যবহার খুবই উপযোগী হতে পারে, তবে সেটি কে অ্যালকোহলমুক্ত হতে হবে । বাজারের বেশির ভাগ মাউথওয়াশেই অ্যালকোহল থাকে বলে এসব ব্যবহারে সাময়িকভাবে মুখের টিস্যু শুষ্ক হয়ে যায় এবং ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এছাড়া রাসায়নিক উপাদান থাকায় মাউথওয়াশ বেশি মাত্রায় ব্যবহার করলে মুখের ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও ধারণা করা হয়েছে কোনো কোনো গবেষণায় । তাই এ বিষয়ে সচেতন হন।

মাউথওয়াশ-ব্যবহার
মাউথওয়াশ-ব্যবহার

 

দাঁতন :

এটি একটি প্রাচীন প্রক্রিয়া, গ্রামাঞ্চলে এখনো মানুষ এই প্রক্রিয়া অবলম্বন করেন ; দাঁতন হলো দাঁত পরিষ্কারে ব্যবহার করা গাছের ডাল। সাধারণতঃ নিম গাছের ডাল বা শাখার ক্ষুদ্র অংশ কেটে নিয়ে এক পাশে সামান্য চিবিয়ে ছিবড়া বানিয়ে নিম – দাঁতন তৈরী করে তা দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করা হয়। এই দাঁতন দিয়ে দাঁত মাজাকেই বলে দাঁতন করা। দাঁতন খুব সম্ভবতঃ টুথব্রাশের পূর্বপুরুষ। শহরাঞ্চলে টুথব্রাশের আগমনের ফলে দাঁতনের ব্যবহার কমে গেছে।

নিম – দাঁতন
নিম – দাঁতন

দাঁতে কোনো ক্ষত ধরা পড়লে, দাঁতে বা মাড়িতে ব্যথা হলে, মাড়ি থেকে রক্তপাত কিংবা দাঁত শিরশির করলে অবশ্যই দাঁতের চিকিত্সকের কাছে যান। সঠিক সময়ে চিকিৎসা করালে দাঁতের সুরক্ষা নিশ্চিত হতে পারে। বছরে এক দুবার আমাদের সবার দাঁত পরীক্ষা করিয়ে নেওয়াটা জরুরি। সত্যি বলতে অনেক সময়ই আমরা দাঁত ও মাড়ির এমন কিছু সমস্যায় আক্রান্ত হই, যা মারাত্মক পর্যায়ে না পৌঁছালে আমরা টের নাও পেতে পারি।

দাঁত সাদা করবেন কি করে ? ধূমপান বা কোনো রকম নেশা করলে দাঁত তার সাদা রঙ হারায় ! কোনো কোনো জায়গার জল পানেও দাঁতের ক্ষতি হয় l ফ্লুরাইড যুক্ত জল পান দাঁতের বিকৃতি ঘটায় l শুধু বলা যেতে পারে নিয়মিত দাঁত মাজুন, নেশা করা পান খাওয়া,অতিরিক্ত চা পান এগুলি বন্ধ করা l আর বাকিটা নিজের সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা l

মুখের সমস্যা থেকে রোগ :

মুখের গহ্বরের নানা সমস্যা থাকতে পারে, যার মধ্যে দন্তক্ষয় বা ডেন্টাল ক্যারিজ, মাড়ির রোগ বা পেরিওডেন্টাল ডিজিজ, মুখের ক্ষত বা ঘা, আঁকাবাঁকা দাঁত, মুখের ক্যান্সার ইত্যাদি।

এইসব রোগ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করে দ্রুত চিকিৎসা করলেই, বেশির ভাগ রোগীই ভালো হয়ে যায়; তবে কাল বিলম্বে বেশি কিছু রোগ জটিলতা তৈরি করে এবং মুখের ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে ।

দাঁত শিরশির করার কারণ ও চিকিৎসা :

এটি একটি স্নায়বিক বিষয় , দাঁতেও স্নায়ু থাকে । একট, দুটি দাঁত বা অনেকগুলো দাঁত কখনো কখনো একই সঙ্গে শিরশির করতেই পারে। এই অবস্থাকে বলে ডেন্টাল এট্রিশন। এর কারণ হচ্ছে দাঁতের ওপরের সবচেয়ে শক্ত আবরণ বা এনামেল ক্ষয় হয়ে যাওয়া।

কোনো কারণে এই এনামেল ক্ষয়প্রাপ্ত হলে দাঁতের পরবর্তী অংশ ডেন্টিন বেরিয়ে আসে। এর নিচের অংশই নার্ভ, আর্টারি, ব্লাড ভেসেলস ইত্যাদি থাকে বলে তখন দাঁতটি খুব স্পর্শকাতর হয়ে পড়ে।

ওই সময় ঠাণ্ডা বা গরম পদার্থ লাগার ফলে দাঁত শিরশির করতে পারে।এক্স-রের মাধ্যমে মাড়ি ও দাঁতের অবস্থান, গর্ত বা ফাটল ইত্যাদি শনাক্ত করা যায়। তখন চিকিৎসা হিসেবে মাড়ি ও দাঁতের সংযোগস্থল থেকে পাথর বা ডেন্টাল প্লাক, খাদ্যকণা পরিষ্কার করতে হয় আল্ট্রাসনিক স্কেলিংয়ের মাধ্যমে। ক্ষয়ে যাওয়া বা ভেঙে যাওয়া ‘লাইট কিউর ফিলিং’ দিয়ে ভর্তি করে পূরণ করা হয়ে থাকে।

কিছু ক্ষেত্রে গ্লাস আইনোমার ফিলিং দিয়েও দাঁতটি ভর্তি করা যায়। তবে অতিরিক্ত ক্ষয়ে যাওয়া বা গর্ত হয়ে যাওয়া দাঁতে রুট ক্যানেল করতে হয়। অনেক সময় দাঁত ব্রাশের সঙ্গে পটাশিয়াম নাইট্রেট সংযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করলেও দাঁতের শিরশির কমে যায় ।

সাইনাস এবং ঊর্ধ্ব চোয়ালের পিছনের দাঁতগুলির সংযোগ রয়েছে। অনেকের ক্ষেত্রেই দাঁতের শিকড়গুলি আসলে সাইনাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে।

যখন সাইনাসের ব্যথা হয় তখন তার সাথে দাঁতের ব্যথা হওয়া সাধারণ বিষয় । সাইনাসের দাঁত ব্যথা কতক্ষণ স্থায়ী হয় নির্দিষ্ট করে বলা যায় না , সাধারণত চিকিসৎসকের সাহায্য নিলে এটি 2-3 সপ্তাহের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে আসা উচিত ।

মাড়ি সংক্রমণ এবং পেরিওডোনটাইটিস মাড়িগুলির সংক্রমণ তখনই ঘটে যখন মাড়িগুলির আশেপাশে ব্যাকটিরিয়া অবস্থান করে । এর একটি লক্ষণ হল দাঁতগুলির মধ্যে মাড়ির এক বেদনাদায়ক সংবেদন এবং ফ্লসিংয়ের সময় রক্তপাত।একে পরিভাষায় পেরিওডোনটাইটিস বলা হয় ।

হাইপারসিটিভিটি সম্ভবত ডেন্টাল শব্দ বন্ধের মধ্যে এমন একটি শব্দ যা সচরাচর শোনা যায় না , তবে এটি আসলে একটি খুব সাধারণ ধারণা ।

আপনি কি জানেন যে, দাঁতে ত্বকের মতো অসংখ্য ছিদ্র রয়েছে? দাঁতের ক্ষেত্রে তাদের ডেন্টিন টিউবুলস বলা হয় । দাঁত ব্যথার অস্থায়ী পর্ব রয়েছে যা স্বতঃস্ফূর্ত বৈদ্যুতিক সংবেদন হিসাবে অনুভূত হয় যা কয়েক সেকেন্ড অবধি স্থায়ী হয়।একে ডেন্টিন সংবেদনশীলতা বলা হয় ।

ডেন্টিন সংবেদনশীলতা থেকে সংবেদনশীলতার দাঁতে দীর্ঘ মেয়াদী কোনো প্রভাব নেই এবং সাধারণত 3-5 দিনের মধ্যে সমাধান হয়।

দাঁতে পোকা :

এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা কুসংস্কার বলাই ভালো ।বিষয়টি হলো, দাঁতের ফাঁকে, মুখবিবরে অনুজীবাণু অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়া জন্মায় । কিন্তু বাজারচলিত পোকার ব্যাপারটি সম্পূর্ণ কুসংস্কার; এর কোনো প্রমাণ বা বিজ্ঞান সম্মত ভিত্তি নেই । একটা সময় মন্ত্র বলে মানুষকে তুলার মধ্যে পোকা দেখিয়ে কিছু অসাধু লোক উপার্জন করতো বা মানুষ ঠকানো হতো, বর্তমানে এগুলোর দেখা তুলনায় কম পাওয়া যায় ।

দাঁতে-পোকা-এটি-একটি-ভ্রান্ত-ধারণা-কুসংস্কার
দাঁতে-পোকা-এটি-একটি-ভ্রান্ত-ধারণা-কুসংস্কার

 

দাঁত ব্যথার জন্য কখন আমাকে একজন দন্ত চিকিৎসক দেখা উচিত?

যদি এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে হালকা ব্যথা হয় বা আপনার যদি 48 ঘন্টারও বেশি সময় ধরে মাঝারি থেকে তীব্র ব্যথা হয় তবে অবিলম্বে দাঁতের চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করতে হবে, দাঁতে যদি ব্যথা ফোলা, জ্বর, বা কোনও দুর্ঘটনার কারণে আঘাতের সাথে যুক্ত থাকে, মাড়ি বা দাঁত থেকে রক্তপাত হয়, তবে অনিবার্য্য ভাবে দাঁতের চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করা উচিত ।

পড়লেন তো সবই এবার, থেকে দাঁতের যত্ন নিন ! দাঁতের মর্ম বুঝুন কাল বিলম্ব না করে দাঁতের যেকোনো সমস্যায় ; প্রকৃত চিকিৎসকের কাছে যান, পরামর্শ গ্রহণ করুন এবং তাকে দিয়েই দাঁতের চিকিৎসা করান, দাঁত ভালো রাখুন, সুস্থ থাকুন ।

সৌভিক রায়

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.3 / 5. Vote count: 6

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

লজ্জাবতী

4.3 (6) বনসপ্তাহে যখন গাছের চারা লাগানোর জন্য গর্ত খোঁড়া হচ্ছে, তখন হাতের ছোঁয়া লেগে চকিতে বিরক্তি প্রকাশ করে উঠলো ঝোপের মধ্যে থাকা লতানে গাছটা। নামটাও মেয়েলি, ‘লজ্জাবতী’ বা Mimosa pudica (fam- Fabaceae). হিন্দিতে এই sensitive plantকে বলে ‘ছুই-মুই’. এদেরকে জনপ্রিয় করেছে এদের rapid movement অর্থাৎ এদের পাতাগুলোতে দেখা যায় […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: