হাজার পাখির গান

কুলিক-হাজার-পাখির -গান

ডঃগৌরব রায়        ডঃ-গৌরব-রায়

হাজার পাখির গান
‘হুয়া-,হুয়া-, হুআও-, উয়া- উয়া।’ ডাক ছেড়ে এগিয়ে আসছে নিশাচর পাতি শিয়ালের দল।
পাটকেলে রঙের একেকটা কুকুরের আকৃতির। এই অমানিশায় তাদের শুধু কৃষ্ণকায় ছায়াগুলাে দেখা যাচ্ছে। আছে আরও ধূর্ত আরও ক্ষিপ্র, আকৃতিতে কিছুটা ছােট, বড় লেজ বিশিষ্ট খেকশিয়ালেরা। আছে বন বিড়াল।

দূরে আরও দূরে গ্রাম লােকালয়ের আলাে আস্তে আস্তে নিভে যাচ্ছে। নিশুতি রাত। নিকষ কালাে। ঝাঁকরা বড় বড় গাছে জঙ্গলের মধ্যেটায় অন্ধকার আরও জমাট বেঁধে আছে।

কুলিক নদীর স্রোত এই আঁধারে মালুম হয় না। গভীর নিস্তদ্ধতায় অস্ফুট শােনা যায় জলের চলার শব্দ। যেন মৃদু নিক্কিনি ৷ তিমির নিশীথে জঙ্গলের নীরবতাকে খানখান করে বিশাল বটগাছের ডাল থেকে ভেসে আসে ভুতুম প্যাঁচার গুরুগম্ভীর ডাক, ‘ব- বম্।

নদীর ধারে ময়না গাছের নীচু ডালে শিকারের অপেক্ষায় বসে থাকে নাইট হেরন বাজকা।
আকাশে অল্প কিছু তারার টিপ আর ঘুটঘুটে বনে বাদাড়ে ইতস্তত ঘুরে বেড়ানাে জোনাকিদের নরম সবুজাভ আলাের দীপ।

বিশাল কাঁটার অলঙ্কার পরে সরসর শব্দে সজারু বেরােয় অভিসারে। গাছের শাখা প্রশাখার মধ্যে দিয়ে বয়ে চলে মর্মর।

‘ক্রোয়াক, ক্রোয়াক’, ‘খটখট শব্দে মা শামুকখােল, বাবা শামুকখােল সাবধান করে দেয়
ছানাদের। সতর্ক করে দেয় প্রতিবেশী শামুকখােল পরিবারগুলােকে। তারাও ক্রোয়াক, ক্রোয়াক’, ‘খটখট শব্দতরঙ্গে জানান দেয় তল্লাটের সমস্ত পাখি পরিবারগুলােকে। চিহি’,

‘ক্লিক ক্লিক’ শব্দে সতর্ক হয়ে যায় সহযােগী পানকৌড়ি, গয়ার, কোঁচ বক পরিবারগুলােও।

কদম, জারুল, শিশু, সেগুন, খয়ের, হিজল বড় বড় গাছের উঁচু ডালে কাছাকাছি বাসা বেঁধেছে হাজার হাজার শামুকখােল। আর তাদের সাথে বক, পানকৌড়িরা। পাখিদের বিশাল কলােনি জঙ্গলের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত।

শকুনের আয়তনের সাদা রঙের কালােপুচ্ছের শামুকখােল পাখিদের লম্বাটে বিশাল ঠোঁট।
উপরের আর নীচের ঠোঁটের মাঝে একটা ফাঁক। যার সাহায্যে খুব সহজেই শামুক, ঝিনুক, গেঁড়ি, গুগলির শক্ত খােলস ভেঙ্গে মাংসল শাসটা খেতে পারে। লালচে রঙের সরু লম্বা পা। একেকটা পাখির ওজন নয় কেজি অবধি হয়। স্ত্রী ও পুরুষ শামুকখােল একইরকম আকৃতির ও দেখতে। ইংরেজিতে এদের বলে এশিয়ান ওপেন বিল স্টর্ক (Openbill stork)।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার সদর রায়গঞ্জ শহরের উপকণ্ঠে কুলিক অভয়ারণ্যে রয়েছে এদের বিশাল কলােনি। এই কলােনির অংশীদার অন্যান্য পাখিরাও। সাদা কাঁক, কোর্চে বক, খুন্তে বক, কাস্তেচরারাও থাকে এদের সাথে মিলেমিশে একসাথে।

শিয়ালের পাল একদম গাছগুলাের নীচে এসে জড়াে হয়েছে। জুড়ে দিয়েছে তীব্র
সােরগােল। গায়ের জোরে ধাক্কা মারছে গাছের গােড়ায়। ভুল করে কয়েকটা পাখি ছানা যদি
অন্ধকারে নীচে পড়ে যায় সেগুলােকে তাে খাবেই, চিৎকার-চেঁচামেচিতে, ভয়ে কিংবা ধাক্কা-
ধাক্কিতে যদি আরও কয়েকটা পাখি ছানা নীচে পড়ে যায় সেগুলােকেও খেয়ে নেবে। তাই পাখি দম্পতীরা বুক আগলে ধরে রাখে তাদের আঁধার মানিক প্রিয় সন্তানদের।

‘ঠক , ঠক’ শব্দে ছানাদের অভয় দেয়, ‘কোয়াও’ গােঙানির মত আওয়াজ করে নড়াচড়া করতে বারণ করে। অনেকক্ষণ ধৈর্য ধরে বিফল হয়ে শেয়ালের দল খরগােশ, প্যাঙ্গোলিন ধরতে মনােযােগ দেয়। তাতেও বিফল হলে রাত দ্বিপ্রহর থেকে শেষ রাতের মধ্যে হানা দেয় লােকালয়ের গেরস্ত বাড়িতে হাঁসমুরগীর খোঁজে।

শেয়ালের পাল চলে গেছে, পাখিরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। শামুকখােল দম্পতীরা কামারের
হাঁপরের মত দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ছানারা গভীর ঘুমে ডুবে যায়। অলক্ষ্যে ডাল বেয়ে চুপিসারে উঠে আসে শিকারি বনবিড়াল। তার গায়ের বােটকা গন্ধ পেয়ে, ডাল-পাতার শব্দ শুনে আর জ্বলজ্বলে চোখ দেখে উঠে পড়ে পাখি দম্পতীরা।

পুর কলােনি জুড়ে জোরালাে আওয়াজ ওঠে। ঐ অন্ধকারেই শক্ত ঠোঁটের মিলিত ঠোকরানাে শুরু হয়। রণে ভঙ্গ দেয় বনবিড়াল। সূর্য ওঠা অবধি হৃদয়ের মণিকোঠায় পাখিরা আগলে রাখে ছানাদের। পুঁচকে ছানারা এসব কিছুই বােঝে না।

মা-বাবার ওমে আরামে ঘুমােয়। শুধু খিদে পেলে বলে ‘চিচি’, ‘চিঁহি চিহি’। ভয় পেলে কাঁদে ‘কুউ-কুউ-’ করে।

পুব আকাশে রাঙা আলাে ছাড়িয়ে সূর্য ওঠে। তার সােনালি কিরণের পরশে জেগে ওঠে
চরাচর। দিব্যি লম্বা ঘুম দিয়ে উঠে খাওয়ার জন্য চিল চিৎকার জুড়ে দেয় হাজার হাজার ছানা । এবার মা ও বাবা পালা করে নেমে পড়ে গাছের নীচে ঝােপ, ঘাস, পরে থাকা পাতার আস্তরণে।

জঙ্গলের ইতিউতি। বহমান কুলিক নদীর পাড়ে। নদী থেকে তৈরি বাঁকের ‘দ’ গুলােতে।
আশেপাশের জলাভূমিতে। ছােট নদী কুলিক মিঠে রােদের ঝিলিক মেখে তাদের অভ্যর্থনা
জানায়।

বাংলাদেশের দিনাজপুর থেকে এই বাংলার দিনাজপুরে বয়ে আসা এই নদী বড় লক্ষীমন্ত। পূর্ব থেকে পশ্চিম বাহিনী এই নদীর জল ভরা মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি কত কি। আশেপাশের গ্রামের মানুষ যেমন নিরাশ হয় না, পাখিরাও আনন্দে থাকে। তার দান বিলিয়ে কুলিক এক সময় নাগর নদের সাথে মিলিত হয়ে মহানন্দায় পড়ে। তারপর আবার ফিরে যায় বাংলাদেশে।

পদ্মা, মহানন্দা দুই জ্যেষ্ঠা ভগিনীর সাথে। নদী থেকে মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি ধরে অথবা জলা থেকে শামুক, ঝিনুক, গেঁড়ি, গুগলি, ব্যাঙ, ছােট মাছ গিলে কিংবা মাটি থেকে পােকা,
সাপ, গিরগিটি, কেঁচো ঠোঁটে করে তাড়াতাড়ি বাবা পাখি বাসায় নিয়ে আসে বাচ্চাদের জন্য।

বাচ্চারা আনন্দে হৈ চৈ জুড়ে দেয়। গপগপ করে খেয়ে ফেলে সব। বাড়ন্ত বাচ্চার দল। খেয়েই আবার চেঁচাতে থাকে আরাে খাবারের জন্য। এবার মা বেরােয়। বাবা পাখি তখন তাদের আগলে রাখে।

এভাবে চলতে থাকে যতক্ষণ না ছানাদের পেট ভরে তারা আবার ঘুমিয়ে পড়ে। তখন মা-
বাবা খায়। ঘুম থেকে উঠেই বাচ্চারা আবার খিদের জন্য চেঁচাতে থাকে। তখন বাবা বা মা আবার খাবার আনতে যায়।

কুলিক-হাজার-পাখির-গান
কুলিকে-হাজার-হাজার-পাখি

বছরের অন্য সময় এরা দূর দুরান্তে খেত, মাঠ, জলায় খাবার সন্ধানে গেলেও প্রজনন ঋতুতে বাচ্চাদের কাছ ছাড়ে না। কাছাকাছি গিয়ে আবার তাড়াতাড়ি ফিরে আসে। সূর্য
ডােবার আগে বেশি করে খাবার নিয়ে আসে দীর্ঘ রাতের জন্য।

দিনের বেলাতেও সতর্ক থাকতে হয়। একটু অসাবধান হলেই ছাে মারে ঈগল, বাজ, চিল,
কাক। ওত পেতে থাকে ময়াল বা অজগর বা পাইথন। বনরক্ষীদের অলক্ষ্যে অনেক সময় লুকিয়ে চলে আসে চোরা শিকারিরা। তখন দলবদ্ধভাবে তাদের প্রতিহত করে ছানাদের বাঁচায় অভিভাবকরা। বর্ষার শুরু থেকে শেষ অবধি শামুকখােল সহ পাখি দম্পতীদের কোন বিরাম নেই।

বর্ষার আগেই হয়ে যায় সঙ্গী নির্বাচন। প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ পাখিরা স্ত্রী পাখিদের নানাভাবে আকৃষ্ট করে। এরপর স্ত্রী পাখি দেখেশুনে তার সঙ্গী নির্বাচন করে। এরপর চলে পূর্বরাগ পর্ব। তারপর স্বল্পকালীন সঙ্গম পর্ব। এর পরপরই স্ত্রী ও পুরুষ পাখি অরণ্যের লম্বা দেখে শাল, শিমূল, লালি, চিলৌনি, পিটালি, বহেরা, চাঁপ, চিকরাশি, কাটুস প্রভৃতি গাছের উঁচু ডালে ডাল, কাঠি, শন, ঘাস, পাতা দিয়ে বড়সড় বাসা বাঁধে।

বাসা তৈরী হতে পাঁচ থেকে পনেরাে দিন লাগে। ইতিমধ্যে স্ত্রী পাখি ডিম পাড়তে শুরু করে। মুরগির ডিমের চাইতে একটু বড় দুই থেকে পাঁচটা ডিম পাড়ে। একেকটা গাছে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য তিন থেকে পাঁচ ফুট তফাতে পনেরাে থেকে পঁচিশটা শামুকখােল দম্পতী বাসা নির্মাণ করে।

প্রজননের সময় স্ত্রী পাখির রং একটু ফ্যাকাসে সাদা হয়ে যায়। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি একত্রে মিলে টানা তা দিতে থাকে ডিমগুলােতে। ডিম পাড়ার পঁচিশ দিনের মাথায় ডিম ফুটে ছানা বেরােয়। এবার শামুকখােল দম্পতীর প্রধান কাজ ছানাদের রক্ষা করা ও বড় করে তােলা।

এরপর ছানারা একটু বড় হলে উড়তে ও ভাসতে শেখানাে হয়। শেখানাে হয় উড়ে বা ভেসে গিয়ে খাদ্য সংগ্রহ করার কৌশল। তিরিশ-পঁয়ত্রিশ দিনের মধ্যে পাখি ছানারা বড় হয়ে যায় এবং ভালােভাবে উড়তে শিখে যায়। ডিম পাড়া থেকে ছানা বড় হওয়া অবধি এই আড়াই মাস পক্ষীশাবকদের ঝড় বৃষ্টি সহ সমস্ত বিপদ থেকে বুকে আগলে পাখার পালক ঢাকা
দিয়ে রক্ষা করে মা ও বাবা শামুকখােল। চঞ্চুতে চঞ্চুতে ঢেলে দেয় অপত্য স্নেহের ডালি।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বহমান এই প্রকৃতির নিয়ম।

শুক্লপক্ষ। আকাশ ভরা পূর্ণিমার চাঁদ। তার মায়াবি রুপােলী জোছনা মেখে পাখিরাও বুঝি
স্বপ্ন দেখে। আলাে আঁধারিতে দাঁড়িয়ে থাকে ঝাঁকড়া গাছগুলাে। কুলিক নদীর জল চিকচিক করে।

কাছে জঙ্গলের ধারে ঝােপ জঙ্গলের মাঠের গর্ত থেকে শিয়ালেরা বেরিয়ে আকাশের দিকে মুখ উঁচিয়ে তারস্বরে চেঁচাতে থেকে, ‘হুয়া, হুয়া, হুক্কা- দুয়া। ক্রমশ তারা জঙ্গলের মধ্যে এসে
গাছগুলাের নীচে ঘুরে বেড়ায়।

এই বর্ষাকালে গাছ ভর্তি শামুকখােল, বক, সারস, পানকৌড়িরা থাকলেও শীতে দুরদুরান্ত থেকে উড়ে এসে বাসা বাঁধে বড়ি হাঁস, সরাল, চখাচখি, দীঘর, নীলশির, রাঙা মুরি, খুন্তেবকরা।

নদী ও জলাশয়ের পর্যাপ্ত জল ও খাদ্য তাদের আকৃষ্ট করে। কোন কারণে ক্ষরা হলে এরা কেউ আসে না। শিয়ালের দল গাছের তলায় এসে আস্ফালন করে। ক্রোধে মহীরূহর কাণ্ডে ধারালাে নখের আঁচড় বসায়। বনবিড়াল, খাটাশ, ভামের দল আক্রোশে চাপা
গর্জন করে।

‘কোয়াক’ ‘কোয়াক’, ‘ক-ক’, ‘ওয়াক’, ‘কওয়াক’ হাজার পাখির মিলিত কলধ্বনিতে তারা ঘাবড়ে যায়। হাজার পাখির বিষ্ঠা বর্ষণে তারা পশ্চদপসরণ করে। রাতের নিস্তব্ধতা খানখান
করে গর্জন কূজনে যে ছােট ছানাদের ঘুম ভেঙ্গে যায় তাদের মা পাখি আরাে বুকের কাছে টেনে নেয়।

বিশাল কমলা সাদা চাঁদের মধ্যে থাকা আবছা কালাে পাহাড়কে দেখিয়ে আদিম অতীতের
পক্ষীরাজের গল্প বলে। রূপকথার অনন্ত সাগরে ভেলা ভাসায়। মাতৃক্রোড়ে নিশ্চিন্তে পাখিছানারা ঘুমিয়ে পড়ে।

দুপুর রােদ। কিন্তু অরণ্যের বৃক্ষরাজির বাতাবরণে রােদের তাপ বা গরম লাগে না। ফিঙ্গে,
বেনেবউ, পাপিয়া, দুর্গা টুনটুনি, ফুলটুসি, পাতাফুটকি, সাতভাই, চাকদোয়েল, দুধরাজ, সিপাই বুলবুল, হাঁড়িচাচা, হাজারিকা, শঙ্খচিল, কাঠঠোকরা, বাঁশপাতি, মাছরাঙ্গা, কুবাে, ঘুঘু, ডাহুক প্রমুখ বাংলার চিরস্থায়ী পাখিরা কুলিক নদী বিধৌত এই জলজঙ্গলে তৃপ্ত আহার সেরে আনন্দে সুমিষ্ট ডাক ছাড়ে।

সুরেলা গান জুড়ে দেয় দোয়েল, শ্যামা আর কালীশ্যামা। ভেসে আসে হরবােলার তীক্ষণ সুর। মেঘ জমে বৃষ্টি আসন্ন হলে নেচে ওঠে চাতক-ফটিকজল। সাদা ও ধূসর রঙের লাল
চোখ বড় গোঁফ খরগােশের দল পেট ভরে তাজা ঘাস খেয়ে ছুটে বেড়ায়। আরাে জোরে ছুটে
বেড়ায় বেজির দল। বিশাল শরীর নিয়ে ধীরস্থিরভাবে হেঁটে চলে বেরায় গােসাপ বা গুইল।

তাদের দেখে পাখি ছানারা ভয় পেয়ে গেলে মা পাখি অভয় দেয়, ঠক্ ঠক্‌। কুলিক নদীর পাড়ে রােদ পােহায় কচ্ছপ আর চন্দ্রবােড়া। একটা শঙ্খচূড় রাজসিক ভঙ্গিতে মাটি বেয়ে এগিয়ে চলে।

কাছের গ্রামের অনন্ত মৃধার দুটো ছাগলছানা ভুল করে চলে এসেছিল জঙ্গলের কিনারে।
শঙ্খচূড়ের বিশাল ফণা তােলা দেখে ভয়ে ছুট। একটা কাঠবিড়ালির বাচ্চাকে তাড়া করছে দুটো তিসাবাজ।

সকাল থেকে পাখি ছানাদের ওড়া শেখার প্রশিক্ষণ চলছিল। যারা ঠিক করছিল মা আর বাবা
পাখি বলছিল ‘ক্রক, ক্রক’। যারা ছােট, ভাল পারছিল না বা পরে যাচ্ছিল, তাদের যত্ন করে তুলে এনে হাতে ধরে আবার বারবার শিখিয়ে দিচ্ছিল।

যে ছানাগুলাে আগে ডিম ফুটে বেরিয়েছে, বড় হয়ে গেছে, ওড়া শিখে গেছে, তাদের শেখানাে হচ্ছিল সূর্য যখন মাথার উপর, চারিদিকে প্রবল দাবদাহ, তখন সবচাইতে মগডাল ছাড়িয়ে মেঘের কোলে আকাশের অনেক উঁচুতে কিভাবে উঠে যেতে হয়। কিভাবে ধীরে ধীরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাক খেতে হয়।

তারপর হাওয়ায় ভেসে গ্লাইড করে চক্ৰবাকের মত কিভাবে নামতে হয়। মা পাখিরা বাড়ন্ত ছানাদের কুলায় ডাকছে। এবার খেয়ে বিশ্রাম করতে হবে। আবার আগামীকাল প্রশিক্ষণ। বাচ্চাদের খাওয়া হলে তারপর তাদের
খাওয়া।
এক পশলা বৃষ্টি হয়ে আবার ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে কনে দেখা রােদ উঠল। তারপর সেই
বৃষ্টি থেমে গেল। মা পাখি ডানা ঝাপটিয়ে একটু ছড়িয়ে দিল। পিছল জলনিরােধক পালক সঙ্গে সঙ্গে শুকিয়ে গেল।

প্রজনন ঋতু শেষ করে একঝাঁক শামুকখােল বাংলাদেশের পচাগড়ের কুঞ্জবিল থেকে উড়ে এসেছে। যাবে শান্তিনিকেতনের যজ্ঞিনগর হয়ে ঝাড়গ্রামের কেন্দুয়া গ্রামের জঙ্গলে। একরাতের জন্য কুলিকে বিশ্রাম। তাদের সর্দার খবর দিল এবার বৃষ্টি ভালাে হয়েছে।
খাবার প্রচুর।

বিকেলে দিগন্তজুড়ে বিশাল এক রামধনু উঠল। ভেজা মাটি থেকে উড়তে লাগল কাতারে কাতারে উই। পাখি ছানারা উড়ে গিয়ে কপাকপ ধরে পেট ভরে খেতে লাগল। রাতে খুব
ঝড় বৃষ্টি হল। বেশ কয়েকটা ডাল ও বাসা ভেঙ্গে গেল। কিন্তু একটা পাখিরও ক্ষতি হয়নি।

ওরা বড় হয়ে এসেছে, উড়তে শিখেছে। কলােনির অন্য পাখিরা তাদের বাসায় আশ্রয় দিল।
বর্ষা চলে গিয়ে শরৎ এসেছে। মাটি, জল, হাওয়া, শরীর – সর্বত্র এক টান, শীতশীত ভাব,
শিরশিরানি। ভােরে কুয়াশার আমেজ। বৃষ্টি কমে এসেছে। নির্মল আকাশ। আরামের সােনা রােদ।

অনন্ত নীলের বুকে ধবধবে পেঁজা তুলাের মত মেঘ সারাদিন ভেসে বেড়াচ্ছে। আলের ধারে জলার পাশে মাইলের পর মাইল কাশ ফুল ফুটে আছে। কদিন পরেই গঞ্জের বাবুরা দুগ্গাপূজার আমােদে মাতবেন। বায়না পেয়ে কর্ণজোড়া হাটের বগলা বায়েন রােজ ঢাক বাজিয়ে তৈরি হচ্ছে।

বিশাল মাঠ জলা ছাড়িয়ে ঐ ঢাকের শব্দ জঙ্গলেও কিছুটা চলে আসে। ‘দ্রিমি-দ্রিমি-দাম।’ অতুল বর্মন, খুদি রায়, কাইসার আলি, হিমল মিঞ্জ – ভাগচাষীরা বারবার জমি দেখতে আসে আমন ধান কত বাড়ল।

আসন্ন প্রসবিনীর মত বিশাল বপু নিয়ে কুলিক নদী তার পাড় প্রায় ছাপিয়ে গেছে।
জলাভূমিগুলােতে ভরা জল। হেঁটে আর পার হওয়া যায় না। নৌকো নেমেছে। মেয়ে বউরা পদ্ম শালুক তুলছে। পুরুষদের চলছে দিনরাত মাছ ধরা। গ্রামের চলা পথে ঝরে আছে অজস্র শিউলি ফুল।

আজ কুলিক অরণ্যে পাখিদের বড় আনন্দের দিন। বর্ষার তিনটে মাস তাদের জীবনচক্রের
প্রজনন ঋতুর গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল কাটিয়ে শামুকখােলরা উড়ে চলে যাচ্ছে একেক দিকে।

কেউ নওগাঁয়ের হাওড়ে, কেউ গরুমারার জঙ্গলে। কেউ বা রাজশাহীর পচামারিয়ায়, কেউ বা নাটোরের পুটিয়ায়। কেউ আরও দূরে সুন্দরবনের সজনেখালির জঙ্গলে। এখন তারা কেউ বাবা, মা অথবা ছানা পাখি নয়। প্রত্যেকেই স্বাধীন একক পাখি। অবশ্যই দলবদ্ধ।

এখন তাদের পরিচয় শুধু প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ অথবা স্ত্রী পাখি। পুরুষ শামুকখােল অথবা স্ত্রী শামুকখােল। বাচ্চারা সব বড় হয়ে মুক্ত বিহঙ্গ রূপে খােলা আকাশে উড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে দিকচক্রবালে। বেশ কিছু শামুকখােল রয়ে যাচ্ছে কুলিক নদী, অরণ্য, জলাভূমি, খেতকে ঘিরে এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে।

ভরা ধান খেত ও জলাগুলােয় নেমে এরা শামুক, গুগলি, সাপ, ব্যাঙ, মাছ, পােকা খেয়ে যাচ্ছে পেটপুরে। নেই কোন উদ্বেগ বা পিছুটান। এভাবেই আনন্দে কাটিয়ে দেবে আগামী বছরের বর্ষার শুরু অবধি।

তারপর আবার সঙ্গী নির্বাচন, বাসা বাঁধা, সন্তান প্রতিপালন। এভাবেই চলবে তাদের প্রায় পনেরাে থেকে কুড়ি বছরের আয়ুষ্কাল।

কুলিক অরণ্য জুড়ে শুধু উৎসবের জয়গান। বিদায় জানানাের পর্ব। নবীন বরণ। তরুণ প্রাণ।

নতুন জীবনের সূচনা। ডানার ঝটপটানি। এক একটা শামুকখােল ঝাঁকের অভিযাত্রা। আজ
আকাশ, বাতাস, অরণ্য, প্রান্তর কেবল মুখরিত হাজার কণ্ঠের তানে। হাজার পাখির গানে।

জুলাই ২০২০

Leave a Reply

%d bloggers like this: