মানস জাতীয় উদ্যানের গল্প – ভারতীয় একশৃঙ্গ গন্ডার

Samrat Sarkar 1
ভারতীয় একশৃঙ্গ গন্ডার ও তার শাবক
4.6
(32)

I think I could turn and live with animals, they are so placid and self-contained

I stand and look at them long and long.

They do not sweat and whine about their condition,

They do not lie awake in the dark and weep for their sins,

They do not make me sick discussing their duty to God,

Not one is dissatisfied, not one is demented with the mania of owning things.” –

WALT WHITMAN.

মানস-জাতীয়-উদ্যানে-ভারতীয়-একশৃঙ্গ-গন্ডার-(Indian-rhinoceros)
ভারতীয় একশৃঙ্গ গন্ডার বিশ্রামরত মানস জাতীয় উদ্যানে

“বিস্ট অ্যান্ড ম্যান ইন ইন্ডিয়া” বইয়ের মুখবন্ধে পড়েছিলাম কবিতাটা। সত্যিই তো, তারা মূলতঃ শান্ত, স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাদের সংগ্রামময় জীবন নিয়ে তারা কখনো ঘ্যানঘ্যান করে না। ভোর থাকতে উঠে অসত্য বলে না। আবার নিজেদের পাপের জন্য অশ্রু বিসর্জনও নেই। ঈশ্বরের প্রতি নেই তাদের কর্তব্যের বাড়াবাড়ি । কেউ তারা জীবনের প্রতি অসন্তুষ্টও নয়, বা কেউ ভোগেসুখের কথা ভেবে পাগল নয়। অবশ্যই সে ভোগ পার্থিব, বৈষয়িক। যে ভোগ আমাদের যথার্থ সুখ ও দুঃখ থেকে দূরে ঠেলে দেয়।

গন্ডারদের দেখলে আমার ঠিক এই কবিতাটাই মনে পড়ে। তারা যেন অনেকটা আমাদের কল্পিত, বর্ণিত যোগীপুরুষদের মতই। অনেকটা , তবে সবটা নয়। সে যে ঈশ্বর বিশ্বাসী নয়! আপাদমস্তক সাধকের জীবন তার নয়। এতকিছুর অস্তিত্বই তার স্বীকৃতির বাইরে।

তার মস্তিষ্ক, তাকে যে জীবনে ন্যস্ত করে রেখেছে সে জীবন আমাদের ভাবায় কবি ওয়াল্ট হুইট্ম্যানের মত। তারা যেন এই জাগতিক সুখ দুঃখে সিক্ত হয়েও আমাদের চোখে সাধকের চর্যা অর্জন করেছে। আর অন্যদিকে মানুষ ভোগে, দখলে, পাপে, পূণ্যে, স্বাচ্ছন্দ্যে, বিরক্তিতে জেরবার, প্রস্ফুটিত। অথচ সেই মানুষের হাতেই ধরা রয়েছে আজকের পৃথিবীর সমস্ত বন্যপ্রাণের ভবিষ্যৎ। তাই কি হওয়ার ছিল! অন্তত যে নিয়মে এই পৃথিবী বয়স্ক হয়েছে ব’লে আমরা মনে করি, সেই নিয়মে তো এমন হওয়ার ছিল না?

ভারতীয় উপমহাদেশের একশৃঙ্গ গন্ডারের যে অতীত -ঐতিহাসিক অতীত, সেটা খুব উজ্জ্বল। চোদ্দশো শতকে তাদের সংখ্যা আনুমানিক সাড়ে চার লক্ষের বেশি ছিল। তৈমুর লঙ কাশ্মিরে গন্ডার শিকার করেছেন। পশ্চিমে পাকিস্তান থেকে পূর্বে মায়ানমার – হিমালয়ের পাদদেশ জুড়ে ছিল তাদের বিচরণ ক্ষেত্র।

যত নদী এই উপমহাদেশে আছে, একেবারে দক্ষিণ ভারত বাদ দিলে তাদের সমস্ত অববাহিকায় যেখানেই সমতল ঘাসজমি (riverine grasslands) ছিল সেখানেই তারা ছিল। এবং গত পাঁচশো বছরে খুব দ্রুত কমেছে তাদের সংখ্যা। ভারতের উত্তর এবং উত্তর-পূর্বের কয়েকটি রাজ্য ছাড়া ভারতের আর কোথাও ভারতীয় একশৃঙ্গ গন্ডার নেই। এখন তাদের সংখ্যা ৩৫০০-র কাছাকাছি। গত সত্তর-আশি বছর বহু কাঠখড় পুড়িয়ে এই সংখ্যা ধরে রাখা গেছে। এমনটা কি হওয়ার কথা ছিল?

সেভাবে দেখতে গেলে আমার ব্যক্তিগত মত হল – যে একতরফা আক্রমন আমরা গত পাঁচশো বছর তাদের বিরুদ্ধে জারি রেখেছি, তা সমলে পৃথিবীতে ভারতীয় একশৃঙ্গ গন্ডার এখনো টিঁকে আছে এটাই আশ্চর্য্যের !

মুঘল আমল থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব এবং উত্তরে গঙ্গার অববাহিকা জুড়ে কৃষির জোয়ার আসতে শুরু করে। মধ্য ভারতের নদীগুলোর অববাহিকাও কৃষির এই জোয়ারের বাইরে ছিল না। নদীগুলোর পাশের যে alluvial grassland একশৃঙ্গ গন্ডারের বাসভূমি ছিল তার সিংহভাগ চাষজমিতে পরিবর্তিত হয়। বাসভূমি হারিয়ে গন্ডার সমগ্র পশ্চিম, উত্তর ও মধ্য ভারত থেকে মুছে যায়।

তারপর এল ইংরেজ আমল। ইংরেজ আমলের শেষ একশ বছর উত্তর-পূর্বের বাকি অঞ্চল কার্যত তছনছ করা হয়। কখনো চা-বাগান তৈরির নামে, কখনো রাস্তা তৈরির নামে, কখনো বসতি স্থাপনের নামে, কখনো কৃষির নামে, কখনো বা খেলাচ্ছলে হত্যার নামে – গন্ডারদের এবং তাদের বাসভূমির ওপর চরম আক্রমন নামিয়ে আনা হয়েছে।এর সঙ্গে আছে জলবায়ুর পরিবর্তন।

কখনো ভয়াল বন্যা, কখনো অনাবৃষ্টি – বাকি কি আছে তাই ভাবি! এতসব আক্রমনের মধ্যে যেকয়টা গন্ডার বেঁচেবর্তে আছে তাদের কি হবে? Indian Rhino Vision 2020তে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছিল ভারতীয় একশৃঙ্গ গন্ডারদের সবচেয়ে বড় বিপদ এই মুহূর্তে চোরাশিকার।

আসামের মানস জাতীয় উদ্যানে (ইংরেজি: Manas National Park) গন্ডারদের ইতিহাস উত্থান-পতনে ভরপুর। মানস জাতীয় উদ্যান ভয়াবহ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের শিকার হয়েছে।

১৯৮৭ সালে মানস সংলগ্ন অঞ্চলে পৃথক বোড়োল্যান্ডের জন্য তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। খুব তাড়াতাড়ি সেই আন্দোলন হিংসাত্মক রূপ নিয়ে নেয়। মানসে তখনও গন্ডারদের সংখ্যা বেশ গর্ব করার মতই। নিশ্চিত ভাবে আশিটা তো হবেই। খুব দ্রুত অবস্থার পতন হয়। মানস দুবছরের মধ্যে ব্যাপক ভাবে তছনছ হয়ে যায়।

পশ্চিমে কোকড়াঝাড় থেকে শুরু করে পূর্বে উদালগুড়ি পর্যন্ত একটার পর একটা ক্যাম্পে আগুন ধরাতে থাকে বোড়ো জঙ্গিরা। রাইফেল ছিনতাই হতে থাকে। জঙ্গলের সীমানার ভেতর শয়ে শয়ে লোক ঢুকে জবরদখল করে ফেলে। যাদের পরবর্তিকালে আর সরানো যায়নি। আর মানসের কোর এরিয়া হয় জঙ্গিদের লুকনোর জায়গা।

কেউ নিশ্চিত করে জানেনা ঠিক কত গন্ডার চোরাশিকার করা হয়েছিল সেই সময়। আমরা ভুলেই গেছি ইব্রাহিম আলি খান নামে সেই রেঞ্জ অফিসারের নাম। প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। তাকে অপহরণ করা হয়েছিল, তারপর গুলি করে মারা হয় ব্যাংতোল রিজার্ভ ফরেস্টের ভেতর দু’মাস বাদে।

ব্যাংতোল ফরেস্ট আজ নিশ্চিহ্ন। দেড় দশক ধরে চলা রক্তক্ষয়ী পৃথক বড়োল্যান্ডের লড়াইয়ে প্রচুর মানুষ মারা যান। পৃথক বড়োল্যান্ড রাজ্য হয়নি কিন্তু মানস থেকে গন্ডার প্রায় সাফ হয়ে যায়। যদিও পৃথক রাজ্য হওয়া আর না হওয়ার সঙ্গে গন্ডার থাকবে কি থাকবে না তার সম্পর্ক থাকার কথা ছিল না।

রাজনৈতিক লড়াই বহুবার বন্যপ্রাণকে উজার করেছে এভাবে। জঙ্গিরা খড়্গের লোভে চোরাশিকার করত। তখন গোলা-বারুদ আর গেরিলা যুদ্ধের খরচ শুধু নয় গন্ডারের খড়্গ যুবরানীদের ব্যাবসায়িক ঋণও শোধ করার চেষ্টা করেছে!

১৯৯৩এর সেপ্টেম্বরে তাইপের চিয়াং কাই-শেক এয়ারপোর্টে ভূটানের এক যুবরানী বাইশটি খড়্গ নিয়ে ধরা পড়েন ও গ্রেপ্তার হন। গন্ডারের খড়্গগুলোর মোট ওজন ছিল ১৪.৯ কেজি। জেরায় তিনি জানান এক ব্যাবসায়ীর কাছ থেকে সেগুলো সংগ্রহ করেছিলেন যে ব্যাবসায়ী সম্ভবত আসাম থেকে সেগুলো জোগাড় করেছিলেন।

বাইশটি খড়্গ সংগ্রহ করতে যুবরানীর সময় লেগেছিল দুবছর। জেরায় আরো আশ্চর্য্য তথ্য উঠে আসে। তিনি তাইওয়ানে সেগুলি বিক্রি করতে যাচ্ছিলেন তাঁর ব্যবসার ঋণ পরিশোধ করার জন্য।

যুবরানীর অনেক ব্যবসার মধ্যে কয়েকটি ব্যবসা ছিল দক্ষিণ ভূটানের ফুন্টসলিং-এ। আসাম থেকে খুব দূরে নয়। তাই মানস ও কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানের সঙ্গে এই খড়্গগুলোর সম্পর্ক একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায়নি। আর অস্বীকার করা যায়নি চোরাশিকারের সঙ্গে ভূটানের প্রভাবশালীদের যোগাযোগ।

সেই যুবরানী ছিলেন কেমব্রিজ শিক্ষিতা। তার কাছে ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট ছিল। অথচ থাকার কথা নয়। কারণ ভুটান সরকার তখন তাইওয়ানকে দেশ হিসেবে স্বীকৃতিই দেয়নি। আপনারা সকলেই জানেন যে ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট থাকলে লাগেজ তল্লাশি এড়িয়ে যাওয়া সহজ হয়।

সেই সুযোগ তিনি কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন। আর একটি দুটি নয় বাইশটি খড়্গ জোগাড় করতে এবং তা ব্যাগে নিয়ে বিদেশ যেতে প্রচুর ক্ষমতার দরকার হয়, যোগাযোগের দরকার হয়। অতয়েব এরকম শিক্ষিত ক্ষমতাবানেরা যখন একটি বিলুপ্তপ্রায় প্রানীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পড়ে তখন তার টিকে থাকাই মুশকিল হয়ে পড়ে। এমন তো হওয়ার ছিল না!

তবে সবচেয়ে বেশি যে জন্য গন্ডার শিকার হয়েছে তা হল যৌনক্ষমতা বর্ধক (Aphrodisiac) ওষুধ ও জ্বরের ওষুধ (Anti-Pyretic)। খড়্গ থেকে তৈরি হয়। চিন, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, জাপান, তাইওয়ানে অত্যন্ত চড়া দাম খড়্গ থেকে তৈরি ওষুধের। বিশেষ করে ভারতীয় একশৃঙ্গ গন্ডারের।

বর্তমান বাজারে চল্লিশ থেকে সত্তর লক্ষ টাকা দাম আছে প্রতি কেজি খড়্গের। কেন মানুষ জীবনের ঝুঁকি নেবে না! অনেকে বলেন কমপক্ষে দুটি পুরুষ গন্ডার বাঁশবাড়ি রেঞ্জে টিঁকে গেছিল। গন্ডারদের স্বভাবের হল তারা একই জায়গায় মলত্যাগ করতে ফিরে আসে। তাই সেই জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করতে পারলে তাদের নাগালে পাওয়া খুব সহজ। পূর্ব ভারতে বেশিরভাগ গন্ডার চোরাশিকার এভাবেই হয়। বিস্ময়কর ভাবে মানসের সেই দুটি প্রানীর এই স্বভাব ছিল না। তারা বেঁচে যায়।

ভারতীয়-এক-শৃঙ্গ-গণ্ডার-মানস-জাতীয়-উদ্যানে-ঘুরে-বেরাচ্ছে
গন্ডারদের স্বভাবের হল তারা একই জায়গায় মলত্যাগ করতে ফিরে আসে

গন্ডারের স্বভাব, অন্যান্য প্রানীদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বরাবর আমাদের দৃষ্টি আকর্ষন করে। মানসে আমি দেখেছি গন্ডার ঘাসে মধ্যে দিয়ে যখন হাঁটে তখন শালিক পাখিগুলো তার পায়ের কাছে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অতিকায় পায়ের পাতা ঘাসের ওপর পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘাসের ভেতরে থাকা পোকা-মাকড় ওড়া-উড়ি শুরু করে। শালিকের খুব লাভ। কষ্ট করে পোকা খুঁজতে হয়না।

ভারতীয়-এক-শৃঙ্গ-গণ্ডার-Indian-rhinoceros
শালিক পাখিগুলো তার পায়ের কাছে ব্যস্ত হয়ে পড়ে

গন্ডারের গায়ে বা পুরু চামড়ার ভাঁজে, কানের ফুটোয় মাছি ও অন্যান্য পোকা বাসা করে থাকে। ডিম পাড়ে। শালিক, বক সেগুলো খায়। গন্ডারের খুব মজা। বিনি পয়সায় গায়ের উকুন, পোকা সাফ।

খুব সম্প্রতি সাউথ আফ্রিকাতে গবেষণায় জানা গেছে ব্ল্যাক রাইনো আবার আড়িপেতে (Eavesdropping) পিঠে, মাথায় বসা অক্সপেকার পাখিদের কিচিরমিচির শোনে। গন্ডারের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ। কোথায় কি বিপদ (পড়ুন চোরাশিকারী) লুকিয়ে আছে চট করে দেখতে পায়না। তবে পিঠের ওপর পাখিদের দল অনেক আগে বিপদ দেখতে পায়। তাদের গলার স্বর পাল্টে যায়। গন্ডার সে ডাকের মানে বুঝতে পারে। সময় থাকতে সতর্ক হতে পারে। বিপদ থেকে দূরে সরে যায়।

মানসে আমি আহত এক গন্ডারকে রোজ দেখতাম। সঙ্গিনীকে পেতে সে ভীষণ লড়েছিল আরেক মদ্দার সাথে। খড়্গের আঘাতে তার পেটের নীচ থেকে পেছনের পায়ের মাঝ বরাবর ফেঁড়ে যায়। জীবন সংকট ছিল। বনকর্মীরা মরিয়া প্রচেষ্টা করেছিলেন। বারবার ট্রাঙ্কোয়ালাইজ করে চিকিৎসা করতে হত। একটু সুস্থ হয়ে সেই গন্ডার বারবার ফিরে আসতো ফেন্সিং-এর ধারে ক্যাম্প চত্তরে।

ভারতীয়-এক-শৃঙ্গ-গণ্ডার-Indian-rhinoceros
সেই গন্ডার বারবার ফিরে আসতো ফেন্সিং-এর ধারে ক্যাম্প চত্তরে

শালিক তার শুকিয়ে আসা ক্ষত থেকে ঠুকরে প্যারাসাইট খেত। যন্ত্রণা হলেও শালিকগুলোকে কখনও তাড়াতে দেখিনি। সে জানে ওরা ক্ষত পরিষ্কার করে দিলে সে তাড়াতাড়ি সুস্থ হবে।

মানস-জাতীয়-উদ্যানে-ভারতীয়-এক-শৃঙ্গ-গণ্ডার-Indian-rhinoceros
শালিক গণ্ডারের শুকিয়ে আসা ক্ষত থেকে ঠুকরে প্যারাসাইট খেত

হয়তো বনকর্মীদের ওপর তার খুব ভরসা জন্মে গেছিল। কাকভোরে ক্যাম্পের কাছে এসে পড়ত। মুখ তুলে চাইত। কেউ কি উঠেছে এত ভোরবেলা! বনকর্মীরা বারান্দায় এসে দেখতেন ওকে।

ভারতীয়-এক-শৃঙ্গ-গণ্ডার-Indian-rhinoceros
বনকর্মীরা বারান্দায় এসে দেখতেন ওকে

মাঝেমাঝেই পড়ন্ত বিকেলে জল খেতে আসতো জনশূন্য ক্যাম্পের কলপাড়ে।

জল খেতে আসতো জনশূন্য ক্যাম্পের কলপাড়ে

আবার অন্য ক্যাম্পে দেখেছি বাচ্চা নিয়ে স্ত্রী-গন্ডার নিশ্চিন্তে ঘাস খাচ্ছে উঠোনে। আর বনকর্মী কুয়োর জলে আনন্দে স্নান করছে। মাঝে কোনো কাঁটাতারের শাসন নেই।

 

মানস-জাতীয়-উদ্যানে-গন্ডার
মানস জাতীয় উদ্যানে  ক্যাম্পে দেখেছি বাচ্চা নিয়ে স্ত্রী-গন্ডার নিশ্চিন্তে ঘাস খাচ্ছে উঠোনে

 

এইতো সম্পর্ক মানুষে গন্ডারে! এইসব বনকর্মীরাও মানুষ আর কোচবিহারের মহারাজারাও। ১৮৭০ থেকে ১৯০৭ পর্যন্ত সাঁইত্রিশ বছরে যাঁরা বৃহত্তর মানসে দুশো সাতটি গন্ডার শিকার করেছেন।

মানসে ২০০৬ থেকে গন্ডার ট্রান্সলোকেট করা শুরু হয়। ট্রান্সলোকেশন হল,  একটি পার্ক থেকে, যেখানে যথেষ্ট সংখ্যায় গন্ডার রয়েছে, তাদের তুলে নিয়ে অন্য পার্কে পুনর্বাসন দেওয়া। কাজিরাঙা আর পবিতোরা থেকে এভাবে মানসে এখনো পর্যন্ত আঠেরোটি গন্ডার ছাড়া হয়েছে।

প্রায় শুন্য থেকে শুরু করে মানসে এখন তারা সংখ্যায় মোট আটত্রিশ এবং অবশ্যই আদি বাসিন্দা সেই দুটি গন্ডার ধরে। WWF বহু পরিশ্রম করেছে এই ঐতিহাসিক ট্রান্সলোকেশনে। সেই সাথে বনকর্মীরা। গন্ডার ট্রান্সলোকেশন একটি জটিল এবং সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া।

বিশেষ করে যে গন্ডারশাবকদের বন্যা থেকে বা অনাথ অবস্থায় উদ্ধার করে ক্যাম্পে লালন-পালন করে সাবালোক করা হয় তাদের ক্ষেত্রে সফলতা পাওয়া কঠিন। পৃথিবী জুড়ে অনেক পার্কে এই ধরনের ট্রান্সলোকেশন সফল হয়নি। কিন্তু মানস করে দেখিয়েছে। সারা পৃথিবীকে পথ দেখিয়েছে। তবে পথ অনেক চলতে বাকি। মানসের এখন যা চেহারা একশো গন্ডার দিব্য থাকতে পারে। এবং হ্যাঁ! যদি মানুষ চায়।

যদিও মানসের ভূপ্রাকৃতিক ও জলবায়ুগত পরিবর্তন আমাদের ভাবায়। অবশ্যই মানুষের সীমাহীন উন্নতির পাগলামো এই পরিবর্তনের বড় কারণ হতে চলেছে। ভূটানে প্রায় মিছিলের আকারে নদীবাঁধ তৈরি হচ্ছে। উদ্দেশ্য জলবিদ্যুৎ উৎপাদন। তালিকা দেখলে শিউরে উঠবেন।

১.  মঙ্গার জেলার কুরি ছু (‘ছু’ কথার অর্থ নদী) বাঁধ ২০০১ থেকে চালু হয়ে গেছে। উচ্চতা ৫৫ মিটার। উৎপাদন ক্ষমতা ৬০ মেগাওয়াট। কুরি ছু মানসে ডানদিক থেকে মিশেছে।

২. ট্রংসা জেলার মাংদে ছু বাঁধ খুব সম্প্রতি চালু হয়েছে। উৎপাদন ক্ষমতা ৭২০ মেগাওয়াট। উচ্চতা ১০১.৫০ মিটার। মাংদে ছু মানসে ডানদিক থেকে মিশেছে।

৩. কুলং ছু বাঁধ। নির্মাণকার্য শুরু হয়েছে ২০১৪ সালে। খুব তাড়াতাড়ি কাজ শেষ হয়ে যাবে। উচ্চতা ৯৫ মিটার। উৎপাদন ক্ষমতা ৬০০ মেগাওয়াট।কুলং ছু মানসে ডানদিক থেকে মিশেছে।

শেষ এখানেই হবে না। ভুটান সরকারের আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা হল এরকমঃ-

১. চামখার ছু বাঁধ। এটি দুটি বড় বাঁধের সম্মিলিত পরিকল্পনা। যথাক্রমে ১৩৯৭ মেগাওয়াট ও ৮৫৭ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা। উচ্চতা ১০৮ মিটার।

২. কুরি গোংরি বাঁধ। উৎপাদন ক্ষমতা ২৬৪০ মেগাওয়াট। উচ্চতা ২৫০ মিটার।

শুধু কুরি ছু বাঁধের জল ছাড়ার কারণে ২০০৪ সালে মানসে ভয়াল বন্যা হয়। তারপর থেকে মানসের ভূমিভাগের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। নদী বাঁশবাড়ি রেঞ্জে চার কিলোমিটার ঢুকে এসেছে। আর অদূর ভবিষ্যতে ভরা বর্ষায় এতগুলো বাঁধের জল একসঙ্গে ছাড়লে মানসে কি আবস্থা হবে তা কল্পনাতীত।

এই যে নদীগুলোর নাম করেছি, তারা কোনো আলাদা আলাদা নদী নয়। নদীগুলো সব  ভূটানের পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে মানসের মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে। এই সমস্ত নদী মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ‘নদী ব্যবস্থা (River System)’। এই সিস্টেমের কোনো একটি নদীকে পাহাড়ের ওপর আটকানোর প্রভাব নিম্ন অববাহিকায় পড়বেই পড়বে।

এই‘নদী ব্যবস্থা’ মানসের লাইফলাইন। মানসের বাস্তুতন্ত্রের মূল ধারক ও বাহক। মানসের ঘাসজমি, যা একশৃঙ্গ গন্ডারের বাসস্থল, ভেসে যেতে পারে যেকোনো দিন। বাঁধের কারণে নদী তার খাত পরিবর্তন করতে পারে দ্রুত। এমনিতেই মানসে নদী ভাঙন চিন্তার বিষয়।

বাঁধের কারণে সেই ভাঙন নিশ্চিতভাবে বাড়বে। তারপর এক অসাধারণ বাস্তুতন্ত্রের আর কি পড়ে থাকবে যা গন্ডারকে কোল পেতে নেবে। ফি বছর জঙ্গল-সীমান্তের গ্রামগুলো প্লাবিত হতে থাকলে মরিয়া গ্রামবাসী যদি আবার চোরাশিকারে ফিরে যায়? তখনই বা কি হবে?

সারা বিশ্বে আজ বড় নদীবাঁধ ব্যর্থ। নদীবাঁধ দিয়ে লাভ যা হয়েছে ক্ষতি হয়েছে তার বেশি। তবু মানুষ বাঁধ বানায়। থামে না। তাদের এই পৃথিবীতে আরো বেশি আলোর চাহিদায় বাঁধের উচ্চতা বাড়ায়। একদিন সেই উচ্চতায় দাঁড়িয়ে ভোগে, দখলে, পাপে, পূণ্যে, স্বাচ্ছন্দ্যে, বিকশিত মানুষ দেখে এক সাধকের চর্যা মাথা নামিয়েছে নিয়েছে তার পায়ের নীচে কলপাড়ের এক চিলতে জলে।

লেখা ও ছবি – সম্রাট সরকার

ই-মেল – samratswagata11@gmail.com

 

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.6 / 5. Vote count: 32

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

One thought on “মানস জাতীয় উদ্যানের গল্প – ভারতীয় একশৃঙ্গ গন্ডার

Leave a Reply

Next Post

অন্য প্রসঙ্গ ; শিশু সাহিত্য

4.6 (32) আজ পন্ডিত ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের দ্বিশত জন্ম বার্ষিকী। সব সামাজিক গনমাধ্যম তাঁকে নিয়ে নানা কথা, ছবি, তাঁর সম্মন্ধে নানা জানা অজানা তথ্য ইত্যাদিতে ভরাট হয়ে আছে। তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে লিখছি। দু সপ্তাহ হল টিভিতে একটি নতুন ধারাবাহিক শুরু হয়েছে। নাম পান্ডব গোয়েন্দা। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: