চার্লস ডারউইন (Charles Darwin )

poribes news
5
(2)

বিবর্তন বলেই আমাদের মাথায় যে লোক দুটির নাম প্রথমেই এসে পড়ে, তাঁরা হলেন ল্যামার্ক এবং ডারউইন ! চার্লস রবার্ট ডারউইন বিশ্ববরেণ্য একজন প্রকৃতিবিদ তিনি দার্শনিকও বটে । কারণ আধুনিক জীব বিজ্ঞানের দর্শন ; প্রজাতির উৎপত্তি তাঁর তত্ব দ্বারাই ব্যখ্যা করা সম্ভব হয়েছে ।

কে ছিলেন ডারউইন

সর্বপ্রথম বৈজ্ঞানিক উপায়ে জীব জগতের সৃস্টির ব্যখ্যা দেন।

বৈজ্ঞানিক পরিবারে জন্ম

অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংংল্যান্ডে ইরামাস ডারউইন ছিলেন একটি ইউরোপ বিখ্যাত নাম। তিনি ছিলেন একাধারে বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, উদ্ভাবক, লেখক এবং অনুবাদক ।

তাঁর লেখা ‘জুনোমিয়া’ শীর্ষক বইটিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘যেসব প্রাণীর রক্ত গরম তারা সবাই একই সূত্র থেকে এসেছে- এই ধারণাটি খুবই সাহসী ও নতুন চিন্তার উপাদান জোগাবে, সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই।’ এই ইরামাস সাহেবের নাতিই হলেন বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইন।

ডারউইনের জন্ম

চার্লস ডারউইন ১২ই ফেব্রুয়ারি ১৮০৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন মাউন্ট হাউজ, শ্রুসবেরি, শ্রপশায়া প্রদেশে; ইংল্যান্ডে ।

পরিবার

তাঁর পিতা ছিলেন রবার্ট ডারউইন, তাঁর পরিবার ছিলো ধর্মভীরু গোঁড়া খ্রিস্টান ! এখানেই তাঁর দৃঢ়তার পরিচয় পাওয়া যায় , ধর্মের বেড়াজালে বেড়ে উঠেও তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন বিজ্ঞানকে এবং সেই যুগ সাপেক্ষে আধুনিক বিজ্ঞান মনস্কতাকে l

ডারউইনের বিবাহ

ডারউইন তাঁর দুঃসম্পর্কের বোন এমা ওয়েজউডকে বিবাহ করেছিলেন।

ডারউইনের আবিষ্কার

তিনিই প্রথম প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিবর্তনবাদের বিজ্ঞান সম্মত ধারণা দেন। তিনিই সর্বপ্রথম বলেন যে, সকল প্রকার প্রজাতিই তাদের নিজো নিজো পূর্বপুরুষ হতে উদ্ভূত হয়েছে এবং এই পর্যবেক্ষণটি তিনি প্রমাণসহ প্রতিষ্ঠা করেন।

বিবর্তনের মাধ্যমে এই নানান প্রজাতির সৃষ্টি হওয়ার প্রবণতা’কে তিনি প্রাকৃতিক নির্বাচন হিসাবে অভিহিত করেন। তাঁর জীবদ্দশাতেই বিবর্তনবাদ একটি তত্ত্ব হিসাবে তদানীন্তন বিজ্ঞানী সমাজ ও মানুষের কাছে স্বীকৃতি লাভ করে !

তবে বিংশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে আধুনিক বিজ্ঞান চেতনার মাধ্যমে বিবর্তন প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক নির্বাচনের গুরুত্ব ও তার সম্যক অনুধাবন করা সম্ভব হয়েছে। ডারউইনের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ছিল জীববিজ্ঞানের একত্রীকরণ তত্ত্ব, যা জীববৈচিত্রের ব্যাখ্যা প্রদান করে।

শৈশব ও পড়াশোনা

ডারউইনের বাবা চেয়েছিলেন পুত্র ডাক্তার হোক,কিন্তু সেই আশা ব্যার্থ হওয়ায় চাইলেন; তিনি চাইলেন ছেলে অন্তত ধর্মযাজক হোক।কিন্তু ইতিহাস এক অন্য রকম সমাপতন চাইছিলো ! চার্লস ডারউইন, হলেন প্রকৃতিবিজ্ঞানী ।

শৈশব থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার প্রতি তিনি ছিলেন উদাসীন । তাঁর নেশা বলতে, নানান ধরনের নুড়িপাথর, মুদ্রা, গাছপালা, লতাপাতা, পোকামাকড়, পাখির ডিম সংগ্রহ করে চিহ্নিত করে রাখার কাজে। এছাড়া রসায়নশাস্ত্রের প্রতি তাঁর এক সহজাত অনুরাগ ছিলো । সাহিত্যেরও তিনি পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রাইস্ট কলেজের যাজক হওয়ার অধ্যায়ন করতে গিয়েও, তাঁর আর যাজক হওয়া হয়নি । এই সময়েই চলতো দল বেঁধে শিকার করা, সেই সঙ্গে পোকামাকড় সংগ্রহ করে চিহ্নিত করা,যা তাঁকে ব্যাবহারিক জীববিদ্যার জ্ঞান সম্পর্কে সমৃদ্ধ করে ।

তাঁর শিক্ষা জীবন সম্পন্ন হয় এডিনবার্গ এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, সেখানেই তাঁর পরিচয় হয় উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক জন সিভেন্স হেনস্লোর সঙ্গে। তিনিই হয়ে ওঠেন চার্লস ডারউইনের প্রেরণাদাতা ও পথ প্রদর্শক । পিতামহের লেখা ‘জুনোমিয়া’ বইটি তাঁর আগেই পড়াছিলো যা জীবসম্পর্কে তাঁর অনুরাগের জন্ম দেয় এবং পরবর্তীতে পড়ছিলেন লামার্কের লেখা।

‘এইচ এম এস বিগল’ জাহাজে গবেষনার জন্য

ডারউইন পাঁচ বছরব্যাপী যাত্রা 

১৮৩১ সাল, চার্লস ডারউইন তখন ২২ বছরের যুবক ; হেনস্লোর সুপারিশে প্রকৃতিবিজ্ঞানী হিসাবে ‘এইচ এম বিগল’ জাহাজের দীর্ঘ অভিযানের শরিক হন ডারউইন যা ছিলো তাঁর জীবনের মোড় ঘুরানো সমুদ্রযাত্রা ।

১৮৩১ সালের ২৭ শে ডিসেম্বর প্লিমাইথ বন্দর থেকে বিগলের যাত্রা শুরু হয়। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার নানান দেশে, আন্দিজ পর্বতাঞ্চল, গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জসহ নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া পরিভ্রমণ করে, কেপটাউন, সেন্ট হেলেনা হয়ে ১৮৩৬সালের ২রা অক্টোবর ফলমাউথ বন্দরে ফিরে আসে বিগলে।

বিগলে জাহাজের অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলভাগের মানচিত্র নির্মাণ করা, এবং সেই সঙ্গে নির্ভুলভাবে দ্রাঘিমারেখা নির্ধারণ করা । কিন্তু প্রকৃতিবিজ্ঞানী ডারউইন ওইসব অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করলেন প্রচুর উদ্ভিদ, কীটপতঙ্গ, মথ, প্রজাপতি, শামুক, পাথর, জীবাশ্ম, সেই সঙ্গে জীব ও প্রকৃতি সম্পর্কে বিপুল অভিজ্ঞতা ।

ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলের জীবাশ্ম এবং গ্যালাপাগোস দ্বীপুঞ্জের বহু বিচিত্র প্রাণীর বিভিন্ন প্রজাতি সম্পর্কে ডারউইন জ্ঞান আরোহন করেন এবং এই সমস্ত উপাদানই ছিলো ডারউইনের যাবতীয় চিন্তাভাবনার মূল উৎস ।

গ্যালাপাগোসের-দ্বীপুঞ্জে-বিরল-সমস্ত-প্রজাতির-প্রানী-Galapagos-Land-Animals
গ্যালাপাগোসের দ্বীপুঞ্জে বিরল সমস্ত প্রজাতির প্রানী

গ্যালাপাগোসের দ্বীপুঞ্জে বিরল সমস্ত প্রজাতির উপস্থিতি লক্ষ্য করেই তিনি ধারণা করেছিলেন, ওইসব প্রজাতি কোনো না কোনো সময়ে, মূল ভূখন্ড মধ্যে থেকেই এসেছিলো ও তারা মূল ভূখণ্ডের পূর্ব পুরুষদের থেকেই উৎপত্তি হয়েছিলো এবং পরে কোন কারণে মূল প্রজাতি থেকে অন্যরকম হয়ে উঠেছে অর্থাৎ প্রকরণ বা ভেদ সৃষ্টি হয়েছে- কিন্তু এর কারণ কি ? কোন প্রক্রিয়ার কেমন করে প্রজাতির উৎপত্তি হলো ? এর কারনের অনুসন্ধান তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল ! পরিবেশের পার্থ্যকে কিভাবে জীবের প্রজাতির পার্থ্যক সৃষ্টি হচ্ছে ? জলবায়ুর ভূমিকা কি ? দক্ষিণ আমেরিকার উড়তে অক্ষম পাখি রিয়া এবং গ্যালাপোগাস দ্বীপের প্রায় ১৪ টি প্রজাতির ফিঞ্চ পাখি ছিলো ডারউইনের চিন্তার মূল কেন্দ্রবিন্দু !

চার্লস-ডারউইন-Charles-Darwin
চার্লস-ডারউইন-Charles-Darwin

তারপর একাধিক সম্ভবনা তাঁকে ভাবিয়ে তোলে, যে জীবনযাত্রা বা পারিপাশ্বিক পরিবেশ পরিস্থিতি, অথবা পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক রয়েছে কি না ?- যা কতকগুলি বৈশিষ্ট্যেরই অনুরূপ, আবার অন্যগুলির নয়?

প্রকৃতির প্রতি ডারউইনের গভীর আগ্রহের কারণে তিনি এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান অধ্যয়নে মনোযোগী ছিলেন না; বরং তিনি সামদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণী নিয়ে গবেষণা করতে থাকেন।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন তাঁর প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের আগ্রহকে অনুপ্রাণিত করে। এইচ এম এস বিগলে তার পাঁচ বছরব্যাপী যাত্রা তাকে একজন ভূতাত্ত্বিক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং বিগলের ভ্রমণকাহিনী প্রকাশিত হলে তা তাঁকে জনপ্রিয় লেখকের খ্যাতি এনে দেয় ! ভ্রমণকালে তাঁর সংগৃহীত বন্যপ্রাণ ও জীবাশ্মের ভৌগোলিক বিন্যাস অনুধাবন করে কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে প্রজাতির ট্রান্সমিউটেশান নিয়ে অনুসন্ধান করেন ।

১৮৩৮ সালে প্রাকৃতিক নির্বাচন মতবাদটি প্রথম তৈরী হতে শুরু করে। যদিও তিনি তাঁর এই ধারণাটি নিয়ে কয়েকজন প্রকৃতিবিদের সাথে আলোচনা করেছিলেন,যদিও গবেষনার জন্যে সময়ের প্রয়োজন ছিল এবং সেই সঙ্গে তাঁকে তাঁর প্রধান ক্ষেত্র ভূতত্ত্ব নিয়েও কাজ করতে হয়েছিল l

এরপর তিনি ১৮৫৮ সালে আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেসের একই ধরনের চিন্তাভাবনা সম্বলিত অনুরূপ একটি প্রবন্ধ পড়েন এবং ওয়ালেসের সাথে যোগাযোগ করেন l তারপর অনতিবিলম্বে লিনিয়ান সোসাইটি থেকে তাঁদের উভয়ের তত্ত্ব যৌথভাবে প্রকাশিত হয়।

 

অরিজিন অব স্পিসিস

অরিজিন অব স্পিসিস’ “ on the origin of species by means of Natural selection” অর্থাৎ প্রজাতির উৎপত্তি সংক্রান্ত যে, চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্তে ডারউইন সেই সমুদ্রযাত্রায় উপনীত হয়েছিলেন ,তা দীর্ঘ দুই দশক পরে তাঁর আবিষ্কার ও তত্ব হিসেবে “ on the tendency of species to form varieties and on the perpetuation of varieties and species by means of natural selection” ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত হয়।যা যুগান্তকারী এক সম্পদ,যা সমৃদ্ধ করেছে ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বিজ্ঞানকে! ডারউইনের তত্ত্ব কিছু পরিবর্তিত হয়ে প্রকৃতিতে বহুল বৈচিত্রের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করে।

অন-দ্য-অরিজিন-অব-স্পিসিস
অরিজিন অব স্পিসিস

সাথে জুড়ে গিয়েছিলো বিতর্ক। ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠেছিলো সমগ্র ইউরোপের খ্রিস্টীয় ধর্মগুরুরা । এই তত্ত্ব বাইবেললোক্ত সৃষ্টিতত্ত্বের বিরোধী- এই অভিযোগে আক্রমণ করা হলো ডারউইন ও তাঁর তত্ত্বকে।

শুধু সভা-সমিতি নয়, কার্যক্ষেত্রে নানান ভাবে ডারউইনকে আক্রমণ করা হয় । মানুষকে বানরের মতো করে কার্টুন তৈরী করে “Monkey law” নামে প্রচার করে ; আমেরিকার বিভিন্ন প্রদেশে ডারউইন তত্ত্ব পড়ানো নিষিদ্ধ হলো । হুকার এবং হাক্সলে প্রবলভাবে ডারউইন কে সমর্থন দিয়েছিলেন যার ফলে তত্বটি টিকে যায় l

বইটি পড়েছিলেন ফ্রিডরিক এঙ্গেলস এবং পরের বছর কার্ল মার্কস এই বইটি পড়ে ১৮৬০ সালের ১৯শে ডিসেম্বর এঙ্গেলসকে চিঠিতে লিখেছিলেন, “আমাদের ধারণার প্রাকৃতিক-ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্থ সৃষ্টি করে দিয়েছে বইটি”।

ডারউইনের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকারের উদ্দেশ্যে ‘ক্যাপিটাল’ গ্রন্থটিতে ডারউইনের নামেই উৎসর্গ করেছিলেন মার্কস। এঙ্গেলস তাঁর রচিত ‘ডায়লেকটিকস্ অব নেচার’ গ্রন্থে প্রকৃতিবিজ্ঞানের জগতে তিনটি ঘটনাকে চূড়ান্ত গুরুত্ব দিয়েছেন- জীবকোশের আবিষ্কার, শক্তির সংরক্ষণ নিত্যতা ও রূপান্তরের নিয়ম আবিষ্কার এবং ডারউইনের আবিষ্কার।

১৮৭১ সালে তিনি মানুষের বিবর্তন এবং যৌন নির্বাচন নিয়ে গবেষণা শুরু করেন এবং মানুষের ক্রমনোন্নয়ন ও তারপর পরই মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীতে অনুভূতির প্রকাশ বিষয়ক দুটি গ্রন্থ তিনি রচনা করেছিলেন । বৃক্ষ নিয়ে তাঁর গবেষণা কয়েকটি গ্রন্থে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এবং তাঁর শেষ বইতে তিনি কেঁচো এবং মাটির উপর এদের প্রভাব নিয়ে তাঁর গবেষণা প্রকাশ করেন।

জীব বিজ্ঞানে অনন্য অবদানের জন্য ডারউইনকে একাধিক সন্মানসূচক পুরস্কার প্রদান করা হয়,যার মধ্যে রয়্যাল মেডেল (১৮৫৩),ওলাস্টন মেডেল (১৮৫৯)এবং কপলে মেডেল (১৮৬৪) ইত্যাদি উল্ল্যেখযোগ্য l

আজ ডারউইন তত্ত্ব নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালাচ্ছেন, নিত্য সংশোধিত হচ্ছে তত্ব । কিছু কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে চলছে গবেষণা, বিতর্ক ! এটাই স্বাভাবিক বিজ্ঞানের নিয়ম । কারণ বিজ্ঞান এগিয়ে চলে তার নতুন কিছু জানার খিদেতে , নানান প্রশ্ন নানা প্রয়াসের মধ্য দদিয়ে ; শুরু হয় অনুসন্ধান ।

এই জন্য বিজ্ঞান গতিশীল,বিজ্ঞানে শেষ বলে কিছু নেই ; এই তত্বও ব্যাতিক্রম নয় ! যদিও ডারউইনের মতো মেধার ভূমিকা অনস্বীকার্য। পৃথিবীর ইতিহাসে ডারউইন ও তাঁর প্রকৃতির নির্বাচন তত্ত্বের কোনো মৃত্যু নেই।কারণ বিবর্তন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া,যত দিন প্রাণের অস্তিত্ব থাকবে বিবর্তন চলতেই থাকবে l বিবর্তন থেমে গেলেই জীবের মৃত্যু !

ডারউইনের মৃত্যু

১৮৮২ সালের ১৯ শে এপ্রিল ৭২ বছর বয়সে ডারউইন মারা গিয়েছিলেন । ডারউইন ছিলেন উনিশ শতকের কেবলমাত্র পাঁচজন রাজপরিবার বহির্ভূত ব্যক্তিদের একজন যাঁর অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া রাষ্ট্রীয় সম্মানে সম্পূর্ণ হয়েছিল বিজ্ঞানে অনন্য অবদানের জন্য তাঁকে এই সন্মান প্রদান করা হয় , বিজ্ঞানী জন হার্শেল ও আইজ্যাক নিউটনের সমাধির পাশে ডারউইনকে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবিতে সমাধিস্থ করা হয়

ডারউইন সমাধি
আইজ্যাক নিউটনের সমাধির পাশে ডারউইনকে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবিতে সমাধিস্থ করা হয়

বিগলের সমুদ্রযাত্রা :

এইচএমএস বিগ্‌লের বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রা পরিচালিত হয় ইংরেজ ক্যাপ্টেন রবার্ট ফিট্‌জ্‌রয় এর নেতৃত্বে। ১৮৩১ সালের ২৭শে ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের ডেভেনপোর্ট থেকে যাত্রা শুরু করে । এটি ছিল বিগলের দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রা। বিগলের প্রথম সমুদ্রযাত্রারও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ফিট্‌জ্‌রয়।

দ্বিতীয় যাত্রায়ই প্রকৃতিবিদ হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন তরুণ চার্লস ডারউইন। এই সমুদ্রযাত্রাই পাল্টে দিয়েছিলো প্রাণীবিদ্যা কে, ডারউইন এই সমুদ্র পথেই বিবর্তনবাদের ভিত রচনা করেছিলেন। যাত্রার বর্ণনা এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে ডারউইন একটি ভ্রমণ মূলক বই লিখেন যার নাম ছিলো ‘ দ্যি ভয়েজ অফ দ্যি বিগ্‌ল’।

২৭ ডিসেম্বর ১৮৩১ -এ শুরু হয়ে এ সমুদ্রসযাত্রা প্রায় পাঁচ বছর চলে এবং ডারউইন ফিটজরয়ের ইচ্ছানুযায়ী, এই পূর্ণ সময়ে স্থলভাগের ভূতাত্ত্বিক ও প্রাকৃতিক ইতিহাস সংগ্রহ করে রাখতেন, যখন বিগল তটভূমি অঞ্চলে সমীক্ষা করতো তখন তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণ ও তাত্ত্বিক সম্ভবনাগুলি লিখে রাখতেন এবং নিয়মিত বিরতিতে সংগৃহীত নমুনা চিঠিসহ কেমব্রিজ পাঠাতেন,লেখা লিপিবদ্ধ হতো ।

তাঁর ভূতত্ত্ব, কীট পতঙ্গ , পোকা সংগ্রহ এবং সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণী ব্যবচ্ছেদ করায় দক্ষতা ছিল, কিন্তু অন্যান্য বিষয়ে তিনি একেবারেই নবীশ ছিলেন এবং তাই তিনি বিশেষজ্ঞদের মতামতের জন্যে কেবল মাত্র নমুনা সংগ্রহ করার কাজও করতেন ।

তাঁর সি- সিকনেস ছিলো এবং এই পাঁচ একাধিকবার অনবরত সমুদ্রপীড়ায় ভুগলেও তিনি তাঁর অধিকাংশ প্রাণীবিজ্ঞানগত লেখা ছিলো সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণী সংক্রান্ত, যার সূত্রপাত হয়েছিল ধীরস্থির প্লাংক্টন সংগ্রহের মাধ্যমে।

সেন্ট জাগোর উপকূলে তাঁদের এই দীর্ঘ যাত্রার প্রথম যাত্রাবিরতিকালে, ডারউইন আবিষ্কার করেছিলেন যে, আগ্নেয় শিলার উঁচু চূড়ার সাদা একটি অংশে ঝিনুক রয়েছে।এরপর ফিটজরয় তাকে চার্লস লায়েলের “প্রিন্সিপালস অফ জিওলজির” প্রথম খণ্ডটি দিয়েছিলেন যাতে ইউনিফির্মিটারিয়ানিজম প্রক্রিয়ায় বহু বছর ধরে ভূ-তত্ব ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে যাওয়া অথবা নিচু হয়ে হারিয়ে যাবার প্রক্রিয়ার কারণ এবং উদাহরণসহ উল্লেখ ছিলো । ডারউইন লায়েলের দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন,এবং ভূতত্ত্বের উপর একটি বই লেখার জন্যে চিন্তাভাবনা ও তত্ত্ব তৈরি করতে শুরু করেন।

এরপর ব্রাজিলে গিয়ে ডারউইন নিরক্ষীয় বনভূমি দেখে মুগ্ধ হন, কিন্তু সেখানকার দাসপ্রথা ও দাসদের উপর নির্মম অত্যাচার তাঁকে ব্যথিত করেছিলো। পাতাগোনিয়ার আলটায় পার্বত্য অঞ্চলে তিনি অতিকায় বিলুপ্ত স্তন্যপায়ীর জীবাশ্ম আবিষ্কার করেছিলেন, একই সঙ্গে তিনি তদানীন্তন আধুনিক সামুদ্রিক শামুকেরও সন্ধান পেয়েছিলেন, সেই থেকে তিনি সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এই সব প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছিলো তাঁর সমসাময়িক সাম্প্রতিক সময়ে, বহুকাল পূর্বে ঘটে যাওয়া কোনো মহাপ্লাবন বা অকস্মাৎ বিপর্যয়ের ফলে নয়।

তিনি মেগাথেরিয়াম আবিষ্কার করেছিলেন, যার গায়ের অস্থিময় আবরণ দেখে তিনি প্রথমটায় স্থানীয় আর্মাডিলোর দানবাকার সংস্করণ ভেবেছিলেন। ইংল্যান্ডে পৌঁছানোর পর এইসব আবিষ্কার রীতিমতো চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলো ।

ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য এবং আরো জীবাশ্ম অনুসন্ধান করার জন্য তিনি স্থানীয় মানুষদের সাথে ঘুরে বেড়াতেন এবং ওই সময়েই তিনি লায়েলের দ্বিতীয় খন্ড পড়েছিলেন এবং তার প্রজাতির সৃষ্টির কেন্দ্র ধারণাটি মেনে নিয়েছিলেন, কিন্তু তার সংগৃহীত নমুনা এবং তাদের ব্যাখ্যা লায়েলের মসৃণ অবিচ্ছিনতা এবং প্রজাতির বিলুপ্তির ধারণার বিরুদ্ধাচারণ করেছিলো। এই সময়ে তিনি ম্যালথ্যাস এর “অ্যান এসে অন পপুলেশন” পড়েছিলেন । ১৮৩৬ সালের ২রা অক্টোবর ফালমাউথ বন্দরে শেষ হয় এইচএমএস বিগলের যাত্রা ।

সৌভিক রায়

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 2

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

২০২০ পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল ও বাঙালি যোগ

5 (2) অক্টোবর মাস টি হল নোবেলের মাস । ​৬ই অক্টোবর এই বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল জয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। পদার্থবিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনজনকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তাঁরা হলেন রবার্ট পেনরোজ, রেইনহার্ড গেনজেল এবং আন্দ্রে ঘেজ। রজার পেনরোজ পেয়েছেন পুরস্কারটির অর্থাৎ আর্থিক মূল্যের ​অর্ধেক এবং বাকি দুজন […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: