২০২০ পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল ও বাঙালি যোগ

poribes news
5
(2)

অক্টোবর মাস টি হল নোবেলের মাস । ​৬ই অক্টোবর এই বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল জয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। পদার্থবিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনজনকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তাঁরা হলেন রবার্ট পেনরোজ, রেইনহার্ড গেনজেল এবং আন্দ্রে ঘেজ। রজার পেনরোজ পেয়েছেন পুরস্কারটির অর্থাৎ আর্থিক মূল্যের ​অর্ধেক এবং বাকি দুজন পাচ্ছেন পুরস্কারের ​বাকি আর্থিক মূল্য অর্ধেক অর্ধেক করে।

মহাবিশ্বের অন্যতম বিস্ময় হলো ব্ল্যাকহোল , আর সেই কৃষ্ণগহ্বরের ​​​ গঠনে সাধারণ আপেক্ষিকতার ভূমিকা নিয়ে গবেষণার জন্য নোবেল পেয়েছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রজার পেনরোজ। নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্যের অর্ধেকটাই পাবেন তিনি ৷

অন্য দুজন হলেন জার্মানির মাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউট ফর এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ফিজিক্সের গবেষক রাইনহার্ড গেনজেল ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দ্রেয়া ঘেজ৷ তাঁরা আমাদের সৌরমন্ডলের​ কেন্দ্রে থাকা অদৃশ্য এবং ভারী এক ধরনের বস্তু আবিষ্কার করেছেন যা সুপারম্যাসিভ কমপ্যাক্ট অবজেক্ট ( SCO) নামে পরিচিত ৷

​সাধারণ আপেক্ষিকতায় পেনরােজ এবং হকিং তাঁদের সিংগুলারিটি তত্ত্বগুলাে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে তাঁরা সাহায্য নিয়েছিলেন এক বাঙালি বিজ্ঞান সাধকের গবেষণালব্ধ সমীকরণকে । না অবাক হবেন না ! কারণ এটাই বাস্তব সত্যি !

সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ও বিশ্বতত্ত্ব-সম্পর্কিত আধুনিক গবেষণায় অনন্য অবদান রয়েছে এক বঙ্গ সন্তানের তিনি খাঁটি বাঙালি,কলকাতার অধিবাসী ছিলেন​ । যিনি তৎকালীন কলকাতায় আধুনিক সুযােগ সুবিধা ছাড়াই ,শত শত সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবিষ্কার করেছিলেন আপেক্ষিকতা তত্ত্ব সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ ।

সত্যি বলতে,​ আমরাই আমাদের মেধাবি কৃতীদের প্রাপ্য মূল্য সন্মান ​ কখনও দিতে শিখিনি, বরং তাঁদের দ্রুত ভুলে গিয়েছি ​​। নয়তো তাঁদের চিনে নিতে অনেক বেশি দেরি করে ফেলেছি।

আর উপেক্ষা এবং রাজনীতি তো রয়েছে, সেই আদি অনন্ত কাল থেকে , মেঘনাদ সাহা পাঁচবার মনোনয়ন পেয়েও ব্যার্থ, সত্যেন বোসেরও যোগ্য সন্মান দেইনি ,অথচ এঁদের গবেষণা কে ভিত্তি করেই অন্তত হাফ ডজন নোবেল ঘরে তুলেছে ইউরোপ ।

এই বছর অর্থাৎ ​​​​​​ ​​২০২০ সালের পদার্থবিদ্যার নোবেল পুরস্কার যে বিজ্ঞানী অমল কুমার রায়চৌধুরীর গবেষণার স্বার্থকতা , সে কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় ! তাঁর সমীকরণ ​​আরেকবার প্রমান করে দিল, পৃথিবীর মানচিত্রে তাঁর গবেষণা কতটা সফল এবং প্রাসঙ্গিক আজও ​​|

অধ্যাপক অমল কুমার রায়চৌধুরী, নামটা আমাদের অনেকের কাছেই অজানা; তিনি হলেন বাংলার আইনস্টাইন | কিন্তু যারা পদার্থ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা করেন তাদের কাছে হয়তাে নামটা বেশ পরিচিত। “Raychawdhuri’s Equation” নামক সমীকরণের জন্য তিনি আজও অমর হয়ে রয়েছেন।
​​​

এই সমীকরণ ব্যবহার করেই পরবর্তীতে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং​​ এবং রজার পেনরোজ​ তাঁদের “Penrose-Hawking Singularity Theorem” দিয়েছিলেন ।

Raychawdhuri’s Equation ছাড়াও আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব (General Theory of Relativity) এবং সৃষ্টিতত্ত্ব (Cosmology) নিয়ে অধ্যাপক অমল রায়চৌধুরীর​ গবেষণা পাশ্চত্যের​ বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ ​।

 

জন্ম

অমল রায়চৌধুরী ১৯২৩ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর অধুনা বাংলাদেশের বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন।

পিতা

তাঁর পিতা সুরেশচন্দ্র রায়চৌধুরী, ছিলেন পেশাগত​ একজন শিক্ষক ! তিনি স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে শিক্ষকতা করতেন।

ছেলেবেলা

ছোটোবেলা থেকে পিতাকে দেখেই অণুপ্রাণিত হয়েছিলেন তিনি এবং বাল্যকাল ​থেকেই তাঁর গণিতের প্রতি আলাদা আগ্রহ ছিলো, গণিতের জটিল সমস্যাগুলি সমাধান করতে ভালবাসতেন, তাঁর কাকে এ জিনিস ছিলো নেশার মতো ​​।

পড়াশোনা ও গবেষনা

১৯৪২ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক এবং ১৯৪৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর কাল্টিভেশন অব সায়েন্সেসে (IACS) যোগ দেন,​ কিন্তু দীর্ঘ চার বছর গবেষণা করেও কোনো রকম তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফল না পেয়ে তিনি হতাশ হয়ে পড়েন।

পরবর্তীতে তিনি আশুতোষ কলেজে লেকচারার ​হিসেবে যোগ দেন এবং ঐ সময়ে অধ্যাপক এন.​ আর. সেন সেখানে আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব পড়াতেন, তিনি অধ্যাপক সেনের সান্নিধ্যে আসেন​​ ​।

তাঁর কাছেই শিখতে শুরু করেন ​আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এবং তাঁরই সাহায্যে প্রথম কয়েকটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এরপর তিনি নিজেই গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকেন।

অমল-কুমার-রায়চৌধুরী

গবেষণার এই পর্যায়ে এসেই তিনি তাঁর বিখ্যাত সমীকরণটি আবিষ্কার করেন। তিনি IACS- এ দ্বিতীয় দফায় গবেষণা সহযোগী হিসেবে কাজ শুরু করেন । তিনি ক্রিস্টালোগ্রাফি নিয়ে কাজ করতেন ​ ​​। ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স, ইলেক্ট্রোডায়নামিস্ক এবং কসমোলজি ইত্যাদি বিষয়ে তিনি বই লিখেছিলেন,যেগুলি আজ আউট অফ প্রিন্ট​​​​​​ ! খুঁজলে এক -দু কপি হয়তো কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে মিলতে পারে !​​​​​

“Raychawdhuri’s Equation”

অমল কুমার রায়চৌধুরী ; তাঁর বিখ্যাত সমীকরণটি ১৯৫৩ সালে আবিষ্কার করলেও, তখন ​আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ করা হয়নি​। দুই বছর পরে ১৯৫৫ সালে এই সংক্রান্ত তাঁর গবেষণা প্রকাশিত হয় বিখ্যাত জার্নাল ফিজিক্যাল রিভিউ-তে।

এই গবেষণাপত্রের সুবাদেই অধ্যাপক অমল রায়চৌধুরী খ্যাতি লাভ করেন এবং   আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান মহলে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এর প্রায় চার বছর পরে তাঁর পিএইচডি সম্পন্ন হয় ১৯৫৯ সালে।

ছাত্রদরদী শিক্ষক

তিনি শুধুমাত্র একজন মেধাবী বিজ্ঞান গবেষকই ছিলেন না ,সেই সঙ্গে ​ অমল কুমার রায়চৌধুরী একজন অত্যন্ত ভালো ও সফল শিক্ষকও ছিলেন, শিক্ষার্থী মহলেও তাঁর জনপ্রিয়তা ছিলো ​​।

মৃত্যুর মাত্র এক বছর আগেও তিনি তাঁর জীবনের শেষ গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করেন। তিনি বই পড়তে ভালবাসতেন, ছিলেন রবীন্দ্রসংগীতের আগ্রহী । রাজনীতি ছিলো তাঁর পছন্দের একটি বিষয়ে, তিনি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আগ্রহী ছিলেন ​, তবুও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করতেন না কিন্তু বিভিন্ন প্রবন্ধে নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শের কথা উল্লেখ করেছেন।২০০৫ সালে তিনি কলকাতায় মারা যান ।

যাঁর সমীকরণ ব্যবহার করে সফল হয়েছেন বিদেশী বিজ্ঞানীরা, বিশ্বব্যাপী খ্যাতি পেয়েছেন হকিং,​ পেনরোজরা​​ – সেই মানুষটি না পেলেন পুরস্কার না পেলেন স্বীকৃতি ! বিদেশ তো সুদূরের ব্যাপার আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকেরাই তাঁকে চেনেন ! ​​​দোষটা আসলে আমাদেরই।

আমরাই জানতে চাই না পড়তে চাই না ! ওই যে কথায় বলে না গেঁয়ো যোগী ভিক্ষ পায় না ,সেই ব্যাপার এক্ষেত্রেও ​​​। আইনস্টাইন​​রা আমাদের দেশেও জন্মাযন, প্রতিটি প্রান্তে প্রতিদিন জন্মান ,ওদের’তো একটা আইনস্টাইন আর আমাদের একাধিক আইনস্টাইন আছে ​​।

কিন্তু পরিকাঠামো ,উপেক্ষও আর আমাদের রাজনীতির ফলে তাঁরা হারিয়ে যান অচিরেই ; আবার কখনো কখনো ​আমরা তাঁদের চিনে নিতে অনেক বেশি দেরি করে ফেলি। আর উৎসের অভাব তো আছেই ! আজ তাঁরই গবেষণাই অন্যের নোবেলের পথ প্রশস্ত করলো আর তিনি রইলেন ব্রাত্য !

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 2

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

খড়ের গাদায় সূচ

5 (2) হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। উনি খড়ের গাদায় সূচই খুঁজছেন। তাও আবার যে সূচ কম করে একশো বছর আগে হারিয়ে গেছে। সূচটি আদপে একটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে ধরে নেওয়া পাখি। পাখিটার নাম Pink-headed Duck। আর যিনি খুজছেন তার নাম রিচার্ড থর্নস্‌। গত ৫০ বছরে সারা বিশ্বের পক্ষীবিদদের অন্যতম সেরা আকর্ষণ […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: