বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনে অন্ধ্র, তেলেঙ্গানা, কর্নাটক, মহারাষ্ট্রের অতি বৃষ্টি

poribes news
4.5
(8)

 

অজয় নাথ   আজয় নাথ

২০২০ সালের অক্টোবর মাসের ১৩ তারিখ থেকে ১৮ তারিখ পর্যন্ত এক এক করে অন্ধ্র প্রদেশ থেকে কোঙ্কণ ও গোয়া উপকূলে একদিন করে ভারী থেকে অতি ভারী এবং কোথাও কোথাও চরম বা এক্সট্রিম বৃষ্টিপাত হয়েছে।

এখন ভারী থেকে অতি ভারী এবং চরম বা ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হলে যে কোন শহর জলমগ্ন হয়ে পড়ে। কেন কি জন্য এখানে সেই বিষয়ে আলোচনা করার জায়গা নেই। আমাদের মূল বিষয় অতি বৃষ্টি।

এখন প্রশ্ন হল অক্টোবর মাসের ১৩ থেকে ১৮ তারিখের মধ্যে ভারতের পূর্ব উপকূলের অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে পশ্চিম উপকূলের কোঙ্কণ ও গোয়া পর্যন্ত কেন হল এই অতি বৃষ্টি।

বিশ্ব-উষ্ণায়ন-ও-জলবায়ু-পরিবর্তনের-জন্য-বেশি-পরিমাণে-বৃষ্টিপাত
হাইদ্রাবাদে কয়েক ঘন্টা বৃষ্টির ফলে বন্যা

আপাত দৃষ্টিতে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণ হলো অক্টোবর মাসের ৯ তারিখ আন্দামান সাগরে তৈরি হওয়া নিম্নচাপ তীব্রতা বাড়িয়ে গভীর থেকে অতি গভীর নিম্নচাপ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তার পর তীব্রতা না কমিয়ে অতি গভীর নিম্নচাপ আকারে অন্ধ্র উপকূল অতিক্রম করে এবং পশ্চিম উপকূলের দিকে সরতে থাকে ।

 

ধীরে ধীরে তার তীব্রতা কমে সুস্পষ্ট নিম্নচাপ আকারে আরব সাগরের উপরে সরে যায়। তার এই গমন পথের উপরে থাকা গ্রাম শহর নগরে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়েছে।

আমরা জানি ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের নির্ঘন্ট অনুসারে ভারতে বর্ষা বা দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর স্থায়ীত্ব ১লা জুন থেকে ৩০শে সেপ্টেম্বর এই চার মাস। কিন্তু ফি বছর বর্ষার আসা যাওয়ার মধ্যে থাকে নানা রকমের বাঁক এবং ঘুর্ণি ইংরেজিতে যাকে বলে টার্ণ এন্ড ট্যুইস্ট।

২০২০ সালের বর্ষার চলনেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী এবার গোটা দেশে মৌসুমী বাতাস পৌঁছেছে নির্ঘন্টের ১১ দিন আগে । বর্ষা বিদায় প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে সেপ্টেম্বর মাসের ২৮ তারিখ এবং তা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। যা এর আগে কখনও ঘটেনি বলে তথ্যাভিজ্ঞ মহলের ধারণা।

সাধারণত অক্টোবর মাসের ১৫ তারিখ নাগাদ বঙ্গোপসাগর ও তামিলনাড়ুতে উত্তর পূর্ব মৌসুমী বায়ু প্রবাহ শুরু হয় এবং বর্ষা বা দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ু বিদায় নেয়। কিন্তু এই বছর অর্থাৎ ২০২০ সালের অক্টোবর মাসের ২১ তারিখেও বায়ু প্রবাহের যা গতি প্রকৃতি তাতে নভেম্বর মাসের আগে উত্তর পূর্ব মৌসুমী বায়ু শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম।

উত্তর ও উত্তর পশ্চিম ভারতের অনেক অন্চল থেকে বর্ষা বিদায় নিলেও পূর্ব, উত্তরপূর্ব ও দক্ষিণ ভারতের উপর বর্ষা এখনও সক্রিয় রয়েছে। গোটা দেশে সেপ্টেম্বর মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত এবারের বর্ষায় বৃষ্টিপাত হয়েছে স্বাভাবিকের তুলনায় ৯ শতাংশ বেশি। সারা দেশে গড় বৃষ্টিপাতের মোট পরিমাণ ৯৫৭.৬ মিলিমিটার।

তেলেঙ্গানাতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১০৯৫.৪ মিলিমিটার যা গড় স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের তুলনায় ৪৬ শতাংশ বেশি। সুতরাং এটা স্বাভাবিক যে হায়দ্রাবাদ বা তার আশেপাশের অঞ্চলের সমস্ত নীচু জায়গা আগে থেকেই জলপূর্ণ ছিল।

তার উপর অক্টোবর মাসের ১৪ তারিখ সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘন্টায়, আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুসারে, ২৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে বেগমপেট বিমানবন্দরে। তাছাড়া সারোরনগরে ২৭৫, মুশেরাবাদে ২৫৮, উপ্পলে ২৫৭, লিঙ্গাজীগোডায় ২৪৭, মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে ২০০ সালের অগাস্ট মাসে বেগমপেট বিমানবন্দরে ২৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে । যার ফলে হায়দ্রাবাদ শহর জলমগ্ন হয়ে পড়েছিল।

হায়দ্রাবাদ শহর থেকে একটু দূরে ঘটকেশ্বরে ৩২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে যা গত ১০০ বছরের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড। তা ছাড়াও প্রায় ৩৫ টি স্থানে ২০০ মিলিমিটার বা তার বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

এই বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাত হায়দ্রাবাদ অঞ্চলের ইতিহাসে সর্বকালীন রেকর্ড। স্বাভাবিক ভাবেই পুরো অঞ্চল জলমগ্ন হয়ে পড়ে। নীচু এলাকায় বাড়ি ঘর জলমগ্ন হয়ে পড়ায় প্রায় ২৮ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে।

সরকারের দেওয়া তথ্য অনুসারে ১৪ জনের জীবনহানি হয়েছে। তীব্রতা হারিয়ে গভীর নিম্নচাপ নিম্নচাপে পরিনত হওয়ায় ও আরও পশ্চিমে সরে যাওয়ার ফলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যায়। অবস্থার দ্রুত উন্নতি হয়।

১৯০৩ সালে হায়দ্রাবাদ শহরে ১১৭.১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল যা ২০০০ সালের আগে পর্যন্ত সর্বোচ্চ পরিমাণ বৃষ্টিপাত ছিল। অতিবৃষ্টির জন্য হায়দ্রাবাদ শহরের জলমগ্ন হয়ে যাওয়াকে বন্যা বলা মনে হয় ঠিক হবেনা।

হড়পা বান বা ফ্ল্যাশ ফ্লাড ( flash flood ) বলাই যুক্তিযুক্ত হবে। এবারের বর্ষায় মধ্যে ভারতের অনেক জায়গায় অল্প সময়ের অধিক বৃষ্টিপাতের জন্য বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রাজস্থান, গুজরাট ও মধ প্রদেশ তার অন্যতম উদাহরণ ।

আসাম এবং বিহার দীর্ঘ সময় ধরে বন্যা কবলিত ছিল জুলাই অগাস্ট মাসে। বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming) ও জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate change) জন্য এখন বৃষ্টিপাতের চরিত্রে পরিবর্তন এসেছে চোখে পড়ার মত। কম জায়গায় বেশি পরিমাণে বৃষ্টিপাত এবারের বর্ষার একটি বিশেষ দিক।

 

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.5 / 5. Vote count: 8

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

দক্ষিণ বঙ্গে পূজোর আবহাওয়া

4.5 (8) অজয় নাথ  অক্টোবর মাসের ৬ তারিখের পর ১৪ দিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর বর্ষা বিদায় পর্ব ২১শে অক্টোবর আবার শুরু হয়েছে। উত্তর ভারতের অধিকাংশ, মধ্য ও পূর্ব ভারতের কিছু অংশ থেকে বর্ষা বিদায় নিয়েছে। তবে ২০ তারিখ মধ্য বঙ্গোপসাগরে তৈরি নিম্নচাপ ২১ তারিখ সুস্পষ্ট আকার নিয়েছে । ২৩ অক্টোবর […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: