পালক থেকে পাখি আবিষ্কারের গল্প

Samrat Sarkar
কারথালা স্কপস্‌ আউল
5
(7)

লেখা – সম্রাট সরকার

পৃথিবীর পক্ষীবৈচিত্রের বৈজ্ঞানিক তালিকাকরণ প্রায় আড়াইশো বছরের পুরনো। সহজ করে বলতে গেলে আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীতে ঠিক কত রকমের পাখি আছে তার একটি সুষ্ঠ, সর্বজনস্বীকৃত, বৈজ্ঞানিকনামসহ মহাতালিকা তৈরির কাজ। এ কাজ এখনো চলছে। চলবেই। এবং ভবিষ্যতে চলতেই থাকবে।

কারন এই বৈজ্ঞানিক তালিকাকরণ বা ক্লাসিফিকেশন অত্যন্ত জটিল পদ্ধতি। ভূল বা মত পার্থক্য থেকে যায় প্রতি মুহূর্তে। পরে শোধরানো হয়। নতুন পাখি আবিষ্কৃত হয়ে সংযোজিত হয়। কখনো বিশদ গবেষণার পর পূর্বের ভ্রম শুধরে কোনো পাখিকে তালিকার ভেতর স্থানান্তরের প্রয়োজন পড়ে।

স্বভাবতই সেই মহাতালিকায় পরিবর্তন চলছেই। এভাবে যতবার সেই তালিকায় পরিবর্তন হয়েছে ততবার সেই তালিকা আরো সুষ্ঠ, মজবুত ও বিজ্ঞানসম্মত হয়েছে। আমাদের জ্ঞান ও চর্চার পরিসর বেড়েছে।

এটা যেকোনো পক্ষীপ্রেমীর কাছে আনন্দের। তবে একেবারে নতুন পাখি আবিষ্কারের যে আনন্দ তা কিন্তু সবচেয়ে আলাদা। কারণ মানুষ সেই মুহূর্তে জানে যে এই পৃথিবীর পক্ষীবৈচিত্রে আরো একটি নতুন নাম সংযোজিত হল। পৃথিবী আরো বৈচিত্রময় হল।

নতুন পাখি আবিষ্কারের সেই সব গল্প কিন্তু কম আকর্ষণীয় নয়। আজ সেই নতুন পাখি আবিষ্কারের একটি ছোট্ট গল্প বলবো।

১৯৫৮ সালে সি ডাব্লিউ বেনসন নামে এক ব্রিটিশ পক্ষীবিদ কোমোরো দ্বীপপুঞ্জে অভিযানে গেছিলেন। ব্রিটিশ অর্নিথোলজিস্টস ইউনিয়ান সে বছর শতবর্ষে পদার্পন করবে। সেই শতবর্ষ উপলক্ষে হয়েছিল কোমোরো অভিযান।

বেনসন সাহেব ছিলেন সেই দলের নেতৃত্বে। এর আগে কোমোরো দ্বীপপুঞ্জে কি কি পাখি আছে তেমন কেউ খুঁজে দেখেননি।  আফ্রিকা মহাদেশের মূল ভূখন্ডের দক্ষিণ-পূর্ব পাশ আর মাদাগাস্কারের মাঝে আছে মোজাম্বিক প্রণালী। এই মোজাম্বিক প্রণালীর উত্তরপ্রান্তে ভারত মহাসাগরের ওপর ভাসছে কোমোরো দ্বীপপুঞ্জ। মূলতঃ চারটি দ্বীপ নিয়ে এই কোমোরো দ্বীপপুঞ্জ। গ্র্যান্ড কোমোরো, মোহেলি, আনজুয়ান আর মায়োট্টে। চারটে দ্বীপেই আভিযান হয়েছিল।

মানচিত্রে কোমোরো দ্বীপপুঞ্জ

গ্র্যান্ড কোমোরোতে ওদের ক্যাম্প ‘লা কনভালেসেন্স’-এর কাছে একদিন বেনসন পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছিলেন। পর্যবেক্ষণের বিষয় হল একটি পাখির বাসা। পাখিটির নাম “হামবোল্টস সানবার্ড”। বাসাটি তারা কি ধরনের খড়কুটো দিয়ে বানায় সেই নিয়ে চলছিল নিবিড় পর্যবেক্ষণ। হঠাৎ বেনসনের খেয়াল হল বাসার ওপরটা সুন্দর ভাবে মসৃণ করেছে পাখিটা।

পক্ষীবিদ্যার ভাষায় ‘লাইনিং’। যাতে করে সদ্যজাত বাচ্চাদের নরম চামড়ায় খড়কুটর খোঁচা না লাগে। এটা নতুন কিছু নয়। বেশিরভাগ পাখিই করে থাকে। বেনসন আরো খেয়াল করলেন এই লাইনিং-এর জন্য পাখিটা অন্য পাখিদের পালক ব্যবহার করেছে। শুরু হল সেই পালকগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ। অনেক কয়টির মধ্যে একটি পালক দেখে একটু অবাক হয়ে গেলেন বেনসন সাহেব। পালকটি হয় কোনো পেঁচা নয় কোনো নাইটজার বা রাতচরার।

মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। গ্র্যান্ড কোমোরোতে এর আগে কেউ পেঁচা আছে বলে তো জানায়নি! তবে এই ছোট্ট সানবার্ড (দূর্গা টুনটুনি জাতীয়) কোথা থেকে পেঁচার পালক পেল? তবে কি গ্র্যান্ড কোমোরো সত্যিই পেঁচা আছে?

পরদিন থেকে শুরু হল তোলপাড়। বেনসন বেশি করে রাতে অভিযানে বেরনো শুরু করে দিলেন। রাত্রের অন্ধকারে টর্চের আলোয় তন্নতন্ন করে খুঁজতেন পেঁচা। আর সেইসাথে রাত্রের প্রতিটি পাখির ডাক গভীর মনযোগ দিয়ে শুনতেন। কোমোরোতে একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরি আছে। মাউন্ট কারথালা।

 মাউন্ট-কারথালা
জীবন্ত আগ্নেয়গিরি মাউন্ট কারথালা। শেষবার জেগে উঠেছিল ২০০৭ সালে।

অচিরেই মাউন্ট কারথালার পশ্চিম ঢালে প্রায় ১৮০০ মিটার উচ্চতায়  শুনতে পেলেন এক অচেনা ডাক। জায়গাটা তার ক্যাম্প ‘লা কনভালেসেন্স’-এর খুব দূরে নয়। ভেবেছিলেন কোনো নাইটজার হবে। কারণ ডাক’টা অনেকটা নাইটজারের মতই। খুব তাড়াতাড়ি পাখিটাকে কয়েদ করে ফেললেন। তেরো বছরের এক স্থানীয় বালক ‘জুমা’ বেনসনকে রাতবিরেত গাছে চড়তে সাহায্য করত। জুমা গাছে চড়তে এতই দক্ষ ছিল যে পুরো অভিযান তাকে দলের সঙ্গে রেখে দিয়েছিলেন বেনসন। তারপর কয়েকদিন চলল পাখিটার ওপর গভীর পর্যবেক্ষণ। না, ওটা নাইটজার ছিল না। পেঁচাই ছিল।

নতুন একটা পেঁচা (‘স্কপস্‌ আউল’ গোত্রের) সেই মহাতালিকায় সংযোজিত হল। ‘কারথালা স্কপস্‌ আউল’। তবে প্রথমেই নতুন পাখির মর্যাদা ‘কারথালা স্কপস্‌ আউল’ পায়নি। বেনসন যদিও নিশ্চিত ছিলেন ওটা নতুন স্কপস্‌ আউল, তবে ওঁর দুই সহকর্মী ভিন্ন মত পোষণ করেছিলেন। তাদের মত মেনে নিয়ে সেটি পড়শি দ্বীপের পেঁচা ‘মাদাগাস্কার স্কপস্‌ আউল’-এর কোনো উপজাতি হিসেবে তালিকাবদ্ধ হয়ে গেল।

কারথালা-স্কপস্‌-আউল
কারথালা স্কপস্‌ আউল

তারপর বহু বছর কেটে গেছে। খুব সম্প্রতি ‘কারথালা স্কপস্‌ আউল’ সম্পূর্ণ নতুন পাখি হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে (১৯৯৯ থেকে ২০০৮) অবশেষে প্রমাণ করেছেন ‘কারথালা স্কপস্‌ আউল’ একটি নতুন প্রজাতি। যদিও কোনো এক অজানা কারনে পাখিটার বিজ্ঞানসম্মত নামে প্রথামত বেনসন সাহেবের নিজের নাম উল্লেখ করেননি। করেছিলেন ফরাসী প্রাণীবিদ পাউলিয়ান-এর নাম।

‘কারথালা স্কপস্‌ আউল’-এর বিজ্ঞানসম্মত নাম দিয়েছিলেন ‘অটাস রুটিলাস পাউলিয়ানি’’। বিজ্ঞানী পাউলিয়ান ভারত মহাসাগরের পাখি ও স্তন্যপায়ীদের নিয়ে বিস্তর কাজ করেছিলেন। এবং সেই অভিযানের জন্য প্রচুর সাহায্যও করেছিলেন। তবে পাখিটার আবিষ্কারক হিসেবে সি ডাব্লিউ বেনসন-কে স্বীকৃতি দিয়েছেন সবাই।

গ্র্যান্ড কোমোরো দ্বীপ

সেই আবিষ্কারের ষাট বছর পর ‘কারথালা স্কপস্‌ আউল’ আজ গভীর অস্তিত্বের সংকটের মধ্যে। মাউন্ট কারথালা ছাড়া কোথাও আর তারা নেই। আগ্নেয় পর্বতের ধার ঘেঁষে জনবসতি, চাষ-আবাদ, রাস্তাঘাট বেড়েছে। বিজ্ঞানীদের হিসেব মাত্র এক হাজার জোড়া হয়তো টিকে রয়েছে গ্র্যান্ড কোমোরোতে। আর বেনসন সাহেবের সেই পেঁচাটি নমুনা হিসেবে ব্রিটিশ ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে সযত্নে রক্ষিত হয়ে আছে।

 

ছবি – ইন্টারনেট থেকে

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 7

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

শুধু সুন্দরবন

5 (7) লেখক- ডঃ গৌরব রায়     ছবি– ডঃ নিলাঞ্জন পাতি শুধু সুন্দরবন, দক্ষিণ রায়ের ডেরায় ১ :  অনেকগুলি অভিযাত্রার এটা একটা, এবার আমাদের সাথে দুই নামী চিত্রগ্রাহক। তাদের দামী ক্যামেরা। যাত্রা শুরু পাথরপ্রতিমা ব্লক এর রামগঙ্গাঘাট থেকে এক শীতের সকালে। লঞ্চেই থাকা খাওয়া রাত্রিযাপন। মৃদংগভাঙ্গা (Mridongobhanga) নদী হয়ে […]
সুন্দরবনে-হরিন
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: