শুধু সুন্দরবন

3.4
(14)

লেখক- ডঃ গৌরব রায়     ডঃ-গৌরব-রায়

ছবি– ডঃ নিলাঞ্জন পাতি

শুধু সুন্দরবন, দক্ষিণ রায়ের ডেরায় ১ : 

অনেকগুলি অভিযাত্রার এটা একটা, এবার আমাদের সাথে দুই নামী চিত্রগ্রাহক। তাদের দামী ক্যামেরা। যাত্রা শুরু পাথরপ্রতিমা ব্লক এর রামগঙ্গাঘাট থেকে এক শীতের সকালে।

লঞ্চেই থাকা খাওয়া রাত্রিযাপন। মৃদংগভাঙ্গা (Mridongobhanga) নদী হয়ে সপ্তমুখি (Saptamukhi) ,ঠাকুরান ( Thakuran), মাতলা ( Matla ) আর তাদের অসংখ্য শাখা নদী ও খাঁড়ি হয়ে গভীর জঙ্গলের মধ্যে আমাদের আনাগোনা। সঙ্গে কলস (Kalas), গজি (Gazi) জঙ্গলে দ্বীপ, Bony Camp ইত্যাদি দেখা । মাঝে একবার গভীর জঙ্গলে খাঁড়িতে আটকে যাওয়া।

একবার পথ ভুল করা। জোয়ার ভাটা, কুল কিনারা না দেখতে পাওয়া নদীর বিশাল ঢেউ আর আকুল বাতাস। গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিনে রাতে কত জানা অজানা পশু পাখির ডাক, লাঞ্চ ও ডিনার এ দারুণ সব মাছের পদ, সব সময় বাঘের ভয়….

সুন্দরবন
সুন্দরবন এর খাড়ি

শুধু সুন্দরবন, দক্ষিণ রায়ের ডেরায় ২:

দুই বাংলার হিন্দু মুসলিম সুন্দরবন এর মানুষ দক্ষিণ রায় ও বনবিবিকে মেনে চলেন। অনভিজ্ঞ পর্যটকেরা চান বাঘ দেখতে, আর সুন্দরবন এর মানুষ চান তার সাথে যেনো দেখা না হয়।

পৃথিবীতে আট প্রজাতির মধ্যে মাত্র চার প্রজাতির বাঘ বেঁচে আছে এশিয়া (Asia) মহাদেশে। এদের মধ্যে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার আছে ভারত সহ মাত্র কয়েকটি দেশে।

এই রাজকীয় অত্যন্ত সুদর্শন সাহসী ও শক্তিমান প্রাণীটি অরুণাচল, ভুটান , সিকিম    (Sikkim ), কালিংপঙ (Kalimpong) এর নেওড়া (Neora) তে 10 – 12 হাজার ফুট উঁচুতে ঠান্ডায়।   রাজস্থানের আরাবাল্লি (Aravali) পাহাড়ের গরম শুষ্ক রণথম্বর (Ranthambhore) ও সরিক্সার (Sariskar) জঙ্গলে, উত্তরাখন্ডের এর করবেট (Corbet) সহ মধ্য ও দক্ষিণ ভারতের জঙ্গলগুলিতে, এমনকি সুন্দরবন এর ম্যানগ্রোভ (mangrove) অরণ্যে অভিযোজন করে বেঁচে আছে।

সুন্দরবন
সুন্দরবন

বাঘ খুব  ক্ষিপ্র , দক্ষ ও হিংস্র শিকারী প্রাণী। ওদের ঘ্রাণ শক্তি দুর্বল হলেও শ্রবণ ও দৃষ্টি শক্তি তীক্ষ্নতী।  চিতল ,কাকর ,সম্বর , নীলগাই ,বুনো শুয়োর বাঘের প্রধান খাদ্য। প্রয়োজনে হনুমান, বাঁনর, খরগোশ , গরু, মোষ শিকার করে। সজারু শিকার করতে গিয়ে বিপত্তি  ঘটায়।

সুন্দরবনের-বানর
সুন্দরবনের-বানর

শুধু সুন্দরবন, দক্ষিণ রায়ের ডেরায় ৩:

বাঘ অনেক ভেবেচিন্তে শিকার নির্বাচন করে, তাকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে, তারপর নিঃশব্দে অনুসরণ করে অথবা অপেক্ষা করে।

সুন্দরবন
সুন্দরবন

সুন্দরবন এর বাঘ কাদা মেখে এমনভাবে হেতাল বনে মিশে থাকে বোঝা যায় না। এরপর অনুকূল সময়ে কাছ থেকে পিছন বা পাশের দিক থেকে লাফিয়ে দাঁত ও থাবা দিয়ে গলা কামড়ে মুহূর্তের মধ্যে শিকারকে হত্যা করে। তারপর নিজের সমান ওজনের শিকারকেও অনেক দূরে জঙ্গলের মধ্যে নিরাপদ জায়গায় মুখে টেনে নিয়ে যায়।

সুন্দরবন

কয়েকদিন ধরে খায়। শিকার ছাড়া অপ্রয়োজনে প্রাণী হত্যা করে না। বিরক্ত না করলে কাউকে আক্রমণ করে না, নরখাদকরা ব্যাতিক্রম।

আহত বা বৃদ্ধ হয়ে শিকারে অসক্ত হয়ে বাঘ পোষা গরু মোষ মারে, তারপর সহজতম শিকার মানুষ। কেউ কেউ মনে করেন লবণ জলের কারণে সুন্দরবন এর বাঘ নরখাদক।

আমার মতে খাদ্যের অভাবে, প্রজনন ঋতুতে বাঘ ও বাঘিনী সঙ্গীর খোঁজে জঙ্গল তোলপাড় করে গর্জন করতে থাকে। সেই সময় সুন্দরবন এর বাঘকে বিশাল নদী পেরিয়ে অন্য জঙ্গলে সঙ্গীর খোঁজে যেতে দেখা যায়।

বাঘিনী একসাথে দু তিনটে শাবকের জন্ম দেয় এবং এক থেকে তিন বছর অবধি অত্যন্ত যত্ন করে বড় করে তোলে

শুধু সুন্দরবন, দক্ষিণ রায়ের ডেরায় ৪:

সুন্দরবন এর রয়্যাল বেঙ্গল অনন্য কারণ তার ভয়াল চেহারা এবং অসম সাহস, শক্তি, বুদ্ধি, ক্ষিপ্রতা, হিংস্রতা, লড়াই করার ক্ষমতার জন্যে । এর কারণ সুন্দরবন এর প্রকৃতি। প্রতিনিয়ত তাকে খুব কষ্ট করে বেঁচে থাকতে হয়।

খাবার বলতে অল্প কিছু চিতল হরিণ আর শুয়োর। তাই তাকে বানর কিংবা জলে নেমে মাছ, কচ্ছপ, কাঁকড়া খেতেঙ্কড় । প্রবল ঝড় তুফান এ গাছে চড়ে বাঁচতে হয়।  দিনে দুবার জোয়ার ভাটা, পা ডুবে যাওয়া কাদা ও ধারালো ঠেস মূলের মধ্যে দিয়ে চলতে হয়।

সুন্দরবনে-হরিন
সুন্দরবনে-হরিন

লবণ জল খেয়ে থাকতে হয়। খাদ্য ও সঙ্গীর সন্ধানে কুমির ভরা বিশাল বিশাল নদী সাঁতরে পাড় হতে হয়…. দক্ষিণ রায় এর ডেরা খুঁজে কি পেলাম এখন রহস্য থাক।

শুধু সুন্দরবন, হেরোভাঙা:

আপনারা অনেক নদী দেখেছেন, আমিও দেখেছি বেশ কিছু। বিশালতার দিক থেকে মেঘনা, পদ্মা, লুইটর বা ব্রহ্মপুত্র, হুগলী, বিদ্যাধরী, মাতলা, থাকুরন , সপ্তমুখী , মহানাদী,  কৃষ্ণা (Krishna) , গোদাবেরী … আর সৌন্দর্যর দিক থেকে মানস ,কালচিনি , কর্নফুলি,কোপাই, সুবর্ন্রেখা,অলোকনন্দা , চেনাব, মান্ডভী.. কত বলব. কিন্তু আপনি কি রূপসী রূপালি হেরোভাঙা নদীকে দেখেছেন ?

সুন্দরবন

একদিকে গভীর বাঘ জঙ্গল, অন্যদিকে ঘন ম্যানগ্রোভ (mangrove)।

শুধু সুন্দরবন, ঝড়খালি (বাসন্তী) :

ঝড়, নদীর প্লাবন, বাঘ, কুমির, সাপ নিয়ে ঘর করে সীমিত চাষ, নদীতে মাছ ধরা, জঙ্গলে মাছ ধরা, বাইরে জন মজুরি কাজ নিয়ে কোনরকম বেঁচে আছেন মূলত পূর্ব বঙ্গ থেকে আসা দলিত জনসমাজ।

সুন্দরবন
সুন্দরবন

শুধু সুন্দরবন, গোসাবা ১:

গোসাবা আমাদের রাজ্যের দক্ষিণ পূর্বের শেষ এবং দুর্গমতম ব্লক. মাতলা, বিদ্যা, রায়মঙ্গল সহ অসংখ্য ছোটো বড় নদীর বদ্বীপ নিয়ে গঠিত। এর উত্তর ও পূর্ব দিকের গোসাবা

,রাঙ্গাবেলিয়া (Rangabelia), কচুখালি  (Kachukhali),কুমিড়মারি (Kumirmari), আমটালি (Amtali), রাধানগর (Radhanagar), শম্ভুনগর (Sambhunagar) প্রভৃতি অঞ্চলে মানুষ বাস করে। পূর্ব ও দক্ষিণ দিকটা সংরক্ষিত অরণ্য। যাবতীয় ঝড়, জল উচ্ছ্বাস বেশিটাই এখানে আছড়ে পড়ে। গোসাবা আমার প্রিয়তম ব্লক। এক সময় নিয়মিত যেতাম, 2013 – 14 নাগাদ জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমে 18 থেকে যে জেলা 02 তে পৌঁছেছিল তাতে গোসাবার একটা বড় অবদান ছিল।

সুন্দরবন

এখানে প্রবল বর্ষার মধ্যে আমরা দূরবর্তী ছোটোমল্লাখালি (Chotomollakhali) তে একটি outbreak investigation ও control এর জন্য যাচ্ছি । গোসবা (Gosaba) থেকে জোয়ারে যেতে তিন ঘণ্টা লাগে। সেদিন দুর্যোগের মধ্যে লেগেছিল পাঁচ ঘণ্টা। একবার সারেঙ্গ (boat) পথ হারিয়ে গভীর জঙ্গলে নিয়ে ফেলেছিল। আমরা মরিচঝাঁপি দ্বীপের পাশ দিয়ে গেছি। এখানে একটা ছবি আছে. অনেক কথা মনে পড়ছে, তার মধ্যে আমাদের লঞ্চ এর পাশেপাশে মাছের ঝাঁক নদীর মধ্যে লাফিয়ে যাচ্ছিল।

শুধু সুন্দরবন, গোসাবা ২:

সুন্দরবন আমাদের কাছে চিরকালই সুন্দর থাকবে।এই মুহূর্তে সুন্দরবন বিধ্বস্ত কিন্তু সুন্দরবন এর অপরাজিত মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়াবেন। মহানদী বিদ্যা থেকে একটা মিষ্টি ছোটো নদী দুর্গাদুয়ানি (Durgaduyani) দক্ষিণ পূর্ব দিকে ঢুকে গোমার (Gomar) নদীর সাথে মিশেছে। ডান দিকে বিরাজনাগার (Birajnagar) ও বালি (Bali) , বাম দিকে আরামপুর (Arampur) , ডুল্কি (Dulki),সোনাগাওঁ (Sonagaon) জঙ্গল লাগোয়া গ্রামগুলি। গোমার (Gomar) থেকে ডানদিকে পড়া গেলো সাজিনা (Sajina) নদীতে, ডানদিকে বাঘের জঙ্গল।

 

নদীর উল্টো দিকে পাখিরালয় (Pakhiralay),দয়াপুর (Dayapur),হামিলটনাবাদ , লাহিড়িপুর (Lahiripur) প্রভৃতি গ্রাম. বাঁ দিকে সাতজেলিয়ার (Satjeliar) দিকে চলে যাওয়া যায়। ডান দিকে ঝিলা (Jhila) নদী ধরে গভীর জঙ্গল ব্যাঘ্র প্রকল্প ।  চামটার (Chamtar) কোর এরিয়া। আরো দক্ষিণে নদী গুলো প্রকান্ড হয়ে সাগরে মিশেছে। পূর্বদিকে বাংলাদেশের সুন্দরবন। হাতানিয়া (Hataniya) -গোমোর ( Gomor) – রায়মঙ্গাল (Raymongol) রুটএ অনবরত বাংলাদেশী জাহাজ চলে।

সুন্দরবনে-বাংলাদেশের-জাহাজ
সুন্দরবনে-বাংলাদেশের-জাহাজ

 

শুধু সুন্দরবন, পাথরপ্রতিমা ১:

সুন্দরবন এর অরণ্য এক সময় উত্তরে কল্যাণী অবধি বিস্তৃত ছিল। তাকে ধ্বংস করতে করতে গোসবা (Gosaba), বাসন্তি (Basanti),কুলতলি (Kultali), মাথুরাপুর ২ (Mathrapur 2), পাথরপ্রতিমা (Patharprotima) এর অঞ্চলে সীমিত   হয়েছে। তার মধ্যে যেটুকু আছে ভয়াবহ আম্পান (Ampan) এ তছনছ। আইলা (Aila), বুলবুল (Bulbul ) প্রতিটি ঝড়েই পাথরপ্রতিমা (Patharprotima)ব্লক (block) টি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।এখানকার ধানচির (Dhanchir) জঙ্গলের মত সৌন্দর্য খুব কম জঙ্গলের আছে।

শুধু সুন্দরবন, পাথরপ্রতিমা ২:

পাথরপ্রতিমাতে রয়েছে আমাদের দক্ষিণতম Primary Health Centre Indrapur PHC বঙ্গোপসাগরের লাগোয়া. অনুকূল সময়ে পাথর থেকে লঞ্চএ তিন ঘণ্টা লাগে. কাছেই সমুদ্র সৈকত. সাদা বালি. লাল কাকরা. নির্জন. বকখালি বা হেনরি Island থেকে অনেক বেশি সুন্দর. ব্লক টি অনেকগুলি নদী ও দ্বীপ এর সমাহার. এর মধ্যে আছে মহানদী Saptamukhi. আছে Lothian Island. Dhanchir অপূর্ব জঙ্গল. Bhagabatpur কুমির প্রকল্প. আমরা বিকেলে বসে বসে দেখছিলাম চিতল হরিণের দল জল খেতে আসছে…

শুধু সুন্দরবন, কুলতলি ১:

জয়নগর ১, ২, ৩ ব্লক তিনটির মধ্যে কুলতলি সবচাইতে দক্ষিণে । জামতলা (Jamtala) বাজার থেকে শুরু করে মইপিঠ (Moipith) ছাড়িয়ে সেই আরেক সুন্দরবন এর মহানদী ঠাকুরন (Thakuran) বা জামিরা (Jamira) পর্যন্ত। ওপারে ঘন বাঘের জঙ্গল । মাঝে মাঝে বাঘেরা খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে হানা দেয়।  আবার গরিব মানুষ পেটের টানে বাঘের জঙ্গলে হানা দেয়।

সুন্দরবন
সুন্দরবন জীবন ও সংগ্রাম

শুধু সুন্দরবন, কুলতলি ২:

আমরা পৌঁছলাম ভূখণ্ড র শেষ গ্রাম কিশোরীমোহনপুরে । একটি স্বাস্থ্যবান দাড়াস সাপ (Rat Snake) আমাদের অভ্যর্থনা জানালো । দেখলাম সেই নারকেল গাছটা যেটাতে মানুষের তাড়া খেয়ে বাঘ উঠেছিল । খুব কষ্ট করে এইসব জায়গার মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়।

 

সুন্দরবন
সুন্দরবন

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 3.4 / 5. Vote count: 14

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

2 thoughts on “শুধু সুন্দরবন

  1. লেখক এর পর ডঃ লেখা মুছে দিও।প্রকৃতি প্রেমিক ডঃ,না। মানাচ্ছে না।
    গৌরব বাউণ্ডুলে ভালো।

Leave a Reply

Next Post

সিল্ক রুট (Silk Route) ভ্রমণ

3.4 (14) লেখক- ডঃ গৌরব রায়            এই অভিযাত্রাটি শুরু হয়েছিলো জলপাইগুড়ির গজলডোবার তিস্তা ব্যারেজ-এর পাখি দেখে ও বরলি (Borali) মাছ ভাজা খেয়ে। তারপর ওদলাবাড়ি – দামডিন (Dumdim) – গরুবাথান (Gorubathan) – রুট এ রিশপ (Rishyap) এর টঙে প্রবল ঠান্ডায় তিনদিন । মাঝে একদিন লোলেগাও (Lolegaon), […]
সিল্ক-রুট
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: