রাধাগোবিন্দ কর ( R G Kar )

poribes news
5
(2)

১২০ বছর আগে, বাংলা তখন আরেক প্যান্ডেমিকে বিধস্ত l সেই সময়ে চিকিৎসক  রাধাগোবিন্দ কর ( R G Kar ) কিভাবে মহামারির হাত থেকে কলকাতা তথা বাংলাকে বাচিয়েছেন তা আজকে আমরা জানি ।

মার্চ মাস, ১৮৯৯ সাল কলকাতায় চলছে প্লেগের দাপট। যদিও দু’বছর আগেই প্লেগ দেখা দিয়েছিলো করাচিতে এবং সেখান থেকেই পুণে ও মুম্বই পেরিয়ে প্লেগ পৌঁছেছিল অবিভক্ত বাংলায় ।

ওয়ালডেমার হপকিন্সের প্লেগ ভ্যাকসিন তখন কলকাতায় পাওয়া গেলেও, টিকাকরণ জরুরি নয় । ব্রিটিশ সরকারের জনবিরোধী এই ঘোষণার ফল হয়েছিল মারাত্মক । বলাইবাহুল্য প্লেগ তখন মহামারীর আকার নিয়েছে।

রাধাগোবিন্দ-কর
রাধাগোবিন্দ-কর

সেই সময়ে উত্তর কলকাতায় ঘুরে ঘুরে রোগীদের সেবা করে চলেছেন এক আইরিশ মহিলা। জেলার স্বাস্থ্য আধিকারিক পদে নিযুক্ত এক ডাক্তারও উত্তর কলকাতার অলিতে গলিতে ঘুরে রোগী খুঁজে বেড়াচ্ছেন। চিকিৎসা করছেন , পরামর্শ দিচ্ছেন ,পথ্য কিনতে অপারগ রোগীকে নিজেই অর্থ সাহায্য করছেন ।

এমন চলতে চলতে সেই বিদেশিনি ও চিকিৎসকের আলাপ হয় । কলকাতায় প্লেগের সংক্রমণ রুখতে ও মৃত্যুর হার কমাতে দু’জনে একজোট হয়ে কাজ করছেন । সেই আইরিশ মহিলা হলেন মার্গারেট এলিজ়াবেথ নোবেল, যিনি ভগিনী নিবেদিতা নামেই বেশি পরিচিত । আর সেই চিকিৎসক ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর।

ইনিই হলেন সেই বিখ্যাত বঙ্গ সন্তান,যে ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ঐতিহ্য কে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁর ঘটনা বহুল জীবনের মাধ্যমে । সিনেমা উপন্যাসের মতোই ঘটনার ঘনঘটায় মোড়া তাঁর জীবন ।

জন্ম ও পরিবারের ইতিহাস ঃ 

হাওড়া জেলার রামরাজাতলার বেতড়ে রয়েছে বিখ্যাত কর বাড়ি। ওই বাড়িরই এক কৃতী সন্তান হলেন রাধাগোবিন্দ কর ।

জনশ্রুতি অনুযায়ী, বাড়িটি তৈরি হয়েছিল পলাশির যুদ্ধের এক বছর আগে। কর পরিবারের সুপ্রাচিন ইতিহাস রয়েছে । বংশের প্রতিষ্ঠাতা হলেন ভূমিঞ্জয় কর l বেতড়ের বাড়িটি তৈরি করান কর বংশের একবিংশতম পুরুষ জয়রাম কর এবং রামচন্দ্র কর সেটিকে সংস্কার করেন এবং বর্ধিত করেন ।

সেই সময়কার করবাড়ির কোনো রকম ছবি পাওয়া যায় না,আর। তবে তাঁদের বর্তমান বংশধর সৌমিত্র কর পুরনো করবাড়ির ছবি ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘মাই হোম ইন গ্রিন ডেজ’ নামে সেই ছবিটি থেকে রাধাগোবিন্দ করের সময়ে বাড়ি কেমন ছিল, তার কিছুটা ধারণা করা যায়।

হাওড়ার বেতড়ের এই বাড়িতেই ১৮৫০ সালের ২৩শে অগস্ট রাধাগোবিন্দ কর জন্মগ্রহণ করেন। যে দালানে রাধাগোবিন্দের জন্ম, সেটির এখন ভগ্নপ্রায় অবস্থা ।

পাশেই বিরাট পুকুর, সেই পুকুরেই স্নান করতেন রাধাগোবিন্দ ; আসলে সহজ সরল জীবন যাত্রায় বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন তো তিনি । লোক মুখে, একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, রাধাগোবিন্দ করে জন্ম হয়েছিল অধুনা বাংলাদেশের ঢাকায়। সেই তথ্য প্রমাদ ব্যাতিত অন্য কিছুই নয় !

পিতা সনামধন্য চিকিতসকঃ তাঁর বাবা দুর্গাদাস কর ,তিনিও একজন চিকিৎসক ছিলেন । তিনিই ঢাকায় মিডফোর্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ফলে অনেকের ধারণা জন্মায় যে, রাধাগোবিন্দের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়।

শিক্ষা জীবন :

রাধাগোবিন্দের স্কুল শিক্ষাজীবন কলকাতার হেয়ার স্কুলে সম্পূর্ণ হয় । সেই সময়ে তিনি স্কুলে যেতেন তাঁদের বাড়ির ঘোড়ার গাড়ি করে, প্রথমে হাওড়ার গঙ্গাঘাট এবং সেখান থেকে নৌকা করে নদী পেরিয়ে স্কুলে পৌঁছনো হতো। পন্টুন ব্রিজ অর্থাৎ আজকের দ্বিতীয় হুগলি সেতু তখনও তৈরি হয়নি। অগত্যা নৌকাই একমাত্র ভরসা ।

হিন্দু স্কুল থেকে উত্তীরণ হয়ে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসেন রাধাগোবিন্দ। যদিও তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথমে বসতে চাননি । বাড়ি থেকে পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে বিদেশ যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু তবে তাঁর বাবা ছিলেন অত্যন্ত কড়া একজন অভিবাবক ।

ছেলেকে বাড়ি ফিরিয়ে এনে, বলপূর্বক প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসান তিনি। প্রবেশিকায় উর্ত্তীর্ণ হবার পরে শুরু হয় রাধাগোবিন্দের ডাক্তারি পড়া ।

থিয়েটার প্রেমী রাধাগোবিন্দ :

পড়াশোনার পাশাপাশি রাধাগোবিন্দের নেশা ছিলো থিয়েটারের, এই নেশাও তাঁর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া । পিতা দুর্গাদাস করের অভিন্নহৃদয় বন্ধু ছিলেন প্রখ্যাত নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র।

এই মানুষটিরও সান্নিধ্য পেয়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যা ছাত্রাবস্থায় তাঁর থিয়েটারের জগতের প্রতি এক গভীর আকর্ষণ তৈররী করে । ১৮৬৮ সালে বাগবাজার অ্যামেচার থিয়েটার তৈরি করেন রাধাগোবিন্দ কর ।এই সময় তাঁর বন্ধু ও সঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ, অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি ও নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ ।

ডাক্তারি পড়ার জন্য রাধাগোবিন্দ তখন বেতড়ের কর বাড়ির বদলে বেশির ভাগ সময়টাই কলকাতার বাড়িতে কাটাতেন। রাধাগোবিন্দ যখন ডাক্তারি পড়া শুরু করেন,তখন তাঁর পঠনপাঠনের সুবিধের জন্য উত্তর কলকাতায় শ্যামবাজারে একটি বাড়ি তৈরি করেন পিতা, দুর্গাদাস কর। উত্তর কলকাতায় সে সময় থিয়েটারের একটি ঐতিহ্য ছিলো ।

রাধাগোবিন্দ স্বয়ং রঙ্গমঞ্চেও অবতীর্ণ হয়েছিলে । ১৮৭২ সালে দীনবন্ধু মিত্রের ‘লীলাবতী’-তে, ক্ষীরোদ বাসিনীর ভূমিকায় রাধাগোবিন্দ স্বয়ং অভিনয় করে খ্যাতি লাভ করেন। একাধিক নাটকের স্ত্রী চরিত্রেও তিনি মঞ্চে অভিনয় করেছেন । থিয়েটারের প্রতি তাঁর এই অনুরাগ, তাঁর ডাক্তারি পাঠের ক্ষতিই করেছিল।

করবাড়ির বর্তমান বংশধরদের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, রাধাগোবিন্দ কোন রকম দিনলিপি বা ডায়রি লিখে যাননি। সেই কারণে, তাঁর জীবনের দৈনন্দিন ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা পাওয়া প্রায় অসম্ভব।যার ফলে তাঁর জীবনী পুনর্নির্মাণ প্রায় অসম্ভব !

বিভিন্ন পত্রপরিকায় একাধিক মানুষের স্মৃতিকথায় তাঁর সম্পর্কে কিছু বিক্ষিপ্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ঘটনা রয়েছে ।যদিও তার কোনো নির্দিষ্ট প্রামান্য তথ্য নেই ,সেগুলো মূলত কোনো কোনো সময়ে চিকিৎসা মহলে লোকমুখে প্রচলিত ছিল।

বিনা দোষে পুলিশের হাতে রাধাগোবিন্দের নিগৃহীত

হনঃ

‘বলাকা’ পত্রিকার ২৮-তম সংখ্যায় (২০০৯সালের প্রকাশিত) সুবীরকুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখা থেকে, ১৮৭৯ সালে বিনা দোষে পুলিশের হাতে রাধাগোবিন্দের নিগৃহীত হওয়ার একটি ঘটনা জানা যায় ।

কালী পুজোর রাতে বাজি পোড়ানো উপলক্ষে এক কনস্টেবলের সঙ্গে তাঁর প্রতিবেশীদের হাতাহাতি হয়। দুর্ভাগ্যক্রমে, সেই সময়ে রাধাগোবিন্দ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকেও গ্রেফতার হতে হয়।

সেই সময়েই তাঁর প্রথম পত্নী বিয়োগ হয় । ছাত্রাবস্থাতেই প্রথম বিয়ে করেছিলেন তিনি। এই সমস্ত বিক্ষিপ্ত ঘটনাগুলি এবং থিয়েটার প্রেম তাঁর ডাক্তারি পড়ায় বাধা সৃষ্টি করে।

উচ্চশিক্ষার জন্য স্কটল্যান্ডে পাড়ি 

কলকাতা ছেড়ে তিনি স্কটল্যান্ডে পাড়ি দেন এবং ভর্তি হন এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর বিদেশযাত্রার সঙ্গী ছিলেন কাশ্মীরের বিখ্যাত ডাক্তার আশুতোষ মিত্র। ১৮৮৬ সালে অবশ্য দেশে ফিরে আসেন তিনি এবং ডাক্তারি পড়া শেষ করেন।

কর্মজীবন :

এর পর রাধাগোবিন্দ যে সময়ে ডাক্তারি করা শুরু করেন । সারা জীবনে চিকিৎসাক্ষেত্রে যে অবদান তিনি রেখে গিয়েছেন, তাতে প্রখ্যাত চিকিৎসক মধুসূদন গুপ্তের পরেই শ্রেষ্ঠ বাঙালি চিকিৎসকদের আসনে তাঁকে বসাতে হয়।

মাতৃভাষায় বাঙালি চিকিৎসকেরা যাতে শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারেন, সেই কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন রাধাগোবিন্দ এবং তিনি দেশীয় চিকিৎসক গড়ে তোলার পক্ষপাতী ছিলেন, তখন প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভাষা। হিন্দু কলেজ থেকে পাশ করা হাতে গোনা কয়েকজন ছাত্র সেই সময় ইংরেজি জানতেন ।

চিকিৎসাবিজ্ঞান দূরস্থ, বাংলা ভাষায় লেখা সাধারণ বিজ্ঞানেরও ভালো কোনও বই ছিল না তৎকালীন সময়ে যদিও আজও বিজ্ঞানের উচ্চশিক্ষায় কোনো বাংলা বই পাওয়া যায় না বললেই চলে।ছাত্রাবস্থায় নিজেও সহপাঠীদের দেখে এই অসুবিধের কথা অনুভব করেছিলেন রাধাগোবিন্দ।

বাংলা ভাষায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের বই রচনা

তাই ডাক্তারি পাশ করার আগে থেকেই বাংলা ভাষায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের বই লেখার কাজে হাত দেন তিনি ।

ভিষগবন্ধু

তাঁর প্রথম বই ‘ভিষগবন্ধু’ যা ১৮৭১ সালে প্রকাশিত । বাকি জীবনে তিনি একাধিক বই লেখেন। যেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘সংক্ষিপ্ত শারীরতত্ত্ব’, ‘রোগী পরিচর্য্যা’, ‘ভিষক সুহৃদ’, ‘প্লেগ’, ‘স্ত্রীরোগের চিত্রাবলী ও সংক্ষিপ্ত তত্ত্ব’, ‘সংক্ষিপ্ত শিশু ও বাল চিকিৎসা’, ‘সংক্ষিপ্ত ভৈষজতত্ত্ব’, ‘কর সংহিতা’ ও ‘কবিরাজ ডাক্তার সংবাদ’ ইত্যাদি ।

প্রত্যেকটি বইই লেখা হয়েছিল বাংলাতে এবং সহজবোধ্য ভাষার ব্যবহার বই গুলিকে সাধারণ মানুষের পড়ার উপযোগী করে তোলে । ইংরেজি জানা ডাক্তারির ছাত্ররাও তাঁর বই পড়তেন।

বাংলায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের বই লেখার ক্ষেত্রেও তাঁর অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর বাবা । তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ভার্নাকুলার বিভাগে অধ্যাপনা করতেন।

বাংলা ভাষায় চিকিৎসা শাস্ত্রের বইও রচনা করেন তিনি। নিঃসন্দেহে বলাই যায় , চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যায়নে দেশীয় ভাষার গুরুত্ব দেওয়ার অণুপ্রেরণা রাধাগোবিন্দ তাঁর বাবা থেকেই পেয়েছিলেন।

রাধাগোবিন্দের জীবনে পিতার প্রভাবঃ

থিয়েটার থেকে ডাক্তারি তাঁর সমগ্র জীবনের অনুধাবন করলেই বোঝা যায়, তাঁর জীবনে তাঁর বাবার প্রভাব। দুর্গাদাস কর নিজে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও, বাঙালি জনসমাজে ইউরোপীয় শিক্ষা ব্যবস্থার আগ্রাসী দাপট কে তিনি মেনে নেননি কোনো দিনই।

চিকিৎসা শিক্ষাক্ষেত্রে ভাষার সমস্যা ছিল অত্যন্ত প্রবল। কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যবহৃত বহু ইংরেজি শব্দকেই বাংলায় অনুবাদ করা ছিল কার্যত সোনারপাথর বাটি।

দুর্গাদাস লক্ষ করেছিলেন, ভারতের নিজস্ব চিকিৎসা ব্যবস্থার লিখিত দলিল গুলিতে খাস ইউরোপীয় চিকিৎসা শিক্ষা শুধু মাত্র প্রভাব বিস্তার করেই রেহাই দেয়নি, ভারতের সব কিছুকেই প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিতেও চেষ্টার কোনো প্রকার ত্রুটি করেননি ।

দুর্গাদাস কর কলোনিয়াল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। ১৮৬৮ সালে ‘ভাষজ্য রত্নাবলী’ নামে তাঁর একটি বই প্রকাশিত হয় । বইটি মূলতঃ ছিল একাধিক ঔষধি গাছের বিবরণ ও ছবি নিয়েই ।

গ্রামগঞ্জের বহু তথাকথিত চিকিৎসকেরা ‘ভাষজ্য রত্নাবলী’ পড়ে চিকিৎসা করতেন। রাধাগোবিন্দ কর নিজস্ব বই লেখার পাশাপাশি বাবার লেখা বইয়ের সম্পাদনাও করেছেন এবং বইয়ের বর্ধিত সংস্করণও প্রকাশ করেছিলেন ।

রোগীদের সমস্যার সমাধানের উপায় খোজাঃ

বাংলায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের বই লিখেই যে কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলের রোগীদের সমস্যার কোনো রকম সমাধান হওয়ার নয়, সেই বাস্তব সত্যি ছাত্রাবস্থাতেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন রাধাগোবিন্দ কর। তাঁর এই আত্ম উপলব্ধির নিদর্শন পাওয়া যায় তাঁরই লেখা ‘ভিষগবন্ধু’ বইয়ের মুখবন্ধে।

তিনি লিখেছিলেন, ‘‘যাহারা চিকিৎসা বিদ্যালয় হইতে সুশিক্ষিত ও কৃতকার্য হইয়া চিকিৎসা কার্যে প্রবৃত্ত হয়েন তাঁহারা যতই বুদ্ধিমান ও বিদ্বান হউন না কেন, তাঁহাদিগের মধ্যে অনেকেই বহুদর্শিতার অভাবে ব্যবস্থাপত্র প্রদান করিতে সহজে সক্ষম হন না” !

ইউরোপীয় ডাক্তারেরা ভারতীয় রোগীদের অবজ্ঞাঃ

ইতিমধ্যেই কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল গড়ে উঠলেও, বহু রোগীই চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হতেন। ইউরোপীয় ডাক্তারেরা ভারতীয় রোগীদের অবজ্ঞাই করতেন। তাঁদের প্রধান লক্ষ্য ছিল, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্য ও উপনিবেশে বসবাসকারী ইউরোপীয়দের স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখা।

রাধা গোবিন্দের অজানা ছিলো না এই বৈষম্যমূলক আচরণ l দেশের মানুষদের চিকিৎসা করতে গিয়ে পুরনো আয়ুর্বেদ দেশীয় চিকিৎসা ও সদ্য শেখা ইউরোপীয় চিকিৎসার মধ্যে দ্বন্ধে পড়তেন দেশীয় বাঙালি চিকিৎসকেরা ।

ভারতীয়দের জন্য মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল

প্রতিষ্ঠার চেষ্টাঃ

রাধাগোবিন্দ করই প্রথম বুঝেছিলেন যে দেশের মানুষের চিকিৎসার জন্যে শুধুমাত্র নির্দেশিকা, বই প্রকাশ যথেষ্ট নয়। বরং প্রয়োজন একটি পৃথক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের।

সেই কলেজ বা হাসপাতালটিকে হতে হবে ব্রিটিশদের থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। ক্রমে রাধাগোবিন্দ করের স্বপ্ন বাস্তবে রূপায়িত হতে থাকে ধীরে ধীরে l এই কলেজ যা আজ বাংলার পুর্ব ভারতের অন্যতম সেরা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল হিসেবে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তা সম্পূর্ণ তাঁরই পরিশ্রম এবং লড়াই’এর ফসল l

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরের বছর মেডিক্যাল এডুকেশন সোসাইটি অব বেঙ্গলের সাধারণ সভায় গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী নাম রাখা হয় ‘আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল’।

আর-জি-কর-মেডিকাল-কলেজ

যদিও নিজের নামাঙ্কিত হাসপাতাল রাধাগোবিন্দ কর দেখে যেতে পারেননি। রাধাগোবিন্দ কর-কে এ কাজ করতে কার্যত, পাহাড় টলাতে হয়েছিল !

একদিকে শাসকের সঙ্গে সম্মুখ শত্রুতা অন্যদিকে,দেশের ও সমাজের কোনো রকম সমর্থন জোটেনি তাঁর ।  রাধাগোবিন্দ অবশ্য হাল ছাড়েননি কোনো দিনই।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের কারিগরি দিক, বই লেখা ও রোগী দেখার কাজে যেমন তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে গিয়েছেন, তেমনই স্কুল স্থাপনের অর্থ সংগ্রহের জন্যও চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি ।

চিকিৎসক রীতম জোয়ারদারের লেখা প্রবন্ধ, ‘ডক্টর রাধাগোবিন্দ কর: আ ফিলানথ্রপিস্ট অ্যান্ড পায়োনিয়ার ইন মেডিক্যাল এডুকেশন’ থেকে জানা যায় যে, হাসপাতাল তৈরির অর্থ সংগ্রহের জন্য ডাক্তার বন্ধু শৈলেন গুপ্তকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান বাড়ি, ধনী পরিবারের বিয়েবাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন রাধাগোবিন্দ কর। শত অপমান সহ্য করেও তিনি হাসপাতাল তৈরির স্বপ্ন সার্থক করার জন্য নির্দ্বিধায় অর্থ সাহায্য চাইতেন।

উপার্জিত অর্থের সমস্তটাই দান করে গিয়েছেন

মেডিক্যাল স্কুল ও হাসপাতাল স্থাপনে

শুধু তাই নয়, চিকিৎসক হিসেবে উপার্জিত অর্থের সমস্তটাই দান করে গিয়েছেন মেডিক্যাল স্কুল ও হাসপাতাল স্থাপনে। অরুণকুমার চক্রবর্তীর ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানে বাঙালি’, বইটি থেকে জানা যায়, মৃত্যুর সময়ে রাধাগোবিন্দ করের নিজস্ব সম্পত্তি বলতে কিছুই ছিল না, শুধুমাত্র বেলগাছিয়ার একটি বাড়ি ব্যাতিত ।

যদিও বাড়িটিও তিনি দান করে যান মেডিক্যাল কলেজকে। উইলের কেবল একটিই মাত্র শর্ত ছিল, তাঁর মৃত্যুর পরে জীবিতাবস্থায় বাড়িটির মালিকানা পাবেন তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রী এবং যাঁর মৃত্যুর পরে দুর্গাদাস করের নামে স্থাপিত হবে ‘দুর্গাদাস আরোগ্য নিকেতন’ ।

তাঁর আরও একটি গুন ছিলো তিনি দুর্দান্ত ভাল সংস্কৃত জানতেন এবং সেই জ্ঞান তাঁকে দেশীয় প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি পাঠে সাহায্য করেছিলো। বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালসের হয়ে ওষুধ তৈরিতেও তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ও অংশগ্রহণ দুই ছিলো।

ওষুধ তৈরির কাজেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকাঃ

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের আত্মজীবনী ‘লাইফ অ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্সেস অব আ বেঙ্গল কেমিস্ট’ থেকে জানা যায়, দেশের প্রথম ফামার্সিউটিক্যাল সংস্থা তৈরির সময়ে রাধাগোবিন্দ করের করা আর্থিক সাহায্য ও উৎপাদনগত পরামর্শের কথা।

তিনি বুঝেছিলেন যে, দেশের মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তোলা, চিকিৎসক তৈরি করা, মেডিক্যাল স্কুল স্থাপন ও বই লেখাই যথেষ্ট নয়; ওষুধও প্রয়োজন ! সেই কারণে রোগীকে যাতে চড়া দামে বিদেশি ওষুধ কিনতে না হয়, সে দিকেও সজাগ দৃষ্টি ছিলো তাঁর l সেই প্রয়োজন উপলব্ধি করেই দেশীয় পদ্ধতিতে ওষুধ তৈরির কাজেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন রাধা গোবিন্দ কর।

প্রদীপ-কে নিভতেই হয় !

১৯১৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়ে 66 বছর বয়সে, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রাধাগোবিন্দ কর। এই প্রখ্যাত চিকিৎসকের মৃত্যুর পরে কেটে গিয়েছে এক শতাব্দীরও বেশি । সাধারণ জনমানসে তাঁর এই কর্মকান্ড এবং লড়াই এর কথা পৌঁছায়নি ।

তাঁর কাজের সুফল আজও আমরা সকলেই ভোগ করছি । আসলে কিংবদন্তিরা বুঝি এই রকমই হন ! বঙ্গ সমাজে তাঁর অনবদ্য অবদান এবং অসামান্য কর্মযজ্ঞ থেকে নির্দ্বিধায় বলা যায় , উনিশ শতকের বাংলায় চিকিৎসা ও বিজ্ঞান আন্দোলনের পুরোধা ব্যাক্তিত্ব তিনিই ! প্রকৃত অর্থেই বাংলার নবজাগরণের একজন প্রাণপুরুষ হলেন আর.জি.কর

লেখকঃ সৌভিক রায়

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 2

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

বিজ্ঞানী ল্যামার্ক

5 (2) বিবর্তন , জীববিদ্যার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ যা জীবের উৎপত্তির এক অন্যতম কারণ ! বিবর্তন শুনলেই আমাদের মাথায় যে দুটি নাম আসে তাঁদের মধ্যে এক জন হলেন ল্যামার্ক ; জ্যা ব্যাপ্তিষ্ট পিয়ের এন্টোনি দ্য মনেট চেভেলেরিয়ার দ্য ল্যামার্ক ! যিনি ল্যামার্ক (Jean-Baptiste Lamarck) নামেই জগৎ বিখ্যাত । কে ছিলেন […]
ল্যামার্ক-Lamarck
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: