বিজ্ঞানী ল্যামার্ক

poribes news
3
(2)

বিবর্তন , জীববিদ্যার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ যা জীবের উৎপত্তির এক অন্যতম কারণ ! বিবর্তন শুনলেই আমাদের মাথায় যে দুটি নাম আসে তাঁদের মধ্যে এক জন হলেন ল্যামার্ক ; জ্যা ব্যাপ্তিষ্ট পিয়ের এন্টোনি দ্য মনেট চেভেলেরিয়ার দ্য ল্যামার্ক ! যিনি ল্যামার্ক (Jean-Baptiste Lamarck) নামেই জগৎ বিখ্যাত ।

কে ছিলেন ল্যামার্ক ?

তাঁর একাধিক পরিচয় একাধারে তিনি প্রখ্যাত ফরাসি সৈনিক, প্রকৃতিবিদ এবং শিক্ষাবিদ ।
প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসারেই বিবর্তন ঘটেছে, এই মতবাদের প্রথম প্রস্তাবকারীদের মধ্যে তিনি অন্যতম।

ল্যামার্ক-Lamarck
ল্যামার্ক-Lamarck

বিবর্তন সংক্রান্ত ধারণার তিনিই ছিলেন পথিকৃৎ ! তাঁর প্রস্তাবিত অর্জিত বৈশিষ্টের বংশানুসরণ তত্ব ছিলো বিবর্তনের ভিত্তিপ্রস্থ স্থাপনকারী একটি মতবাদ ।

জন্মঃ

ল্যামার্ক ১লা আগস্ট, ১৭৪৪ সালে উত্তর ফ্রান্সের বাইজেন্টাইনে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন,

ফ্রান্সের পিকার্দি-তে এক দরিদ্র সৈনিক পরিবারের একাদশ সন্তান হিসেবে তার জন্ম হয় ।

শিক্ষাঃ

১৭৫০ সালে পারিবারিক আর্থিক অবস্থার জন্য তাঁকে একটি জেসুইট কলেজে পড়তে বাধ্য করা হয়েছিল ।

সেনাবাহিনীতে যোগদানঃ

১৭৬০ সালে বাবার মৃত্যুর পর তিনি সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার মৃত্যু হয় যুদ্ধ ক্ষেত্রে এবং তাঁর অন্য দুই ভাইও সেনা বাহিনীতেই নিযুক্ত ছিলেন ,

ল্যামার্কের ছোটবেলার ইচ্ছা ছিলো সেনা বাহিনীতে যুক্ত হওয়া । এই কারণেই তিনি ঘোড়া চালানো এবং অসিযুদ্ধ শিখেছিলেন এবং ফ্রান্স সেনা দলে যুক্ত হন ; সেনাবাহিনী তখন জার্মানিতে নিযুক্ত ছিল !

১৭৫৭ সাল থেকে ১৭৬১সাল পর্যন্ত  চলা প্রুশিয়ার বিরুদ্ধে সংঘটিত পমেরানীয় যুদ্ধে তিনি অংশ নেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে অসীম সাহসিকতা প্রদর্শনের স্বীকৃতিস্বরূপ সন্মাননা হিসেবে কমিশন লাভ করেন ।

এরপর তাঁর পদোন্নতি হয় ,সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তিনি মোনাকোতে  চলে আসেন ।

সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসরঃ

মোনাকোতে অবস্থানকালে তিনি আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে প্রাকৃতিক ইতিহাস বিষয়ক অধ্যয়নে আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান সংক্রান্ত পঠনপাঠনের শুরু করেন । এই সময় তিনি বছরে ৪০০ ফ্রান্স পেনশন পেতে যা তাঁর জীবন ধরণের জন্য পর্যাপ্ত ছিলো না ; তাই চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যয়নের সাথে সাথেই উপার্জনের জন্য ব্যাংকে চাকরি করতেন ।

উদ্ভিদবিজ্ঞান শিক্ষা

উদ্ভিদবিজ্ঞানে বিশেষ আগ্রহ ছিল তার। এ কারণেই বের্নার দ্য জুসিও (Bernard de Jussieu)-র কাছে প্রায় ১০ বছর উদ্ভিদবিজ্ঞান শিক্ষা করেছিলেন। প্রাথমিক পর্যায়ে কোশ তত্ত্ব বিষয়ক সবচেয়ে প্রভাবশালী অবদানকারীদের মধ্যে তিনি অন্যতম ছিলেন । ১৭৭৬ সালে তাঁর প্রথম বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রায় এক দশক তিনি ফ্রান্স বিভিন্ন প্রকারের ফ্লোরা নিয়ে কাজ করেছিলেন ।

“Flore Français” নামে প্রথম বই প্রকাশঃ

১৭৭৮ সালে ল্যামার্কাঁর পর্যবেক্ষণ এবং অনুসন্ধানের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে ফ্লর ফ্রঁসে (Flore Français) নামে একটি তিন খণ্ড বিশিষ্ট একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন এবং এরপর ১৭৭৯ সালে তিনি আকাদেমি দে সিয়ঁস (Académie des sciences) তথা ফরাসি বিজ্ঞান একাডেমির সদস্যপদ লাভ করেন । এই একাডেমির সদস্যপদ লাভে তাকে সহায়তা করেছিলেন জর্জ-লুই ল্যক্লের, কোঁত দ্য বুফোঁ ।

এই গ্রন্থই তাঁকে প্রথম পরিচিতি দেয় এবং ফ্রান্সে একজন বিজ্ঞানী হিসেবে এটাই ছিলো তাঁর আত্মপ্রকাশের মঞ্চ । ১৭৭৮ সালের আগস্টেই তাঁর প্রথম বিবাহ হয়েছিল এবং ২২ শে এপ্রিল ১৭৮১ সালে তিনি এক পুত্র সন্তানের পিতা হন l রয়্যাল বোটানিস্ট নির্বাচিত হন

উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রধানঃ

লামার্ক জার্‌দাঁ দে প্লঁত (Jardin des Plantes)-এর কাজে জড়িয়ে পড়েন এবং ১৭৮৮ সালে তাকে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান নিযুক্ত করা হয় । ১৭৮১সালে তিনি রয়্যাল বোটানিস্ট নির্বাচিত হন এবং কাজের সূত্রেই বিশ্বের বিভিন্ন জায়গার বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং মিউজিয়াম গুলিতে ঘুরতে শুরু করেন । প্রায় দুই বছর বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করে তাঁর জ্ঞান ভান্ডার সমৃদ্ধ হয় এবং সেই সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বিভিন্ন লুপ্ত প্রায় উদ্ভিদ সংগ্রহ করতে শুরু করেছিলেন এবং যে সব গাছ সাধারণত ফ্রান্সে পাওয়া যায় না সেগুলিও তিনি সংগ্রহ করেন ।

প্রাণি বিজ্ঞানের অধ্যাপক হনঃ

১৭৯৩ সালে মুজেয়াঁ নাসিওনাল দিস্তোয়ার নাতুরেল (Muséum national d’histoire naturelle) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি সেখানে প্রাণি বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে তাঁর কর্ম জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু করেন । ল্যামার্ক তিনটি বিবাহ করছিলেন এবং ১৭৮৬ সালে তিনি দ্বিতীয়বার পুত্র সন্তানের পিতা হন । ১৭৮৮ সালে তিনি রয়্যাল গার্ডেনের হার্বেরিয়াম সংরক্ষকও হিসেবে কাজ করেন ।

অমেরুদন্ডী বিভাগে অধ্যাপনা শুরু করেনঃ

১৭৯০ সালে ফরাসি বিপ্লবের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়্যাল গার্ডেনের নাম পরিবর্তন করা হয় এবং জার্ডিন ডে’স প্ল্যানটিস রাখা হয় । প্রায় পাঁচ বছর হার্বেরিয়াম সংরক্ষকের দায়িত্ব সামলানোর পরে, তিনি ন্যাশনাল ডি’ হিসটোইরি ন্যাচারিলি মিউজিয়ামের কিউরেটর পদে আসীন হন এবং প্রাণীবিদ্যার অমেরুদন্ডী বিভাগে অধ্যাপনা শুরু করেন ।

গবেষণা পত্র প্রকাশঃ

ছয় বছরের অধ্যাপনা জীবনে ল্যামার্ক কেবল মাত্র একটি গবেষণা পত্র প্রকাশ করেছিলেন , ১৭৯৮ সালে প্রকাশিত এই গবেষণা পত্রটির বিষয় বস্তু ছিল “পৃথিবীর জলবায়ুর উপর চাঁদের প্রভাব” প্রথমে তাঁর ধারণা ছিলো একেবারে সনাতনী পন্থার বিজ্ঞানীদের মতোই , যে প্রজাতির কোনো পরিবর্তন হয়ই না কিন্তু ফ্রান্স বেসিনে মোলাস্কাদের উপর পর্যবেক্ষণ চালানোর পর ; তাঁর ধারণা বদলে যায় !

সর্বপ্রথম বিবর্তন সম্পর্কে  ধারণা প্রদানঃ

তিনি ১৮০০ সালের ১১ই মে সর্বপ্রথম বিবর্তন সম্পর্কে তাঁর ধারণা নিয়ে মিউজিয়ামে একটি বক্তৃতা করেন । এর ঠিক এক বছর পরে অর্থাৎ ১৮০১ সালে লামার্ক সিস্তেম দে আনিমো সঁ ভের্তেব্র (Système des Animaux sans Vertebres) নামক একটি বই প্রকাশ করেন যার বিষয়বস্তু ছিল অমেরুদণ্ডী প্রাণীর শ্রেণীবিন্যাস ।

ল্যামার্ক-Lamarck
ল্যামার্ক-Lamarck

“biology” নামটির প্রথম ব্যাবহারঃ

১৮০২ সালের হাইড্রোজিওলজি সংক্রান্ত একটি প্রকাশনায় তিনি জীববিজ্ঞানের জন্য “biology” নামটি ব্যবহার করেন । মনে করা হয় যে ; আধুনিক পরিপ্রেক্ষিতে এই শব্দের ব্যবহার এখানেই প্রথম করা হয়েছিল ।

পরবর্তী জীবনে ল্যামার্ক অমেরুদণ্ডী প্রাণিবিদ্যার গবেষক ও অধ্যাপক হিসেবে অতিবাহিত করেছিলেন । ১৮০৯ সালে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “ফিলোজফিক জুওলজি” প্রকাশিত হয় যা তাঁর সারাজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয় ।

ল্যামার্কবাদ তত্ত্ব

তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত তাঁর লামার্কবাদ তত্বের জন্য যা বিবর্তনের প্রাথমিক ধারণা প্রদান করে ।একে “অর্জিত বৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার” তত্ত্বও বলা হয় । চার্লস ডারউইনের পূর্ব পর্যন্ত সব প্রাকৃতিক ইতিহাসবিদই তাঁর তত্ত্বকে মেনে নিয়েছিলেন। তাঁর মতবাদের মধ্যেই বিবর্তন ও পরিবেশ পারস্পরিক সম্পর্কের তত্ত্ব নিহিত ছিলো ।

লামার্কবাদ এ কি বলা আছে

তাঁর মতবাদে বলা হয়েছে, একটি জটিলীকরণ প্রক্রিয়া জীবকূলকে ক্রমান্বয়ে জটিলতর করেছে এবং একটি দ্বিতীয় পারিপার্শ্বিক বল তাদেরকে স্থানীয় পরিবেশের সাথে অভিযোজিত করে তুলেছে । বৈশিষ্ট্যের ব্যবহার, অব্যবহার এবং এক জীবের সাথে অন্য জীবের পার্থক্য করে দেওয়ার মাধ্যমে এই পারিপার্শ্বিক বল কাজ করেছে ।

সাধারণভাবে বলতে গেলে, জীবের অঙ্গ ক্রমাগত ব্যবহারের ফলে সেগুলি শক্তিশালী হয় এবং যে অঙ্গগুলি অপেক্ষাকৃত কম ব্যবহৃত হয় সেগুলি লুপ্ত হয়ে যায় যা সম্পূর্ণ পরিবেশের প্রয়োজনীয়তার উপর নির্ভরশীল । একে ব্যবহার অব্যাবহারের সূত্র বলা l নিয়মিত ব্যবহারের ফলে যে অংশগুলি সুগঠিত হয় ,তাদেরই বংশানুসরণ ঘটে পরবর্তী প্রজন্মে – একেই অর্জিত বৈশিষ্টের বংশানুসারণ বলা হয়ে থাকে ।

ল্যামার্কের শেষ জীবনঃ

শেষ জীবনে ল্যামার্ক খুবই দারিদ্রের মধ্যে দিন যাপন করেন এবং আস্তে আস্তে তাঁর সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি চলে যায় এবং প্যারিসে ১৮ই ডিসেম্বর ১৮২৯ সালে তাঁর মৃত্যু হয় । সাধারণ একটি কবরস্থানে মন্ত্পর্ণাসি সিমেট্রিতে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয় মাত্র পাঁচ বছরের জন্য ! এর পর কবর খোঁড়া হয় ; তাঁকে পুনরায় সসম্মানে সমাধিস্থ করার জন্য যদিও তাঁর দেহাশেষ অচিরেই মাটির তলায় হারিয়ে যায় ।

ল্যামার্কের প্রতি সন্মান প্রদানঃ

জীববিদ্যায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ , ল্যামার্কের প্রতি সন্মান জানিয়ে জীববিদ্যার একাধিক প্রজাতির নামকরনে বা বিন্যাসবিধির নির্দিষ্টি ট্যাক্সন হিসেবে তাঁর নাম এবং তাঁর নামের অংশ ব্যবহার করা হয় । সংখ্যাতত্বের হিসেবে প্রায় ৫৮টি প্রাণী প্রজাতি, ১১৬টি উদ্ভিদ প্রজাতি এবং ১০৩ টি সামুদ্রিক জীব প্রজাতির নামে ল্যামার্কের  নামের অংশ রয়েছে ।

 লেখক: সৌভিক রায়

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 3 / 5. Vote count: 2

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভারতের পুষ্টি সমস্যা

3 (2) প্রত্যেক বছর ডিসেম্বর অক্সফোর্ড তাদের বিচারে একটি শব্দকে ওয়ার্ড অফ দ্যি ইয়ার অর্থাৎ বছরের সেরা শব্দ ঘোষণা করে,২০১৯ সালে “ক্লাইমেট ইমার্জেন্সি(Climate Emergency)” শব্দটি সেরা শব্দ মনোনীত হয়েছে ! জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্ব উষ্ণায়ন ক্রমাগত আমাদের খাদ্য এবং পুষ্টি সুরক্ষা কে আঘাত করছে এবং এরফলেই আমাদের সমূহ ক্ষতি হচ্ছে […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: