ভাটনগর

Shanti-Swaroop-Bhatnagar

শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার , নামটা আমাদের সকলেরই চেনা প্রতিবছরই বিজ্ঞানের নতুন প্রতিভাদের এই সম্মানে ভূষিত করা হয় ।

গত বছর পেয়েছিলেন বারো জন তাঁর মধ্যে ছয় জন বঙ্গসন্তান, এই বছরও বারো জন প্রাপকের তালিকায় রয়েছে সাত জন বাঙালি ! বাঙালি বিজ্ঞানে বিজয়ের জয়গাঁথা লিখছে এই পুরস্করে যা শান্তিস্বরূপ ভাটনগরের নামে নামাঙ্কিত !

ভাটনগর হলেন ভারতীয় বিজ্ঞান আকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র , আজ বিশ্বের নানান দেশে তাঁর আবিষ্কৃত জিনিস গুলি নিয়ে গবেষণা চলছে।

ভারতীয় উপমহাদেশে তাঁকে ব্যাবহারিক রসায়নের জনক বলা যায় । বিজ্ঞান সাধনার পাশাপাশি তিনি ছিলেন মননশীল কবি, নাট্যকার এবং অভিনেতা ।

জন্ম :

১৮৯৪ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী অবিভক্ত পাঞ্জাবের ভেরী অঞ্চলে তাঁর জন্ম হয় এবং তাঁর শৈশব কাটে ওই স্থানেই ।

শিক্ষাজীবন :

তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়ে অবিভক্ত ভারতের লাহোরে, ভারতে পড়াশুনার পাঠ শেষ করে তিনি ছাত্রাবস্থায় দ্বিতীয় পর্যায়ে চলে যান লন্ডনে ।

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯১৯ সালে তিনি রসায়নের স্নাতকোত্তর এবং ১৯২১ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করলেন ।

কর্মজীবন :

ভারতে ফিরে এসে তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন, ১৯২১ সাল থেকে তাঁর অধ্যাপনা জীবন শুরু হয় ।

অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ছাত্র মহলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন,ভাটনগর ! তাঁর শিক্ষা প্রদানের এক নিজস্ব পদ্ধতি ছিলো ।

তিনি চার পাশের বিভিন্ন বস্তুর মধ্যে লুকিয়ে থাকা বিজ্ঞানের রহস্যগুলি হাতে কলমে খুঁজে দেখাতেন ছাত্রছাত্রীদের ।

শুধু রসায়ন নয়,অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীরাও রীতি মতো মুগ্ধ হয়ে তাঁর ক্লাস শুনতো ।

বেনারস থেকে কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি চলে আসেন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে।

তাঁর স্বপ্ন ছিলো পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় যেনো পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়দের তালিকায় স্থান করে নেয় ।

যুক্তরাজ্যের একটি শিল্পসংস্থায় কাজ করে উপার্জিত অর্থ প্রায় দেড় লক্ষ টাকা তিনি অনুদান হিসেবে দান করেছিলেন ।

১৯৪০ সালে তাঁকে “বোর্ড অফ সায়েন্টিফিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের ” ডিরেক্টর নির্বাচন করা হয়।

ব্রিটিশ ভারতে এটি ছিলো বিজ্ঞান গবেষণার একটি অগ্রগণ্য সংস্থা। পরবর্তীতে এই সংস্থাটিই ” কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ ” নামে পরিচিত হয় ।

বিজ্ঞানী ভাটনগর এর পাশাপাশি একাধিক প্রশাসনিক পদেরও দায়িত্ব সামলেছেন,তিনিই ছিলেন অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের প্রথম মহাসচিব ।

তিনি ইউ. জি. সি-র চেয়ারম্যান পদেও আসীন ছিলেন । এই সব প্রশাসনিক কাজ সামলেও তিনি নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে গেছেন , সাথে লেখা লেখি ও অভিনয়ও চলতো তাঁর ।

একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে তাঁর নাম ভারতের বিজ্ঞান গবেষণায় চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে কারণ, তিনি ভারতে বারোটি জাতীয় গবেষণাগার স্থাপন করেছিলেন ।

তাঁর কর্মজীবন কেটেছে পরাধীন ভারতে ; তাই বারবার তাঁকে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে।

ভারতীয়দের মধ্যে বিজ্ঞান চর্চা হোক – ব্রিটিশ এটা কথনোই চায়নি ,তিনি রীতি মতো লড়াই করে বিজ্ঞান চর্চার জন্য অনুমতি ও অর্থ আদায় করে আনতেন । তাঁর অনমনীয় মনোভাবের কাছে ব্রিটিশরাও পরাজিত হতেন ।

তিনি তাঁর উপার্জিত অর্থের অধিকাংশই পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করেছিলেন ।

তিনি ভারতে একটি আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরিকাঠামো তৈরী চেষ্টায় ব্রতী হয়েছিলেন।

একাধিকবার বিদেশযাত্রার ফলে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য সবার দেশের সাধারণ মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলতে হবে ।

বিজ্ঞান কে পরীক্ষাগারে আটকে রাখার পক্ষপাতি তিনি কোনো দিনই ছিলেন না ।

স্বাধীনতা উত্তর ভারতে তিনি একাধিকবার বিভিন্ন মন্ত্রকের সাথে যোগাযোগ করতেন বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য ।

প্রধানমন্ত্রী নেহেরু ছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক একজন রাষ্ট্রনেতা । তিনি এবং ভাটনগরের প্রতক্ষ্য সহযোগিতায় ভারতের বিজ্ঞান চর্চার এক নতুন অধ্যায় রচিত এবং ভারতের সুদীর্ঘ ইতিহাসে সংযোজিত হয় ।

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি গবেষণার কাজ করে গিয়েছেন ।

গবেষক ভাটনগর :

চুম্বক ও কোলয়েডীয় রসায়নে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য এবং আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত । তাঁর তত্বের উপর ভিত্তি করেই অ্যান্টি রাস্ট ক্লথ এবং ভার্নিশ আবিষ্কৃত হয় ।

রাসায়নিক আগুনের সাথে লড়াই করক সক্ষম ফোমও তাঁর শ্রমের ফসল, লুব্রিকেন্ট যা যন্ত্রাংশকে সচল রাখে ,সেই জিনিসও তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি ।

কাঁচের বিকল্প পদ্ধতি, ক্যাস্টর অয়েল নিষ্কাশিত করার পদ্ধতি এবং বর্জ্য থেকে প্লাষ্টিক তৈরির পদ্ধতিও তাঁর অনবদ্য আবিষ্কারের তালিকায় পড়ে ।

তিনি একাধিক যন্ত্রও আবিষ্কার করেছিলেন ; মোম কে গন্ধক শূন্য করার পদ্ধতি এবং কেরোসিন কে বিশুদ্ধ করে আলোক ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি করার প্রক্রিয়াও তিনিই উদ্ভাবন করেছিলেন ।

শিল্প রসায়নের ক্ষেত্রেও তিনি নতুন আবিষ্কারে মগ্ন ছিলেন।

প্রখ্যাত পদার্থবিদ কে. এন.মাথুর কে সঙ্গী করে তিনি ইন্টারফ্যারান্স তুলাদন্ড আবিষ্কার করেন যা বাণিজ্যিক ভাবে তৈরির দায়িত্ব নিয়েছিলো একটি ব্রিটিশ সংস্থা ।

তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় টাইটেনিয়াম এবং জিরকোনিয়ামের মতো ধাতু সম্পর্কে গবেষণার কেন্দ্র স্থাপিত হয় । তিনি ভারতে একাধিক তৈল শোধনাগার স্থাপনের প্রতক্ষ্য কারিগর ছিলেন ।

ভারতে কোথায় কোথায় তেল আকরিক পাওয়া যায় এই বিষয়ে তিনি সুদীর্ঘ অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন।

আজ পরমাণু শক্তিতে ভারতে যে বলীয়ান হয়েছে তার অন্তরালে যে সকল বিজ্ঞান সাধকদের নিরলস পরিশ্রম রয়েছে ,তাঁদেটি মধ্যে অন্যতম ছিলেন শান্তিস্বরূপ ভাটনগর ।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তিনি নানান সন্মান ও পুরস্কার পেয়েছেন এবং ১৯৪৩ সালে তাঁকে রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত করা হয় ।

তাঁরই স্মৃতিতে কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ প্রতিবছর তাঁর নামে নামাঙ্কিত পুরস্কার দিয়ে থাকে, নবীন প্রতিভা কে এই পুরস্কার প্রদান করা হয় ।

একটি তাম্র ফলক এবং এককালীন পাঁচ লক্ষ টাকা ও মাসিক পনেরো হাজার টাকা পুরস্কার স্বরূপ প্রদান করা হয় । এই ভাবে তিনি আজও শ্বাসত আধুনিক ভারতীয় বিজ্ঞানে ।
১৯৫৫ সালের ১লা জানুয়ারী ভারতীয় বিজ্ঞানের এই কিংবদন্তির জীবনাবসান হয় ।

 

 লেখক:সৌভিক রায়

Leave a Reply

%d bloggers like this: