পরিবেশ কর্মী সুমি সিকদার

বাংলার পরিবেশ  আন্দোলনের অন্যতম একজন নেত্রী হলেন শ্রীমতি সুমি সিকদার, যদিও তিনি তাঁর ডাক নাম রাই – নামেই বেশি পরিচিত । গত দশকের শেষ অর্ধের অন্যতম প্রধান বাংলার পরিবেশ আন্দোলন অর্থাৎ যশোর রোডের গাছ বাঁচাও আন্দোলনের তিনি ছিলেন প্রথম সারির পরিবেশ কর্মী – গাছেদের রক্ষার এক অতন্দ্র প্রহরী ।

তাঁর জন্ম হয় ১৯৮৪ সালের ৯ই মে উত্তর ২৪ পরগনার,বনগাঁ শহরে । তাঁর পিতা হলেন শ্রীযুক্ত সুবোধ সিকদার এবং মা শ্রীমতি মিনা সিকদার । স্থানীয় বিদ্যালয় থেকে স্কুল শিক্ষা সম্পূর্ণ হওয়ার পর তিনি গোবরডাঙ্গা হিন্দু কলেজ থেকে স্নাতক হন । এরপর উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে সংস্কৃত সাহিত্য শিক্ষা নিকেতন থেকে সংস্কৃত ভাষায় তিনি স্নাতকোত্তর সম্পূর্ণ করেন । পেশাগত ভাবে তিনি স্বনিযুক্ত । এর পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনেও সক্রিয় ভাবে যুক্ত থেকেছেন ।

তাঁর বাড়ি যশোর রোডের অনতিদূরে,নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে রাস্তার ধারে ২০-২৫ মিটারের মধ্যেই,ফলত তাঁর বেড়ে ওঠা ওই সব শতবর্ষী গাছেদের সাথেই,তাদের সাথেই শৈশব থেকে বড়ো হয়ে ওঠা । স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর গাছেদের প্রতি এক আত্মিক বন্ধনের সৃষ্টি হয় । ২০১৭ সাল নাগাদ তিনি অন্য সকলের মতোই একদিন খবর পান যে, এই ঐতিহাসিক গাছ গুলি রাস্তার সম্প্রসারণের জন্য কাটা পড়বে । গাছেদের এই খবর  হত্যা ব্যথিত করে তাঁকে । তিনি যোগ দেন একটি প্রতিবাদী সভায়,যার মূল উদ্দেশ্য ছিলো এই নির্বিচারে গাছেদের হত্যালীলা বন্ধ করা । ওই পথসভা থেকে তিনি সক্রিয় যুক্ত হয়ে পড়েন ঐতিহাসিক যশোর রোডের গাছ বাঁচাও আন্দোলনে ।

এ পি ডি আর নামে এককটি সংস্থা আন্দোলন করছিলো তার সাথে সাথে আন্দোলনে যুক্ত হতে শুরু করেন বহু মানুষ,বিভিন্ন কৃত মেধাবী সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ জন এবং প্রচুর সংখ্যায় ছাত্র যুব তরুণেরা l শুরু হয় গাছেদের রক্ষা করার সক্রিয় প্রত্যক্ষ সংগ্রাম । এই লড়াই তে তাঁদের হাতিয়ার ছিলো গাছেদের ব্যথায় হাঁটা,একবার নয় একাধিক বার তাঁরা হেঁটেছেন,সরব হয়েছেন গাছেদের জন্য । যার মধ্যে দীর্ঘ ৫৩ কিলোমিটার ব্যাপী বারাসাত থেকে বনগাঁ পর্যন্ত পদযাত্রা ছিলো অন্যতম । এই পদযাত্রার পুররোভাগে তিনি সক্রিয় ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং এই পদযাত্রাই অনুঘটকের মতো কাজ করে আন্দোলনের বিস্তারে । তিনি যশোর রোড গাছ বাঁচাও কোর কমিটির এক জন সদস্যা হিসেবে দায়িত্বভার সামলেছেন ।

যশোর রোডের নিকটে বাড়ি হওয়ার কারণে অনেক সময় গাছেদের উপর আক্রমণে তাঁকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হয়েছে,একাধিকবার তিনি দায়িত্ববান পরিবেশ কর্মী হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে থেকেও গাছেদের প্রহরীর মতো কাজ করে গেছেন ।তাঁরা পরবর্তীতে মহামান্য বিচারালয়ের দ্বারস্থ হন, ২০২০ সালে এখনো পর্যন্ত মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে স্থগিতাদেশে বন্ধ রয়েছে যশোর রোডের শতাব্দী প্রাচীন গাছেদের হত্যালীলা ।

এছাড়াও বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের পরিবেশ আন্দোলনে তিনি যুক্ত থেকেছেন । ২০১৮ সালের নদিয়ার শান্তিপুরে ডিজে নামক শব্দ দানবের বিরুদ্ধে আন্দোলনেও তিনি যুক্ত থেকেছেন, শান্তিপুর থেকে রানাঘাট প্রায় ২০ কিলোমিটার তাঁরা পদযাত্রার মাধ্যমে অতিক্রম করে এসে SDO সাহেব কে শব্দ দূষণ বিষয়ক একটি ডেপুটেশন দেন । তাঁদের এই আন্দোলন মানুষের সার্বিক চেতনার বৃদ্ধি ঘটায় । এর পাশাপাশি তিনি ব্যারাকপুরে পরিবেশ বান্ধব মঞ্চের আয়োজিত গ্রীন কর্নার শীর্ষক অনুষ্ঠান গুলিতেও নিয়মিত যুক্ত থাকেন ।

২০১৮ সালের The green walk পন্থী ভাবধারার পরিবেশকর্মীরা আয়োজন করে এক ঐতিহাসিক পরিবেশের জন্য পদযাত্রা, পাহাড় থেকে সাগরদ্বীপ পর্যন্ত তাঁরা প্রায় ১০৭৫ কিমি পথ অতিক্রম করেন । পরিবেশের জন্য এই হাঁটাতে অগুনিত পরিবেশ কর্মীদের সঙ্গে শ্রীমতি সুমি সিকদারও পা মেলান । পরবর্তীতে তিনি green walk আয়োজিত একাধিক পদযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন,তার লাটাগুড়ি জঙ্গল বাঁচানোর জন্য,লালগড়,শান্তিনিকেতনের কোপাই নদীর জন্য হাঁটা বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য ।

তিনি নিজে বনগাঁর একটি পরিবেশ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত,যা বনগাঁ গ্রীন ওয়েভ নামে পরিচিত । ২০১১ সাল থেকে শুরু হওয়া এই সংগঠনটি প্রায় এক দশক ধরে পরিবেশের জন্য কাজ করে চলেছে । সচেতনতা মূলক বিভিন্ন কর্মসূচি তাঁরা ধারাবাহিক ভাবে পালন করে আসছেন । সাপ উদ্ধার তাঁরা বিশেষ মুন্সিয়ানার সাথে করে থাকেন,তাঁদের সংগঠনের নেতৃত্বে বিগত কয়েক বছর বনগাঁ ও সংলগ্ন অঞ্চল থেকে তাঁরা বহু সাপ জীবন্ত উদ্ধার করেছেন ।ফলে রক্ষা পেয়েছে বহু সরীসৃপ এবং সর্বোপরি সমৃদ্ধ হয়েছে জীব বৈচিত্র । এছাড়াও তাঁরা বাঘরোল রক্ষা করার ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন l বাগদা পদ্মপুকুর অঞ্চল টি একটি ভেরী সমৃদ্ধ এলাকা,প্রচুর মৎসজীবি মানুষের বাস সেখানে,ঐখানেই প্রচুর বাঘরোল পাওয়া যায় কিন্তু বাঘ সন্দেহে তারা আক্রমণের শিকার হয় । সুমি সিকদারদের এই সংগঠন ওই অঞ্চলে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি করে,বন্যপ্রাণ সংরক্ষনের উদ্যোগ নিয়েছেন,যার সুফল হিসেবে ওই অঞ্চলে বাঘরোলের সংখ্যা বেড়েছে l ২০২০ সালের covid আবহে ৪টি বাঘরোল শাবকের জন্ম হয়েছে l তাঁরা বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে ২০২০ সালের ৫ই জুন প্রায় ১০০০০ গাছের চারা রোপনের কর্মসূচি নিয়েছিলেন যা অনেক অধিক সংখ্যক চারা গাছ তাঁরা ৪-৫ দিনেই রোপন করতে পেরেছেন । এছাড়াও তাঁরা প্রতিবছর সবুজ সৈনিক সন্মান প্রদানের মাধ্যমে একজন করে পরিবেশ যোদ্ধাকে সম্মানিত করেন ।

ভারতীয় উপমহাদেশের পরিবেশ আন্দোলনের সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে,কয়েক শতাব্দী পূর্বে অমৃতা দেবী প্রথম সরব হন গাছেদের রক্ষা করতে যা ছিলো চিপকোর মতো আন্দোলনের পূর্বসূরি । সেই ধারা আজও অক্ষত রেখেছেন সুমি সিকদারেরা, যে নারী নেতৃত্ব থেকে ভারতের পরিবেশে আন্দোলনের সূত্রপাত সেই রকমই নির্ভীক নির্ভরযোগ্য  নারী নেতৃত্বের হাতে ন্যস্ত রয়েছে বর্তমান আন্দোলনের দায় ভার ।

 

 

লেখক

সৌভিক রায়

ভারতীয় উপ মহাদেশের পরিবেশ আন্দোলনের গবেষক ও লেখক
পরিবেশ আন্দোলন নিয়ে আপনার আরো তথ্য দেওয়ার থাকলে আমাদের জানান । Mail – poribesnews@gmail.com

পরিবেশ আন্দোলন গবেষণা পরিষদ

 

Published by @

পরিবেশ, পরিবেশ আন্দোলন, দূষণ, গাছ, নদী, পাহাড়, সাগর

Leave a Reply

%d bloggers like this: