ভারতে বিজ্ঞানে প্রথম মহিলা ডক্টরেট অসীমা চট্টোপাধ্যায়

1
5
(2)
ভারতে বিজ্ঞানে প্রথম মহিলা ডক্টরেট অসীমা চট্টোপাধ্যায় । ১৯৪৪ সালে তিনি জৈব রসায়নে পিএইচডি করেন। রসায়ন ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য দেশের বিজ্ঞানী মহলে তিনি আজও সমাদৃত।
ভিনকা অ্যালকালয়েডের গবেষণা ও কুষ্ঠ, ম্যালেরিয়া রোধী ওষুধ আবিষ্কারের ক্ষেত্রে তাঁর অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে ভারতীয় বিজ্ঞানী মহল। এই ভিনকা অ্যালকালয়েড এখন কেমোথেরাপিতে ব্যবহার হয়।
এই জৈব যৌগটি ক্যানসার কোষের বাড়বাড়ন্ত কমায়। বিজ্ঞানে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাঁকে দেওয়া হয় ‘পদ্মভূষণ’ সম্মানও।
জৈব রসায়নে অসীমাদেবীর অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বর্ধমান জেলায় তিনি জন্মাননি বা তাঁর কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও বর্ধমানের তেমন যোগ ছিল না৷ কিন্ত বর্ধমানের সঙ্গে বিজ্ঞানী অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের যোগসূত্র হল বিবাহসূত্রে তিনি ছিলেন বর্ধমানের বধূ ৷
বর্ধমান জেলারই এক কৃতী সন্তান বরদানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়েছিল ৷ সে হিসেবে বর্ধমান জেলার সঙ্গে তাঁর যোগ তো ছিলই৷

জন্মঃ

অসীমা চট্টোপাধ্যায় জন্মেছিলেন কলকাতায় ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ সেপ্টেম্বর৷
বাবা চিকিৎসক ইন্দ্রনারায়ণ মুখোপাধ্যায় কলকাতায় থাকলেও তাঁরা আদতে ছিলেন হুগলির হরিপালের বাসিন্দা৷

শিক্ষাঃ

স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে স্নাতক অত্যন্ত মেধাবী এই ছাত্রী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জৈব রসায়ন বিষয়ে ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন৷
রক্ষণশীল হিন্দু পরিবারের কন্যা ছেলেদের সঙ্গে কলেজে পড়বে এই বিষয়ে বাবা -মাকে বাদ দিয়ে পরিবারের অন্যান্য বড়দের ঘোর আপত্তি ছিল ৷
কিন্তু তাঁর মা কমলাদেবী কোনও আপত্তিই মানেননি, মেয়েকে ছেলেদের সাথে কলেজে পড়াতে৷ মেয়েকে সব দিক থেকে পারদর্শী করে গড়ে তুলতে কোনও দিকে খামতি রাখেননি ।
বাবা -মা প্রাচীন সাহিত্য পড়ে জ্ঞান লাভের জন্য সংস্কৃত শিখিয়েছিলেন মেয়েকে ৷ উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে ১৪ বছর তালিম নিয়েছিলেন অসীমা চট্টোপাধ্যায়৷

শিক্ষকতাঃ

১৯৪০ সালে কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন অসীমাদেবী। আর সেই থেকেই ওই কলেজে চালু হয় রসায়ন বিভাগ।
লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে রসায়ন বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা -প্রধান ছিলেন তিনিই ৷ গবেষণা করেছিলেন উদ্ভিদ রসায়ন এবং কৃত্রিম জৈব রসায়ন বিষয়ে ৷ তিনিই প্রথম মহিলা যিনি রসায়ন শাস্ত্রে কোনও ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিএসসি ডিগ্রি পান ১৯৪৪ সালে ৷
ওই বছরই তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে সাম্মানিক শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ৷ ১৯৪৭ -এ তিনি প্রথমবার আমেরিকা যান গবেষণার কাজে ৷
এ -সময় তিনি দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন গভর্নেস সহ তাঁর এগারো মাসের কন্যা জুলিকে সঙ্গে নিয়ে আমেরিকায় যেতে ৷
সেখানেই তিনি রামকৃষ্ণ মিশনের সংস্পর্শে আসেন ৷ এ দেশেও আমৃত্যু জড়িয়েছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৷ তিনি গবেষণা করেছেন ইউনির্ভাসিটি অব উইসকন্সিন , ম্যাডিসন ও ক্যালটেক থেকে ৷
দেশে ফিরে ১৯৫৪ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন৷

ক্যান্সার নিরাময় বিষয়ে কাজঃ

ক্যান্সার নিরাময় বিষয়ে বিশ্ববিশ্রীত বিজ্ঞানী লাইনাস পাওলিং একসময় সারা পৃথিবীতে সাড়া ফেলেছিলেন ৷ নিয়ম করে ভিটামিন সি খাবার খুব সহজ পরামর্শ ছিল তাঁর ৷ বিতর্কও হয়েছিল এ -বিষয়ে ৷
১৯৭৯ সালে তিনি ‘ক্যান্সার অ্যান্ড ভিটামিন সি ’ শীর্ষক একটি বই লিখেছিলেন৷ ক্যান্সার নিরাময় বিষয়ে কাজ করেছিলেন অসীমা চট্টোপাধ্যায়ও ৷
১৯৫৩ সালের ৭ জুলাই তিনি চিঠি লিখে সর্পগন্ধার অ্যালকালয়েড বা উপক্ষারের এক্স -রে বিশ্লেষণগত ফলাফল বিষয়ে পরামর্শ চান পাওলিং -এর কাছে৷
শিক্ষা এবং কর্মসূত্রে পেয়েছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় , মেঘনাদ সাহা প্রমুখ ভারতসেরা বিজ্ঞানীদের ৷
ভারতীয় বনৌষধি নিয়ে গবেষণা তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছিল৷
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত ‘ভারতীয় বনৌষধি ’ শীর্ষক ছ’টি গ্রন্থের পরিমার্জন ও সম্পাদনা করেন তিনি৷
অসীমা চট্টোপাধ্যায় সত্যেশচন্দ্র পাকড়াশির সঙ্গে যৌথভাবে রচনা করেন ‘দ্য ট্রিটিজ অব ইন্ডিয়ান মেডিসিন্যাল প্ল্যান্টস ’ শীর্ষক গ্রন্থ৷
Treatise on Indian Medicinal Plants - 6 Volumes by Asima Chatterjee at Vedic Books
তাঁরই প্রচেষ্টায় সল্টলেকে গড়ে ওঠে আয়ুর্বেদ গবেষণা কেন্দ্র ৷
সব কাজে উত্সাহ পেয়েছিলেন বাবা -স্বামীর কাছ থেকে , পাশে পেয়েছিলেন প্রখ্যাত চিকিত্সক ভাই সরসীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়কে ৷

বহু সম্মানে ভূষিতঃ

নিজস্ব ক্ষেত্রে শান্তিস্বরূপ ভাটনগর -সহ বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি ৷
১৯৭৫ সালে পান পদ্মভূষণ৷
ওই বছরই তিনি প্রথম মহিলা বিজ্ঞানী হিসেবে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের সাধারণ সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন৷
সাম্মানিক ডিএসসি উপাধি পান
বর্ধমান ,
কল্যাণী ,
বিদ্যাসাগর এবং
বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে৷ ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ তিনি ছিলেন রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত রাজ্যসভার সদস্য৷
কাছের মানুষদের তিনি বলতেন , ‘যতদিন বাঁচি ততদিন যেন শুধু কাজ করেই যাই৷
বাস্তবে তিনি আমৃত্যু কাজই করে গেছেন মানুষের কল্যাণে ৷ ৯০ বছর বয়সে ২২ নভেম্বর ২০০৬ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন৷
মহীয়সী বিজ্ঞানী অসীমা চট্টোপাধ্যায়কে প্রয়াণ দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই 🙏🙏

@ পঞ্চানন মণ্ডল       পঞ্চানন-মণ্ডল

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 2

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

One thought on “ভারতে বিজ্ঞানে প্রথম মহিলা ডক্টরেট অসীমা চট্টোপাধ্যায়

Leave a Reply

Next Post

বিজ্ঞানসাধক জগদীশচন্দ্র বসু

5 (2) বিজ্ঞানসাধক জগদীশচন্দ্র বসু ( ১৮৫৮ – ১৯৩৭) নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী স্যার নেভিল মট ১৯৭৭ সালে স্যার জগদীশচন্দ্র বসু সম্পর্কে বলেন,”জে সি বোস তার সময় অপেক্ষা ৬০ বছর এগিয়ে ছিলেন”। তাঁর প্রমাণ আমরা হাতেনাতে পেয়েছি। যেমন বর্তমানে চালু হওয়া 5G প্রযুক্তির ভিত্তি হলো জগদীশচন্দ্র বসুর গবেষণা। জগদীশ চন্দ্র যে গ্যালিলিও-নিউটনের […]
জগদীশ চন্দ্র বসু
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: