সবুজ হাইড্রোজেন শক্তির ব্যবহার কি বিপর্যস্ত পরিবেশ মোকাবিলার বাস্তব সমাধান? 

@
4
(4)

লোহিতসাগরের পাশে মরুভূমির কিনারা ঘেঁষে ৫০০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে নতুন এক শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে সৌদি প্রশাসন। ১০ লক্ষ মানুষ বসবাস করতে পারবে এই শহরে, শক্তির উৎস হবে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে “গ্রিন হাইড্রোজেন”। কিভাবে পাওয়া যাবে এই বিপুল হাইড্রোজেন?    

 সৌরশক্তি ও মরুভূমির উপর বয়ে যাওয়া বাতাসের বেগকে কাজে লাগিয়ে জলের তড়িৎ বিশ্লেষণ করে অক্সিজেনকে আলাদা করে বের করে আনা হবে হাইড্রোজেন। তৈরি হবে চার গিগাওয়াটের শক্তি-ঘর। এবং এরকম আরো বেশকিছু শক্তিঘর তৈরির চিন্তাভাবনা করছেন সৌদি- সরকার।

 বৃহৎ তেল কোম্পানিগুলো কি তাহলে জীবাশ্ম- জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহার থেকে সরে আসতে শুরু করেছে? অনেক বহুজাতিক কোম্পানি- বিনিয়োগকারী, সরকার ও পরিবেশবিদরা দাবি করছেন- হাইড্রোজেনকে শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করলে বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি কমবে। নিউইয়র্ক-এর Natural Resources Defense Council -এর শক্তি বিশেষজ্ঞ Rachel Fakhry বলছেন- “এটা বেশ সাড়া জাগানো প্রকল্প। বায়ু ও সৌরশক্তি যেখানে গৃহস্থালী ও বৈদ্যুতিক গাড়ির শক্তি যোগান দেয়, সেখানে গ্রীন হাইড্রোজেন বড় বড় উৎপাদন সংস্থার শক্তি যোগানোর ব্যবস্থা করতে পারে”। জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ গ্রীন হাইড্রোজেনের দিকে ঝুঁকছে। এই প্রসঙ্গে ইউরোপিয়ান কমিশনের বক্তব্য- ” কার্বন বিহীন অর্থনৈতিক জগতে গ্রীন হাইড্রোজেন হল পাজলের একটি মিসিং পার্ট”।

কেন বলা হচ্ছে গ্রিন হাইড্রোজেন? বর্তমানে প্রাকৃতিক গ্যাস মিথেন জলীয়-বাষ্পের সাথে বিক্রিয়া করে হাইড্রোজেন, কার্বন মনোক্সাইড ও কার্বন ডাই অক্সাইড তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত বাতাসে গ্রীন হাউস এফেক্ট বাড়িয়েই দেয়। কিন্তু পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তি দিয়ে তড়িৎ বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে প্রাপ্ত হাইড্রোজেনের শক্তিকে বলা হচ্ছে গ্রীন হাইড্রোজেন। তাই এই শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হলে সাথে সাথে অচিরাচরাত পুনর্ব্যবহারযগ্য শক্তির উৎস যেমন বায়ু শক্তি ও সৌর শক্তির ব্যবহার বাড়বে কয়েকগুণ। অর্থাৎ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমে বায়ুদূষণ কমবে ও পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে অনেকটা রাশ টেনে ধরা যাবে।

তাহলে কি জীবাশ্ম জ্বালানির আর দরকার হবে না?? আসলে বিষয়টা অত সহজ সরল নয়। প্রথমত: হাইড্রোজেন প্রকৃতিতে মুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় না। সুতরাং জল থেকে একে আলাদা করতে হলে প্রচুর শক্তির দরকার হবে, তা চিরাচরিত বা অচিরাচরিত যে উৎস থেকেই আসুক না কেন।

 দ্বিতীয়তঃ হাইড্রোজেন গ্যাসকে ষ্টোরেজ করতে হলে শূন্যের নিচে ২৫৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা ও ৭০০ বায়ুমণ্ডলীয় চাপের প্রয়োজন। কোথা থেকে আসবে এ বিপুল ব্যবস্থার বিশাল শক্তি?

 তৃতীয়তঃ অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় গ্রীন হাইড্রোজেন তৈরিও বেশ ব্যয়সাপেক্ষ। একটি উদাহরণ দিই- অস্ট্রেলিয়ার শক্তিমন্ত্রক একটি ২৬ গিগাওয়াটের গ্রীন হাইড্রোজেন প্রকল্পের সাহায্যে সিঙ্গাপুরে শক্তি সরবরাহের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। যার জন্য প্রয়োজন হবে বায়ু শক্তি চালিত বিশাল মাপের প্রায় দুই হাজার উইন্ড টার্বাইন ও তিরিশ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে সৌর প্যানেল।

পরিবেশের উপর সৌর শক্তির ক্ষতিকারক দিক 

 শুরুতেই বলে নেওয়া যাক, সূর্য থেকে বিকিরিত ফটোন কনা যখন অর্ধপরিবাহী সিলিকন বা জার্মেনিয়াম-এর ওপর পড়ে তখন অর্ধপরিবাহী থেকে ইলেকট্রনের স্রোত নির্গত হয় এবং তড়িৎ শক্তির জন্ম হয়। তাই এই প্রক্রিয়াকে বলে আলোক- তড়িৎ ক্রিয়া এবং ব্যবহৃত অর্ধপরিবাহীকে বলা হয় আলোক তড়িৎ কোষ বা ফটোভোলটাইক সেল। এইরকম অনেকগুলি কোষকে একসাথে যোগ করে তৈরি হয় একটি সোলার প্যানেল। সুতরাং সৌর শক্তির ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে গ্রীন হাউজ গ্যাস বাতাসে মিশে না। তাই একে ক্লিন ফুয়েল বলা হয়, আর সূর্যের শক্তিকে কিনতে পয়সাও খরচ করতে হয় না। 

কিন্তু অন্য একটা দিকও ভাবা দরকার। অর্ধপরিবাহী দিয়ে বড় বড় প্যানেল তৈরি করার সময় লাগে প্রচুর পরিমাণে ক্যাডমিয়াম এবং লেড যা আসলে পরিবেশকে দূষিতই করে। এছাড়া আছে গ্যালিয়াম- আর্সেনাইড; হাইড্রোক্লোরিক,সালফিউরিক ও নাইট্রিক অ্যাসিড; ট্রাইক্লরো ইথেন এবং অ্যাসিটোন। এরা বস্তুগত ভাবে দূষিত পদার্থ। বিষয়টা একটু ব্যাখ্যা করা যাক। সৌর প্যানেলের কার্যক্ষমতা শেষ হয়ে গেলে ধাতব পদার্থ জল, মাটি ও বাতাসকে ভয়ানকভাবে দূষিত করে। তাই আমেরিকার পরিবেশ দপ্তরের কড়া আইন অনুসারে- বিষাক্ত ধাতুগুলোকে যেখানে-সেখানে ফেলে না দিয়ে রিসাইক্লিং করা হয়। অন্যদিকে আবার চীন, মালেয়শিয়া, ফিলিপাইনস, তাইওয়ানের মতো দেশগুলোতে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ফটোভোলটাইক সেল উৎপাদিত হয় অথচ এইসব দেশে বিষাক্ত ধাতুগুলিকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য না করে দায়িত্বজ্ঞানহীন ভাবে ফেলে দেওয়া যায় যত্র তত্র। ফলে জল মাটি ও বাতাস দূষিত হয় ব্যাপক পরিমাণে। আসলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মোটিভ হল- মুনাফা, আরো মুনাফা। তাতে প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশ চুলোয় যাক- কুছ পরোয়া নেহি। সৌরশক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রচুর পরিমাণে জমি লাগে এবং বৃহৎ মাপের সৌর প্যানেল তৈরি ও উৎপন্ন বিদ্যুৎ শক্তিকে সঞ্চয় বা স্টোরেজ করার ক্ষেত্রে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ লাগে। 

তবুও আমরা বলব- তাপবিদ্যুৎ কারখানাগুলো কার্বন ডাই অক্সাইড সহ অন্যান্য গ্রীনহাউজ গ্যাস প্রচুর পরিমাণে বাতাসে মিশিয়ে দেয়। যার হাত ধরে বাড়ে বায়ুদূষণ ও পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা, সাথে বয়ে নিয়ে আসে ফুসফুস ও শ্বাসনালির হাজারো ব্যারাম। তাই অচিরাচরিত পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তি যেমন সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তি ব্যবহারের প্রযুক্তি আরোও উন্নত ও সহজ সরল করে খরচ অনেক কমানো যায়,  দক্ষতাও বাড়ানো যায় এবং পরিবেশ দূষণকে কমানো যায়।

সমাধান কোন পথে:

বিশ্বজুড়ে চলতে থাকা বড় মাপের পরিবেশ বিপর্যয়কে কি শুধুমাত্র এইসব প্রযুক্তি দিয়েই সমাধান করা যাবে, না কি ভাবতে হবে নতুন তারিখায়? সমাধান কি লুকিয়ে আছে অন্য কোনোখানে?? লেখকের মতে বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফার স্বার্থে কৃত্রিমভাবে চাহিদা তৈরি করে অপ্রয়োজনিয় অবৈজ্ঞনিক যত্তসব হাবিজাবি ভোগ্যপণ্যের ব্যবহার কমাতে হবে। পরিবর্তন আনতে হবে আমাদের অপ্রাকৃতিক খাদ্যাভাসেও। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে হবে যত দ্রুত সম্ভব যে কোন মূল্যে।  প্রকৃতি পরিবেশ নির্বিচারে ধ্বংস করে, জল জঙ্গল জমিন লুঠ করে ছিন্নমস্তা উন্নয়নের রথের রশিতে লাগাম পড়াতে হবে। প্রকৃতির সন্তান মানুষকে হতে হবে প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। প্রকৃতি ও পুঁজির দ্বন্দ্বকে গুরুত্ব সহকারে বিচার করতে হবে।

তথ্যসূত্র:

https://www.bbc.com/future/article/20201112-the-green-hydrogen-revolution-in-renewable-energy

https://ecavo.com/solar-energy-disadvantages/#:~:text=The%20environmental%20impacts%20associated%20with,materials%20in%20the%20manufacturing%20process

লেখক পরিচিতি:

সন্তোষ সেন 

বিজ্ঞান শিক্ষক, বিজ্ঞান ও পরিবেশ কর্মী।

মেইল আইডি:

santoshsen66@gmail.com 

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4 / 5. Vote count: 4

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

আসামের দেহিং পাটকাই কয়লা খনির ছাড়পত্র বনাম জল জঙ্গল জমিন লুঠের বন্দোবস্ত

4 (4) শুরুর কথা  করোনা অতিমারী  ও লকডাউন এর প্রভাবে এটা সকলের কাছে স্পষ্ট যে, যানবাহন কম থাকায়, কারখাণায় উৎপাদন প্রায় বন্ধ থাকায় এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কম হওয়ার কারণে প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশ নিজের স্বাভাবিক ছন্দ কিছুটা হলেও ফিরে পেয়েছে। বিজ্ঞানীরা বারবার সতর্কবার্তা শোনাচ্ছেন- এই নীল গ্রহে মানবসভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: