হাইজেনবার্গ ও কোয়ান্টাম বলবিদ্যা

@@
0
(0)
পরমাণুর ভিতরের কাণ্ডকারখানা বড় অদ্ভুত! এর ভিতরের চিত্রটা কিছুতেই বিজ্ঞানীদের কাছে পরিষ্কার হচ্ছিল না।
এত ক্ষুদ্র একটি পরমাণুর ভেতর কী করে এতগুলো ইলেকট্রন ঘুরপাক খায়, কিছুতেই তা মেলানো যাচ্ছিল না। হিসাব করে দেখা যায়, ইলেকট্রনগুলো আসলে শক্তি হারিয়ে নিউক্লিয়াসে পতিত হবে। ফলে পরমাণুর অস্তিত্ত্বই থাকবে না।
বোর ইলেকট্রনের ‘কোয়ান্টাম লাফের’ ধারণা এনে আপাতত একটা সমাধান দিলেও স্বয়ং আইনস্টাইন এই অদ্ভুত লাফালাফির ব্যাখ্যায় সায় দিলেন না ।উল্টে শ্রোডিঞ্জারের তরঙ্গের ব্যাখ্যা পেয়ে তার কিছুটা মেনে নিলেন । কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, কারও ব্যাখ্যাই আসলে পরমাণু সমস্যার নিষ্পত্তি করতে পারছে না।
১৯২৫ সালের জুন মাস। এমন উত্তেজনাকর এক বিকেলে শরীরে সামান্য জ্বর নিয়ে হাওয়া বদলের জন্য নিরিবিলি স্থান খুঁজছিলেন এক তরুণ বিজ্ঞানী। নাম ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ  ( Werner Karl Heisenberg)
জার্মানির উত্তর সমুদ্রপারের এক নির্জন দ্বীপ আছে, হেজল্যান্ড। হাইজেনবার্গ সেই দ্বীপের বেলাভূমিতে হাঁটছিলেন তিনি। বয়স তখন সবে ২৪। কিন্তু পরমাণুর অদ্ভুত সমস্যাটা তার মাথা থেকে যাচ্ছে না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পরমাণুর যে আচরণ দেখা যাচ্ছে, এ থেকে এটা স্পষ্ট পুরনো কোনো নিয়ম বা সমীকরণের সাহায্যে একে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
পরমাণুর এই অদ্ভুত আচরণের পেছনে রয়েছে সম্পূর্ণর্ নতুন কোনো নিয়ম। এসব ভাবতে ভাবতেই তার মনে হয়েছিল, পরমাণুর গণিতও সম্ভবত নতুন কোনো গণিত হবে! বিষয়টি একটু মিলিয়ে না দেখা পর্যন্ত তার সময় কাটছিল না।
ওইদিন রাতেই তিনি ইলেকট্রনের গতি ও ভরবেগ নিয়ে কিছু গণনা করতে বসে যান। তা করতে গিয়েই তার হৃৎস্পন্দন বন্ধ হওয়ার জোগাড়। তিনি দেখলেন, কোনো একটি মুহূর্তে একটি ইলেকট্রনের ‘অবস্থান’ এবং ‘গতিবেগ’ এই দুটি রাশিকে গুণ করলে যে ফল পাওয়া যায়, ‘গতিবেগ’ ও ‘অবস্থানকে গুণ করলে সেই ফলাফল পাওয়া যায় না। কিন্তু বীজগণিতে আমরা শিখে এসেছি, (৩×২) বা (২×৩) যা-ই লেখি না কেন, ফল একই।
কিন্তু ইলেকট্রনের ভর আর গতিবেগের ক্ষেত্রে এ নিয়ম আর চলছে না।
এই গণনার ভিত্তিতেই তিনি সমাধান করেন পরমাণু রহস্যের। প্রস্তাব করেন অনিশ্চয়তা নীতি। বিশ্ববাসী এমন অদ্ভুত তত্ত্বের কথা আগে কখনও শোনেনি।
এই নীতির মূলকথা হলো_ ইলেকট্রনের মতো ক্ষুদ্র কণিকাদের ক্ষেত্রে ভরবেগ বা অবস্থানের মতো দুটি রাশির মান কখনও একসঙ্গে জানা যাবে না। কিছু অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে।
বিষয়টি কিন্তু এমন নয় যে, আমাদের কাছে সূক্ষ্ম যন্ত্র নেই বলে আমরা সঠিক মান নির্ণয় করতে পারছি না। বরং এই অনিশ্চয়তা হলো প্রকৃতির একটি মৌলিক নিয়ম। এই নীতি আমাদের বিজ্ঞানকে আমূল বদলে দিয়েছে। বদলে দিয়েছে অতীতের ধারণা, শূন্যস্থানের ধারণা।
এই নীতি থেকে দেখা যায়, ঘটে যাওয়া অতীতকেও পরিবর্তন করা সম্ভব হতে পারে! বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে দেখতে পেলেন শূন্য থেকেই অবিরত পদার্থ ও প্রতি-পদার্থ তৈরি হয়ে চলেছে!
 ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ ১৯০১ সালের ৫ ডিসেম্বর আজকের দিনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি এর্ভিন শ্র্যোডিঙ্গারের সমসাময়িক কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান উদ্ভাবন করেন। অনিশ্চয়তা নীতি আবিষ্কারের জন্য তিনি বিখ্যাত
১৯২৫ সালে মাক্স বর্ন ও পাসকুয়াল জর্ডানের সঙ্গে মিলে হাইজেনবার্গ কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ম্যাট্রিক্স ভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার আবিষ্কারক হিসাবে এবং এর ব্যবহারিক প্রয়োগ হিসাবে হাইড্রোজেনের বহুরূপতা আবিষ্কারে অবদান রাখার জন্য হাইজেনবার্গ ১৯৩২ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার লাভ করেন ।
Why Quantum Mechanics Still Stumps Physicists | Discover Magazine
১৯২৪ সালে নিলস বোরের সঙ্গে তিনি কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের উপর কাজ শুরু করেন। এই কাজ শেষ হয় ১৯২৬ সালে দুর্বোধ্য ‘ম্যাট্রিক্স বলবিজ্ঞান’-এর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। পরবর্তীতে বিশেষত পল ডিরাক, ভোলফ গাং পাউলি, প্রমুখের প্রচেষ্টায় কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের স্পষ্টতর ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠিত হয়।
যদিও তাত্ত্বিক ভাবে নতুন এই বলবিজ্ঞান হাইজেনবার্গের ম্যাট্রিক্স উপায়ের সমার্থক। অবশ্য হাইজেনবার্গ তাঁর নিজস্ব তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যেই অনিশ্চয়তা সূত্রটি প্রমাণ করেন।
 নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ এর ১২০ তম জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করি। শ্রদ্ধা জানাই 🙏🙏

© পঞ্চানন মণ্ডল   

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

জীবন জালেই বন্দী

0 (0) জাল, আমাদের জীবন জালেই বন্দী। সংসারের জাল থেকে সম্পর্কের জাল আবার রাজনীতির জাল থেকে অন্তর্জাল। এই জালে জালেই জ্বলে গেলাম কিন্তু আজ যে জালের কথা বলবো; সে জাল কিন্তু আরো মারাত্বক। হয়তো আপাত ভাবে মনে হতে পারে কি এমন কিন্তু সে জাল আমাদের বাস্ততন্ত্রকে ভেঙে খান খান করে […]
জালে আটকে পাখি
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: