স্বপ্ন ও বিজ্ঞান

@@
5
(3)

স্বপ্ন ও বিজ্ঞান

বাংলা অভিধানে স্বপ্ন কথাটির অর্থ হল অলীক কল্পনা। স্বপ্ন নিয়ে গবেষণা কম হয়নি, কোনো কোনো গবেষক বলেন, যে স্বপ্ন হচ্ছে অবদমিত মনের প্রতিফলন, কারো মতে স্বপ্ন অর্থহীন। অনেকে আবার বলেন যে স্বপ্ন শুধুই সাদাকালো, কিন্তু রঙিন স্বপ্নও দেখা দেয়। যাই হোক না কেন লোকসংস্কৃতিতে নানারকম স্বপ্নের নানারকম অর্থ বহন করা হয়ে থাকে।

স্বপ্নের সঙ্গে মানুষের যে একটা অদ্ভুত রহস্যময় সম্পর্ক আছে তা আমরা অনেকদিন ধরে মেনে আসছি।

অতীতের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় যে খ্রিস্টের জন্মের আগে মেসোপোটেমিয়ার রাজা তার স্বপ্ন গুলোকে একটা মোমের ক্যাফেটে বাঁধিয়ে রাখত। তার কিছু সময় পরে ইজিপ্সিয়ানরা স্বপ্নের হিসাব রাখার জন্য বই তৈরি করেছিল। যেখানে ১০০ কৃত্রিম স্বপ্নের কথা লেখা হয় এবং বাস্তব জীবনে তার মানে খোঁজার চেষ্টা করার কথা বলা হয়েছে। এইভাবে চলতে থাকে স্বপ্নের রহস্যময় খোঁজ।

এরপরে মানুষের জীবনে আসে বিজ্ঞান। বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার মাধ্যমে স্বপ্ন নিয়ে চলে বিভিন্ন গবেষণা। স্বপ্ন নিয়ে যে শাখায় আলোচনা করা হয় তাকে বলে ওনিরলজি (Oneirology )।

১৯৫২ সালে এই বিষয় নিয়ে এক বিজ্ঞানী গবেষণা শুরু করেন। শিকাগো ইউনিভার্সিটি তে কয়েকজন ঘুমন্ত মানুষের মাথায় ইলেকট্রনিক্স সিগন্যাল রেকর্ড করা হয়। দেখা যায় যে ঘুমোনোর কিছু সময় পরে ইলেকট্রনিক সিগন্যালের কম্পাঙ্ক বাড়তে থাকে। এরপর তাদের জাগানো হয় এবং জানা যায় যে তারা এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল।

মেশিন ছাড়া এই তথ্য জানা সম্ভব ছিল না কিন্তু আবার দেখা যায় যে তারা যখন স্বপ্ন দেখছিল তখন তাদের চোখ নড়াচড়া করছিল এবং চোখ ওপরে করে দেখা স্বপ্নও সম্ভব ছিল। এই ধাপ বা স্টেজ নাম দেয়া হয় রেপিড আই মুভমেন্ট স্টেপ।

ব্রেনের ইলেকট্রনিক সিগন্যাল টেস্ট করে দেখা যায় যে ঘুমন্ত অবস্থায় সিগন্যালের কম্পাঙ্ক এবং ব্রেনের জাগা অবস্থায় সিগন্যালের কম্পাঙ্ক এক। শুধু পার্থক্য ছিল এই যে ঘুমন্ত অবস্থায় শরীরের কিছু রাসায়নিক প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায় বলে পেশী কাজ করা বন্ধ করে দেয় সেই জন্যই আমরা স্বপ্নে দৌড়ানো , হাঁটাচলা, খেলা সবই করতে পারি – কিন্তু বাস্তবে আমরা সেই একই অবস্থায় থাকি।

কেউ কেউ এই অবস্থা নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে স্বপ্নের মধ্যে আসল ক্রিয়া করে বসে যেমন, স্বপ্ন দেখতে দেখতে চিৎকার করা, হাঁটাচলা করা বা লাফানো ইত্যাদি।স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা করাটাই একটা মজার ব্যাপার। আরো একটি মজাদার ঘটনা হল এই যে, কিছু স্বপ্নকে আবার নিজে নিজে নিয়ন্ত্রন করা যায় এই স্বপ্নকে বলা হয় লুসিড ড্রিমিং (The lucid dreaming)।

 স্বপ্ন আমাদের শরীরে কি সত্যি কোন লাভ দেয় ?

২০১০ সালে কিছু প্রতিযোগীকে একটা পাজল গেম সমাধান করতে দেয়া হয়। পাজেল গেম সমাধান করার পর কিছু জনকে রাতে ঘুমোতে দেওয়া হয় আর কিছু জনকে ঘুমোতে না দিয়ে সেই একই অবস্থায় আবার পাজেল গেম সমাধান করতে বলা হয়। দেখা যায় যে যারা ঘুমিয়েছিল তারা না ঘুমোনোর প্রতিযোগিদের থেকে ১০ গুণ বেশি দ্রুততায় এই পাজেল গেম সলভ করেছিল।

অবাক করা ব্যাপার এই যে রাতে ঘুমানো প্রতিযোগিরা পাজেল গেম এর স্বপ্ন দেখেছিল। এর থেকে বোঝা যায় যে স্বপ্ন আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মনে রাখতে সাহায্য করে। আমরা যখন কোন কঠিন জিনিস শিখি ঘুমানোর সময় আমাদের মস্তিষ্ক সেই সব জিনিসকে পুনরাবৃত্তি করে।

মেশিনের সাহায্যে দেখা গেছে যে শেখার সময় নিউরনের ক্রিয়া-কলাপ এবং ঘুমানোর সময় নিউরনের ক্রিয়া-কলাপ একই রকম। বাস্তবে আমরা যে স্বপ্ন দেখি সেগুলি ভীষণ রকমের আজব টাইপের হয়ে থাকে এবং আমাদের শরীরের কোষ গুলি স্বপ্নের মধ্যে সঠিক তথ্য পরিবেশন করতে পারেনা।

তাই এইগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুল হয়। স্বপ্ন এমন একটি প্রক্রিয়া যা আমাদের মস্তিষ্কের বিকাশ করতে থাকে এবং কিছু জানা-অজানা বিষয়কে এক সঙ্গে মিলাতে থাকে। তাই সবশেষে বলা যায় যে, বাস্তবিক জগতের সাথে স্বপ্নের যোগসুত্র নিত্যদিনের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে হয়। মানুষের মস্তিষ্ক কে সম্পূর্ণ জানা গেলে স্বপ্ন কি তাও একদিন জানা যাবে তাই যতদিন না জানা হচ্ছে ততদিন স্বপ্ন দেখে যাওয়াই উত্তম।

প্রেরণা মিত্র

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 3

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

মঙ্গল গ্রহে কলোনি- বিজ্ঞান প্রযুক্তির বিকাশ, না অন্য কিছু? 

5 (3) স্পেস এক্স ও স্টারশিপ:    স্পেস -এক্স কোম্পানি মঙ্গলগ্রহে কলোনি তৈরির প্রচেষ্টা হাতে নিয়েছে। কোম্পানির প্রধান এলন মাস্ক জানাচ্ছেন “স্টারশিপ” মহাকাশযান সুপার হেভি রকেটের পেটে চেপে ১০০ জন মানুষ ও বাড়তি ১০০ টন ভার নিয়ে মঙ্গলে পৌঁছে যেতে পারবে । বলা হচ্ছে- এই স্টারশিপ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী লঞ্চ […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: