কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষ

@@
5
(1)

কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষ

সালোকসংশ্লেষ, এমন একটি প্রক্রিয়া যা উদ্ভিদ এবং আমাদের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।  কারণ এই পদ্ধতি সম্পন্ন না হলে আমাদের জন্য বেঁচে থাকার অন্যতম মূল জিনিসটি অর্থাৎ, অক্সিজেন উৎপন্ন হতে পারত না। তার সাথে ক্ষতিকারক কার্বন-ডাই-অক্সাইড যা আমাদের থেকেই মূলত সৃষ্টি হয় তার পরিমাণ বিশ্বের চারিদিকে এতই পরিমানে বেড়ে যেত, যে তাকে কমানো অসম্ভব হয়ে পড়তো।

আমাদের সবারই সালোকসংশ্লেষ সম্পর্কে মোটামুটি কিছুটা ধারণা আছে। এটি মূলত জল কে ভেঙে দুটো আলাদা আয়ন সৃষ্টি করে। সাথে অক্সিজেনকে ত্যাগ করতে সাহায্য করে। এই বিক্রিয়া কালে এদের দরকার পড়ে কার্বন ডাই অক্সাইডের, তাই জন্য পরিবেশে ছড়িয়ে থাকা কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে এরা গ্রহণ করে এবং এর ফলে পরিবেশে কার্বন ডাই অক্সাইড এর ভারসাম্য বজায় থাকে।

প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে এই কাজটি আমরা সকলেই জানি উদ্ভিদ করে থাকে। উদ্ভিদ সূর্যকিরণ থেকে তার ফোটন কণা নামক একটি কণা নিজের মধ্যে গ্রহণ করে তা দিয়ে পাতার মধ্যে থাকা কেমিক্যাল সাবস্টেন্স কে উজ্জীবিত করে এরপর সালোকসংশ্লেষের মূল বিক্রিয়াটি শুরু করে।

কৃত্তিম সালোকসংশ্লেষ পদ্ধতি

তবে বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং গবেষণা ফলে তাদের দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে কৃত্তিম সালোকসংশ্লেষ পদ্ধতি। এই সালোকসংশ্লেষ পদ্ধতিতে কাজটা কিন্তু একটু অন্যরকম। এখানে যন্ত্রপাতি গুলি মূলত কিছুটা ন্যানোটেকনোলজির ওপর ভিত্তি করে। বিভিন্ন যন্ত্রের দ্বারা, প্রাকৃতিক সালোকসংশ্লেষের পদ্ধতি কে অনুসরণ করে তারই প্রতিকৃতি দেওয়া হয়েছে।

কৃত্তিম সালোকসংশ্লেষ পদ্ধতি সৃষ্টি করার অন্যতম প্রধান কারণ হলো আমাদের ভূগর্ভস্থ জ্বালানির অতি পরিমাণ হ্রাসপ্রাপ্তি। আমাদের চেনাজানা বহু জ্বালানি শেষের পথে, এই মুহূর্তে আমাদের অন্য জ্বালানির খোঁজ করতেই হবে, এবং তা করতে হবে খরচের কথা মাথায় রেখে, তার সঙ্গে পরিবেশের কথা মাথায় রাখতে হবে।

সেই জ্বালানি এই কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষ পদ্ধতির মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব। অত্যাধিক পরিমাণে উদ্ভিদকে কেটে ফেলার ফলে প্রাকৃতিক সালোকসংশ্লেষের পরিমান নিম্নমুখী। কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষের দরকার বহুরুপ ভাবে।

যেমন যেসকল অঞ্চলে চাষবাসের খুব সমস্যা হয় সূর্যকিরণ সঠিক পরিমাণে না পৌঁছনোয়, অর্থাৎ যেখানে প্রায় সারাবছরই মেঘলা আবহাওয়া থাকে অথবা অত্যধিক পরিমাণে ফসল বৃদ্ধির জন্য কৃত্রিমভাবে তৈরি করা গ্রীন হাউস এফেক্ট বিশিষ্ট ঘরগুলি তাতেও উদ্ভিদের চাহিদা পূরণের জন্য এই কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষ পদ্ধতি খুবই প্রয়োজনীয়।

এই কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষ পদ্ধতিতেও প্রাকৃতিক সালোকসংশ্লেষ পদ্ধতির মতই শুধুমাত্র জল এবং অক্সিজেন পাওয়া যায়। এছাড়া এর মাধ্যমে হাইড্রোজেন ফুয়েল উৎপন্ন করা হয় যেটি এই কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক এবং এটি হয় সম্পূর্ণ কার্বন হীন।

কার্বন হীন হওয়ার ফলে পরিবেশের কোনরকম ক্ষতি এই কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষ পদ্ধতিতে ঘটে না। এই হাইড্রোজেন ফুয়েল ভবিষ্যতের অন্যতম জ্বালানির চাহিদা পূরণ করবে। সেই জ্বালানিকে যানবাহনে ব্যবহার করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার যে কোনরকম জ্বালানি দহনের ফলে কিন্তু গ্রীন হাউজ গ্যাস তৈরি হয় যা আমাদের পৃথিবী ওজনস্পিয়ার বা যে ওজন গ্যাসের স্তর তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে।

সেই স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়লে সূর্যের ক্ষতিকারক বিভিন্ন রকম রশ্মি সরাসরি আমাদের ভূপৃষ্ঠে এসে পড়বে এবং তাতে করে বিভিন্ন রকম রোগের সৃষ্টি হবে। যেমন স্কিন ক্যান্সার সর্বাধিক সৃষ্ট রোগ এই ওজোন স্তর ক্ষয়ের ফলে। কিন্তু কৃত্তিম সালোকসংশ্লেষের ফলে সৃষ্ট এই হাইড্রোজেন ফুয়েল কোনরকম গ্রিন হাউস গ্যাস সৃষ্টি করে না। অর্থাৎ এটি সম্পুর্ণ পরিবেশবান্ধব একটি পদ্ধতি।

এই সালোকসংশ্লেষ পদ্ধতি যেহেতু প্রাকৃতিক সালোকসংশ্লেষ পদ্ধতির অনুরূপ ভাবে তৈরি করা হয়েছে তাই এখানেও পাতার ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই পাতা তৈরি হয় ন্যানো পার্টিকেল দিয়ে, যা টাইটানিয়াম ডাই অক্সাইড এর তৈরি।

এর মধ্যেই মূলত সূর্যকিরণ থেকে আগত ফোটন কণা কে আবদ্ধ করে তারপর তাকে ঠিক উদ্ভিদ যে পদ্ধতিতে সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সেই ভাবেই হাইড্রোজেন এবং জলকে আলাদা করিয়ে একদিকে যেমন সূর্যের থেকে আগত শক্তিকে হাইড্রোজেন ফুয়েল হিসেবে সংরক্ষিত করা হয় তেমনি জলের সৃষ্টি করা হয়।

তবে যেমন সুবিধা আছে তেমনি কিছু অসুবিধাও নিশ্চয়ই আছে এই ক্ষেত্রেও, সেটা যদিও এটি তৈরি করার যন্ত্রাংশ নিয়েই বেশি, কার্বন গ্রহণকারী যে কার্বন ক্যাটালিস্ট এর মধ্যে ব্যবহৃত হয় তা অক্সিজেন এর সঙ্গে খুব তাড়াতাড়ি বিক্রিয়া করে ফেলে এবং নষ্ট হয়ে যায়। ফলে একে খুব তাড়াতাড়ি আবার পাল্টাতে হয়, সুতরাং বারবার করে পাল্টানো খরচ সাপেক্ষ ব্যাপার।

এছাড়া যেহেতু এই প্রকল্প খুব বেশি দিন পুরানো নয় তাই একে সম্পূর্ণভাবে দাঁড় করাতে অনেক পুঁজির দরকার। এছাড়াও সকলকে এই কৃত্তিম সালোকসংশ্লেষের ব্যাপারে অবগত করা প্রয়োজন।

বিভিন্ন জায়গায় এর জন্য গবেষণা কেন্দ্র তৈরি প্রয়োজন। আগত নতুন গবেষকদের এই নির্দিষ্ট বিষয়টি সম্বন্ধে বেশি পরিমাণে উদ্যোগী করে তোলা দরকার। যে পরিমান শক্তি আমরা নষ্ট করেছি তাকে আবার ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষিত করে রাখা দরকার।

-সৌরদীপ কর্মকার

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

স্যাটেলাইট সিস্টেম

5 (1) স্যাটেলাইট সিস্টেম স্যাটেলাইট শব্দটির সঙ্গে আজ সবাই পরিচিত। তার কারণে এর বহুমুখী প্রয়োজনীয়তা । স্যাটেলাইট এর ব্যবহার সর্বত্র। মাটি থেকে জল থেকে মহাকাশ – প্রত্যেকটি স্থানে প্রত্যেক জরুরি ব্যবস্থাই স্যাটেলাইট এর অন্তর্ভুক্ত। সেনাবাহিনী, আবহাওয়া, মহাকাশ গবেষণা, রেডিও, ইন্টারনেট সর্বত্রই স্যাটেলাইটের প্রয়োগ লক্ষণীয়। মহাকাশের প্রত্যেকটি গ্রহের নিজস্ব উপগ্রহের অস্তিত্বের […]
Space-Station
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: