ট্যাক্সোনমি কি ও কেন?

Subhankar
4.1
(9)

ট্যাক্সোনমি

পৃথিবীতে বসবাসকারী সকল প্রকার উদ্ভিদ এবং প্রাণীদের হিসাব রাখা কোনো একজনের পক্ষে সম্ভব নয়। আবার হিসাব যদি না থাকে তাহলে পৃথিবীর উদ্ভিদ এবং প্রাণীর মধ্যে যে বৈচিত্রতা তাও অপ্রকাশিত থেকে যায়। শুধু তাই নয়, কোন প্রাণী বা উদ্ভিদ বৈচিত্রটি সর্বাধিক এবং কোনটি সংকটের মুখে, অবলুপ্তির পথে, তার ধারণাও অপ্রকাশিতই থেকে যাবে। এছাড়া কোন উদ্ভিদ বা প্রাণী, কোন গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, কোন প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত সে বিষয়েও জানা দরকার। এগুলি না জানতে পারলে তাদের বংশপরিচয় জানা সম্ভব নয়। এর সাথে সব থেকে জরুরি যে বিষয়টি সেটি হল এদের নামকরণ, যার মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন উদ্ভিদ এবং প্রাণীদের সনাক্তকরণ সম্ভব। বিভিন্ন উদ্ভিদ এবং প্রাণী কে আলাদা করতে পারলে তবেই তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য জানাও সম্ভব। এইসব বিষয়বস্তু গুলি ‘ট্যাক্সোনমির’ অন্তর্গত। অর্থাৎ বিজ্ঞানের ভাষায় সনাক্তকরণ, শ্রেণীবদ্ধকরণ ও নামকরণ এই তিনটি বিষয় নিয়ে ‘ট্যাক্সোনমি’ প্রক্রিয়াটি তৈরি হয়েছে।

‘ট্যাক্সোনমি’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন বিজ্ঞানী অগাস্টিন পি. দ্যা ক্যানডলে ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে। ‘ট্যাক্সোনমি’ শব্দটি দুটি গ্রিক শব্দ ‘ট্যাক্সিস’ ও ‘নোমোস’ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। যাদের অর্থ যথাক্রমে বিন্যাস এবং বিধি। সুতরাং দুটিকে মিলালে পাওয়া যায় ‘বিন্যাসবিধি’।

‘ট্যাক্সোনমি’ কিছু বিশেষ বিষয় এবং উপাদানের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। সেগুলি হল সনাক্তকরণ, নামকরণ, শ্রেণীবিন্যাস ও প্রামাণ্য দলিল সংরক্ষণ। বিভিন্ন জীবগোষ্ঠীকে নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে আলাদা করে পরিচিত করা হয়ে থাকে সনাক্তকরণ প্রক্রিয়াতে। এর ফলে বিভিন্ন জীবগোষ্ঠী গুলিকে আলাদা ভাবে চেনা যায়। সনাক্তকরণ হয়ে যাবার পরে এদের সকলকে আলাদা নাম দেওয়া হয়ে থাকে সেই বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলির উপর ভিত্তি করে। যাকে নামকরণ প্রক্রিয়া বলে।

সনাক্তকরণ এবং নামকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবার পরে প্রত্যেকটি উদ্ভিদ এবং প্রাণী কে বিশেষ গোষ্ঠীভুক্ত করা হয় এটিকে শ্রেণীবিন্যাস প্রক্রিয়া বলে।

সনাক্তকরণ, নামকরণ এবং শ্রেণীবিন্যাস

এই প্রক্রিয়াগুলি শেষ হওয়ার পরে এই সকল বিষয়বস্তু গুলিকে আলাদা করে দলিলে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। যাতে পরবর্তীকালে এগুলি সম্বন্ধে জানা যায়। দলিলে সংরক্ষিত করে রাখার আরেকটি বড় কারণ হল, কোন একজন একটি জীবকে সনাক্তকরণ করবার পরে যদি দলিলে সংরক্ষিত না করে তবে পরবর্তীকালে অন্য যেকোনো কেউ জীবটিকে নিজের আবিষ্কার বলে দাবি করতে পারে। আরেকটি বিষয় হলো কোন জীব যদি অবলুপ্ত হয়ে যায় তবে তার সম্বন্ধে এইসব দলিলগুলি ভবিষ্যতে গবেষণার কাজে লাগে।

‘ট্যাক্সোনমির’ সঙ্গে আরেকটি শব্দ যা ওতপ্রোতভাবে জড়িত তা হল ‘সিস্টেমেটিক্স’। ‘সিস্টেমেটিক্স’ এর মূল বিষয় হলো জীব এর প্রকারভেদ ও বৈচিত্রতা। এদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও পার্থক্য নিরূপণ প্রক্রিয়া। ‘ট্যাক্সোনমি’ এবং ‘সিস্টেমেটিক্স’ দুটি বিষয় কে অনেকে একই মনে করে থাকেন। তবে দুটি বিষয় ভিন্ন ভিন্ন।

এছাড়া উল্লেখ্য নামকরণের প্রক্রিয়াটি একটি বিশিষ্ট পদ্ধতির মাধ্যমে হয়। যাকে বলা হয় ‘দ্বিপদ নামকরণ’। ‘দ্বিপদ’ শব্দটি থেকেই স্পষ্ট যে এটি দুটি ভিন্ন পদের দ্বারা গঠিত। এই পদগুলি হল যথাক্রমে গণ এবং প্রজাতি। এই দুটি পদের উপর ভিত্তি করে কোন জীবের নামকরণ করা হয়। প্রত্যেকটি জীব আলাদা গণ এবং প্রজাতিভুক্ত হওয়ায় সবাইকে আলাদা করে সনাক্ত করা সম্ভব। এগুলি হল ট্যাক্সোনমির মূল বিষয়বস্তু।

তবে ট্যাক্সোনমির আসল গুরুত্বটা কি? কেনই বা ট্যাক্সোনমির প্রয়োজন?

প্রথমেই বলা হয়েছে ট্যাক্সোনমি ছাড়া পৃথিবীর জীব গোষ্ঠী সম্পর্কে ধারণা রাখা সম্ভব নয়। এছাড়াও কোন ধরনের প্রজাতি জীব কত পরিমাণ রয়েছে, কি ধরনের জীব এর থেকে কি ধরনের রোগজীবাণু সংক্রমণ হতে পারে, কোন ধরনের উদ্ভিদ থেকে কি ধরনের রোগনাশক ওষুধ তৈরি করা যেতে পারে সে বিষয়ে জানতে পারা যায়।
কোন ধরনের উদ্ভিদ বা জীব কোন ধরনের বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে থাকে তা জানা যায়। কোন শ্রেণীর জীবদের পূর্বপুরুষ কি ধরনের ছিল সেই সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া সম্ভব। এতে করে পরবর্তীকালে কি ধরনের জীব সৃষ্টি হতে পারে তার আন্দাজ পাওয়া যায়। সংকরায়ন পরীক্ষার জন্য ‘ট্যাক্সোনমির’ ধারণা থাকা প্রয়োজনীয়। অবলুপ্ত হতে পারে এ ধরনের জীব সম্পর্কে ‘ট্যাক্সোনমিতে’ উল্লেখ থাকে যার দ্বারা এদের সংরক্ষণ করা সম্ভব। ভূগর্ভস্থ জ্বালানির সন্ধান পেতে কোন অঞ্চলে কি ধরনের জীব বসবাস করত তা এর মাধ্যমে জানা যায়।
সর্বোপরি ‘ট্যাক্সোনমি’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিজ্ঞানের শাখা।

-সৌরদীপ কর্মকার

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.1 / 5. Vote count: 9

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

২০৫০-এর মধ্যে ভারতবর্ষ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে মালায়ান জায়ান্ট স্কুইরেল

4.1 (9) কমতে কমতে তাদের বাসস্থানের আর ৪৩.৩৮ শতাংশ পড়ে আছে আমাদের দেশে। জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-র হিসেবে আর ২০৫০-এর মধ্যে তাদের সংখ্যা নব্বই শতাংশ হ্রাস পাবে। এইভাবে যদি তাদের বাসস্থান ধ্বংস চলতে থাকে। মালায়ান জায়ান্ট স্কুইরেল(Malayan Giant Squirrel) নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলাম কয়েকমাস আগে আমার কলামে।  মাননীয় পাঠকদের হয়তো […]
malayan-giant-squirrel-manas
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: