মানব কম্পিউটার শকুন্তলা দেবীর অজানা কিছু কথা

Subhankar
4
(4)

মানব কম্পিউটার – শকুন্তলা দেবী

অসামান্য গণনা করার ক্ষমতা দিয়ে সারা পৃথিবীর মন জয় করা একটি নাম। পাঁচবছর বয়েস থেকে মুখে মুখে যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ মুহুর্তে সমাধানের অসাধারণ ক্ষমতা তাঁর। আঙুল গোনা তার ধাতে নেই। বাবা আদর করে বলতেন ‘ক্যালকুলেটর’। শৈশবে বাবার দেওয়া ভালোবাসার নাম একবাক্যে মেনে নেয় গোটা বিশ্ব। শকুন্তলা দেবী, সারা বিশ্বে যিনি পরিচিত ‘হিউম্যান ক্যালকুলেটর’ নামে। গ্রিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড তাঁকে নতুন নাম দিয়েছে ‘মানব কম্পিউটার’।
শকুন্তলা দেবী ১৯২৯ সালের ৪ নভেম্বর ব্যাঙ্গালোরের একটি গোঁড়া কন্নড় ব্রাক্ষণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। চরম আর্থিক অনটনের সংসার পিতা সার্কাস খেলা দেখিয়ে চলত, তাদের পরিবারের ভাগ্য খুলে যায় যখন শকুন্তলা দেবীর পিতা মেয়ের অসাধারণ ক্ষমতা লক্ষ করেন। ৩ বছর বয়সে মেয়েকে তাস খেলা শেখানোর সময় প্রথম লক্ষ করেন তাঁর মেয়ের সংখ্যা মনে রাখার অসাধারণ দক্ষতা। সার্কাসের চাকুরি ছেড়ে মেয়েকে রোড শো তে নিয়ে যান, তাঁর গণনা ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য। প্রথাগত শিক্ষার বাইরে থেকেও, মাত্র ৫বছর বয়সে গাণিতিক সমস্যা সমাধানে তিনি দক্ষ হয়ে ওঠেন। ৬বছর বয়সে শকুন্তলা দেবী মাইসোর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম মুখ্য প্রর্দশনী করেন। সেখান থেকেই তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। শকুন্তলা দেবী পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। একটি শিশুর পক্ষে এই দায়িত্ব সামলানো সহজ ছিল না। ১০বছর বয়সে একটি কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি হলেও, মাসিক ২টাকা ফি না দিতে পারায় তাঁকে স্কুল থেকে বিতাড়িত হতে হয়।

যত জটিল কঠিন বড় অঙ্কের সংখ্যার যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ রুট তাঁর সামনে হাজির করানো হোক না কেন, তিনি উত্তর দিতেন সেকেন্ডের মধ্যে এবং কোনো খাতা কলম ছাড়াই‌।

১৯৭৭ সালে Southern Methodist University-তে প্রর্দশনীতে ২০১ অঙ্কের সংখ্যার ২৩তম রুট নির্ণয় করেন মাত্র ৫০সেকেন্ডে। যদিও মজার বিষয় এই সমস্যার উত্তর সঠিক কিনা যাচাই করতে হিমশিম খেতে হয়েছিল বড় বড় গণিতবিদকে। শেষে UNIVAC 1101 কম্পিউটারের জন্য বিশেষ প্রোগাম লিখতে হয়েছিল। ক্যালেন্ডার বিষয়ে অসামান্য প্রতিভার অধিকারী ছিলেন শকুন্তলা দেবী।
তিনি গণিতকে জনপ্রিয় করেছেন তাঁর দ্রুত সমাধান করার আকর্ষণীয় ক্ষমতার জোরে। তিনি উপন্যাস, গণিত, ধাঁধা, জ্যোতিষ বিষয়ে বই লিখেছেন। তাঁর গণিত কৌশল ও বৈদিক গণিত বিষয়ে কর্মশালা দেশজুড়ে জনপ্রিয় হয়েছিল। তিনি সামাজিক ক্ষেত্রে সমাজের বঞ্চিত শিশুদের মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য “Shakuntala Devi Education Foundation Public Trust” এর সূচনা করেন। বৈদিক গণিতের উপর গবেষণার জন্য তিনি উৎসাহিত করেছিলেন এবং গণিতে ভারতীয়দের অবদান বিষয়ে বিশ্বকে সচেতন করার প্রয়াসে সাহায্য করেছিলেন। সারা জীবন তিনি প্রচুর পরিশ্রম করেছেন। সংসার ভেঙেছে, জীবনে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে তা সত্বেও গণিতের প্রতি তাঁর ভালোবাসা বিন্দুমাত্র কমেনি।

তাঁর লেখা

সেই সত্তরের দশকে শকুন্তলা সমকামী, উভকামী ও রূপান্তরকামীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটান যাতে তাদের মন-মানসিকতা ও জীবনযাপনের ধরন বুঝতে পারেন। তাঁর এই দীর্ঘ সময়ের গবেষণার ফল ছিল ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অব হোমোসেক্সুয়ালিটি’ বইটি। এই বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে, তবে সেই সময়ে বইটি সামাজিক প্রেক্ষাপট ও মানসিকতার কারণে সেরকম স্বীকৃতি পায়নি। কিন্তু পরবর্তীতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পায় তাঁর বইটি। ভারতে সম্ভবত সমকামিতা সম্পর্কে এত বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে সেরকম বই এটিই প্রথম। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য বই গুলি হল: Astrology for You, Book of Numbers, Figuring: The Joy of Numbers, In the Wonderland of Numbers, Mathability: Awaken the Math Genius in Your Child, More Puzzles to Puzzle You, Perfect Murder, Puzzles to Puzzle You । জীবনের এক পর্যায়ে শকুন্তলা দেবী রাজনীতির দিকে কিছুটা অগ্রসর হয়েছিলেন। তবে সেরকম কোনো সফলতা পাননি। ১৯৮০ সালে তিনি ভারতের লোকসভায় স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মুম্বাই ও মেদাক থেকে নির্বাচনে দাঁড়ান। মেদাকে শকুন্তলার বিপরীতে ছিলেন স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে তিনি প্রায়ই খোলামেলাভাবে সমালোচনা করতেন। তবে শকুন্তলার খ্যাতি তাকে মানুষের ভোট পেতে তেমন কোনো সাহায্য করতে পারেনি। ফলস্বরূপ নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর কাছে পরাজিত হন তিনি।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4 / 5. Vote count: 4

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

হাত ধোয়া স্বাস্থ্য রক্ষার উপায় যে চিকিৎসক গবেষক সর্বপ্রথম বলেছিলেন তাঁকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল !!

4 (4) এখন করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচতে আমরা মাস্কের মতো হাত ধোয়াকে সঙ্গী করেছি। কিন্তু জানেন কি হাত ধোয়া যে স্বাস্থ্য রক্ষার এক অন্যতম উপায় এই কথা যে চিকিৎসক গবেষক সর্বপ্রথম বলেছিলেন তাঁকে মানসিক হাসপাতালে পাঠিয়ে নাকি পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল !! টিভি , রেডিওতে বিজ্ঞাপনে বার বার বলা হচ্ছে […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: