পেঁয়াজ কাটলে চোখে জল আসে কেন?

Subhankar
5
(3)

পেঁয়াজ কাটলে চোখে জল আসে কেন?

বাঙালির রান্নাঘরে পেঁয়াজ ও রসুন দেখা যায় না এরকম পরিবারের সংখ্যা খুব কম।
পিয়াজ ও রসুন এই দুই সদস্যের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কিছুটা এক ধরনের। তবে পেঁয়াজ কাটতে গেলে আমাদের চোখে জল আসে, যেটা রসুন কাঁটলে হয় না। পিঁয়াজের মধ্যে কি এমন আশ্চর্য শক্তি আছে যা আমাদের কাঁদিয়ে ছাড়ে?

সর্বক্ষেত্রেই যেমন বিজ্ঞানের অবাধ বিচরণ তেমন এর পেছনেও রয়েছে বিজ্ঞান, আরো ভালোভাবে বললে রসায়ন। পেঁয়াজ কেন কাঁদায় তা জানতে গেলে আমাদের জানতে হবে এর পেছনের রসায়ন। তবে সেই রসায়ন জানার পূর্বে আসুন কান্না সম্বন্ধে কিছু জেনে নিই!

কান্না প্রধানত তিন রকম।

সর্বপ্রথম যে ধরনের কান্না দেখা যায় তা হল ‘ন্যাচারাল’ বা ‘প্রাকৃতিক কান্না’ যা ‘বেসাল টিয়ার ‘(basal tear) নামেও পরিচিত। আমাদের চোখে যে মনি বা আইবল রয়েছে সেটিকে লুব্রিকেট (lubricate) বা ভিজিয়ে রাখার জন্য এক প্রকার তরল সবসময় আমাদের চোখে থাকে যেটি কে ‘বেসাল টিয়ার’ নাম দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় টি হল মনের অবস্থা যেমন আনন্দ, দুঃখ বা কোন কিছু কৃতিত্বের কারণে যে কান্না হয়, এটি হয় আমাদের মস্তিষ্কের সংবেদনশীলতার জন্য তাই এটি ‘সংবেদনশীল কান্না’ নামে পরিচিত।

তৃতীয় কান্না হল ‘আত্মবাচক’ বা ‘রিফ্লেক্সিভ কান্না’। এই ধরনের কান্না আমাদের চোখে তখন তৈরি হয় যখন কোনো জিনিস চোখে প্রবেশ করে চোখের ক্ষতি করার চেষ্টা করে। যেমন ধুলো,বালি কণা, হাওয়া, ছোট পোকামাকড় বা পিঁয়াজ জাতীয় কোন বস্তু। আমরা দৈনন্দিন জীবনে যত রকম সবজি ব্যবহার করি তার মধ্যে একমাত্র পিঁয়াজ থেকেই আমাদের চোখে জল আসে।

রাসায়নিক বিক্রিয়া

যদি বলি কান্নার কারণ সালফিউরিক অ্যাসিড! ভাববেন কি ভাবে সম্ভব? তাই এবার আসা যাক রাসায়নিক বিক্রিয়ার কথায়। পিঁয়াজ সাধারণত মাটির নিচে হয়ে থাকে, পিঁয়াজ যখন গাছ আকারে মাটির মধ্যে থাকে তখন মাটি থেকে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিপোষক পদার্থ সংগ্রহ করে নিজের মধ্যে জমা রাখে। যেমন নাইট্রোজেন, কার্বন, ফসফরাস ও সালফার।

পিঁয়াজের মধ্যে যে সালফার সংগৃহীত হয় সেটা পিয়াজের মধ্যে থাকা অ্যামোনিয়ার সঙ্গে বিক্রিয়া করে এবং ‘অ্যামিনো-অ্যাসিড সালফোক্সাইড’ নামক একটি যৌগে পরিণত হয়। আমরা যখন পিঁয়াজ কাটি তখন পেঁয়াজের বিভিন্ন অংশ পৃথক হয়ে বাতাসের সংস্পর্শে আসে তখন এই ‘অ্যামিনো-অ্যাসিড সালফোক্সাইড’ পুনরায় বিক্রিয়া করে ‘সালফোনিক অ্যাসিড’ এ পরিণত হয়। এই ‘সালফোনিক অ্যাসিড’ আবার পিঁয়াজের মধ্যে আগে থেকে থাকা এনজাইমের সঙ্গে বিক্রিয়া করে যেটির নাম “lachrymatory factor synthase”। এই এনজাইম সালফোনিক অ্যাসিড এর সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে এবং একটি উদ্বায়ী ঘোলাটে পদার্থে পরিণত হয় যা আমাদের চোখ থেকে জল বের করে দেয়। আসল ব্যাপার হলো এটি একটি উদ্বায়ী পদার্থ যা সহজে বাতাসে মিশে যেতে পারে এবং তা বাতাসে মিশে আমাদের চোখে প্রবেশ করে।

এবার আসি সালফিউরিক অ্যাসিড এর কথায়

এই অকাঙ্খিত প্রবেশ কে আটকাতে বেসাল টিয়ার বা সাধারণ জলকে মুক্ত করে যা এই উদ্বায়ী পদার্থের সাথে একটি বিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এর ফলে একটি অ্যাসিড তৈরি হয়, তার নাম ‘সালফিউরিক অ্যাসিড’। এই সালফিউরিক অ্যাসিডের তীব্রতা এতই কম থাকে যেটা চোখের মধ্যে জ্বালার অনুভূতি ছাড়া আর অন্য কোন সমস্যা তৈরি করতে পারে না।

আমাদের চোখের ঠিক ওপরে একটা গ্ল্যান্ড থাকে যার নাম ‘ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ড’ (lacrimal gland)। এই গ্ল্যান্ড থেকে একটা জীবাণু বিহীন তরল নিঃসৃত হয় যা চোখে তৈরি হওয়া সালফিউরিক অ্যাসিডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে করে তীব্রতা এত কমিয়ে দেয়।আমাদের চোখে এই তরলের পরিমাণ যত বাড়তে থাকে তত বেসাল টিয়ারের পরিমাণও বাড়তে থাকে। যখন এটা অত্যাধিক বেড়ে যায় বা ওভারফ্লো হয়ে যায় তখন চোখ দিয়ে জল পড়ে। অর্থাৎ যেকোন রকম পরিস্থিতিতে আমাদের শরীর দারুন ভাবে নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম।

আমাদের মনে প্রশ্ন থাকতে পারে যে আমরা পিয়াজ কাটবো কিন্তু চোখ দিয়ে জল বেরোবে না তা কি সম্ভব?

অবশ্যই সম্ভব, তারও উপায় আছে। অ্যামিনো অ্যাসিডকে সালফিউরিক এসিডে পরিণত হওয়ার থেকে আটকানোর জন্য পেঁয়াজটিকে কাঁটার পূর্বে ফ্রিজে রেখে দেওয়া যেতে পারে। কারণ অ্যামিনো অ্যাসিড অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে সালফিউরিক অ্যাসিডে পরিণত হতে অনেক সময় নেয়। এর ফলে বাইরের তাপমাত্রায় যতক্ষণে না এটি সালফিউরিক অ্যাসিডে পরিণত হচ্ছে ততক্ষণ সময় আমাদের হাতে থাকে একে কাঁটার জন্য। সালফিউরিক অ্যাসিডে পরিণত না হওয়ার ফলে চোখের জলও বের হতে পারেনা। তাই সবশেষে বলা যায় যে রসায়নবিদ্যার জ্ঞানের দৌলতে আমাদের চোখে যাতে পেঁয়াজ কাঁটার সময় জল না আসে তার উপায়ও আমরা জেনে গেলাম।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 3

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

সাবু বা সাগু (Sago)

5 (3) জ্বর হলেই হাল্কা পথ্য হিসাবে এখন ও অনেকে সাবু বা সাগু জলে ভিজিয়ে খাই। কিন্তু জানা আছে কি এই সাবু বা সাগু কি? ছবির এগুলি সাবু গাছ।( Metroxylon sagu.)বিশাল উঁচু। শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনের প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট কিড-এর নিজের হাতে পোঁতা এই গাছগুলি। সাবু গাছ নাকি ৭০০ বছরও বাঁচতে পারে। […]
সাবু -সাগু
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: