আজও বেঁচে আছি রোজ, বেনেবউ পাখি!

black-headed-oriole
বেনেবউ
পূর্ণবয়স্ক বেনেবউ

সদ্যপ্রয়াত কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত তাঁর “নিষিদ্ধ কোজাগরী” কাব্যগ্রন্থে লিখেছিলেন –

“তবু কি আমার কথা বুঝেছিলে, বেনেবউ পাখি,

 যদি বুঝতে পারতে

নারী হতে।

 

আমাকে বুঝতে পারা এতই সহজ?

কারুকেই বোঝা যায় নাকি!

শুধু বহে যায় বেলা, ঈশ্বর নিখোঁজ;

কিংবা বুঝি এ-দুঃখ পোশাকি,

না-হলে কি করে আজও বেঁচে আছি রোজ,

বেনেবউ পাখি!”

বেনেবউ। ইংরেজিতে Black-headed Oriole। নিম্ন-গাঙ্গেয় সমভূমিতে অতি পরিচিত পাখি। কত গান, পুরনো গল্পগাথা রয়েছে পাখিটিকে ঘিরে। ভোরবেলা প্রায় আমার ঘুম ভাঙে বেনেবউ-এর ডাক শুনে। আমাদের বাড়ির পেছনের আমবাগানে মিষ্টি সুরে ডেকে ঘুরে বেড়ায়। পাখিটার ছবি আমি তুলেছি বহুবার। একটা নস্ট্যালজিয়া কাজ করে যখন পাখিটাকে দেখি। আমাদের পুরনো গ্রামের বাড়িতেও আসতো, বাসা বাঁধতো। হলুদ-কালো রঙ। দেখতে দেখতে অনেক কিছু মনে পড়ে। ভাবি, জার্মানির বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব বুরুসিয়া ডর্ট্মুন্ড-এর প্লেয়ার নাকি? হলুদ-কালো রঙ্গের আরেকটি প্রাণী বহুকাল ধরে আমাদের দেশে টিকে আছে। আমরা তাকে জাতীয় পশুর মর্যাদা দিয়েছি। আবার আমাদের হতভাগ্য দেশের পলিসি-মেকারদের এমনই অবস্থা যে সেই জাতীয় পশুকেই গুলি করে মারতে হয়। যাকে ঠান্ডামাথায় গুলি করে মারা হল সেই বাঘিনী আবার দুটি সন্তানের মা। বাচ্চারা তার কাছে ছিলো।মন খারাপ হয়ে যায় হলুদ-কালো রঙ দেখলে।

বেনেবউ তার মাথার কালো রঙটি কিন্তু জন্মের প্রথম বছরেই পায় না। নাবালকদের (immature)গলায় সাদা রঙের ওপর কালো ছিটে দাগ থাকে। যেমন দেখছেন এই ছবিতে।

বেনেবউ
নাবালক বেনেবউ

আমাদের গ্রামের চাষের মাঠগুলিতে বিকেলে দিকে দেখি ওদের। মাঠ লাগোয়া কাঁঠালগাছ, আমগাছ, সজনেগাছগুলো ওদের ঘুরেফিরে দেখতেই হবে। বেশিরভাগ বুনোফল খায়। তবে বিশেষ দুর্বলতা আছে শুঁয়োপোকাদের ওপর। উত্তরবঙ্গের হিমালয়ের পাদদেশের জঙ্গলগুলোতে ওদের অন্য প্রজাতি (Species)Maroon Orioleবা ‘মেরুন অরিওল’-দেরও দেখেছি শুঁয়োপোকা খেতে।

maroon-oriole
শুঁয়োপোকা খেতে ব্যস্ত মেরুন অরিওল

একদিন সকালবেলা দেখি আমাদের গ্রামের একটা কুলবাগানে এই রকম একটা নাবালক বেনেবউ মহা-আনন্দে শুঁয়োপোকা খাচ্ছে।

black-headed-oriole

প্রথমে পোকাটাকে ধরেই সুবিধামত জায়গায় নিয়ে যায়।

black-headed-oriole

তারপর গাছের ডালের ওপর পোকাটাকে সজোরে আছড়ায়।

black-headed-oriole

যতক্ষন পোকাটা মরে না যাচ্ছে এবং পেটের নাড়ি-ভুঁড়িগুলো বেরিয়ে আসছে।

সবশেষে টপাস করে গিলে ফেলে।

বেনেবউ-দের ক্ষেত্রে খুব সাধারন একটা পদ্ধতি খাবার খাওয়ার। তবে তারা অন্য রকমের কিছু করতে খুব একটা অপছন্দ করে এমন নয়। শুঁয়োপোকার জন্য তারা যথেষ্ট অ্যাক্রোব্যাটিক হতে পারে।

সেদিন সন্ধ্যেবেলায় বার্ডিং শেষ করে ফিরে আসছি। বাড়ির কাছেই দেখি একটা গাছে গায়ে কতগুলি শুঁয়োপোকা জড়ো হয়েছে। আর এক নাবালক বেনেবউতাদের খাওয়ার জন্য তৈরি।

বেনেবউ

আলো খুব কম। খেয়াল করলাম শুঁয়োপোকার দলটা মাটি থেকে বড়জোর আটফুট ওপরে আছে। বেনেবউটা মাটির কাছাকাছি একটা মড়া ডালে নেমে আসছে, তারপর উড়ে গিয়ে শুন্যে ভেসে থেকে একটা করে শুঁয়োপোকা গাছ থেকে তুলে চলে যাচ্ছে। অনেকবারের চেষ্টায় অসফল হলাম। হয় ঠিকমত জায়গা নিতে পারছি না, নয়তো শাটারস্পিড, ফোকাস ইত্যাদিতে গন্ডগোল হচ্ছে। একটা শুঁয়োপোকা ধরতে গেলে ডানার ঝাপটায় বেশ কয়েকটা মাটিতে পড়ে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত যখন ঠিকমত জায়গা নিতে পারলাম আর ক্যামেরার সেটিং চলনসই হল তখন একমাত্র হতভাগ্য শুঁয়োপোকাটি গাছের গায়ে লেপ্টে আছে। এক চমৎকার শারীরিক কসরত আর মনসংযোগ দেখালো নাবালক বেনেবউটি।

উড়ে এসে গাছ থেকে তুলে নিলো শেষ শুঁয়োপোকাটিকে।

বেনেবউ

ডানা ঝপটে কিছুটা পেছেন সরে এলো।

বেনেবউ

তারপর উড়ে চলে গেলো সেদিনের সন্ধ্যের মত।

বেনেবউ

সিদ্ধান্ত –

১. বেনেবউটি জানে ঠিক কোন নির্দিষ্ট বিন্দুতে গিয়ে তার সামনের দিকের গতি শুন্যে নামিয়ে আনতে হবে। না হলে গাছের গুঁড়ির সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খেতে হতে পারে। লক্ষ্য করেছি সে তার সামনের দিকের ওড়ার গতি কম রাখার জন্য গাছটার থেকে খুব দূরে বসেনি যেখান থেকে তার উড়ান শুরু করেছে। কারণ যত দূর থেকে উড়ে আসবে তত বেশি গতি তৈরি হবে আর গাছের ঠিক সামনে নিজের গতিবেগ শুন্য করতেও তার যথেষ্ট অসুবিধা হবে। ডানার সজোরে ডাউনস্ট্রোক তাকে গতিশুন্য করেছে। দেহের অক্ষ সামনের দিকে বেঁকে থাকে। ঠিক যে ভাবে আমরা দৌড়ে এসে কোনো বিন্দুতে থামার জন্য মেরুদন্ড সামনের দিকে বেঁকিয়ে ঝুঁকে পড়ি।

২. এক সেকেন্ডের যে ভগ্নাংশের মধ্যে সে শুঁয়োপোকাটিকে তুলে নিতে পেরেছে, সেই অল্প সময় জন্য সে শুন্যে স্থিরভাবে ভেসে ছিলো।

এই প্রক্রিয়াটিকে বলে হভারিং(Hovering)। ডানার দ্রুত ঝাপটে পাখি অনেক ক্ষেত্রে এভাবে শুন্যে স্থির হয়ে ভেসে থাকতে পারে।

৩. ডানার দ্রুত ও জোরালো ডাউনস্ট্রোকে কিছুটা পেছনে সরে আসে।লেজ দুদিকে ছড়ানো থাকে। শেষে একটি নির্দিষ্ট দিকে উড়ে যায়।

এই পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণের রোজকার বেঁচে থাকার পেছনে রয়েছে অনন্ত প্রচেষ্টা আর বিজ্ঞান। সেই প্রচেষ্টা আর বিজ্ঞান আমাদের সবসময় চমৎকৃত করে। যদি আমরা সেই ভাবে তার দিকে তাকিয়ে দেখি। তার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য্যের সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করে নিই।

 

লেখা, ছবি, স্কেচ (রঙিন কাঠ-পেন্সিল) – সম্রাট সরকার

ইমেইল –samratswagata11@gmail.com

Leave a Reply

%d bloggers like this: