স্টিফেন হকিং

@@
5
(1)
স্টিফেন হকিং
একাই এক প্রতিষ্ঠান এই মানুষটি প্রমান করেছেন যে মানুষের ইচ্ছা থাকলে কি না সম্ভব।
স্টিফেন হকিং) ( Stephen William Hawking) একজন ইংরেজ  তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী , গণিতবিদবিশ্বতাত্ত্বিক ও বিজ্ঞান-বিষয়ক জনপ্রিয় ধারার লেখক
মস্তিস্কই যে আমাদের পরিচয় তার প্রমান তার থেকে ভালো কে দিয়েছেন ? আজ এই মানুষটির চলে যাওয়া তাই অনেক বড় শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। আজকের লেখা সাজালাম তার জীবন,তার কাজ আর তার অবদান নিয়ে।
একটি লেখায় তাকে ধরার মতো ক্ষমতা বা সাহস কোনোটাই আমার নেই তবু এই মহামানবের উপর কিছু লিখলাম,আমার সামান্য নিবেদন তার প্রতি এবং তার অদম্য প্রাণশক্তির প্রতি।
স্টিফেন হকিং জন্ম নিয়েছিলেন জানুয়ারির ৮ তারিখ ,১৯৪২ সালে, এই দিনটি আবার একটি বিশেষ দিন কারন ওটা ছিল আরো এক মহামানব গ্যালিলিওর ৩০০তম প্রয়াণদিবস। সমাপতন বড় অদ্ভুত তাই না ? যাই হোক মানুষটি নোবেল পুরস্কার পান নি তবে ওটা অনেকেই পাননি, তবে যা পেয়েছেন তাই বা কতজন পায় ? তাই পুরস্কারের গন্ডির বাইরে আসুন এই অমিত শক্তির অসাধারন মানুষটির জীবন নিয়ে কথা বলি।
আমার মতো ওছা ছাত্রদের জন্য তার শৈশবের লেখাপড়ার রেকর্ড বেশ উত্সাহব্যঞ্জক কারন তিনি ছোটবেলা লেখাপড়াতে মোটেই খুব একটা ভালো ছিলেন না।
তার ৯ বছর বয়েসে স্টিফেন হকিং ছিলেন ক্লাসের সব চেয়ে খারাপ ছাত্র।  পরবর্তিতে কিছু উন্নতি করলেও ওই মাঝারি সারির একটু উপরেই তার স্থান ছিল। তার সৌভাগ্য যে তিনি জন্মছিলেন প্রথম বিশ্বে না হলে হয়ত এগোতেই পারতেন না । তার যন্ত্রপাতি বা অন্য গাণিতিক গুন এর মধ্যেই তার শিক্ষক বা সহপাঠীদের চোখে পড়েছিল ফলে তার ডাকনাম হয়েই গিয়েছিল ‘আইনস্টাইন ‘,হলে কি হবে ক্লাসের নম্বর খারাপ তাই পরবর্তিতে অক্সফোর্ড এ ভর্তি হতে অসুবিধে হলো।
এছাড়া তার বাবার আর্থিক সঙ্গতি ও সেইরকম না বলে বৃত্তি দিয়ে ওতে ভর্তি ছাড়া তার কাছে রাস্তা ছিল না।এইখানেই তিনি তার উত্কর্ষ দেখান।ওই স্কলারশিপ পরীক্ষায় সবাইকে ছাপিয়ে যান বিশেষত পদার্থবিজ্ঞানে ১০০ শতাংশ নাম্বার পেয়ে নিজের ডাকনাম কে স্বার্থক করে তোলেন।
হকিং এর বাবার ইচ্ছা ছিল তিনি চিকিত্সাবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করুন কিন্তু তিনি অঙ্ক আর পদার্থবিজ্ঞান এর বাইরে যেতে রাজি ছিলেন না।এক্ষেত্রে তার আরো সমস্যা হলো সেই সময়ে অক্সফোর্ড এ গণিত নিয়ে স্নাতক মানে মেজর করার উপায় ছিল না ফলে তিনি বেছে নেন পদার্থবিজ্ঞান।   এতেই শেষ না,পদার্থবিজ্ঞানের পার্টিকেল ফিজিক্স এর দুটো ভাগের একটি কসমোলজি বা মহাজাগতিক পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে কোনো প্রথাভিত্তিক বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিই ছিল না তবু তিনি বেছে নেন ওই বিভাগ।
অক্সফোর্ডে তার জনপ্রিয়তা আসে কিন্তু অন্য জায়গায়, সেই সময়ে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের রোইং এর খেলা ছিল অতীব জনপ্রিয় আর হকিং তার কলেজের নৌকা বাইচ এর সঞ্চালক মানে হাল ধরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে অতীব দক্ষতার পরিচয় দিয়ে কলেজে জনপ্রিয় হয়ে যান।
স্নাতক পর্যায়ে পড়ার সময় তার রোগের কিছু বহিপ্রকাশ ঘটতে থাকে,এক পর্যায়ে নিজের বাড়িতে বড়দিনের ছুটিতে গেলে তার এই শারীরিক অসঙ্গতির কারণে তাকে বাড়ির লোক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান।ভাগ্যের পরিহাস হলো এই সময়েই তার ভবিষ্যতের ঘরণী জেন উইলডির সাথে তার আলাপ হয়। যাইহোক ডাক্তারি পরীক্ষার পরে তার Lou Gehrig রোগ ধরা পরে,ডাক্তাররা তার আয়ু দু বছর ধরে তাকে এগোতে বলেন।
অসম্ভব মনবল সম্পন্ন হকিং তার জীবন উপভোগ করা কে রাস্তা ধরে নেন।হকিং এর ভাষ্য অনুযায়ী তিনি তার মনোবল ফিরে পান পাশের বেডের একটি অল্প বয়েসী বাচ্চাকে ব্লাডক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিত্সা করাতে দেখে।
হকিং তার স্বদর্থক জীবনের পথে চলতে থাকেন এবং তার ভালবাসার মানুষটির সাথে বন্ধন আরো প্রবল করেন।  আরো চিত্তাকর্ষক হলো তাকে তিনি বিয়ে করেন দুই বছরের মধ্যেই !
তার ছিল অফুরন্ত রসবোধ।    এই রসবোধ এর পরিচয় ভালোভাবেই পেয়েছিল অক্সফোর্ড এর তার পরীক্ষকরা। হকিং এক অতীব দুর্লভ অথচ প্রাণঘাতী স্নায়ুর ব্যাধিতে আক্রান্ত হন যখন তার বয়েস মাত্র ২১,সময় ১৯৬১।   সেই সময়ে চিকিত্সকরা তার আয়ু আর বছর দুয়েক বেশি ভেবেছিলেন,তাদের সাথে রসিকতা করেই আমাদের আলোকিত করে গেলেন আরো অর্ধ শতাব্দী।
এই সংকট মুহুর্তে তার স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য সময় দেওয়া কমে যায়,তিন বছরে মাত্র ১হাজার ঘন্টা দিতে পারেন।   মজার হলো তারপরেও তিনি যা নম্বর পান তাতে প্রথম শ্রেণী আর দ্বিতীয় শ্রেনীর একদম সীমান্তে মানে দোরগোড়ায় তার নম্বর ছিল।
তার কথা অনুযায়ী জানতে পারছি তার শিক্ষকরা তাকে নিয়ে একটু বিব্রত ছিলেন।এর সুযোগ রসিক হকিং নিয়েছিলেন যখন তার পরীক্ষকরা এই কোন শ্রেণী তাকে দেবেন তার সমাধান করতে তার স্বাক্ষাতকার এর সময় এই নিয়ে প্রশ্ন করেন।হকিং বলেন,তাকে প্রথম শ্রেণী দিলে তিনি কেমব্রিজে ডক্টরেট করতে চলে যাবেন আর না দিলে কিন্তু অক্সফোর্ডকে জ্বালাতে থেকে যাবেন।
তাকে প্রথম শ্রেণীই দেওয়া হয় !  রসিক হকিং তার সর্বদা মৃত্যুর এই আশংকা নিয়ে রসিকতা করতে ছাড়েন নি,তার ভাষ্য পাই তার আত্বজীবনী ‘ My Brief History ‘ তে,তিনি বলেন “আমি মৃত্যু নিয়ে আশঙ্কিত না,তবে জানি ওটা একটা কালো মেঘের মতো আমার উপর ছেয়ে আছে তবে থাকলেই আমি যাচ্ছি না,আরো অনেকদিন আছি এবং আমার নিজের কাজ চালিয়ে যাবো, এতো সহজে জ্ঞান অর্জন ফেলে যাচ্ছি না “
অশেষ প্রাণ সম্পন্ন হকিং ৬০ এর দশকেই বাধ্য হন ক্রাচ ব্যবহার করতে,পরবর্তিতে খুব তারাতারি তাকে হুইলচেয়ার এর আশ্রয় নিতেই হয়। এতে তিনি দমেন নি, কলেজ ক্যাম্পাসে ওই হুইল চেয়ার কে নিয়ে সহপাঠিদের উপর রসিকতা করে ওটা চালিয়ে দেওয়া এমনকি কলেজ পার্টিতে ড্যান্স ফ্লোর এ ওই হুইল চেয়ার কে নিয়ে বনবন করে ঘুরিয়ে আনন্দ করার জন্য সারা কলেজে পরিচিত ছিলেন।
সত্তরের দশকে তিনি বিজ্ঞানীদের কাছে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি এবং রজার পেনরোজ নিয়ে আসেন গাণিতিক ভাবে এক নতুন তত্ব যাতে কৃষ্ণগহ্ববর এর সূত্র ধরে এই মহাবিশ্বের শুরুর সময়ের একক বিন্দুতে অবস্থান আর স্থানকাল এর অসীম বক্রতা এবং আজকের বহুল আলোচিত বিগ ব্যাং এর বাখ্যা তুলে ধরেন।এই সময় থেকেই তার কথা বলার অসুবিধে হতে থাকে তবে অদম্য হকিং তার কাজ থামিয়ে যান নি, মূলত সময় অল্প তাই কাজ শেষ করতে হবে ওটাই তার কাজের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পথ চলা এই অসীম সাহসী এবং আত্বপ্রত্যয়ী মানুষটিই বলতে পারেন কোনো নস্ট হয়ে যাওয়া কম্পিউটারের যেমন পরবর্তিতে স্বর্গ বা নরক থাকে না তেমনি আমাদের মানুষের জন্য ও সেই রকম কিছু নেই,যা কিছু আমরা ভাবি তা সবই মৃত্যুপরবর্তী অনিশ্চয়তার থেকে নিজেদের স্বান্তনা দিতে।
১৯৭৪ এ তিনি আমাদের পরিচিত করেন এই কৃষ্ণগহ্বর এর আরো একটি রূপের সাথে। এবার ব্যাখ্যা দেন এর অন্তিম সময়ের,তিনি গাণিতিক ভাবে জগৎবাসি কে দেখান যে এই কৃষ্ণগহবর শুধু শুষে নেয় না ,উগরে ও দেয় নিজের অন্তিম দশায়। এই উগরে দেওয়া শক্তি ও অপরিসীম। আরো দেখান এক প্রোটন জায়গায় কি ভাবে বিলিয়ন বিলিয়ন টন ওজন থাকতে পারে।
এক পর্যায়ে তার একটি ধারণা নিয়ে বিতর্ক হয় পদার্থবিদদের মধ্যে ,তিনি ধারণা দেন ওই কৃষ্ণগহ্বর এর মধ্যে শুষে নেওয়া সকল কিছু নিঃশেষ হয়ে যায়। এক পর্যায়ে তিনি তার আগের ধারণা থেকে সরে আসেন ,ওই কৃষ্ণগহ্বরের ভিতরে তার থেকে যাওয়ার কথা মেনে নেন। এক্ষেত্রে হকিং এর নিজের ভুল স্বীকার করার গুণাবলী কে অনেক বড় মানসিকতার বলেই মনে করা হয় কারন অনেক জ্ঞানী মানুষের নিজের ভুল মেনে নেওয়ার ক্ষমতা থাকে না।
হকিং তার ওই মহাবিশ্বের তত্বের জন্য ১৯৭৪ এর রয়াল সোসাইটির সভ্য নির্বাচিত হন মাত্র ৩২ বছর বয়েসে।এর পাচ বছর বাদে কেমব্রিজের লুকেশিয়ান গণিত প্রভাষক হিসেবে অভিষিক্ত হন।এই সম্মান বড় দুর্লভ,মনে রাখবেন এই পদে কাজ করেছিলেন আইজাক নিউটন,চার্লস ব্যাবেজ এবং পল ডিরাক।

হকিং এর প্রতি পৃথিবীর সম্মানের কিছু বিবরন :

এই বিরল প্রতিভাকে নোবেল না দিয়ে আমরা প্রমান করেছি পুরস্কার শেষ কথা না তবে ওটা ছাড়া যা পেয়েছেন তা হয়ত এক জীবনে অন্য কারোর খুব একটা জোটেনি।
আগেই কেমব্রিজের লুকেশিয়ান প্রফেসর অফ ম্যাথমেটিক্স এর গৌরবজনক পদের কথা বলেছি,ওতে উনি ছিলেন ৩০টি বছর,এছাড়া রয়েল সোসাইটির এলবার্ট আইনস্টাইন এবং হিউজেস পুরস্কার লাভ করেন।
এ ছাড়া পোপ ষষ্ঠ পল এর থেকে তিনি এবং রজার পেনরোজ পান বিজ্ঞানের জন্য Pius XI পুরস্কার।ব্রিটিশ সরকার এ ছাড়া দিয়েছেন ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের সম্মানিক কমান্ডার উপাধি।আরো পেয়েছেন উলফ পুরস্কার,কপ্লে মেডেল এবং ফান্ডামেন্টাল ফিজিক্স এর পুরস্কার।
এর পরে পেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর দেওয়া ২০০৯ সালে আমেরিকার শ্রেষ্ঠ বেসামরিক সম্মান প্রেসিডেন্ট মেডেল অফ ফ্রিডম।  সর্বসাকুল্যে পেয়েছেন ১২টি বিশ্বমানের সম্মান তবে নোবেল? না ওটা অধরা থেকে গেল তার জন্য অথবা নোবেল নিজেকে সম্মানিত করতে পারতো ওটা তাকে দিয়ে।

স্টিফেন হকিং লেখা বই

পৃথিবীর মানুষ তাকে চিনেছেন তার বই ‘ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম ‘ থেকে, এই প্রথম কোনো বিজ্ঞানী উপহার দিলেন সহজ ভাষায় মানুষের জন্য এই মহাবিশ্বের রহস্য কে নিজের করে জানার মত লেখা।স্টিফেন হকিং হলেন সাধারণের কাছের এক বিজ্ঞান শিক্ষক।
তার লেখা এই বই তার মতোই আকর্ষনীয়।বস্তুতু এই ১৯৮৮ তে এই বইটি প্রকাশ পাওয়ার পর তার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে ।সানডে টাইমস এর বেস্ট সেলার বিভাগে এই বইটি ২৩৭ সপ্তাহ নিজের স্বমহিমায় বিরাজ করে।এক কোটি বই বিক্রি হয় আর অনুবাদ হয় ৪০টি ভাষায়।আরো মজার হলো অনেকেই বলেন এই বইটি ইতিহাসের অন্যতম প্রধান বই যা মানুষ পড়ে নি তবে কিনেছেন বা নাম শুনেছেন।
স্টিফেন হকিং এবং শিশু কল্প বিজ্ঞান :
অনেকেই আমরা জানি না যে তিনি তার মেয়ে লুসি হকিং এর সাথে একত্রে লিখেছেন ‘George’s Secret Key to the Universe ‘নামের একটি কল্পবিজ্ঞানের বই।এই সিরিজের প্রথম বইটি প্রকাশ পায় ২০০৭ সালে আর পরের পর্বে আসে ‘George’s Cosmic Treasure Hunt’ ২০০৯ সালে।এই কাহিনীগুলোতে ও আছে সেই ব্ল্যাকহোল আর মহাজাগতিক রহস্যের হাতছানি।

ভিনগ্রহি প্রানের বিষয়ে হকিং :

নাসার ২০০৮ সালের এই সম্পর্কিত আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে তিনি ভিনগ্রহে প্রাণ উদ্ভব হওয়াকে সমর্থন তো করেন তার সাথে এই ধরনের সভ্যতার শক্তি ব্যবহারের উপর সেই নক্ষত্রের শক্তি কে সর্বত ব্যবহার করে ওয়ার্মহোল তৈরির উপর প্রযুক্তি থাকার সম্ভাবনার কথা ও বলেছেন।

আমাদের পৃথিবী আর তার ভবিষ্যত সমন্ধে স্টিফেন

হকিং :

এই ক্ষেত্রে তার ভাবনা কিন্তু বেশ নৈরাশ্যের কথা বলে,আমাদের অবিবেচকের মতো দূষণ ছড়ানো,নিজেদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রন না করা ইত্যাদির কারনে তিনি সতর্ক করেছেন মানুষকে টিকে থাকতে ছড়িয়ে পরার কথা বলে।
এ ক্ষেত্রে ভিন্ন গ্রহে আবাসন এবং আরো গিতিশীল প্রযুক্তির মাধ্যমে ভিন্ন নক্ষত্রের দিকে নিজেদের নজর দিতে নিজেই একটি প্রজেক্টে হাত দিয়েছিলেন।এর উপর আলাদা করে লিখেছিলাম তাই আর এক্ষেত্রে ওটা বর্ননা করলাম না।ধারণা অতীব অসাধারন এবং সৌর আর মহাজাগতিক বিকিরণ কে পাল বানিয়ে অতীব ক্ষুদ্র ডাকটিকিটের আকৃতির মহাকাশযান বা খবর সংগ্রহের প্রযুক্তির কথা তিনিই আমাদের দিয়ে গেলেন।

স্যার রিচার্ড ব্র্যানসন এর ভার্জিন এয়ার লাইনস এর

জিরো গ্র্যাভিটি এবং স্টিফেন হকিং :

২০০৭ সালে তার ইচ্ছা পূর্ণ করেন স্যার রিচার্ড।তার প্রজেক্ট জিরো গ্র্যাভিটি বলে এক বিশেষ প্রযুক্তিতে রকেটের ধাঁচে বিমানে তাকে নিয়ে যান প্রায় উচ্চ বাযুস্তরে যে খানে ৪০ বছরের মধ্যে প্রথমবার হকিং তার হুইল চেয়ার ছেড়ে মুক্ত মানুষ হয়ে আনন্দে শিশুর মত ওই বিমানে অভিকর্ষবিহীন হওয়ার আনন্দ উপভোগ করেন ডিগবাজি খেয়ে।অসামান্য এই মানুষের কত কম প্রাপ্তি হয়েছিল কত বড় !

অতিমানুষ এবং মানুষ হকিং :

কালকেই এক জায়গায় বলেছিলাম,আমরা খুব তারাতারি কাউকে দেবতার আসনে বসিয়ে ফেলি ফলে তার সর্বগুনসম্পন্ন হওয়ার এক ভাবমূর্তি আমরা নিজেরাই তৈরী করে ফেলি।অন্য বড়মাপের মানুষের মতো হকিং ও একজন মানুষ,তার বৈবাহিক জীবন তাই অনেকের মতোই সমস্যা নিয়ে এসেছে।
স্নায়ুর কারনে প্রথমে ক্রাচ আর তারপর হুইল চেয়ারে আবদ্ধ হয়েও মানুষটি ছিলেন অদম্য।তার মতো এত প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আর কোনো মনীষী পথ চলেছেন বলে মনে হয় না।অনেকেই আমরা জানি না যে উনি ১৯৮৫তে সার্ন (সেই গড ড্যাম পার্টিকেল এর পরীক্ষার জায়গা ) গবেষনাগার দেখতে যাওয়ার সময় একটি কঠিন গলার সংক্রমনে আক্রান্ত হন।
চিকিত্সকরা এক পর্যায়ে তার বেচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম খুলে উনার মৃত্যু ত্বরান্তিত করতে চেয়েছিলেন,তার স্ত্রী দ্বিমত পোষণ করে তাকে ওই অবস্থায় নিয়ে যান কেমব্রিজের এডেনব্রুক হসপিটালে,তার জীবন বাঁচে কিন্তু তার কথা বলার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় চিরতরে।এরপর তাকে বাকি জীবন কথা বলতে হয়েছে কৃত্রিম কম্পিউটারের স্বরক্ষেপনের মাধ্যমে।এতো প্রতিবন্ধকতার পরেও হকিং ছিলেন অবিচল।কজন পারে এই অতিমানবীয় মনবল দেখাতে ?

হকিং এর বিবাহিত জীবন

তার এবং তার স্ত্রী জেন অবশেষে একসাথে পথচলা বন্ধ করেন ১৯৯১ সালে।জেন এর নিজের লেখনি থেকে জানতে পারা যায়,হকিং ভীষণ একগুয়ে এবং ব্যক্তিগত জীবনে নিজের কথাই শেষ কথা ভাবতেন।
নিজের রোগ নিয়ে কোনো আলোচনা করা বা স্ত্রীকে নিজের ইচ্ছামতো চালনা করা তাদের বিচ্ছেদের কারন হয়ে যায়।জেন এর ভাষ্য অনুযায়ী ব্যক্তিগতভাবে হকিং অনেকটাই অপরিনত ব্যবহার করতেন এবং নিজের স্ত্রী নিজের ইচ্ছার পুতুল বা তার সার্বিক নিয়ন্ত্রন নিজের কাছেই থাকবে ওটাই তাদের এই বিচ্ছেদের কারন বলেছেন।
এই বিচ্ছেদের চারবছর পর তিনি আবার বিয়ে করেন তার অসুস্থ থাকার অবস্থায় তাকে পরিচর্যা করা নার্স এলিনি ম্যাসন কে।এই বিয়ে ১১ বছর স্থায়ী হয় তবে রহস্যজনক ভাবে কেমব্রিজ পুলিশ একটি নিজস্ব তদন্ত করেন কারন তাদের কাছে হকিং এর উপর শারীরিক নির্যাতন এর একাধিক রিপোর্ট ছিল।হকিং অবশ্য এই কথা কে অস্বীকার করেন এবং তার অসহযোগিতার কারণে ওটা ধামাচাপা পরে যায়।
বিবাহ সম্পর্কিত এবং আরো কিছু কারনে আইনি ক্ষেত্রে তার উপর অভিযোগ এসেছে তিনি যৌনতাড়িত এবং নারী বিদ্বেষী,তার উপর তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া দেন নি চলেছেন নিজের মতো করেই।নিজের লেখায় বলেছেন মহিলারা তার কাছে এক অতীব রহস্যের বিষয়।
হকিং এবং তার উপর নির্মিত সিনেমা ইত্যাদি :
তাকে নিয়ে পুরোদস্তুর সিনেমা হয়েছে যার নাম,’Theory of Everything’ ,নির্মিত হয়েছে ২০১৪ সালে।এটি তার জীবনীমূলক।এটির একটি ট্রেলার এর সূত্র দিলাম,আগ্রহী কেউ দেখতে পারেন : https://www.youtube.com/watch?v=OUpl0HDGq1Q
এছাড়া তাকে যুক্ত করে একটি বিখ্যাত কার্টুন চরিত্রে কাজ হয়েছে,সিম্পসন বলে এনিমেশনে নিজে অভিনয় করেছেন The Culture Show বলে একটি ভাগে।
ডিসকভারি চ্যানেল এর কয়েকটি প্রতিবেদনে নিজে ভুমিকা নিয়েছেন,কাজ করেছেন ষ্টারট্রেক এর দি নেক্সট জেনারেশন পর্বে।এই ক্ষেত্রে নিজেই আগ্রহী হয়েছিলেন অভিনয় করতে, তাতে তাকে হলোগ্রাম এর মাধ্যমে তাস খেলতে দেখা যাচ্ছে,সঙ্গে আরো দুই মহারথী আইনস্টাইন এবং নিউটন ও আছেন।একমাত্র এই একটি পর্ব যাতে কোনো বাস্তবের চরিত্র নিজের নামে নিজেই অভিনয় করেছেন।তার এই রুপোলি পর্দার ছোট এবং বড় দুটোতে আর মিডিয়া সম্পর্কে বেশ আগ্রহ দেখা গিয়েছে।তার এই ক্ষেত্রে করা কাজের উপর আরো বিস্তারিত জানতে এই তথ্যসূত্র দেখতে পারেন : https://en.wikipedia.org/…/Stephen_Hawking_in_popular…
প্রসঙ্গত বলা যায়,২০১৭ তে একটি ত্রিমাত্রিক ভিডিও কনফারেন্স এ নিজের বক্তব্য রাখেন হকিং।অনেকটাই আমাদের কল্পবিজ্ঞানের দেখা ত্রিমাত্রিক রূপের বাস্তবের প্রকাশ হয়,এই কথা বলার কারন হলো,ব্যক্তিগত ভাবে হকিং তার সকল শারীরিক বাধা কে অতিক্রম করতে প্রযুক্তি আর বিজ্ঞান কে আত্মস্থ করেছিলেন অন্য সব সমসাময়িক মনীষীদের থেকে অনেক বেশি। সূত্র : http://radicalsciencenews.org/stephen-hawking-appears-as…/

ইশ্বর ধর্ম এবং হকিং

হকিং তার ঠোটকাটা স্বভাবের জন্য অনেকের মানে ধার্মিক(পড়ুন উগ্র ধার্মিক ) গোষ্ঠির কাছে অতীব বিরাগভাজন হয়েছেন। তার নিজের লেখা বই গ্র্যান্ড ডিজাইন এ ইশ্বরের অস্তিত্ব নস্যাৎ করে মানুষ কে স্রেফ উন্নত ধরনের কম্পিউটার এর মতই অবিহিত করেছেন।
মৃত্যুকে নিয়ে রসিকতা করেছেন ওই চন্দ্রবিন্দুর গানের মতোই,বলেছেন “আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না,ওটা অনিবার্য তবে আমার অনেক কাজ বাকি তাই বললেই যাচ্ছি না,আরো বেশ কিছুদিন আছি “

রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং হালে বাজারে প্রচলিত

একটি ভিয়েতনাম প্রতিবাদ নামের মিথ্যার স্বরূপ :

ব্যক্তিগতভাবে প্রবল বিরোধী ছিলেন ব্রিটেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে।এছাড়া ইরাকের যুদ্ধ বা ডোনাল্ড ট্রাম্প কে অপচ্ছন্দ করতেন,তাকে প্রকাশ্যে মিথ্যাবাদী বলতে দ্বিধাবোধে থাকেন নি।
অন্যদিকে বিজ্ঞানের স্বার্থে প্রাণীর উপর পরীক্ষার বিরোধিতাকে সমর্থন করেন নি তিনি।
পরমানু যুদ্ধাস্ত্র এবং মানুষের ভবিষ্যত নিয়ে অতীব শঙ্কিত ছিলেন মানুষটি।তার ঐতিহাসিক উক্তি ছিল যে আমরা টিকে থাকবো কতদিন ওটা স্থির হয়ে যাবে আগামী দুই শতকের মধ্যেই তাই আমাদের এর মধ্যেই তৈরী হতে হবে অন্য সৌরলোকে অথবা অন্য গ্রহে মানব বসতি তৈরী করতে।

স্টিফেন হকিং এর তিন সন্তান লুসি,রবার্ট এবং টিম ।

ইরাকে আমেরিকার কাজকারবার আর সিরিয়ার এই হত্যাযজ্ঞ কে তিনি এক কথায় যুদ্ধপরাধ বলেছেন এবং মানব সভ্যতার একটি কলঙ্ক বলে অবিহিত করেছিলেন।
সিরিয়ার উপরে হকিং এর মতামত : https://www.theguardian.com/…/syria-abomination-human…
ইরাকের উপর আগ্রাসন যুদ্ধপরাধ এর সমান, সোচ্চার হকিং এর বক্তব্য জানতে দেখুন : https://www.chron.com/…/Stephen-Hawking-says-Iraq-war…
উপরে যেমন বলেছি,কিছু জায়গায় কাল দেখলাম তাকে ভিয়েতনাম এর আগ্রাসনের প্রতিবাদী বলে দেখানো হয়েছে।যা হয় ,বাজার গরম হলে তখন মিথ্যে দিয়ে যদি কিছু টিআরপি বাড়ে,না অতীব মিথ্যা কথা,তারিক আলী যে মিছিল করেছিলেন লন্ডনে সেই সময়ে তাতে উনি ছিলেন না,একটি ক্রাচ নেওয়া মানুষ কে দেখিয়ে যে মিথ্যা টুইট কাল থেকে চলছে ওটা নিয়ে স্বয়ং আলীই তার হাড়ি ভেঙ্গে দিয়েছেন।সঙ্গে ছবি দিয়েছি একটু দেখে নিলেই বুঝে যাবেন ।
আজীবন স্পষ্ট বক্তা হকিং তার রাজনৈতিক মত দিয়েছেন বিষয়ের উপরে কোনো পুর্বানুভুতি বা আগের রাজনৈতিক মানসিকতা থেকে না,তাই তিনিই বোধহয় সব চেয়ে যোগ্য যে বলতে পারেন স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকার দেওয়া হোক কোনো মানুষকে যদি সে আজীবন অকেজো হয়ে বাচতে না চায়।
একই হকিং বলেছেন সকলের জন্য স্বাস্থ্য এই নীতি থাকুক বিশ্বব্যাপী, পরিবেশ দুষন কে আটকাতে চেষ্টা হোক সর্বতো।
তিনি মারা গেছেন শান্তিতে,অন্তত বিবিসির আর তার পারিবারিক সুত্রে তাই জানা যাচ্ছে।উত্তরাধিকার সুত্রে রেখে গেলেন নিজের অমূল্য চিন্তা আর আমাদের জন্য পথচলার অনুপ্রেরনা।
ইচ্ছাশক্তি যদি প্রবল হয় তা হলে মানুষ পারে না হেন কাজ হয় না।হকিং চিকিত্সাবিজ্ঞানের মুখের উপর নিজের জীবন দিয়ে আমাদের শিক্ষা দিয়ে গিয়েছেন।আসুন,একটু নিজেদের তার মতোই বলিয়ান করে তুলি আগামীর সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য !

তথ্যসূত্র :

হাজার হাজার সূত্রের মধ্যে কয়েকটি তুলে ধরলাম মানে যে গুলো এই লেখা লিখতে সাহায্য করেছে।যে গুলো উপরে উল্লেখ করিনি তার কিছু নিচে দিলাম
১. https://www.wired.com/2008/07/the-geekly-re-3/ হকিং আর তার মেয়ের যৌথউদ্যোগে শিশুতোষ কল্প বিজ্ঞানের উপর জানতে
২. http://www.hawking.org.uk/ তাকে জানুন তার নিজের ওয়েব থেকেই !
৩. তার আরো একটি বই এর উপর একটু জানার জন্য http://books.google.com/books?id=Kc5qky1dIkIC
৪. তার ভাষ্যে তার জীবনের ফেলে আসা কথার উপর জানতে দেখুন https://plus.maths.org/…/os/issue18/features/hawking/index
৫. মানুষের কেন মহাকাশ অভিযান করা উচিত তার উপর হকিং এর বক্তব্য,নাসার ওয়েব থেকে https://www.nasa.gov/pdf/223968main_HAWKING.pdf
৬. স্টিফেন হকিং এর ব্ল্যাক হোল এর তথ্য নস্ট করার ধারণা ভুল প্রমান হওয়ার পরে তা উনি স্বীকার করেন ,সূত্র https://www.newscientist.com/…/dn6193-hawking-concedes…
৭. মানব বসতি হোক অন্য গ্রহে তার উপর হকিং এর চিন্তার কিছু সূত্র http://www.dailymail.co.uk/…/Mankind-colonise-planets…
৮. হকিং এবং পেনরোজ এর যুগান্তকারী গাণিতিক সিদ্ধান্ত এবং বিগ ব্যাং এর উপর কিছু আধুনিক দিক নির্দেশ http://rspa.royalsocietypublishing.org/content/314/1519/529    

লেখকঃ পঞ্চানন মন্ডল   

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

গ্রেট কনজংশন, ২১ডিসেম্বর - 2020

5 (1) ২০২০।বছরটা কে বিশে বিষময় বলে দাগিয়ে দেওয়া হলেও  আকাশপ্রেমীদের কাছে এমনটা নয় ।এই বছর আমরা দেখেছি সূর্য গ্রহণ,চাঁদের নানারূপ, ধুমকেতু থেকে উলকাবৃষ্টি। বছরের  একেবারে শেষ প্রান্তে সামনে এসেছে  আরো এক মহাজাগতিক ঘটনার সাক্ষী হবার সুযোগ। তবে ঘটনাটা পর্যবেক্ষণ করতে শুধুমাত্র ওই দিন আকাশে নজর করলে হবে না ।ঘটনার […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: