কেমন আছে মহুয়াডাঁড়ের নেকড়েরা !

@@
5
(2)

লেখা – স্বাগতা সরকার

“জঙ্গল জঙ্গল বাত চলি হ্যায় পাতা চলা হ্যায়”

– গুলজার সাহেবের এই সুরের ম্যাজিক মাতিয়ে দিয়েছিল আমাদের – আমাদের যাদের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে নব্বই-এর দশকে।

মোগলি, বালু, বাঘিরা, শের খান আর সেইসাথে অ্যানিমেশনের যাদু মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত আমাদের। আমরা ‘জঙ্গল বুক দেখব’ বলতাম না, বলতাম ‘মোগলি’ দেখব।  ‘মোগলি’ সহ সমস্ত চরিত্রই অ্যানিমেশনের গুণে হয়ে উঠত দারুন ভাবে জীবন্ত। সব চরিত্রের মাঝে যে চরিত্রটি সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করত আমার তা ছিল ‘আকেলা’-র চরিত্র। যে ‘শের খানের’ সঙ্গে অসম লড়াইয়ে বরাবর লড়াকু ও আত্মপ্রত্যয়ী মনোভাবের পরিচয় দিয়ে এসেছিল।

ছেলেবেলায় বাক্স টিভির পর্দায় ‘আকেলা’-র এই লড়াই অসম হলেও তা ছিল প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম মেনেই। তাই এই লড়াইয়ে বন্যপ্রাণ, বাস্তুতন্ত্র এ সবকিছুর ভারসাম্যই প্রকৃতির নিজস্ব হিসেবনিকেশের পাল্লায় সুষ্ঠভাবে বজায় থাকত।

এভাবেই তো চলতে পারত ‘জঙ্গল কা কানুন’! কিন্তু চলল না। কারণ প্রকৃতির রাজ্যে আমাদের অবাধ দখলদারির মাত্রা এতটাই বেড়ে গেল যে ‘আকেলা’ আজ আর একা নয়, সমষ্টিগত ভাবেই এক অসম লড়াইয়ের মুখোমুখি।

‘আকেলা’ অর্থাৎ Indian Grey Wolf (Canis lupus pallipes)  সমগ্র উত্তর-পশ্চিম এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা Grey Wolf বা ধূসর নেকড়ে (বৈজ্ঞানিক নাম ক্যানিস লুপাস)-দের একটি উপপ্রজাতি।

ভারতবর্ষের গুজরাট, রাজস্থান, ছত্তিশগড়, ঝাড়খন্ড, পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্রপ্রদেশ ও কর্নাটকের তৃণভূমি ও কাঁটাঝোপের জঙ্গলে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে শিকার করে নেকড়েরা। আর এদের সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে একটি অভয়ারণ্যকে নির্দিষ্ট করা হয়েছিল, যেটির অবস্থান ঝাড়খন্ড ও ছত্তিশগড়ের সীমানা বরাবর ঝাড়খন্ডের লাতেহার জেলায়। ‘মহুয়াডাঁড় উল্ফ স্যাংচুয়ারি”।

এমন একটি পোশাকি নাম থাকলেও ভারতীয় নেকড়েদের জন্য সংরক্ষিত এই বনাঞ্চলটি প্রচারের কোনো আলোই পায়নি এযাবৎকাল। খুব কম মানুষই এই অভয়ারণ্যের নামের সাথে পরিচিত। ভারতবর্ষের সমতলভূমির এই নেকড়েদের বাসস্থান অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংরক্ষিত অভায়ারণ্য ও জাতীয় উদ্যানের বাইরে।

এমনকি প্রায়শই এদের বিচরণক্ষেত্র মনুষ্যবসতি ও কৃষিজমির মধ্যে চলে আসে। তখন ছাগল, বাছুর এসব গবাদি পশুকে সহজ শিকার হিসেবে বেছে নেয় এরা। ফলে মানুষের সঙ্গে সংঘাত হয়ে ওঠে অনিবার্য।

indian-grey-wolf-নেকড়ে
হরিণ শিকাররত Grey Wolf ছবি –Shyamala Kumar

তাই এদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে দ্রুত হারে। এমতাবস্থায় সংরক্ষণের যথাযথ প্রয়োগ না হলে এই প্রজাতিটির অস্তিত্ত কিন্তু প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়তে বাধ্য, কারণ ইতিমধ্যেই এটি ভারতবর্ষের বন্যপ্রাণ আইন, ১৯৭২-এর সিডিউল – ১-এর অন্তর্ভূক্ত হয়েছে বিপন্নপ্রায় প্রজাতি হিসেবে। তবুও বাস্তবে বাঘ, একশৃঙ্গ গন্ডার, ভারতীয় সিংহ বা হাতির ক্ষেত্রে সংরক্ষণের যে প্রয়াস চোখে পড়ে, এই ভারতীয় নেকড়েদের ক্ষেত্রে সেই প্রয়াস শুধু সিডিউল – ১-এ অন্তরভুক্তিকরণ অবধি এসেই থেমে যায়।

মহুয়াডাঁড়ের এই সংরক্ষিত অরণ্যেও তাই এই নেকড়েরা আদপে সংরক্ষণের রক্ষাকবচহীন। সুমারি সাম্প্রতিককালে আর হয়নি। তাই নেকড়ের সঠিক সংখ্যা অনুমান নির্ভর।

স্থানীয় প্রকৃতবিদরা অভয়ারণ্যটিতে নেকড়ের গুহার সংখ্যা গুনে একটি হিসেব করে থাকেন। এই বনাঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে থাকা নেকড়েদের গুহাগুলির প্রতিটি যদি একজোড়া প্রজননক্ষম নেকড়ে দ্বারা অধিকৃত হয় তবে ধরে নেওয়া যেতে পারে ওই গুহার সংখ্যার দ্বিগুনের আশেপাশে হবে বর্তমান নেকড়ে সংখ্যা। তবে শাবক, অপরিণত নেকড়ে ও বয়স্ক নেকড়ের সংখ্যার হিসেব এভাবে অনুমান নির্ভর হবে না।

তাই সঠিক সংখ্যা না জানলে সংরক্ষণের অন্যতম প্রধান শর্তই তো বিঘ্নিত হয়। ২০০৯-এ শেষ এখানে সুমারি হয়েছিল। ২০০৪ সালের সুমারিতে ৫৬৮টি নেকড়ের উপস্থিতি জানা গিয়েছিল। আশ্চর্যজনক ভাবে ২০০৯তে এই সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ৫৮তে। অতিদ্রুত সুমারির ব্যবস্থা করে বর্তমানে এদের সংখ্যা ঠিক কত তা জানা অত্যন্ত জরুরি।

indian-grey-wolf-নেকড়ে
Grey Wolf-এর দল। ছবি –Indrajeet Ghorpade

কিন্তু এই অভয়ারণ্যটিতে নেকড়ের দলের ভবিষ্যৎ বেশকিছু বাস্তব সমস্যার ওপর নির্ভরশীল। সুমারি তো দুরের কথা, এই বনাঞ্চল মাওবাদী উপদ্রুত হওয়ায় বনরক্ষী ও বনাধিকারিকরা গা’ বাঁচিয়েই চলেন। বনপ্রহরা না হওয়ারই শামিল। মাওবাদী সমস্যা তাই নির্বিঘ্ন চোরাশিকারের রাস্তা খুলে দেয়। একটু সদিচ্ছা থাকলে নিশ্চই প্রশাসন ও বন দপ্তর সমস্যার আংশিক সমাধান করতে পারেন।

দৃষ্টান্ত তো আমাদের দেশেই রয়েছে। আসামের মানস জাতীয় উদ্যান আজ বড়োল্যান্ড আন্দোলনের ক্ষত সারিয়ে আবার তার বন্যপ্রাণকে পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে। আশির দশকের শেষ থেকে প্রায় দুহাজার তিন সাল অবধি বড়োল্যান্ড আন্দোলনের জেরে অবাধ চোরাশিকার এখানকার বন্যপ্রাণকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল।

কুড়ি বছরের ক্ষত পরবর্তি কুড়ি বছরে ধীরে ধীরে নিরাময় হয়েছে। এই দৃষ্টন্ত অনুসরন করে মহুয়াডাঁড়ের ক্ষেত্রেও গঠনমুলক কিছুই কি করা সম্ভব নয়? প্রশ্ন জাগে।

কার্যক্ষেত্রে এই অঞ্চলের বন ও বন্যপ্রাণ নিয়ে মাথা ঘামানোর থেকেও যে বিষয়টি গুরুত্ব বেশি পায় তা হল এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ খনিগুলি থেকে লোহা, বক্সাইট, তামা ইত্যাদির আকরিক উত্তোলন।

মহুয়াডাঁড়ের দুই-তিন কিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে ঝাড়খন্ডের ওরসা ও চির কুকুদ খনি, যেখানে বক্সাইট উত্তোলন চলছে প্রায় আশির দশক থেকে। ২০১৯ সালে ভারত সরকার পরিবেশ মন্ত্রক এই অভয়ারণ্যটির আশেপাশের কিছু অঞ্চলকে “ Eco Sensitive Zone” হিসেবে নির্দিষ্ট করেছিল, যেখানে এই ধরনের কার্যকলাপ নিষিদ্ধ। তবুও স্থানীয়রা জানিয়েছেন আংশিকভাবে বক্সাইট উত্তোলন হয়েই চলেছে। অভয়ারণ্যটি যেহেতু ঝাড়খন্ড ও ছত্তিশগড়ের সীমানা বরাবর তাই ওরসা খনির উত্তোলন কাজ বন্ধ হলেও অরণ্য লাগোয়া ছত্তিশগড়ের বলরামপুর জেলায় এখনও তা অব্যাহত।

এখানে রয়েছে বিড়লা গোষ্ঠীর হিন্দালকোর বেশ কয়েকটি বক্সাইট খনি। এই ধরনের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর ব্যবসায়িক কার্যকলাপ পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার নয়। তাদের রক্ষাকবচ তো দিয়েই রেখেছে পরিবেশ ও বন দপ্তর। দূষণ নিয়ন্ত্রন পর্ষদের ছাড়পত্রও তারা পেয়েছে। যদিও পরিবেশ মন্ত্রকের ছাড়পত্র বন্যপ্রাণ আইন ১৯৭২-এর অনুমতি সাপেক্ষ, যা বন্যপ্রাণ আইন মোতাবেক তারা পেয়েছে কিনা তা পরিষ্কার নয়।

indian-grey-wolf
ছবি –Indrajeet Ghorpade

ভারতীয় নেকড়েদের জন্য এই সংরক্ষিত আবাসে তাই তাদেরই পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ বড়ই অস্পষ্ট। বিপন্ন পরিবেশ, চোরাশিকারের বাড়-বাড়ন্ত, বাসস্থানের সংকোচন এবং সর্বোপরি বন্যপ্রাণ রক্ষকদের চূড়ান্ত অবহেলা – ‘আকেলা’কে আজ কোন ‘শের খান’ বাঁচাবে কে জানে!

লেখা – স্বাগতা সরকার

ইমেল – samratswagata11@gmail.com

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 2

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

বায়ুদূষণ-শিশুমৃত্যু- নারী ও প্রকৃতি

5 (2) শুরুর আগে: ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর, কারণ ইহা ক্যান্সারের কারণ। এই ট্যাগ লাইনটা আমরা সবাই জানি। সময়ের দাবি মেনে এটাকে আরো বড় করে লেখা হোক-“বায়ুদূষণ স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক, কারণ ইহা মানুষের মৃত্যু ও ক্যান্সারের কারণ”। বাড়তে থাকা বৈশ্বিক উষ্ণতা, বরফের গলন, জলবায়ুর পরিবর্তন, সমুদ্র- দূষণের হাত ধরে মানবসভ্যতা […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: