​​​2019 সালে বায়ুদূষণের ফলে ভারতেই ​ মৃত্যু হয়েছে প্রায় 17 লক্ষ মানুষের

environment-pollution

“ধোঁয়া ধুলো ধোঁয়াশায় কই পাখি আকাশে,
মিশে গেছে কতো বিষ সকালের বাতাসে !”

আজকের পৃথিবীর যে দিকে তাকাবেন, শুধুই দূষণ আর দূষণ।

1998 সাল থেকে প্রতিবছরে গড়ে 42 শতাংশ করে দূষণ বেড়েছে দেশে।​​​ এই সব রকম দূষণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় রয়েছে বায়ু দূষণ।

এই দূষণ অন্যতম ভয়ঙ্কর দূষণও বটে কারণ জীবন ধারণের জন্যে নিঃশ্বাস নেওয়া আবশ্যক ! আর সেই প্রাণবায়ুই যখন বিষাক্ত তখন আর উপায় কি ! ভারতের মতো জনসংখ্যার প্রায় 84 শতাংশ মানুষ অর্থাৎ প্রায় 100 কোটির বেশি মানুষ (গ্রাম ও শহরাঞ্চল মিলিয়ে) বায়ু দূষণ প্রবন এলাকায় বসবাস করেন। দেশের সংখ্যাধিক নাগরিকই দূষিত বায়ুকেই বাঁচার জন্যে গ্রহণ করছেন।যা ক্রমশ অশনি সংকেত ডেকে আনছে।

বিশ্বের সর্বাধিক দূষিত শহরের তালিকায় ইতিমধ্যেই ভারত দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। পৃথিবীর 20টি সর্বাধিক দূষণ বহুল স্থানের মধ্যে 14টিই আমাদের দেশের শহর।

রাজধানী শহরের মধ্যে দিল্লির অবস্থা খুব খারাপ বায়ু দূষণে দিল্লি জর্জরিত। কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই,হায়দ্রাবাদ ইত্যাদি শহর গুলির বায়ু ক্রমশই দূষিত হয়ে পড়ছে।

একটি সমীক্ষা করেছেন ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগোর এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট, তাঁরা তৈরী করেছেন এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স। তাঁদের সমীক্ষা অনুযায়ী ভারতীয়রা নিজেদের জীবনের আয়ু 5.2 বছর করে হারাচ্ছে শুধু মাত্র এই বায়ু দূষণের কারণে।

এই সমীক্ষার একটি অনুষঙ্গে তাঁরা জানাচ্ছেন বাতাসের দূষণের পরিমাণ কমানো গেলে দিল্লি এবং কলকাতার মানুষদের গড় আয়ু অতিরিক্ত নয় বছর করে বৃদ্ধি পাবে​​​।​​​
সামগ্রিক ভাবে সব রকম দূষণের ফলেই দেশে গড়ে 1.8 বছর করে আয়ু কমে যাওয়ার সম্ভবনা তৈরী হয়েছে।​​​ ​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​
​​​

দ্যি ল্যানসেট জার্নালে প্রকাশিত সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতে প্রতি আটজনের মধ্যে একজনের মৃত্যুর কারণ বায়ু দূষণ এবং এই ঘটনা 2017 সাল থেকেই হয়ে আসছে।​​​ ​​​
আমাদের রাজ্যের কথায় আসি একটু, কলকাতা তথা রাজ্য এবং সারা পৃথিবীর বায়ু দূষণের মূল সমস্যা হলো বাতাসের ভাসমান ধূলিকণা। যা পি.এম. নামে পরিচিত।

দুই -রকমের পি.এম. বা পার্টিকুলেট ম্যাভা দেখা যায় । ​​​যথা : পিএম 10 যার ব্যাস 10 মাইক্রোমিটার বা তার কম। যা নিঃশ্বাসের সঙ্গে নাকে বা মুখে প্রবেশ করলেও ফুসফুস পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারে না।

এই ধরণের ভাসমান ধুলকণা খুব বেশি মারাত্মক নয়! এদের গড় দৈনিক নিরাপদ মাত্রা হলো প্রতি ঘনমিটারে 100 মাইক্রোগ্রাম। অপেক্ষাকৃত সূক্ষ্ম ধূলিকণা পিএম 2.5, যাদের ব্যাস 2.5 মাইক্রোমিটার বা তার কম, ফলে এই কণা গুলি সহজেই শ্বাসনালী ও ফুসফুসে প্রবেশ করে।

একবার ফুসফুসে প্রবেশ করলে আর কোনো ভাবেই এদের ফুসফুস থেকে অপসারণ করা যায় না। এদের নিরাপদ দৈনিক মাত্রা হলো প্রতি ঘনমিটার 60 গ্রাম। শীতকালে বাতাসে এই ভাসমান ধূলিকণার পরিমাণ নির্ধারিত মাত্রার প্রায় তিন গুন বেশি থাকে, দূষণের মাত্রাও বেশি থাকে।

এই পিএম 10 এবং পিএম 2.5 এর উৎস সম্পর্কে অনুসন্ধান চালিয়েছে ন্যাশনাল এনভারমেন্টাল ​ ইঞ্জেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট। 2013-2018 এর মধ্যে তাঁদের ধারাবাহিক সমীক্ষায় কলকাতা শহরের বায়ু দূষণের নয়টি প্রধান উৎস পাওয়া গিয়েছে।

লক্ষণীয় ভাবে রাস্তাঘাট পরিবহন থেকে 58 শতাংশ এবং গৃহস্থালি বিভিন্ন বিষয় থেকে 13 শতাংশ পিএম 10 বায়ুতে মেশে। পিএম 2.5 প্রধানত​​​ রাস্তা থেকে 25 শতাংশ, গৃহস্থালি থেকে 28 শতাংশ এবং পরিবহন থেকে 23 শতাংশ বাতাসে মিশে বায়ু দূষণ ঘটায়।​​​ ​​​​​​​​ ​​​​​​ ​​​​​ ​​​​​ ​​​​ ​​​ ​​​​​​​​ ​​​​​​​​​​​ ​​

এই বায়ু দূষণ মৃত্যু ডেকে আনছে বিপুল সংখ্যক মানুষের, মানব সম্পদের ব্যাপকহানি ঘটছে।​​​
​​​​​​​​​​​​​​​​​​​
2017 সালে ভারতেই শুধু মাত্র বায়ুদূষণের কারণে 12.4 লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, সেই সংখ্যার বিপুল পরিমানে বৃদ্ধি পেয়েছে ক্রমাগত​​। ​​​2019 সালেই শুধু মাত্র বায়ুদূষণের ফলে ভারতেই ​ মৃত্যু হয়েছে প্রায় 17 লক্ষ মানুষের।

 

সমগ্র দেশের নিরিখে যা দেশের মোট মৃত্যুর 18 শতাংশ। এই করণেই ভারতের বার্ষিক​ জাতীয় গড় উৎপাদনের (G.D.P) 1.4 শতাংশ ক্ষতি হয়েছে। ভারতীয় মুদ্রায়​ যার আর্থিক মূল্য প্রায় 2.6 লক্ষ কোটি টাকা।​​​

দূষণের কারণে উত্তর এবং মধ্য ভারতের রাজ্যগুলোর জিডিপর উপর প্রভাব পড়েছিল সর্বাধিক​। উত্তর ভারতের রাজ্য গুলির সর্বাধিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার কারণ হলো ওই সমস্ত অঞ্চলের বাতাসে পিএম 2.5 বা তার কমে বিরাজ করে অধিকাংশ সময়ে।​​​ ​

আর্থিক ক্ষতির পরিমানের নিরিখে রাজ্যগুলোর মধ্যে ​সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছিলো উত্তরপ্রদেশে তাদের রাজ্যের মোট জিডিপি-র প্রায় 2.2শতাংশ ।  তার পরেই রয়েছে বিহার, সংখ্যাতত্ত্ব-এর নিরিখে বিহারের ক্ষতির পরিমান বিহারের মোট ​​জিডিপি-র প্রায় 2 শতাংশ।

বায়ুদূষণের কারণে স্বাস্থ্য এবং দেশের অর্থনীতির উপর কী প্রভাব পড়েছে তা নিয়ে একটি তথ্য সমীক্ষা সম্প্রতি প্রকাশ করেছে দ্য ইন্ডিয়া স্টেট-লেভেল ডিজিজ বার্ডেন ইনিশিয়েটিভ। তাঁদের সমীক্ষা অনুযায়ী, ​দেশের মোট জিডিপি-র 0.4 শতাংশ দূষণ সংক্রান্ত রোগের চিকিৎসাতেই ব্যয় হয়।

এই সমীক্ষায় অনুযায়ী, ভারতে ঘরের দূষিত বাতাস থেকে যে রোগ হয়, তার মাত্রা কমলেও বাইরের অর্থাৎ পরিবেশের দূষণের ফলে যেসব রোগ হয় সেই রোগের পরিমান বহুগুনে বেড়ে গিয়েছে ।

সংখ্যাতত্ত্বর হিসেবে 1990 থেকে 2019 ​​​​ পর্যন্ত প্রায় তিন দশকে,​ ঘরোয়া দূষণ জনিত রোগে মৃত্যুর হার 64 শতাংশ কম হয়েছে। কিন্তু এই সময়েই বাইরের দূষণ জনিত রোগে মৃত্যুর হার 115 শতাংশ বেড়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বায়ু দূষণ সংক্রান্ত রোগের মধ্যে 40 শতাংশই ফুসফুসের রোগ। 60 শতাংশ হলো হৃদরোগ ও অন্যান্য রোগ।​​​ ​​​
​​
সমীক্ষায় অনুযায়ী, 2019 দূষণের কারণে ভারতে মোট মৃত্যুর 32.5 শতাংশ দীর্ঘ মেয়াদি অবস্ট্রাকটিভ ​পালমোনারি ডিজিজ (C.O.P.D.), 29.2 শতাংশ ​ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ (C.H.D.), 16.2 শতাংশ স্ট্রোকের কারণে হয়েছে। এছাড়াও 36.6 শতাংশ ফুসফুস সংক্রান্ত রোগ, 14.2 শতাংশ লোয়ার রেসপিরেটরি ইনফেকশন, 1.2 শতাংশ ফুসফুস ক্যানসার, 24.9 শতাংশ ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ, 14.1 শতাংশ কার্ডিয়াক ​স্ট্রোক , 8.9 শতাংশ ডায়াবাটিস, 13.3 শতাংশ নিওনেটাল ডিসঅর্ডারস এবং 2.7 শতাংশ ​ক্যাটারাক্ট-এর কারণে রোগীদের মৃত্যু হয়েছে যার নেপথ্যে রয়েছে দূষন।​​​

এই সমীক্ষা থেকে জানা যাচ্ছে, ভারতের মোট জি.ডি.পি-র 3.8 শতাংশ চিকিৎসা খাতে খরচ হয়। তার সঙ্গেই রয়েছে আরেকটি পরিসংখ্যান ভারতের মোট জি.ডি.পি-র 1.36 শতাংশ যা ভারতের বায়ু দূষণ ও তার মোকাবিলা এবং বায়ু দূষণ সৃষ্ট রোগ নিরাময় খাতে ব্যায় হয়। অর্থাৎ বায়ু দূষণ সংক্রান্ত বিষয়ে ভারতের মোট জি.ডি.পি-র 1.36 শতাংশ খরচ হয়।​​​

এই করোনা এবং লকডাউনে কিন্তু দূষণ বৃদ্ধিও পেয়েছে ,দুটো সমীক্ষার কথা বলি। প্রথম সমীক্ষাটি প্রকাশ করেছে ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউটের ভারতীয় শাখা। বিশ্বের 50 টিরও বেশি দেশে কর্মরত এই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সমীক্ষা অনুযায়ী, 25 শে মার্চ ভারতে লকডাউন জারি হয়ে যাওয়ার ফলে,​ পরিবারের সকলে একসঙ্গে বাড়ির মধ্যে থাকায় রান্নার পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

যার জেরে হাউজহোল্ড এয়ার পলিউশন (HAP) নিঃশব্দেই গড়ে প্রতিদিনই বাড়ছে, এইভাবেই 150 টন সূক্ষ্ম ধোঁয়া-ধূলিকণা ছড়িয়েছে ঘরের মধ্যের অভ্যন্তরীণ পরিবেশে। তার জেরেই অসুস্থতাও ক্রমশ বাড়ছে। যার প্রমাণ মিলেছে দ্বিতীয় সমীক্ষায়; বেঙ্গালুরুর কেম্পেগৌড়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস-এর গবেষকদের গবেষণা অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে এই কয়েকমাসে ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD) আক্রান্তের সংখ্যা পুরুষদের মধ্যে 5.32 শতাংশ এবং মহিলাদের মধ্যে 3.41 শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যার নেপথ্যে হাউজহোল্ড এয়ার পলিউশন (HAP) বেড়ে যাওয়াই অন্যতম কারণ, বলে গবেষকদের ধারনা।

ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউটের ভারতীয় গবেষকেরা আরও দাবি করেছেন, ঘরের ভেতরের বাতাসে ছড়িয়ে থাকা এই ধোঁয়া-ধূলিকণা এতটাই সুক্ষ্ম যে, সহজেই সেগুলি শ্বাসনালীর পথে সরাসরি ফুসফুসে পৌঁছে ফুসফুস এবং হৃদযন্ত্রে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে! এই ঘটনাই করোনাভাইরাস সংক্রমণ জনিত কোমর্বিডিটির অন্যতম কারণ।

135 কোটির,​ দেশের 78% মানুষ যেখানে কাঠ-কয়লা-গোবরের মতো ‘কঠিন জৈব জ্বালানি’ ব্যবহার করে থাকে, সেখানে লকডাউনের সময় তাঁদের আরও বেশি করে সাবধান হওয়ার প্রয়োজনীয়তা ছিল।

আরেকটি সমীক্ষায়​ ভয়ঙ্কর খবর সামনে এসেছে, পার্টিকুলেট ম্যাটার ২.৫ -র ক্ষেত্রে মার্কিন এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সির ন্যাশনাল অ্যাম্বিয়েন্ট এয়ার কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রমান মান হিসেবে ( 2020 সালের প্রমান মান) যেখানে দৈনিক ভিত্তিতে (প্রতি 24 ঘণ্টায়) 35 মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার এবং দীর্ঘকালীন ভিত্তিতে 12 মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার ধরা হয়েছিলো।

সেখানে লকডাউনের সময় দেশে দৈনিক ভিত্তিতে বাতাসে পার্টিকুলেট ম্যাটার ২.৫ -র ক্ষেত্রে; 163-600 মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটারের মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে। যার ফলে অনুমান করা যায় আগামীদিনে দেশবাসীর মারাত্মক শারীরিক দুর্ভোগ ও রোগব্যাধি অনিবার্য্য।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, লকডাউনের সময়ে পার্টিকুলেট ম্যাটার ২.৫ -এর নির্গমনের পরিমাণ গড়ে 8,​600-8,​750 টন বেড়ে গিয়েছে। রাজ্য গুলির মধ্যে, ​পিএম 2.5 নিষ্ক্রমণের পরিমান ​কেরল (প্রতিদিন20 টন), মহারাষ্ট্র (প্রতিদিন15 টন) এবং পশ্চিমবঙ্গ (প্রতিদিন 14 টন) এবং ঝাড়খণ্ড (প্রতিদিন 12 টন)।​​​

এই ধরনের দূষণের নিরিখে এই রাজ্য গুলোই দেশের মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে। জানা যাচ্ছে সদ্যোজাত শিশু এবং পাঁচ বছরের কমবয়সী বাচ্চাদের এবং বয়স্ক নাগরিকদের মধ্যে এই HAP- এর কারণে শারীরিক সমস্যা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা সবথেকে বেশি।

লেখকঃ সৌভিক রায়

তথ্যসুত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

 

Leave a Reply

%d bloggers like this: