আইফেল টাওয়ার (The Eiffel Tower)

@@
5
(1)

১৮৮৯ সালে ফরাসী বিল্পবের শতবার্ষিকী উদযাপনের জন্য নানান পরিকল্পনা গ্রহণ করে তৎকালীন ফ্রান্স সরকার। বিশ্বের কাছে ফ্রান্সকে নতুন করে তুলে ধরতে রাজধানী প্যারিসে বিশ্বমেলার আয়োজনের কথা ভাবা হয়।

শতবর্ষ উদযাপনের এই আয়োজনটিকে স্মরণীয় করে রাখবার বিভিন্ন পরিকল্পনার হাত ধরেই আসে এক টাওয়ারের ভাবনা। মূলত বিশ্বমেলার প্রবেশদ্বার হিসেবেই অস্থায়ীভাবে ২০ বছরের জন্য এই স্থাপত্য নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল।

এই স্থাপত্য নির্মানের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয় তখনকার সময়ে প্যারিসের অন্যতম সফল প্রকৌশলী গুস্তাভ আইফেলকে। মূলত তার নাম অনুসারেই আইফেল টাওয়ারের নামকরণ করা হয় পরবর্তীতে।

সেই থেকে আজ অবধি আইফেল টাওয়ার (The Eiffel Tower) সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে প্যারিসের বুকে। আইফেল টাওয়ার নির্মাণে আরো দুজনের কথা না বললেই নয়; আর তারা হলেন – প্রকৌশলী মরিস কোচিন ও এমিল নুগুইয়ার। আইফেল টাওয়ারের নকশার কৃতিত্ব মূলত এই দুজনারই। কেননা, দুজনই ছিলেন গুস্তাভ আইফেলের ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মের চিফ ইঞ্জিনিয়ার।

১৯ শতকের স্থাপত্যগুলোর মধ্যে আইফেল টাওয়ার একদমই অনন্য আর সেরা। এই দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য আজও মানুষকে মুগ্ধ করে দেয়। আধুনিকতা আর প্রযুক্তির অপূর্ব নিদর্শন হচ্ছে বিশ্বসেরা আইফেল টাওয়ার। ১৮৮৭ সালের ২৮ জানুয়ারি এই স্থাপনার কাজ শুরু হয়; আর শেষ হয় ১৮৮৯ সালের ৩১ মার্চ। স্থাপত্যটি নির্মাণে সময় লেগেছিল মাত্র ২ বছর ২ মাস ৫ দিন।

যার মধ্যে ৫ মাস কেবল মাটির নিচে ফাউন্ডেশনের ভিত শক্ত করার কাজেই ব্যয় হয়েছিল। স্থাপত্যশৈলীর ভাবনা আর প্রযুক্তির কল্যাণে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল অপূর্ব এই সৃষ্টি। প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রতীক হিসেবে আইফেল টাওয়ার তার ভাবমূর্তি অটুট রেখেছে আজ অবধি। উনিশ শতকের শেষ অবধি এটিই ছিল গুস্তাভ আইফেল নির্মিত ফরাসি প্রকৌশলের সেরা নিদর্শন। সেই থেকে আজ অবধি, সারা বিশ্ববাসীর কাছে এটা অন্যতম আকর্ষণীয় দ্রষ্টব্য হয়ে উঠেছে। তৈরি হয়েছে রূপকথা।

শিল্পের শহরে এমন কীর্তি যুগে যুগে আকৃষ্ট করেছে শিল্পী থেকে সাধারণ মানুষকে। ভ্যান গঘ, অস্কার ওয়াইল্ড, চার্লস ডিকেন্স প্রমুখরা তাঁদের মুগ্ধতার কথা ব্যক্তও করে গেছেন। তবে এই টাওয়ার স্থাপনের পর বিরক্তও হয়েছেন অনেকে। সে কথায় পরে আসছি।

প্যারিসের আইফেল টাওয়ার(ফরাসি ভাসায়: La Tour Eiffel লা তুর ইফেল) পৃথিবীর বিখ্যাত কাঠামোর একটি এবং ফ্রান্সের অন্যতম এক প্রতীক ।গুস্তাভো আইফেলের নির্মিত ৩০০ মিটার(৯৮৬ ফুট) উচ্চতার এই টাওয়ার

১৯৩০ সালে নিউইয়র্কে ‘ক্রাইসলার বিল্ডিং’ টির (Chrysler Building) নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত আইফেল টাওয়ারই ছিল পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থাপনা।

আইফেল,রেলের জন্য সেতু ডিজাইন করতেন,টাওয়ারটি নির্মাণে তিনি সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছিলেন। তাঁর নামানুসারেই টাওয়ারটির নাম রাখা হয়েছিলো ‘আইফেল টাওয়ার’।১৮,০৩৮ টি লোহার বিভিন্ন আকৃতির ছোট ছোট কাঠামো জোড়া লাগিয়ে এই টাওয়ার তৈরি করতে ৩০০ কর্মীর প্রয়োজন হয়েছিল।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, ১৮৮৯ সালের ৩১ মার্চে মাত্র দুই বছর, দুই মাস, দুই দিনে টাওয়ারটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছিল। এতো উঁচু আর এমন আকৃতির টাওয়ার বানাতে কিন্তু খুবই কম শ্রম ব্যয় করা হয়েছে। এই টাওয়ারের নির্মাণ কাজটি পূর্তবিদ্যা (Civil Engineering) ও স্থাপত্যশিল্পের ক্ষেত্রে এক বিপ্লবের সূচনা করেছিলো।

১৯০৯ সালে এর চুড়ায় বসানো হয় একটি বেতার এন্টেনা। এতে তার উচ্চতা আরও ২০.৭৫ মিটার (৬৬ ফুট) বেড়ে যায়। সেই থেকে আইফেল টাওয়ারকে বেতার তরঙ্গ প্রেরণের (Radio Transmision) জন্যও ব্যবহার করা হচ্ছে। পরে আইফেল টাওয়ারে একটি টিভি এন্টেনাও সংযোজন করা হয়েছে।

প্যারিসের আইফেল টাওয়ার ইতিমধ্যে পার করল ১৩০ বছর। এ টাওয়ার তৈরির সময় কিন্তু মানুষকে তত আকর্ষিত করতে পারেনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। শুরুতে এটি যেন একটি ধাতব বস্তুর চেয়ে খুব বেশি কিছু ছিল না। কাল প্রবাহে এ আইফেল টাওয়ার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস নগরীকে সারা বিশ্বে এক অনন্য মর্যাদা এনে দিয়েছে। এ টাওয়ার বিশ্ববাসীর কাছে অন্যতম আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে টাওয়ার চালু হওয়ার পর শহরের মানুষ বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, প্যারিসের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে গেল। বিশিষ্টজনরা গর্জে উঠেছিলেন, এ যেন এক দৈত্য শহরের লজ্জা। এমনকি কমিটি গড়ে রীতিমত আইফেল টাওয়ার হটাও আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছিল।

প্যারিসের যাবতীয় আকর্ষণ অনেকটা নিজেই টেনে রেখেছে আইফেল টাওয়ার। তার ফলে ল্যুভঁ মিউজিয়াম, নত্রেঁ ডাম চার্চ, আর্ক দে ট্রায়ম্ফের মতো বিখ্যাত জায়গাগুলি কিছুটা হলেও চাপা পড়ছে। সেটা মেনে নিতে রাজি নয় অনেকেই। অনেকে এটাও মনে করেন যে প্যারিসের মতো শিল্পের শহরে এই ১,০৬৩ ফুট উঁচু লোহার টাওয়ার একেবারেই বেমানান। প্যারিসের ঐতিহ্যের সঙ্গে একেবারেই যায় না। এমনকি, এই মত যারা পোষণ করেন, তাঁদের ‘কমিটি অফ থ্রি হান্ড্রেড’ নামের একটি নিজস্ব সংগঠনও আছে।

Eiffel-Tower

শুধু কি সাধারণ মানুষ? মঁপাসার মতো কিংবদন্তি লেখকও আইফেল টাওয়ারের ওপর বেজায় খাপ্পা ছিলেন। এতটাই ছিলেন যে ‘আয়রন লেডি অফ প্যারিস’-এর সামনেও কখনও আসতেন না। খাওয়ার সময়ও যাতে তাকে দেখতে না হয়, তাই তিনি বের করেছিলেন একটি চমকপ্রদ উপায়। খোদ আইফেল টাওয়ারের তলায় রেস্তোরাঁয় খেতেন তিনি। যাতে সামনে, পাশে তাকালে এটিকে চোখে না পড়ে। শুধুমাত্র এর কারণেই তিনি প্যারিস ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।

নির্মাণের সময় এটি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু স্থাপনা ছিল। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আইফেল টাওয়ারের অনুকরণে রেপ্লিকা টাওয়ার নির্মাণ করা আছে। সবচাইতে বড় রেপ্লিকাটি রয়েছে যুক্তরাষ্টের লাস ভেগাসে। যার উচ্চতা ৫৪১ ফুট। এটি ১৯৯৯ সালে বিলাসবহুল হোটেল-ক্যাসিনো কমপ্লেক্সের কাছে নির্মাণ করা হয়। আজকের যুগে আইফেল টাওয়ার এর থেকেও বেশি উচ্চতার স্থাপনা থাকলেও নিজের অনন্যতা ধরে রেখেছে আইফেল টাওয়ার।

যে আইফেল টাওয়ার নির্মান করা হয়েছিল মাত্র ২০ বছরের জন্য তা আজ বিশ্ব সেরা দ্রষ্টব্যের অন্যতম । ১৮৮৯ সাল থেকে এখন অবধি প্রায় ৩০০ মিলিয়ন দর্শনার্থী আইফেল টাওয়ারে এসেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুভির শুটিং স্পট হিসেবে ব্যবহৃত হয় আইফেল টাওয়ার।

সারা বছর জুড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা সেমিনারের আয়োজন করা হয় আইফেল টাওয়ারকে ঘিরে। বর্তমান বিশ্বে আইফেল টাওয়ার থেকে উঁচু টাওয়ার থাকলেও আইফেল টাওয়ার সবার সেরা হয়ে রয়েছে নিজস্ব বৈচিত্র্যে। আর তাই বিশ্ব মানচিত্রে আইফেল টাওয়ার এক ও অনন্য।

আজ ১৫ ই ডিসেম্বর।১৮৩২ সালের আজকের দিনে গুস্তাভ আইফেল জন্মগ্রহণ করেন ।তাঁর জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি 🙏।

 

পঞ্চানন মণ্ডল পঞ্চানন মন্ডল

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

কম্পিউটারের জনক কে ?

5 (1) কম্পিউটারের জনক কে ? প্রশ্নটি বিতর্কিত । আসলে বছরের পর বছর ক্রমোন্নতির এক সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কম্পিউটার আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। আসলে শুধু একজন নয়, অনেকের অবদানেই ঋদ্ধ এই কম্পিউটার! সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, সর্বপ্রথম কম্পিউটার শব্দটি দ্বারা কোনো যন্ত্রকে বোঝাতো না। বরং যারা হিসাব-নিকাশের কাজ করতো, […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: