বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড জেনার

১৭৯৬ সালের মে মাস ।   চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসের একটি অত্যন্ত স্মরণীয় মাস । ইংল্যান্ডের বার্কলিতে একজন চিকিৎসক একদিন লক্ষ্য করেন যে, বাড়ি বাড়ি গরুর দুধ দিয়ে বেড়ানো গোয়ালার দেহে স্মলপক্স অর্থাৎ গুটিবসন্ত রোগের সংক্রমণ হয়নি।
আশেপাশের মানুষজন গুটিবসন্তে আক্রান্ত হচ্ছে, কিন্তু প্রচন্ড সংক্রমণশালী এই গুটিবসন্ত মেয়েটিকে কিছুতেই সংক্রমণ করতে পারছে না। তখনকার দিনে শতবছর ধরে টিকে থাকা এ রোগে মানুষের মৃত্যুহার ছিলো অনেক বেশি। করোনা এর কাছে নস্যি! !গত শতাব্দীতেও প্রতি দশজনে তিনজনের মৃত্যু হতো, এতটাই ভয়ানক এক রোগ এই গুটিবসন্ত।
তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি এই মেয়েটিকে পরীক্ষা করে দেখবেন, কোনো একভাবে নিশ্চয়ই মেয়েটির শরীরে গুটিবসন্ত সৃষ্টিকারী ভ্যারিওলা ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা তৈরি হয়েছে।
যদি সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি পুনরায় তৈরি করা যায়, তবে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচানো যাবে।এই বিষয়টিকে খতিয়ে দেখতে একদিন মেয়েটির বাড়ি যান। তিনি দেখতে পান যে, মেয়েটির বাড়িতে গরুগুলো সবই গোবসন্তে আক্রান্ত। গুটিবসন্তের মতো গরুতেও একধরনের বসন্তরোগ হয়ে থাকে, এরই নাম ছিলো গোবসন্ত। গরুর শরীরেও তরলপূর্ণ ছোট ছোট গুটি দেখা যেতো।
তিনি বুঝতে পারেন যে, হয়তো কোনোভাবে গরুটির সংস্পর্শে থেকে মেয়েটির শরীরে গোবসন্ত সংক্রমিত হয়েছে, গোবসন্ত মানবদেহে কোনো রোগ তৈরি করতে পারেনি, একইসাথে গুটিবসন্তের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
ভাবলেন এই ধারণাটি তিনি নিজে পরীক্ষা করে দেখবেন। ৮ বছর বয়সী একটি বাচ্চা ছেলের দেহে তিনি একটু ক্ষতসৃষ্টি করে সেখানে গোবসন্তের ক্ষত থেকে সংগৃহীত তরল লাগিয়ে দেন। বাচ্চাটির ক্ষতস্থানটি তাৎক্ষণিক ভাবে ফুলে উঠলেও কিছুদিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যায় সবকিছু।
কিছুদিন পর বাচ্চাটির দেহে আবারো একইভাবে জীবাণু প্রবেশ করান। তবে এবার গোবসন্তের জীবাণু নয়, তরতাজা গুটিবসন্তের জীবাণু !! বাচ্চাটি অল্প অসুস্থ হয়ে কদিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠে, গুটিবসন্ত শিশুটিকে আর আক্রান্ত করতে পারছে না। এভাবে গুটিবসন্তের কবল হতে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব।
রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপণাকে নির্ভর করতে হয় মানবদেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর। মানবদেহের সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যবস্থা হলো তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। খুবই শক্তিশালী এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
নির্দিষ্ট অণুজীব যা দিয়ে প্রতিনিয়ত আমরা রোগে আক্রান্ত হই, কোনোভাবে যদি অণুজীবগুলোর সাথে দেহকে আগেই পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায়, তবেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি সেসব অণুজীবের বিরুদ্ধে কাজ করে সক্ষম হবে। মানব ইতিহাসের প্রথম টিকা গুটিবসন্ত টিকা আবিষ্কারের সময়, ঠিক এই ধারণাটিই কাজে লাগিয়েছিলেন সেই চিকিৎসক বিজ্ঞানী।
ভ্যারিওলা ভাইরাস বসন্ত রোগ সৃষ্টি করে, এর ভিন্ন দুইটি টাইপের (এই ভাইরাসের সর্বমোট ৪টি টাইপ রয়েছে) একটি থেকে গরুদের, আরেকটি থেকে মানবদেহে বসন্ত রোগ সৃষ্টি করে । গরুদের ভাইরাস মানবদেহে উপস্থিত থাকার কারণে অন্য টাইপটি বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারে না। আর গোবসন্তের জীবাণুও মানবদেহে রোগ তৈরিতে অক্ষম। কেবলমাত্র এই ধারণাকে ব্যবহার করেই তৈরি করা হয়েছে অন্যান্য রোগের টিকাগুলো। ১৮৮৫ সালে লুই পাস্তুর যখন জলাতঙ্কের প্রতিষেধক আবিষ্কার করেন , তিনিও এই পদ্ধতি অনুসরণ করেন।
গুটিবসন্তের বিরুদ্ধে এই টিকা আবিষ্কারের খবর দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সব এলাকায় চিকিৎসকরা একইভাবে মানুষকে টিকা প্রদান করতে শুরু করেন।
এই মহান চিকিৎসক বিজ্ঞানী হলেন এডওয়ার্ড জেনার (Edward Jenner ) ( ১৭ মে ১৭৪৯-২৬ জানুয়ারি ১৮২৩)।
যিনি গুটিবসন্ত রোগের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পথিকৃৎ, যা মানবজাতির প্রথম ভ্যাকসিন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক নতুন ইতিহাস তৈরি করলেন।
এডোয়ার্ড জেনার ( Edward Jenner ১৭ মে, ১৭৪৯ – ২৬ জানুয়ারি, ১৮২৩) ছিলেন একজন ইংরেজ চিকিৎসক এবং বৈজ্ঞানিক, যিনি গুটিবসন্ত রোগের ভ্যাকসিন আবিস্কারের পথিকৃৎ। তিনি   গ্লৌচেস্টারশায়ারের বার্কলেতে জন্মগ্রহণ করেন ।
তাঁর বাবা ছিলেন বার্কলের উপাচার্য,এই কারণে জেনারের প্রাথমিক শিক্ষা ভাল ভাবেই সম্পন্ন হয় । তিনি যখন স্কুলে পরতেন তখন তাকে স্মল পক্সের জন্য ভারিওলেসন> (আদিম টিকাদান পদ্ধতি) করা হয়, যা তার স্বাস্থ্যে সুদূর প্রভাব ফেলেছিল ।
১৪ বছর বয়সে তাকে শিক্ষানবিশ হিসেবে সার্জন ড্যানিয়েল লুডলর কাছে পাঠানো হয় যেখানে তিনি নিজে সার্জন হিসেবে প্রয়োজনীয় সমস্ত শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা লাভ করেন । ১৭৭০ সালে জন হান্টারের অধীনে সেন্ট জর্জ হাসপাতালে তিনি সার্জারি ও অ্যানাটমি বিভাগে যোগদান করেন ।
হান্টারই তাঁকে ন্যাচারাল হিস্ট্রির সাথে পরিচয় করিয়ে দেন এবং রয়াল সোসাইটিতে তাঁর নাম প্রস্তাব করেন । ১৭৭৭ সালের দিকে জেনার বার্কলেতে ফিরে আসেন এবং একজন সফল ডাক্তার এবং সার্জন হিসেবে মানবসেবায় নিজেকে সঁপে দেন ।
এডওয়ার্ড জেনার জাতিতে একজন ইংরেজ। তাঁর জন্ম ও কর্মস্থল ইংল্যান্ডের বার্কলিতে। বার্কলি থেকেই গুটিবসন্ত নিয়ে তার গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার শুরু।
যদিও ছাত্রজীবন থেকেই ভয়াবহ গুটিবসন্ত রোগটি সম্পর্কে তার মনে আগ্রহ ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়।নানা রকম প্রতিকূলতা ও নানা বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হন তিনি তাও তিনি নিজের সাধ্যমতো এগোতে থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত সফলতার মুখ দেখেন।
জেনার তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান ।
শুরুর দিকে রয়্যাল সোসাইটি তাঁর গবেষণাপত্রগুলি গ্রহণ করে নি । কিন্তু বিস্তর গবেষণা আর পরীক্ষা নিরীক্ষার পর তাঁর ২৩টি কেস এর ফলাফল প্রকাশ করা হয়, যার মধ্যে একটি কেস ছিল তাঁর ১১ বছরের ছেলে রবার্টের । তার কিছু সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল, কিছু ভুল; যদিও আধুনিক মাইক্রোবায়োলজি ও আনুবীক্ষন পদ্ধতি তার গবেষণা গুলো আরও নির্ভুল করে তুলতে পারত । শেষ পর্যন্ত ভ্যাকসিনেসন পদ্ধতি স্বীকৃতি পায়, এবং ১৮৪০ সালে ব্রিটিশ সরকার ভ্যারিওলেশন নিষিদ্ধ করে ও বিনামূল্যে ভ্যাকসিনেসন পদ্ধতির সুচনা করে ।
এই সাফল্যের খবর সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে এবং আমেরিকা, ফিলিপিন্স, মাকাও ও চীনে ফ্রাঞ্চকো জাভিয়ার ডি বাল্মিসের অধিনে বাল্মিস মিশনে হাজার হাজার লোককে স্মল পক্সএর টিকা দেওয়া হয় ।
জেনার এর অবিরত গবেষণা তাঁর সাধারণ ডাক্তারি পেশায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় । তার সহকর্মীরা এবং রাজা তাঁকে এ ব্যাপারে সাহায্য করে, এবং ১৮০২ সালে সংসদ এর পক্ষ থেকে তাঁকে ১০,০০০ পাউন্ড দেওয়া হয়, ভ্যাকসিনেসন পদ্ধতির ওপর আরও গবেষণা করার জন্য ।
১৮০৭ সালে রয়্যাল কলেজ অফ ফিজিসিয়ান তাঁর ভ্যাকসিনেসন পদ্ধতির সুদূর প্রসারি অবদানের কথা স্বীকার করলে তাঁকে আরও ২০,০০০ পাউন্ড প্রদান করা হয়
জেনার ছিলেন ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের খুবই প্রিয়ভাজন। নেপোলিয়ন নিজে টিকা নিলেন। তখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ জেনারকে সম্মানিত করতে লাগল।
বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হল। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, যে তারিখে এডওয়ার্ড জেনার বালক জেমস ফিপসকে গুটিবসন্তের টিকা দিয়েছিলেন (৪ মে), জার্মানি প্রতি বছর সেই দিনকে একটা জাতীয় পর্ব দিন হিসেবে ধার্য করল।
ডা. জেনার তার আবিষ্কারের পদ্ধতি লুকিয়ে রাখলেন না। পৃথিবীর নানা জায়গা থেকে নানা প্রশ্ন আসতে লাগল। তিনি ঠিকভাবে সব কথা বুঝিয়ে দিতে লাগলেন। অনেক দেশ আইন করে টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক করল।
১৮০২ সালে জেনার ‘অ্যামেরিকান একাডেমী অফ আর্টস অ্যান্ড সায়েন্স’ এবং
১৮০৬ সালে ‘রয়্যাল সুইডিশ একাডেমী অফ আর্টস অ্যান্ড সায়েন্স’ এর ফরেন অনারি মেম্বার হিসেবে নির্বাচিত হন । ১৮০৩ সালে জেনার ‘জেনারিয়ান সোসাইটি’র সভাপতি নির্বাচিত হন, যেটির মূল উদ্দেশ্য ছিল স্মল পক্স ভ্যাকসিনকে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া । ১৮০৮ সালে সরকারি পৃষ্ঠপোষকোতা নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় ন্যাশনাল ভ্যাকসিন স্টাব্লিসমেন্ট । কিন্তু জেনার ও কর্তৃপক্ষের মোধ্যে মনোমালিন্য দেখা দিলে তিনি পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেন ।
১৮১১ সালে তিনি আবার লন্ডন ফিরে বেশ কিছু স্মল পক্সের রোগীর দেখা পান, যারা আগে ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছিল । কিন্তু তিনি লক্ষ করেন রোগের তীব্রতা আগের থেকে অনেক কম ছিল । নাচারাল হিস্ট্রির ওপর তিনি তার গবেষণা চালিয়ে যান । অবশেষে ১৮২৩ সালে, তার জীবনের শেষ বর্ষে, তিনি তার ‘অবসারভাসন অন দা মাইগ্রেসন অফ বার্ড’ রয়্যাল সোসাইটিতে পেশ করেন ।
জেনারের আবিষ্কারে বিশ্বজুড়ে সাড়া পড়ে যায়। এমনকি তিনি মারা যাওয়ার পরও চলতে থাকে গবেষণা কার্যক্রম। স্বস্তি পায় মানুষ ।
তাঁর মৃত্যুর ৫৭ বছর পর ১৯৮০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা(WHO) ঘোষণা করে, গুটিবসন্ত রোগটি শতভাগ নির্মূল সম্ভব হয়েছে। শেষবার এ রোগে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গিয়েছিল ১৯৭৭ সালে।
এভাবেই আবিষ্কৃত হয় প্রাণঘাতী মারাত্মক ছোঁয়াচে গুটিবসন্ত রোগের টিকা। আর এই আবিষ্কারের সঙ্গে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে আছে এডওয়ার্ড জেনারের নাম।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয় – প্রতিকারের চেয়ে কোনো রোগকে প্রতিরোধ করতে পারাটাই হল সবচেয়ে উত্তম।
ডাঃ জেনার আবিষ্কৃত প্রতিরোধ ব্যবস্থা অনুসরণ করে গুটিবসন্ত রোগকে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিতাড়িত করতে প্রায় ২০০ বছর লেগে যায়। এই সময়ে বিশ্বে আনুমানিক ৩০ কোটি লোকের মৃত্যু হয় এই মারণব্যাধিতে !!
বিজ্ঞানী ও গবেষকরা কেউ আজ বসে নেই। বিশ্বজুড়ে দাপিয়ে বেড়ানো করোনা ভাইরাসের(Covid 19)এর আগ্রাসী থাবায় জনজীবন আজ বিপন্ন হয়ে পড়েছে। সবকিছুই আজ স্থবির, স্তব্ধ।
আমাদের আশা, মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ পোলিও, হাম, যক্ষা, হেপাটাইটিস-বি, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকারসহ যাবতীয় রোগের মতোই করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনও সহসা মানুষের হাতের নাগালে চলে আসবে।
সারা বিশ্বের বিজ্ঞানী ও গবেষকরা নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সে দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছি আমরা ।পৃথিবীর অনেক দেশে অনেক বিজ্ঞানী ও গবেষক করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের একেবারে শেষ পর্যায়ে চলে এসেছেন। তবে পুরোপুরি স্পষ্ট নয় বিশ্বের কোন প্রান্তে , কোন বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম চিৎকার করে উঠবেন ইউরেকা ইউরেকা বলে! ! বিশ্ব তবুও আশায় বুক বেঁধে আছে। যদি উদিত হন কোনো জেনার !!!
 মহান বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড জেনারের কে  বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

©

Panchanan Mandal  পঞ্চানন মন্ডল

তথ্যসূত্র

Leave a Reply

%d bloggers like this: