ব্যাটারির আবিষ্কার ও বিবর্তন

Subhankar
5
(4)

ব্যাটারি বিবর্তন

আপনার হাতের ঘড়িটির থেকে আপনার সর্বক্ষণের সঙ্গী মোবাইল সবকিছুতেই যার অবদান আপনি কিছুতেই অস্বীকার করতে পারবেন না সেটি হল ব্যাটারি। আজকাল একটি বাচ্চাও বলে দেবে যে আপনার হাতের মোবাইলটি বা তার খেলার রিমোট কন্ট্রোল গাড়িটি ব্যাটারীতে চলে। আমাদের ঘুম থেকে উঠার পর রাতে শুতে যাবার আগে পর্যন্ত কত কিছুতে ব্যাটারি ব্যবহার হয় তা কখনো ভেবে দেখেছেন? কিংবা এই ব্যাটারি যখন আবিষ্কার হয়নি তখন মানুষের কিভাবে চলত? ব্যাটারি আবিষ্কার হলোই বা কি ভাবে?

ব্যাটারির আবিষ্কার কে এবং কিভাবে করল?

সর্বপ্রথম ব্যাটারি আবিষ্কার করেন ইতালির বিজ্ঞানী ‘অ্যালেসান্ড্রো ভোল্টা’ (১৮০০ খ্রিস্টাব্দ)। এই ‘অ্যালেসান্ড্রো ভোল্টা’-র নামের থেকেই এসেছে ব্যাটারি ক্ষমতা নির্ণায়ক একক ‘ভোল্ট’। তবে তখনকার ব্যাটারি মোটেও এখনকার মত ছিল না। তার ক্ষমতাও ছিল অতি নিম্ন। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের এই ব্যাটারি তৈরি হয়েছিল একটি জিঙ্ক দন্ড এবং একটি কপার দন্ডকে লবন জলে রেখে। যার থেকে অতি কম পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।
তবে ঐতিহাসিকবিদেরা মনে করেন মানুষ এই ব্যাটারি ব্যবহার আরো বহু বছর আগেই জেনে গেছিলো। তার প্রমাণস্বরূপ পাওয়া যায় এক বিশেষ ধরনের মাটির তৈরি জার। যেটি পুরোটাই ভিনিগার সলিউশন দিয়ে পূর্ণ, এবং তার মধ্যে ছিল একটি লোহার রড যেটি কপার দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। মনে করা হয় এর মধ্যে ১.১ থেকে ২.০ ভোল্ট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপন্ন হতে পারত। এটি প্রায় ২৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ আগের আবিষ্কার। এটি বাগদাদ শহরে পাওয়া যায়। মনে করা হয় তাঁরা বৈদ্যুতিক বিষয় নিয়ে বেশ ভালো রকমই জ্ঞান অর্জন করেছিল। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দ কালে যখন বাগদাদে রেলের জন্য লাইন করার ব্যবস্থা হয় তখন মাটি খননকালে এই প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তুটি আবিষ্কৃত হয়। এটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘পার্থিয়ান ব্যাটারি’।

ব্যাটারির উন্নতি এবং রূপান্তর

প্রথমের দিকে যেসব ব্যাটারি উৎপন্ন হয়েছিল সেগুলো কোনটাই এখন আর কাজে লাগেনা। কারন সে সব ব্যাটারির ক্ষমতা ছিল খুবই স্বল্প সময়ের জন্য, ক্ষমতার পরিমাণও ছিল স্বল্প। তাই ক্রমশ বিজ্ঞানীরা ভেবে নতুনভাবে ব্যাটারি তৈরি করেন। ব্যাটারি তৈরি হয় বিভিন্ন রকম ভাবে। কোনোটা অ্যাসিড দ্বারা কোনটা আবার ড্রাইসেল। ড্রাইসেল অর্থাৎ শুষ্ক ব্যাটারি, যেখানে কোন প্রকার অ্যাসিড ব্যবহার করা হয় না। অ্যাসিড না থাকায় এই ব্যাটারি হয় অনেক নিরাপদ।
আমাদের ফোনে যে সমস্ত ব্যাটারি ব্যবহার করা হয় সেগুলি হল ‘লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি’। এই ‘লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি’ তৈরি করেন বিজ্ঞানী ‘আকিরা ইওসিনহ’ ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে। এটিতে তিনি ব্যবহার করেন লিথিয়ামের জায়গায় ‘পেট্রোলিয়াম কোক’। যা লিথিয়াম এর তুলনায় অনেক বেশী কার্যকর।

রিচার্জেবল ব্যাটারি

গাড়ির ব্যাটারি হোক কিংবা ফোনের ব্যাটারি অথবা হাতের টর্চলাইট এইসকল ব্যাটারি গুলো কে যে রিচার্জ করে আবার চালানো সম্ভব তা প্রথম করে দেখান ফ্রান্সের বিজ্ঞানী ‘গ্যাসটন প্লান্টে’ ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে। যদিও এটি তখন তৈরি হয়েছিল লেড এবং অ্যাসিড দিয়ে। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে এর বিবর্তন হয় এবং আজকের উন্নত রিচার্জেবল ব্যাটারি তৈরি হয়।
এই রিচার্জেবল ব্যাটারিতেও একটু সমস্যা আছে যেটি হল অ্যাসিড। অ্যাসিড থাকার কারণে এটি অনেকেই ব্যবহার করতে ইতস্তত বোধ করেন। এটিকে রিচার্জ করা ও কিছুটা ঝামেলার বিষয়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য তৈরি হয় শুষ্ক ব্যাটারি বা ড্রাইসেল। যেটিকে ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে তৈরি করেন বিজ্ঞানী ‘কার্ল গ্যাসনার’। এই ব্যাটারি আবিষ্কার হওয়ার পরে ব্যাটারির জগতে একতি নিরাপদ উপায় সবার সামনে বেরিয়ে আসে। ব্যাটারি ব্যবহার ক্রমশই ছড়িয়ে পড়তে থাকে বিভিন্ন ভাবে।
অ্যাসিড ব্যাটারি এবং ড্রাইসেল ছাড়াও ব্যাটারিকে দুটো ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। প্রথমটি হল প্রাথমিক ব্যাটারি যাকে রিচার্জ করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়টি হল গৌণ ব্যাটারি যাকে রিচার্জ করা যায় তবে তাও একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে।

পরিবেশের উপর প্রভাব

সব জায়গায় ব্যাটারি ব্যবহার আজকের দিনে ছড়িয়ে গেছে। তেমনি ছড়িয়েছে ব্যাটারির জন্য দূষণ। ব্যাটারিতে ব্যবহৃত ক্ষতিকারক ক্যাডমিয়াম, কপার, জিংক, লিথিয়াম ইত্যাদি পরিবেশে মিশে গেলে ক্ষতিকারক রাসায়নিক দূষণ সৃষ্টি হয়। আবার অ্যাসিড ব্যাটারি অ্যাসিড যে কোন কারোর চোখে ছিটে গেলে চোখ অন্ধ পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। শুষ্ক ব্যাটারির ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত চার্জ কিংবা বারংবার ব্যবহার ব্যাটারির বার্স্ট এর মত ঘটনা ঘটাতে পারে। সম্প্রতি এরকম মোবাইল ব্যাটারি বার্স্টের বিভিন্ন দুর্ঘটনা দেখা গেছে।
তা সত্তেও আমাদের প্রত্যেকদিন এর হাজার রকম যন্ত্রপাতি বা জিনিসে ব্যাটারির ব্যবহার করতেই হচ্ছে। ভবিষ্যতে হয়ত ব্যাটারি বিবর্তিত হয়ে আরো উন্নত মানের তৈরি হবে। একবার রিচার্জ করলেই চলবে বছরের পর বছর। ব্যাটারি থেকে দূষণের মাত্রা কমে হবে শূন্য।
-সৌরদীপ কর্মকার

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 4

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

ভারতের বিভিন্ন জায়গায় পরিযায়ী পাখির মৃত্যু

5 (4) পরিযায়ীরা সংকটে : নতুন বছর, হরষে বিষাদে এলো জানুয়ারি কিন্তু কাটলো না বিষ। এবার আতঙ্ক পরিযায়ী পাখিদের মৃত্যু ঘিরে! পক্ষীবিদ বনকর্মীদের কপালে এই শীতেও চিন্তার ঘাম জমা হচ্ছে। হিমাচল প্রদেশের পং বাঁধ সংলগ্ন জলাভূমি অঞ্চলে শত শত পরিযায়ী পাখির রহস্য মৃত্যু হচ্ছে। গত এক-দেড় সপ্তাহে এখানে মৃত পাখির […]
পাখিদের মৃতদেহ
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: