অ্যানিমোমিটার কী? তার প্রয়োজনীয়তা ও ব্যবহার

দিনের শুরুতেই খবরের কাগজে বাকি খবরগুলোর আগে অনেকেই আবহাওয়ার খবর দেখেন। প্রযুক্তির যুগে মোবাইলে একটিমাত্র ক্লিক করলে আবহাওয়ার খবর জানা যায়।  এই যে আবহাওয়া দপ্তর সমস্ত আপডেট আগে থেকে দিয়ে দেয়, তা কীভাবে দিতে পারে?

তারা এই খবর বা সম্ভাবনা গুলি দিয়ে থাকে বায়ুর গতিপথের উপর নির্ভর করে। আর এই বায়ুর গতিপথ যে যন্ত্রের মাধ্যমে মাপা হয় তার ব্যাপারে আজ আলোচনা করা যাক।

এই যন্ত্রটিকে বলা হয় অ্যানিমোমিটার  (Anemometer)

বায়ুর গতিপথের দিক দেখে বহু যুগ ধরেই মানুষ চলার পথ নির্ণয় করে থাকে। এমনকি বহু প্রাণীরাও এমন আছে যারা বায়ুর গতিপথ দেখেই নিজেদের শিকার ধরা কিংবা শিকার হওয়ার থেকে বাঁচার চেষ্টা করে। আবার বহু প্রাণী নিজেদের চলার পথও নির্ণয় করে থাকে। এই পদ্ধতি গুলি অনুসরণ করি করেই প্রথম যে অ্যানিমোমিটারটি তৈরি হয় তা ইতালিয়ান আবিষ্কারক এবং আর্কিটেক্ট ‘লিওন ব্যাটিস্টা অ্যালর্বাটি‘ এর দ্বারা ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দ তে। তখনকার তার এই অ্যানিমোমিটার ছিল একদম প্রাথমিক পর্যায়, খুবই অনুন্নত।
বর্তমান অ্যানিমোমিটার এর সদৃশ প্রথম যে অ্যানিমোমিটারটি তৈরি হয় তারা তৈরি করেন আমেরিকার ‘বিজ্ঞানী জন থমাস রমনে রবিনসন‘ ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে। তার তৈরি অ্যানিমোমিটারটি ছিল আজকের অ্যানিমোমিটারের ক্ষুদ্র সংস্করণ, তাও প্রাথমিক পর্যায়ে।

প্রথমদিকের অ্যানিমোমিটারটি তৈরি হয়েছিল ছোটখাটো কয়েকটি অংশ নিয়ে। তখন এটি অনুন্নত প্রকৃতির থাকায় এটি শুধুমাত্র বায়ুর গতিবেগ মাপা যেত। একটি লম্বা দন্ডের উপরে একটি অর্ধ গোলক বা একটি বাটি কে উল্টো করে বসানো হয়। এরপর এই বাটিটার থেকে ঠিক ১২০° অন্তর বাটির ব্যাস বরাবর ৩ টি ছোট বাটি লাগানো থাকে। এগুলি এমন ভাবে লাগানো হয় যাতে করে ওই ছোট বাটি গুলির মধ্যে বায়ু সঞ্চিত হবার মত অবস্থার সৃষ্টি হয়। বায়ু প্রবাহের ফলে এই বাটিগুলো নিজের অক্ষ বরাবর ঘুরতে থাকে। এই ঘূর্ণন কত তাড়াতাড়ি হচ্ছে সেই পরিমাপ থেকে বায়ুর গতিবেগ মাপা হয়। ১৮৪৬ এর অ্যানিমোমিটারটির গঠন এর সঙ্গে আজকের অ্যানিমোমিটার এর সাদৃশ্য তো আছে কিন্তু এর মধ্যে অনেক কিছু নতুনভাবে যুক্ত করা হয়েছে। যার ফলে এর থেকে আরো নিখুঁত আবহাওয়ার তথ্য জানা যায়।

প্রয়োজনীয়তা ও ব্যবহার

প্রথমেই যেমন বলা হয়েছে অ্যানিমোমিটার আবহাওয়ার অবস্থান বুঝতে সাহায্য করে। আরো সঠিকভাবে বললে বায়ুর গতিপথ এর অবস্থান নির্দেশ করে। গতিপথের পরিমাপ, অর্থাৎ প্রত্যেক ঘন্টায় কত গতিবেগে বায়ু প্রবাহিত হচ্ছে তা অ্যানিমোমিটার এর মাধ্যমে মাপা যায়। প্রথম থেকে যেসব অ্যানিমোমিটার গুলি ব্যবহৃত হয়ে আসছে সেগুলি ‘এনালগ’ প্রকৃতির। তবে এখন ডিজিটাল রূপে অনেক অ্যানিমোমিটার ব্যবহার করা হয়। যার ফলে গতিবেগের পরিমাপ আর নিখুঁত ভাবে পাওয়া যায়। যদিও এর মূল গঠন-প্রকৃতি একই আছে,খালি কিছু অংশ কে আগের চেয়ে উন্নত করা হয়েছে।

যেকোনো অঞ্চলের আবহাওয়া নির্ভর করে বায়ুর প্রকৃতির উপর। সেখানকার শীত, গ্রীষ্ম বা বর্ষা বায়ুর গতিপ্রকৃতির ওপরনির্ভরশীল। নিম্নচাপ, উচ্চচাপ এই সমস্ত ধরনের বায়ুর অবস্থার পরিমাপ এই যন্ত্রের মাধ্যমে করা হয়। ভারতে যেমন মৌসুমী ঢুকলে তবে বর্ষা শুরু হয়। সেই মৌসুমী বায়ু ঠিক কখন কোন অঞ্চল দিয়ে কতটা বেগে প্রবেশ করে সেটাও আমাদের আবহাওয়াবিদরা অ্যানিমোমিটার এর সাহায্যে জানতে পারেন। আবার শীতের পূর্বে ঠিক কখন সাইবেরিয়ান শীতল বায়ু প্রবেশ করার চেষ্টা করে সেটিও এর মাধ্যমে জানা যায়।

আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করেই কৃষি ক্ষেত্রে বিভিন্ন ফসলের চাষ শুরু হয়। বৃষ্টির অবস্থা, গরমের পরিমাণ কি ধরনের হতে পারে তা এই বায়ুর প্রবেশ দেখে কিছুটা নির্ণয় করা সম্ভব। এছাড়া বিভিন্ন সঙ্কটের মুহূর্তগুলি, যেমন বড় সামুদ্রিক ঝড় গুলির সম্বন্ধে আগে থেকে জানা যায়। ঝড়ের গতিবেগ এর উপর নির্ভর করে জেলেদের মাছ ধরতে যাওয়া না যাওয়া নির্ণয় করা হয়। বায়ুর গতিবেগ বিপদসংকুল অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে এরকম মনে হল সামুদ্রিক যাত্রা ব্যাহত করা হয়। এমনকি সমুদ্রে স্নান করতেও নিষেধ করা হয়।

বহু যুগ ধরে এভাবেই বড় জাহাজ গুলিতে সামুদ্রিক যাত্রার সময় অ্যানিমোমিটার যন্ত্রের সাহায্যে বায়ুর দিক নির্ণয় এবং ঝড়ের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে যাত্রা করা হত‌। যার ফলে বহু জাহাজ বড় ঝড়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের হাতে উন্নত যন্ত্রপাতি চলে আসুক না কেন, অ্যানিমোমিটার এর ব্যবহার সর্বদাই প্রয়োজনীয়। অন্তত এর কার্যকারিতার বিষয়টি কেউই অস্বীকার করতে পারবে না।

সৌরদীপ কর্মকার

Leave a Reply

%d bloggers like this: