দু’হাত নিচে ওড়ে ধারাবাহিক শোক

bengal-florican-male

এককালে, পশ্চিমে হস্তিনাপুর থেকে শুরু করে গঙ্গানদীর বামদিকের তীর বরাবর যে বিস্তীর্ণ ঘাসজমি ছিল পূর্বে অরুণাচলের মিশমি পর্বতমালা পর্যন্ত, সেই ঘাসজমিতে তারা হাজারে হাজারে বসবাস করত। তরাই-এর ঘাসজমির পাখি বেঙ্গল ফ্লোরিকান। ‘দ্য গেম বার্ডস্‌ অফ্‌ ইন্ডিয়া, বার্মা অ্যান্ড সিলন, ভল্যুম – ১’ (১৮৭৯) বইতে অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম সাহেব পাখিটার কথা প্রচুর লিখেছেন। সেই হিউম সাহেব, যিনি ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের জন্মের সঙ্গে জড়িত আর ব্রিটিশ ভারতের পক্ষীবিদ্যাচর্চার জনক।

আঠারোশো সালের শেষের দিকের কথা। ঘোর ইংরেজ আমল। ভারতীয় উপমহাদেশের পাহাড়, নদী, জঙ্গলের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ব্রিটিশ অফিসারেরা। হিউম সাহেবের সিমলার বাসভবনে নিয়মিত রিপোর্ট পাঠাতেন তারা। কোথায় কি পাখির সন্ধান পাওয়া গেলো। আর গুলি করে মারা গেলো। কর্নেল গ্রাহাম নামে এক সাহেব রিপোর্ট দিচ্ছেন “ নর্থ অফ্‌ মঙ্গলদই, ইন দরং, অ্যাবাউট ফাইভ মাইলস্‌ ফ্রম দ্য ভুটান হিলস্‌, অ্যাট এ স্টেজিং বাংলো, ওয়েল নেমড্‌ শিকার, আই শট্‌ ফোরটিন ফ্লোরিকান ইন ওয়ান ডে

আসামের দরং জেলায় বেঙ্গল ফ্লোরিকান ছিলো খুব পরিচিত পাখি। গ্রাহাম সাহেব দরং জেলায় দিনে তিরিশ থেকে চল্লিশটি ফ্লোরিকান দেখতে পাওয়ার কথা নিশ্চিত করে বলেছেন। কামরূপ ও গোয়ালপারাতে ভালোই দেখা মিলত। নগাঁও, শিবসাগার, লখিমপুরে যথেষ্ট সংখ্যায় তারা ছিল।

মি. ডামান্ট নামে একজন লিখছেন যে গারো পর্বতমালার পাদদেশে ফ্লোরিকান আকচার দেখা যায়। একটা সকালে বন্দুক হাতে বার হলে আট-দশটা মারা কোনো ব্যাপার না। এমনকি তৎকালীন দিনাজপুর ও মালদা জেলাতেও তিনি ফ্লোরিকান থাকার কথা বলেছেন। বাংলায় পাখিটার সুন্দর একটা নামও আছে, ‘ডহর’।

ব্রিটিশ অফিসারদের খাবার টেবিলে বেঙ্গল ফ্লোরিকানের কদর ছিল। হিউম সাহেব লিখছেন “ফ্লোরিকান আর, আই থিংক্‌, অলমোস্ট দ্য ফ্যাটেস্ট বার্ডস্‌ ওয়ান ফর শুটস্‌, অ্যান্ড সার্টেইনলি অ্যামোঙস্ট দ্য বেস্ট বার্ডস্‌ ফর দ্য টেবল্‌ উইথ হুইচ ইন্ডিয়া ফার্নিসেস আস্‌”।

তারপর গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। ব্রিটিশ গেছে। ভারতের উত্তর এবং পূর্বের বড় বড় নদীগুলোর ধার ঘেঁষে পিলপিল করে জনবসতি বেড়েছে। ঘাসজমি কেটে কেটে সাফ করে চাষ শুরু হয়েছে বহুদিন আগে থেকে। সেই সাথে কল-কারখানা বেড়েছে। তরাই-এর ঘাসজমি কমতে কমতে প্রায় শেষ। ভারতবর্ষের সমস্ত ‘বাস্টার্ড’ গোত্রে পাখিদের সঙ্গে বেঙ্গল ফ্লোরিকান আজ প্রায় নিঃশেষ। ভারত আর নেপাল মিলিয়ে সম্ভবত পাঁচশোটির বেশি নেই। কম্বোডিয়াতে অন্য একটি উপজাতি (সাব-স্পিসিস ‘ব্লান্ডিনি’) পাওয়া যায়। ভারতে সংখ্যাটা তিনশোর বেশি নয়। মাত্র তিনটে রাজ্যে পাওয়া যায়। উত্তরপ্রদেশ, আসাম, অরুনাচলপ্রদেশ। আজ বেঙ্গল ফ্লোরিকান ভারতের অন্যতম দুষ্প্রাপ্য পাখি। সরকারি নিয়ম মোতাবেক বাঘকে যে গুরুত্ব দিয়ে বাঁচাতে হবে বেঙ্গল ফ্লোরিকানকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে রক্ষা করতে হবে। কিন্তু তত দিনে যা দেরি হবার হয়ে গেছে।

bengal-florican-female
স্ত্রী বেঙ্গল ফ্লোরিকান
bengal-florican-male
পুরুষ বেঙ্গল ফ্লোরিকান

গত দেড়শো বছরের মধ্যে কেন পাখিটার এই হাল হল তা নিয়ে গত চল্লিশ বছর বেশ কিছু কাজ হয়েছে। সত্যিই কেন ঘাসজমির এই উল্লেখযোগ্য পাখিটা চোখের সামনে প্রায় লোপাট হয়ে গেল? ব্রিটিশরা দায়ী? ঘাসজমি সাফ করে ব্যাপক চাষ-আবাদ কে দোষ দেবেন? নাকি ‘কালের নিয়ম’ ব’লে দায়ভার ঝেড়ে ফেলবেন! মানবসভ্যতা এগোলে কিছু পশুপাখি ধ্বংস হবেই এই তত্ত্বের আড়ালে নিজেকে লুকোবেন? আগে মানুষ, তারপর পশুপাখি।

সত্যিতো, ফ্লোরিকান হারিয়ে গেলে কি হবে! শেয়ার বাজারে ধস নামবে? চুরি বন্ধ হবে? ভারতের অর্থনীতি ভেঙে পড়বে? ভোটবাক্সে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে? উত্তরটা “না”। কিস্যু হবে না। আধুনিক ভারত-আত্মার নির্মাণের কোনো কাজেই বেঙ্গল ফ্লোরিকান লাগেনা। কত পশু-পাখিই তো হারিয়ে গেছে। কি হয়েছে তাতে আমাদের এই দেশটার। চিতা হারিয়ে গেছে। রাজস্থান-গুজরাটের মানুষের কি গিয়েছে-এসেছে! আসামে এখন অনেক সমস্যা। নাগরিক পঞ্জি, উগ্রপন্থা কত কি। সেসব আগে সামলাতে হবে।

আমরা আমাদের মত চলি। যে থাকার থাকলো, যে যাচ্ছে যাক।  আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে পাখিদের প্রভাব (পড়ুন সু-প্রভাব ) প্রমাণ করার মত বাড়তি উদ্যম কোনো কালেই অর্নিথোলজিস্টদের ছিলো না। তাদের সেটাই একমাত্র কাজ বলেও আমি মনে করিনা। সারা জীবন ‘মানব কল্যানে পাখির ভূমিকা’ নিয়ে কাজ করে যাওয়া সম্ভব নয়। আর আজকের জীবনযাত্রায় পাখিদের উপকারিতা ফুঁৎকারে উড়িয়ে দেওয়ার হিম্মত মানুষের আলবাত আছে। সেই সূত্রে বিভিন্ন পাখির সংরক্ষণের আদৌ কোনো যুক্তি আছে কি? তবে একটা কথা বলা যেতেই পারে যে ভারত-আত্মা শুধু একশ-কুড়ি কোটি মানবসন্তান নিয়ে নয়, প্রকৃতি, বন্যপ্রাণ আরো আরো লক্ষ-কোটি বস্তু দিয়ে তৈরি।

আধুনিক ভারতের যে সাচ্চা ছাত্র পরাধীন ভারত, জাতীয় কংগ্রেস, হিউম ইত্যাদি পড়বে তার চোখ কখনোই এড়োবে না ভারতের পাখির ওপর হিউম ও তার দলবলের কাজের কথা। তৎকালীন ভারতের পক্ষীবৈচিত্রের কথা। সেই ছাত্রের বিশ্বচিন্তায় মানুষ, পরিবেশ ও তার সংকট, জীববৈচিত্র নিশ্চিত ভাবে স্থান করে নেবে। খুব মলিনভাবে হলেও তাই তো হয়ে এসেছে চিরকাল। মানুষ ও সেই সাথে সবাই। ভারত সবার। হিন্দুর, মুসলমানের, গাছপালার, নদীনালার, পশুপাখির। এই চিন্তা মুছে ফেলা যায়নি। আরো গভীরে যদি যাই, আমাদের চলতি অর্থনীতি, সমাজনীতি, স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রযন্ত্রের বন্যপ্রাণ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা ইত্যাদি নিয়ে বেশ কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলতে হবে।

আমি বরং সেইদিকে না গিয়ে বেঙ্গল ফ্লোরিকান পাখিটা কেন উল্লেখযোগ্য, কেন পাখিটার কথা এত আলোচনা হয়েছে চিরকাল সেদিকে নতুন করে দৃষ্টিপাত করি। কারণ প্রজাতি সম্পর্কে জ্ঞান (স্পিসিস নলেজ), আলোচনা, আমাদের প্রজাতিটিকে বুঝতে সাহায্য করে। সচেতন করে। আকৃষ্ট করে। আমাদের ভাবায়। তার নাম আমাদের কানে বাজতে থাকে। তাহলে ভারত কি শুধু আমাদের? আমরা থমকে দাঁড়াই। আর পাখিটার টিঁকে থাকার সপক্ষে কিছু কথা বলে ফেলি। জনমত তৈরি হয়। আদপে তা পাখিটার উপকারে লাগে।

আসামের মানস জাতীয় উদ্যান এই মুহূর্তে বেঙ্গল ফ্লোরিকানের উল্লেখযোগ্য বাসভূমি। অসমিয়ারা “উলু মুরা” নামে পাখিটাকে চেনে। ‘উলু’ একধরনের ঘাস। তরাই অঞ্চলের ঘাস। বৈজ্ঞানিক নাম ‘ইম্পারাটা সিলিন্ড্রিকা’। উত্তর-পশ্চিমে ভুটান পাহাড়ের পাদদেশে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সে ঘাস জমি। ‘মুরা’ মানে ময়ুর। ঘাসজমির ময়ুর।

habitat-bengal-florican
মানসের ঘাসজমি, বেঙ্গল ফ্লোরিকানের বাসভূমি

সেই ঘাসজমির কোথা থেকে, কখন হাউইবাজির মত তার জগৎ-বিখ্যাত লাফ দিয়ে উঠবে কেউ জানে না। মার্চ থেকে জুন সন্তান উৎপাদনের সময়। পুরুষেরা বহুগামী। মেয়েরা আবার সংসারী। ঘাসের আড়ালে থাকতে পছন্দ করে। পুরুষদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয় প্রজননের জন্য। মেয়ে ভোলানোর জন্য ঘাসজমির মধ্যে ঘাড়, গলা, বুকের লম্বা লম্বা পালক ফুলিয়ে সদর্পে হাঁটে কিছক্ষণ।

bengal-florican-male
ঘাড়, গলা, বুকের লম্বা লম্বা পালক ফুলিয়ে সদর্পে হাঁটে কিছক্ষণ

তারপর হাঁটু ভাঁজ করে দে লাফ। সঙ্গে ডানা ঝাপটানো আর চিৎকার। একলাফে প্রায় তিনতলা সমান উঠে যায়। মাথা থেকে পেট, ফুলিয়ে ঢোল।

display-bengal-florican
একলাফে প্রায় তিনতলা সমান উঠে যায়
display-bengal-florican
তারপর নেমে আসতে থাকে

নিচে নামে আসাটা প্যারাশ্যুটের মত। ধবেধবে সাদা ডানা দুপাশে মেলে ঝুপ করে নেমে আসে তাদের বাপ-কাকার বসতভিটেতে।

display-bengal-florican
নিচে নামে আসাটা প্যারাশ্যুটের মত

এত কসরত করে মেয়েদের কেউ রাজি হল তো হল, না হলে আবার লাফ। প্রধানত ওই লাফের বাহারের ওপর ঝুলছে ভাগ্য। ওই লাফ পছন্দ হলে তবেই মেয়েটা সম্মতি দেবে। পুরুষেরা তার কম্পিটিটরকে এলাকা-ছাড়া করার জন্য উড়তে উড়তে তাড়া করে। শোনা যায় এই তাড়া করার সময় একজন অন্যজনের লেজ থেকে একগোছা পালক ঠোঁট দিয়ে ছিঁড়ে দিতে পারলেই কেল্লাফতে। পালক-খসা পুরুষটা হেরো।

মেয়েটাকে তো পাবেই না আর এলাকাও ছাড়তে হবে। দুটি পুরুষ অবশ্য মাটিতেও লড়াই করে। ব্লিথ (ব্রিটিশ ভারতের আরেক নামকরা পক্ষীবিদ ও অফিসার) নামে এক সাহেবকে উল্লেখ করে হিউম জানাচ্ছেন যে ব্লিথ দেখেছেন দুটি পুরুষ সামনে খুব লড়ছে। মানুষের পায়ের শব্দ শুনে দুজনেই পালালো। তারপর হিউম সাহেবের কথায় “দে রিনিউড দেয়ার কনফ্লিক্ট অ্যাট এ শর্ট ডিস্ট্যান্স, অ্যান্ড দাস্‌ অ্যালাউড হিম টু ব্যাগ বোথ”। ব্লিথ এই সুযোগে অনায়াসে দুজনকেই গুলি করে মেরে ফেললেন।

হিউম লাজুক পাখিটার বিখ্যাত লাফ-এর বিবরণ দিয়েছেন ওই বইয়ে। খাদ্যাভ্যাস, জীবনচর্যা, সব লিখেছেন। অবশ্য আরো অনেকে গবেষণা করেছেন পরবর্তিকালে। বম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটি-র বিজ্ঞানীরা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন পাখিটাকে নিয়ে। তবে ওই লাফই অনন্য করে দিয়েছে পাখিটাকে। ওই লাফের আকর্ষনে বহু পক্ষীপ্রেমী, চিত্রগ্রাহক মানসে যান। আমিও যাই। দেখি সূর্য ডুবে যায় পাহাড়ের কোলে। এপ্রিলের দুপুরে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। সবুজ ঘাসজমি যেন জোকারের স্প্রিং লাগানো বিছানা। প্রায় এক-মানুষ উঁচু ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে থেকে কখন, কোথা থেকে তড়াক করে সোজা আকাশে। পায়ের জোরে তিন মিটার স্পটজাম্প। বাইনোকুলার সামনে তাক করে আছি, লাফ দিলো হয়তো পেছন থেকে। তাই অপেক্ষাটাও বেশ মজার। মাঝে মাঝে ছবি তুলি। স্কেচ করি। হিউমের বইয়েও স্কেচ আছে। ছেলেটা ব’সে। মেয়েটা গায়ের কাছে ঘাড় নিচু করে এগিয়ে আসছে। অন্তরঙ্গ মুহূর্ত যেন। আর তো মাত্র তিনশোটা আছে আমাদের দেশে। যেকোনো মুহূর্তে শেষ হয়ে যেতে পারে। একটা ভয়ঙ্কর বন্যা, একটা মাহামারি এই সংখ্যাটাকে মুছে ফেলার পক্ষে যথেষ্ঠ। ভাবি একদিন যদি এমন হয়, সকলের অজান্তে, ভারতের শেষ ‘উলু মুরা’ শেষ লাফটা দিয়ে ফেলে তরাইয়ের ঘাসজমিতে চিরকালে জন্য ঘুমিয়ে পড়েছে। আমাদের অজান্তে যেমন ‘পিঙ্ক-হেডেড ডাক’ হারিয়ে গেছে। আর আমরা সবাই বোকার মত অপেক্ষা করছি এই বুঝি কোথা থেকে দিলো লাফ। লড়াকু ‘ডহর’। এই ভারতে তার লম্ফঝম্ফ শেষ করেছে। অপেক্ষা শেষ করে আমরা আবার ফিরে গেছি ভোটের লাইনে, টিভির সামনে। বিবিধ নাগরিক বিতন্ডায়। নতুন ভারত তৈরিতে। কবি রণজিৎ দাশ তো লিখেই দিয়েছেন-

আমার বাড়ির মাথায় সারাক্ষণ/ একটি পতাকা অর্ধনমিত থাকে/ এতে সুবিধে হয় পাখিদের, আমি দেখি,/ খুঁটির ডগায় বসে তারা অবাধে ডানা ঝাপটায়, যার/ দু’হাত নিচে ওড়ে ধারাবাহিক শোক/……

পাখিদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ বন্ধ হলে/ বাতাসের সঙ্গে কালো লংক্লথের বিতর্ক শুরু হয়”।

 

লেখা, ছবি, স্কেচ – সম্রাট সরকার

Email – samratswagata11@gmail.com  

Leave a Reply

%d bloggers like this: