ব্যাটারির আবিষ্কার ও বিবর্তন

ব্যাটারি বিবর্তন

আপনার হাতের ঘড়িটির থেকে আপনার সর্বক্ষণের সঙ্গী মোবাইল সবকিছুতেই যার অবদান আপনি কিছুতেই অস্বীকার করতে পারবেন না সেটি হল ব্যাটারি। আজকাল একটি বাচ্চাও বলে দেবে যে আপনার হাতের মোবাইলটি বা তার খেলার রিমোট কন্ট্রোল গাড়িটি ব্যাটারীতে চলে। আমাদের ঘুম থেকে উঠার পর রাতে শুতে যাবার আগে পর্যন্ত কত কিছুতে ব্যাটারি ব্যবহার হয় তা কখনো ভেবে দেখেছেন? কিংবা এই ব্যাটারি যখন আবিষ্কার হয়নি তখন মানুষের কিভাবে চলত? ব্যাটারি আবিষ্কার হলোই বা কি ভাবে?

ব্যাটারির আবিষ্কার কে এবং কিভাবে করল?

সর্বপ্রথম ব্যাটারি আবিষ্কার করেন ইতালির বিজ্ঞানী ‘অ্যালেসান্ড্রো ভোল্টা’ (১৮০০ খ্রিস্টাব্দ)। এই ‘অ্যালেসান্ড্রো ভোল্টা’-র নামের থেকেই এসেছে ব্যাটারি ক্ষমতা নির্ণায়ক একক ‘ভোল্ট’। তবে তখনকার ব্যাটারি মোটেও এখনকার মত ছিল না। তার ক্ষমতাও ছিল অতি নিম্ন। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের এই ব্যাটারি তৈরি হয়েছিল একটি জিঙ্ক দন্ড এবং একটি কপার দন্ডকে লবন জলে রেখে। যার থেকে অতি কম পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।
তবে ঐতিহাসিকবিদেরা মনে করেন মানুষ এই ব্যাটারি ব্যবহার আরো বহু বছর আগেই জেনে গেছিলো। তার প্রমাণস্বরূপ পাওয়া যায় এক বিশেষ ধরনের মাটির তৈরি জার। যেটি পুরোটাই ভিনিগার সলিউশন দিয়ে পূর্ণ, এবং তার মধ্যে ছিল একটি লোহার রড যেটি কপার দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। মনে করা হয় এর মধ্যে ১.১ থেকে ২.০ ভোল্ট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপন্ন হতে পারত। এটি প্রায় ২৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ আগের আবিষ্কার। এটি বাগদাদ শহরে পাওয়া যায়। মনে করা হয় তাঁরা বৈদ্যুতিক বিষয় নিয়ে বেশ ভালো রকমই জ্ঞান অর্জন করেছিল। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দ কালে যখন বাগদাদে রেলের জন্য লাইন করার ব্যবস্থা হয় তখন মাটি খননকালে এই প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তুটি আবিষ্কৃত হয়। এটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘পার্থিয়ান ব্যাটারি’।

ব্যাটারির উন্নতি এবং রূপান্তর

প্রথমের দিকে যেসব ব্যাটারি উৎপন্ন হয়েছিল সেগুলো কোনটাই এখন আর কাজে লাগেনা। কারন সে সব ব্যাটারির ক্ষমতা ছিল খুবই স্বল্প সময়ের জন্য, ক্ষমতার পরিমাণও ছিল স্বল্প। তাই ক্রমশ বিজ্ঞানীরা ভেবে নতুনভাবে ব্যাটারি তৈরি করেন। ব্যাটারি তৈরি হয় বিভিন্ন রকম ভাবে। কোনোটা অ্যাসিড দ্বারা কোনটা আবার ড্রাইসেল। ড্রাইসেল অর্থাৎ শুষ্ক ব্যাটারি, যেখানে কোন প্রকার অ্যাসিড ব্যবহার করা হয় না। অ্যাসিড না থাকায় এই ব্যাটারি হয় অনেক নিরাপদ।
আমাদের ফোনে যে সমস্ত ব্যাটারি ব্যবহার করা হয় সেগুলি হল ‘লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি’। এই ‘লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি’ তৈরি করেন বিজ্ঞানী ‘আকিরা ইওসিনহ’ ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে। এটিতে তিনি ব্যবহার করেন লিথিয়ামের জায়গায় ‘পেট্রোলিয়াম কোক’। যা লিথিয়াম এর তুলনায় অনেক বেশী কার্যকর।

রিচার্জেবল ব্যাটারি

গাড়ির ব্যাটারি হোক কিংবা ফোনের ব্যাটারি অথবা হাতের টর্চলাইট এইসকল ব্যাটারি গুলো কে যে রিচার্জ করে আবার চালানো সম্ভব তা প্রথম করে দেখান ফ্রান্সের বিজ্ঞানী ‘গ্যাসটন প্লান্টে’ ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে। যদিও এটি তখন তৈরি হয়েছিল লেড এবং অ্যাসিড দিয়ে। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে এর বিবর্তন হয় এবং আজকের উন্নত রিচার্জেবল ব্যাটারি তৈরি হয়।
এই রিচার্জেবল ব্যাটারিতেও একটু সমস্যা আছে যেটি হল অ্যাসিড। অ্যাসিড থাকার কারণে এটি অনেকেই ব্যবহার করতে ইতস্তত বোধ করেন। এটিকে রিচার্জ করা ও কিছুটা ঝামেলার বিষয়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য তৈরি হয় শুষ্ক ব্যাটারি বা ড্রাইসেল। যেটিকে ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে তৈরি করেন বিজ্ঞানী ‘কার্ল গ্যাসনার’। এই ব্যাটারি আবিষ্কার হওয়ার পরে ব্যাটারির জগতে একতি নিরাপদ উপায় সবার সামনে বেরিয়ে আসে। ব্যাটারি ব্যবহার ক্রমশই ছড়িয়ে পড়তে থাকে বিভিন্ন ভাবে।
অ্যাসিড ব্যাটারি এবং ড্রাইসেল ছাড়াও ব্যাটারিকে দুটো ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। প্রথমটি হল প্রাথমিক ব্যাটারি যাকে রিচার্জ করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়টি হল গৌণ ব্যাটারি যাকে রিচার্জ করা যায় তবে তাও একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে।

পরিবেশের উপর প্রভাব

সব জায়গায় ব্যাটারি ব্যবহার আজকের দিনে ছড়িয়ে গেছে। তেমনি ছড়িয়েছে ব্যাটারির জন্য দূষণ। ব্যাটারিতে ব্যবহৃত ক্ষতিকারক ক্যাডমিয়াম, কপার, জিংক, লিথিয়াম ইত্যাদি পরিবেশে মিশে গেলে ক্ষতিকারক রাসায়নিক দূষণ সৃষ্টি হয়। আবার অ্যাসিড ব্যাটারি অ্যাসিড যে কোন কারোর চোখে ছিটে গেলে চোখ অন্ধ পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। শুষ্ক ব্যাটারির ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত চার্জ কিংবা বারংবার ব্যবহার ব্যাটারির বার্স্ট এর মত ঘটনা ঘটাতে পারে। সম্প্রতি এরকম মোবাইল ব্যাটারি বার্স্টের বিভিন্ন দুর্ঘটনা দেখা গেছে।
তা সত্তেও আমাদের প্রত্যেকদিন এর হাজার রকম যন্ত্রপাতি বা জিনিসে ব্যাটারির ব্যবহার করতেই হচ্ছে। ভবিষ্যতে হয়ত ব্যাটারি বিবর্তিত হয়ে আরো উন্নত মানের তৈরি হবে। একবার রিচার্জ করলেই চলবে বছরের পর বছর। ব্যাটারি থেকে দূষণের মাত্রা কমে হবে শূন্য।
-সৌরদীপ কর্মকার

আইজ্যাক আসিমভ – সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কল্পবিজ্ঞান লেখক

আইজ্যাক আসিমভ – সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কল্পবিজ্ঞান লেখক।
************************************************************************

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন , “সায়েন্স ফিকশন হল আধুনিক জগতের রূপকথা“ ।

প্রাচীন রূপকথা গুলো যেমন মানব মনের কল্পনা প্রসূত তেমনি সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞানও তাই। পার্থক্য শুধু সায়েন্স ফিকশন বিজ্ঞান কে ভিত্তি করে মানব মনের কল্পনা! আর তাই কল্পবিজ্ঞানকে আধুনিক জগতের রূপকথা বলা যথার্থ।

আধুনিক জগতের এই রূপকথার সবচেয়ে বড় কথক হলেন আইজ্যাক আসিমভ। বলা হয়ে থাকে আইজ্যাক আসিমভ হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কল্পবিজ্ঞান লেখক। আর এজন্যই তাকে বলা হয়, ‘গ্র্যান্ডমাস্টার অফ সায়েন্স ফিকশন।’ সম্পূর্ণ অবাস্তব এক জগৎকে পাঠকের কাছে বাস্তব করে তোলার এক অসামান্য ক্ষমতা ছিল আইজ্যাক আসিমভের।

তাঁর জন্মদিনে প্রতি বছর ২ জানুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘সায়েন্স ফিকশন ডে’ পালিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাখো কল্প বিজ্ঞান প্রেমী আনন্দ ও উৎসাহের সাথে পালন করে এ দিনটি।

২ জানুয়ারিতেই সর্বকালের সেরা সায়েন্স ফিকশন লেখক আইজ্যাক আসিমভ জন্মেছিলেন সোভিয়েত রাশিয়ার এক ছোট্ট গ্রাম পেত্রোভিচিতে। আর তার জন্মদিন উপলক্ষেই এই দিনটিকে ‘সাইন্স ফিকশন ডে’ হিসেবে পালন করা হয়।

বর্তমান পৃথিবীতে কল্পবিজ্ঞান অর্থ্যাত সায়েন্স ফিকশন প্রেমীর সংখা কম নয়। কিন্তু সায়েন্স ফিকশনের উৎপত্তি বা শুরুর দিকের ইতিহাস সম্পর্কে স্পষ্ট কোন তথ্য নেই কারো কাছেই। কেউ কেউ মনে করেন সুপ্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতার গিলগামেশ ছিল প্রথম বিজ্ঞান কল্পকাহিনীমূলক রচনা বা সাহিত্য। তবে এর বিরোধিতা করেছেন অনেকেই।

অধিকাংশ বিশ্বাস করেন বিজ্ঞান কল্পকাহিনী নিছক কল্পনা নয়, বিজ্ঞান কল্পকাহিনী লেখা যেতে পারে কেবল প্রকৃত বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করেই। বিজ্ঞানের সাথে মানব মনের কল্পনা মিশেই এক একটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর জন্ম। সে বিবেচনায় বৈজ্ঞানিক বিপ্লবোত্তর যুগেই বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর উৎপত্তি।

জানেন কি? বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর গ্র্যান্ড মাস্টার - আইজ্যাক আসিমভ কে? না  জানলে আজ জেনে নিন আর তার লেখা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর অনন্য সব লেখা ...

আইজ্যাক আসিমভ ১৯২০ সালের ২ জানুয়ারি সোভিয়েত রাশিয়ার সেই ছোট্ট গ্রাম পেত্রোভিচিতে জন্মগ্রহণ করেন। ৩ বছর বয়সে বাবা মার সাথে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। বড় হয়েছেন নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে।

তার পরিবারের সবাই ইদিশ এবং ইংরেজি ভাষায় কথা বলার কারণে আসিমভ রাশিয়ান বংশোদ্ভূত হলেও কখনো রাশিয়ান ভাষা শেখেন নি। ইদিশ এবং ইংরেজি উভয় ভাষাতেই সমান পারদর্শিতা ছিল তার। মাত্র ৫ বছর বয়স থেকেই নিজে নিজে পড়তে শিখে যান।

ব্রুকলিনে তার পরিবার একটা দোকান চালাত। সেই দোকানে বাবার সাথে আসিমভকেও কাজ করতে হত। দোকানে অন্যান্য জিনিসের সাথে সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন ও বিক্রি হত। আসিমভ সেগুলো পড়তে শুরু করেন। এবং প্রেমে পড়ে যান এসবের। শুরু করেন লেখালেখি।

মাত্র ১১ বছর বয়সেই তার লেখালেখির হাতে খড়ি। লেখালেখির পাশাপাশি সেগুলো তিনি বিভিন্ন ম্যাগাজিনে বিক্রি করতে শুরু করে দেন অল্প বয়সেই। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তার প্রথম ছোটগল্প ছাপা হয় ‘অ্যামেজিং স্টোরিস’ ম্যাগাজিনে। সেই যে লেখালেখির শুরু তা আর শেষ হয় নি। অপ্রতিরোধ্য গতিতে লিখে গেছেন আজীবন ।

আইজ্যাক আসিমভ নিউ ইয়র্ক সিটির ব্রুকলিন বয়েজ হাই স্কুল এ পড়াশোনা শুরু করেন। পরে ১৯৩৯ সালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে রসায়নে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এখান থেকেই ১৯৪৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। এরই মাঝে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। রসায়নবিদ হিসেবে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেন।

ফিলাডেলফিয়া নেভি ইয়ার্ডের ন্যাভাল এয়ার এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশনে সিভিলিয়ান হিসেবে কর্মরত ছিলেন এসময়। যুদ্ধের পর তাকে মার্কিন সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। টাইপিংয়ে বিশেষ দক্ষতার জন্য তিনি দ্রুতই পদোন্নতি পেয়ে কর্পোরাল হন। ১৯৪৬ সালে বিকিনি প্রবাল প্রাচীরে পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের সময় সুকৌশলে নিজেকে সরিয়ে নেন। মার্কিন সেনাবাহিনী থেকে সম্মানজনক অবসর প্রদান করা হয় তাকে।

ডক্টরেট শেষ করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ মেডিসিনে পরিদর্শক হিসেবে যোগ দেন তিনি। এখানেই কর্মরত ছিলেন অনেকদিন। শিক্ষকতার পাশাপাশি পুরোদমে লেখালেখি চালিয়ে যেতে থাকেন তিনি।

ধীরে ধীরে শিক্ষকতার প্রতি ঝোঁক কমে আসে তার। শিক্ষকতা জীবনে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার লেখার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তাকে জৈব রসায়নের পূর্ণ অধ্যাপক পদ প্রদান করে।

আইজ্যাক আসিমভ তার বিশ্ববিখ্যাত সায়েন্স ফিকশনগুলোর জন্য অমর হয়ে থাকলেও সায়েন্স ফিকশন থেকে শুরু করে, ফ্যান্টাসি, মিস্ট্রি, ইতিহাস, নন-ফিকশন, এমনকি বেশ কিছু হিউমার আর স্যাটায়ারও লিখেছেন তিনি।

তার লেখা বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৫০০! যার মধ্য সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে তার ‘ফাউন্ডেশন’ ও ‘রোবট’ সিরিজের বই গুলো। আইজ্যাক আসিমভের ‘গ্র্যান্ড মাস্টার অব সাইন্স ফিকশন’ হয়ে উঠবার পিছে বড় ভূমিকা এই ‘ফাউন্ডেশন’ সিরিজের।

এ সিরিজের প্রথম বই ফাউন্ডেশন প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ সালে, এরপর ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়, ফাউন্ডেশন এন্ড দি এম্পায়ার ও দি সেকেন্ড ফাউন্ডেশন। এই তিনটি বইকে একত্রে বলা হয় ফাউন্ডেশন ট্রিলজী।

এটিই অরিজিনাল ফাউন্ডেশন সিরিজ। এরপর প্রায় ৩০ বছর তিনি এই সিরিজ নিয়ে আর এগোননি। কিন্তু পাঠকদের অনুরোধে বাধ্য হয়ে ৩০ বছর পর এই সিরিজের আরো ৪টি বই লেখতে বাধ্য হন তিনি। ৮০ এর দশকে প্রকাশিত হয় ফাউন্ডেশন্স এজ, ফাউন্ডেশন এন্ড দি আর্থ, প্রিলিউড ট্যু ফাউন্ডেশন এবং ফরোয়ার্ড দি ফাউন্ডেশন।

এই ৭টি বই নিয়েই মূলত ‘ফাউন্ডেশন’ সিরিজ। আইজ্যাক আসিমভ তার ফাউন্ডেশন সিরিজের প্রথম তিনটি খন্ড (ফাউন্ডেশন,ফাউন্ডেশন এন্ড এম্পায়ার এবং সেকেন্ড ফাউন্ডেশন) নিয়ে গঠিত ‘ফাউন্ডেশন ট্রিলজি’ ১৯৬৬ সালে ‘বেস্ট অল টাইম সাইন্স ফিকশন সিরিজ’ হিসেবে দ্য ওয়ার্ল্ড সাইন্স ফিকশন কনভেনশন থেকে ‘হুগো এওয়ার্ড’ লাভ করেন। ১৯৮৭ সালে ‘সাইন্স ফিকশন রাইটার্স এসোসিয়েশন অব আমেরিকা’ তাকে ‘গ্র্যান্ড মাস্টার জিবি সায়েন্স ফিকশন’ সম্মানে ভূষিত করে।

ফাউন্ডেশন সিরিজের মূল পটভূমি হলো ফার্স্ট গ্যালাকটিক এম্পায়ার। প্রায় ২৫ মিলিয়ন তারা নিয়ে এর ব্যপ্তি অনেকটা সৌরজগতের ন্যায়। এর জনসংখ্যা অকল্পনাতীত যা কোয়াড্রিলিয়নে হিসাব করতে হয়।

প্রায় ১২ হাজার বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত এ সাম্রাজ্যকে বলা হত মানবসভ্যতার সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন। ধারণা করা হত কোনো কিছুই এর পতন ঘটাতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। এম্পায়ার এর অকল্পনীয় উন্নত সভ্যতায় মরচে পরা শুরু করেছিল। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিলো এর ধ্বংসের সময়কাল।

আর এই নির্মম সত্যটি প্রথম উপলব্ধি করতে পারেন এম্পায়ার ‘হ্যালিকন রাজ্যের গণিতবিদ হ্যারি সেলডন। ৩০ বছর বয়সে ল্যাবটারীতে কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে নেহাৎ মজা করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ইকুয়েশন নিয়ে একটি হাইপোথিসিস প্রতিষ্ঠার সময় তিনি আবিষ্কার করে ফেলেন ‘সাইকোহিস্টোরি’।

যার সাহায্যে শেলডন হিসাব নিকাশ করে দেখতে পেলেন যে, এই বিশাল এম্পায়ারের আয়ু আছে আর মাত্র ৩০০ বছর। তারপর আর অস্তিত্ব থাকবে না এই বিশাল সাম্রাজ্যের। ৩০ হাজার বছরের এক অন্ধকার যুগ নেমে আসবে পুরো মানব জাতির উপরে।

বিশাল সাম্রাজ্য ও মানবজাতি রক্ষায় হ্যারি সেলডন তৈরি করলেন ‘সেলডন প্ল্যান’। সেলডন প্ল্যান বাস্তবায়ন করা গেলে ৩০ হাজার বছরের অন্ধকার যুগ মাত্র ১ হাজার বছরেই শেষ হবে। আর ধ্বংস হয়ে যাওয়া গ্যালাক্টিক এম্পায়ারের স্থানে মাথা তুলে দাঁড়াবে এক নতুন শক্তিশালী সম্রাজ্য।

শেষ পর্যন্ত সেলডন প্ল্যান কি সফল হয়? আসলেই কি হ্যারি সেলডন পেরেছিল মানব সভ্যতা কে রক্ষা করতে? এরই উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় আইজ্যাক আসিমভের ‘ফাউন্ডেশন’ সিরিজে।

ফাউন্ডেশন সিরিজের পাশাপাশি আইজ্যাক আসিমভের আরো দুটো বিখ্যাত সিরিজ হচ্ছে এম্পায়ার সিরিজ আর রোবট সিরিজ। সাহিত্যের প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিচরণ ছিল তার। বিজ্ঞান কল্পকাহিনির পাশাপাশি লিখেছেন ছোটগল্পও।

তার অসংখ্য ছোটগল্পের মধ্যে ‘নাইটফল’ গল্পটিকে ‘সায়েন্স ফিকশন রাইটার্স অফ আমেরিকা’ ১৯৬৪ সালে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান কল্পকাহিনী বিষয়ক ছোটগল্পের সম্মানে ভূষিত করে। ছোটদের জন্য ও রয়েছে তার অনেক লেখা। ‘পল ফ্রেঞ্চ’ ছদ্মনামে তিনি লিখতেন ছোটদের জন্য। অসংখ্য বিজ্ঞান কল্পকাহিনির জনক হলেও তিনি ছিলেন মানবতাবাদী।

তিনি আমেরিকান হিউম্যানিস্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার নামে পরবর্তীতে নামকরণ করা হয় ‘৫০২০ আসিমভ’ গ্রহাণু, ‘আসিমভ্‌স সাইন্স ফিকশন সাময়িকী’। এছাড়াও আইজাক আসিমভ এর নামে একাধিক পুরস্কারের নামকরণ করা হয়।

আইজ্যাক আসিমভ তার আত্মজীবনী লিখে গিয়েছেন। তিনখণ্ডে প্রকাশিত হয় তার আত্মজীবনী। আইজ্যাক আসিমভের ক্লসট্রোফিলিয়া ছিল অর্থাৎ তিনি ছোট আবদ্ধ স্থানে থাকতে ভালবাসতেন। তার আত্মজীবনী গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে তিনি সেটা উল্লেখ ও করে গেছেন। তিনি ছোটবেলায় এমন একটি ম্যাগাজিন স্ট্যান্ডের মালিক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন যা নিউ ইয়র্ক সিটি সাবওয়ে স্টেশনে অবস্থিত এবং যেখানে তিনি নিজেকে আবদ্ধ রেখে চলমান ট্রেনের শব্দ শুনতে পাবেন।

আইজ্যাক আসিমভের উচ্চতা ও উড্ডয়ন ভীতি ছিল। তিনি বিমানে চড়তে চাইতেন না। আর এজন্য দূরে কোথাও যেতেন ও না যেন বিমানে চড়তে না হয়। জীবদ্দশায় মাত্র দুবার বিমানে চড়েছেন তিনি। জীবনের শেষ সময়গুলোতে তিনি সমুদ্র ভ্রমণে অনেক সময় বের করেন। তিনি প্রমোদ জাহাজে করে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করতেন খুব। একজন লেখক পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি অসাধারণ জনপ্রিয় বিনোদন ব্যক্তিত্ব এবং বক্তা ছিলেন। তার সময় জ্ঞান ছিল অত্যন্ত প্রখর। কখনও ঘড়ি না দেখেও প্রায় নিখুঁত সময় বলে দিতে পারতেন।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কল্পবিজ্ঞান লেখক আইজ্যাক আসিমভ ১৯৯২ সালের ৬ ই এপ্রিল মারা যান । এ প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যত প্রজন্মের মাঝেও তিনি বেঁচে থাকবেন তার অসাধারণ সব লেখনীর মাধ্যমে।
তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করি, শ্রদ্ধা জানাই 🙏

পঞ্চানন মন্ডল   পঞ্চানন মন্ডল

তথ্য সূত্রঃ

https://www.britannica.com/biography/Isaac-Asimov

https://www.notablebiographies.com/An-Ba/Asimov-Isaac.html

http://unmuseum.mus.pa.us/notescurator/b3asimov.htm

আমেদিও_অ্যাভোগেড্রো

১৭৭৬ সালের ৯ ই আগস্ট ইতালিতে বিজ্ঞানী আমেদিও অ্যাভোগাড্রো( 9 August 1776 – 9 July 1856) জন্মগ্রহণ করেন।
১৮১২ খ্রিস্টাব্দে ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী আমেদিও অ্যাভোগাড্রো গ্যাসের আয়তন ও অণুর সম্পর্কীয় একটি সূত্র প্রস্তাব করেন। তাঁর দেয়া এ প্রস্তাবটি যদিও বিগত প্রায় ২০০ বছর যাবৎ নির্ভুল প্রমাণিত হয়ে আসছে অর্থাৎ তত্ত্ব হিসাবে প্রতিষ্ঠিত তথাপি আজও এ প্রস্তাবটি ‌#অ্যাভোগাড্রো_প্রকল্প (Avogadro’s Hypothesis) নামেই পরিচিত।
অ্যাভোগাড্রোর প্রকল্পটি এরূপ – স্থির তাপমাত্রা ও চাপে সম আয়তনের মৌলিক ও যৌগিক সকল গ্যাসে সমান সংখ্যক অণু থাকে। বিপরীতভাবে বলা যায় যে, স্থির তাপমাত্রা ও চাপে যে কোন গ্যাসের সমান সংখ্যক অণু সম আয়তন দখল করে।
উদাহরণস্বরূপ, যদি নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও চাপে চারটি একই আয়তনের বেলুনে যথাক্রমে হাইড্রোজেন (H2), অক্সিজেন (O2), নাইট্রোজেন (N2) ও কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2) গ্যাস ভরা থাকে এবং কোনভাবে প্রথম বেলুনে n সংখ্যক হাইড্রোজেন অণুর অস্তিত্ত্ব পাওয়া যায় তবে অ্যাভোগাড্রোর সূত্র অণুসারে অন্যান্য বেলুনগুলোতেও যথাক্রমে n সংখ্যক অক্সিজেন অণু, n সংখ্যক নাইট্রোজেন অণু এবং n সংখ্যক কার্বন ডাইঅক্সাইড অণু বিদ্যমান থাকবে; যদিও গ্যাসসমূহের রাসায়নিক ভর, গঠন ও প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটিই অ্যাভোগাড্রো প্রকল্পের মূল ধারণা।
এছাড়া অ্যাভোগাড্রোর প্রকল্প থেকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অণুসিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া গেছে। এগুলো হলো –
১. নিষ্ক্রিয় গ্যাস ব্যতীত অন্য সকল মৌলিক গ্যাসের অণু দ্বিপরমাণুক।
২. যেকোন গ্যাসের আণবিক ভর তার বাষ্প ঘনত্বের দ্বিগুণ।
. স্থির তাপমাত্রা ও চাপে সকল গ্যাসের মোলার আয়তন সমান এবং আদর্শ তাপমাত্রা ও চাপে তা ২২.৪ লিটার (L) বা ২২.৪ ঘনডেসিমিটার (dm3) ।
অ্যাভোগাড্রো সংখ্যার নামকরণ করা হয়েছে ১৯ শতকের ইতালীয় রসায়নবিদ আমাদিও আভোগাদ্রোর নামানুসারে। ১৮১১ সালে তিনি প্রথম বলেন যে কোন গ্যাসের আয়তন স্থির তাপমাত্রা ও চাপে তাতে বিদ্যমান অণু বা পরমাণু সংখ্যার সমান।
১৯০৯ সালে ফরাসী বিজ্ঞানী জিন বাপটিস্ট পেরিন ধ্রুবসংখ্যাটিকে অ্যাভোগাড্রোর সম্মানে নামকরণের প্রস্তাব করেন। পেরিন বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় অ্যাভোগাড্রো সংখ্যার মান নির্ণয়ের চেষ্টা করেন এবং এ কারনে ১৯২৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
১৮৬৫ সালে সর্বপ্রথম জোহান জোসেফ লসমিডট্‌ ধ্রুবসংখ্যাটির মান নির্দেশ করেন। তিনি একটি নির্দিষ্ট আয়তনে অণুর সংখ্যা গণনা করার মত একি ধরনের একটি প্রক্রিয়ায় বাতাসের অণুগুলোর গড় ব্যাস নির্ণয় করতে সমর্থ হন। তাঁর সম্মানে একক আয়তনে গ্যাসের অণুর সংখ্যাকে লসমিডট্‌ ধ্রুবক নামকরণ করা হয়েছে যা কিনা অ্যাভোগাড্রো সংখ্যার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
অ্যাভোগাড্রো সংখ্যার নির্ভুল মান নির্ণয় করা সম্ভব হয় যখন ১৯১০ সালে আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট মিলিকান একটা ইলেকট্রনের চার্জ পরিমাপ করেন। ১৮৩৪ সালে মাইকেল ফ্যারাডের তড়িৎ বিশ্লেষণ এর গবেষণা গুলো থেকে জানা যায় এক মোল ইলেকট্রনের চার্জ সর্বদা স্থির বা ধ্রুব, যাকে বলা হয় ১ ফ্যারাডে। এক মোল ইলেকট্রনের চার্জকে একটা ইলেকট্রনের চার্জ দিয়ে ভাগ করে অ্যাভোগাড্রো সংখ্যার মান নির্ণয় করা যায়।
পেরিন মূলত অক্সিজেনের এক গ্রাম অণুতে বিদ্যমান অণুর সংখ্যাকেই অ্যাভোগাড্রো সংখ্যা নামকরণের প্রস্তাব করেছিলেন, যেটা এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, বিশেষত প্রাথমিক গবেষণা কাজ গুলোতে।
পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে যখন পরিমাপের আন্তর্জাতিক একক (SI) এ মোল কে একটি মৌলিক এককে রূপান্তর করা হল তখন এর নাম পরিবর্তন করে অ্যাভোগাড্রো ধ্রুবক (NA) রাখা হয়, যা কোন বস্তুতে উপস্থিত পদার্থের পরিমাণ প্রকাশ করে এবং পরিমাপের মাত্রার উপর নির্ভর করে না।
এই স্বীকৃতির ফলে অ্যাভোগাড্রো সংখ্যা (NA) আর একটি বিশুদ্ধ সংখ্যা নয়, এর একক রয়েছে যা হচ্ছে মোলের বিপরীত রাশি (মোল−1)। যদিও পদার্থের পরিমাণ প্রকাশে সাধারণত মোলই ব্যবহৃত হয়, অ্যাভোগাড্রো সংখ্যাকে আরো কিছু এককের মাধ্যমেও প্রকাশ করা হয়, যেমন পাউন্ড মোল (lb-mol) কিংবা আউন্স মোল (oz-mol)।
NA = ২.৭৩১৫৯৭৫৭(১৪)×১০২৬ (lb-mol)−১ = ১.৭০৭২৪৮৪৭৯(৮৫)×১০২৫ (oz-mol)−১
আমরা জানি ১ মোল কোন পদার্থে অ্যাভোগেড্রো সংখ্যক কণা থাকে। অ্যাভোগেড্রো সংখ্যার মান হল 6.02×10^23।
কিন্তু এই সংখ্যাটির মান কেনো এই নির্দির্ষ্ট সংখ্যাটিই হল? অন্য কোন মান হতে পারলো না?
আমরা জানি হাইড্রোজেনের (H) এর পারমাণবিক ভর 1.008 g. এটা পাওয়া যায় হাইড্রোজেনের প্রধান তিনটি আইসোটোপের গড় ভর থেকে। এখন হাইড্রোজেন পরমাণুর নিক্লিয়াসে সাধারণত একটিমাত্র প্রোটন থাকে, কোন নিউট্রন থাকে না। তাহলে একটি H পরমাণুর ভর আসলে এর পরমাণুর কেন্দ্রের প্রোটনটির ভরের সমান (কক্ষপথস্থ ইলেক্ট্রনের ভর অতিমাত্রায় নগণ্য বলে হিসাব-বহির্ভূত।
অর্থ্যাত ১ টি H পরমাণুর ভর = ১ টি প্রোটনের ভর। = 1.672 × 10^-24 g।
এখন আমরা বের করব, এরকম কতগুলো H-পরমাণুর সমন্বিত ভর 1.008 g হয়।
গাণিতিকভাবে, (ঐকিক নিয়ম)
ভর 1.672 × 10^-24 g হয় যখন কণা 1 টি
ভর 1 হয় যখন কণা 1/(1.672 × 10^-24 g) টি
ভর 1.008 g হয় যখন কণা 1.008 g/(1.672 × 10^-24 g) টি ≈6.02×10^23 টি।
অর্থ্যাত 6.02×10^23 টি H-পরমাণু নিলে আমরা 1.008 g H পাব। অন্য কোন মৌল থেকেও হিসেব করে আমরা এই সংখ্যা পেতে পারি।
তাহলে, মূলত আমরা যে বলি হাইড্রোজেনের পারমাণবিক ভর 1.008 g, এটা আসলে ১ মোল বা 6.02×10^23 সংখ্যক হাইড্রজে ন পরমাণুর ভর। নচেৎ, একটি H-পরমাণুর ভর তো সেই শধু প্রোটনটির ভরের সমান মানে 1.672 × 10^-24 g।
অবশ্য, এখানে আমরা যাকে পারমাণবিক ভর বলছি তা মূলত গ্রাম পারমাণবিক ভর।
পারমাণবিক ভরকে মূলত Atomic Mass Unit (a.m.u) এককে প্রকাশ করা হয়। সেক্ষেত্রে সেটা একটি পরমাণুরই ভর, অ্যাভোগেড্রো সংখ্যক কণার ভর নয়।
তথ্যসূত্র -উইকিপিডিয়া
Image may contain: 1 person

পঞ্চানন মণ্ডল