মোবাইলের জন্ম ও রেডিওর থেকে অনুপ্রেরণা

মবাইল-ফোনের-জন্ম

আজ থেকে পনেরো বছর আগে মোবাইল ফোন সম্পর্কে আমাদের ধারণা ছিল খুব সীমিত। তখন খুঁজলে এলাকার সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত পরিবারে একটি টেলিফোন পাওয়া যেত। আজকের চিত্রটা একেবারেই আলাদা, ছোটো বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ সবার হাতেই গ্যাজেট মোবাইল থাকে সর্বাগ্রে। একে অপরের সাথে সামনা সামনি কথা বলা অপেক্ষা আমরা ভার্চুয়াল জগতের প্রতি বেশি আকৃষ্ট। আধুনিক কালের প্রযুক্তিতে যেসব আবিষ্কার মানুষের জীবনকে সবচাইতে বেশি প্রভাবিত করেছে – তার মধ্যে মোবাইল ফোন বা সেল ফোনের সাথে হয়তো আর কোন কিছুরই তুলনা চলে না।

রেডিওর প্রভাব ও অনুপ্রেরণা

মোবাইল ফোন সম্পর্কে কিছু বলার আগে টেলিফোন আর রেডিওর কথা বলে নেওয়া দরকার। ১৮৭৬ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে টেলিফোন উদ্ভাবন করেছিলেন অ্যালেকজান্ডার গ্রাহাম বেল। তার এক বছর বাদে গ্রাহাম বেল টেলিফোন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে টেলিফোন পরিষেবা দেওয়া শুরু করেন। রেডিও আসে টেলিফোনের অনেক পরে।

প্রথম রেডিও স্টেশন চালু হয় ১৯২২ সালে। কিন্তু অতি অল্প সময়ের মধ্যেই এটি অসাধারণ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। রেডিওর যেটা মস্ত বড় সুবিধা সেটা হল এটি চলে বেতারে। ঘরে বাইরে যে কোনও জায়গা থেকেই রেডিও শুনতে কোনো অসুবিধা ভোগ করতে হতো না। এই সুবিধা যদি টেলিফোনে থাকত অর্থাৎ যে কোনও জায়গা থেকে যদি টেলিফোন ব্যবহার করা যেত, তা হলে এর উপযোগিতা যে আরও অনেক গুণ বাড়ত তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

রেডিওর উদ্ভাবন হতে না হতেই বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদরা উঠে পড়ে লাগলেন রেডিও-র প্রযুক্তি ব্যবহার করে যদি একটি চলমান টেলিফোন ব্যবস্থা তৈরি করা যায়। সাধারণ ভাবে রেডিও আর টেলিফোনের মধ্যে প্রাথমিক তফাৎ হল যে, রেডিও একমুখী। অর্থাৎ এতে শক্তিশালী প্রেরকযন্ত্র বা ট্র্যান্সমিটার দিয়ে গান-বাজনা-কথা ইত্যাদি সম্প্রচার করা যায়।

গ্রাহকযন্ত্র বা রিসিভার-এর মাধ্যমে যে কেউ বহু দূর থেকেও তা শুনতে পায়। এই ভাবে সবার জন্য একমুখী প্রচার করাকে বলা হয় ‘ব্রডকাস্ট’। অন্য পক্ষে টেলিফোনের কথাবার্তা সব সময়ে দুমুখী। টেলিফোনের মাধ্যমে দু’জনে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলতে পারে – সবাইকে তা না শুনিয়ে। এই তফাতটা চিন্তা করলে বোঝা যায় যে, এই দুই প্রযুক্তিকে মেলানো খুব একটা সহজসাধ্য ব্যাপার নয়।

মার্টিন কুপার – মোবাইলের জনক:

প্রথম মোবাইল ফোন তৈরি হয়েছিল ১৯৭৩ সালে, আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে – আর তা তৈরি করেছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মার্টিন কুপার। তাকেই বলা হয় মোবাইল ফোনের জনক। ইতিহাস বলে, ১৮৮১ সালে প্রথম কলকাতায় টেলিফোনের মাধ্যমে কথা বলা ও শোনা হয়।

Who Invented the First Mobile Phone? - YouTube

কিন্তু আসল ব্যাপার হল, এর পাঁচ বছর আগে, ১৮৭৭ সালেই কলকাতায় টেলিফোনের সাহায্যে প্রথম কথোপকথন হয়েছে। আর ১৮৮১ সালে ওরিয়েন্টাল টেলিফোন কোম্পানি প্রথম কলকাতায় টেলিফোন এক্সচেঞ্জ স্থাপন করে। তখন থেকেই যে টেলিফোন ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে এরকমটা একেবারেই নয়। কিন্তু শেষ পনেরো বছরে মোবাইলের ব্যবহার বেড়েছে মাত্রাতিরিক্ত।

দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য মোবাইল ফোন এত জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। মোবাইল লার্নিং আজকের দিনে শিক্ষাগত প্রযুক্তির অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। ব্যক্তিগত ইলেকট্রনিক মিডিয়াম ব্যবহারের দ্বারা বিষয়বস্তুকে আত্তীকরণ ও শিখন-ই হল মোবাইল লার্নিং। এটি দূরশিখনের অন্যতম মাধ্যম। প্রথাগত শিখনের বাইরে নিজের মনমতো শিখনে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করে। ওয়ারলেস নেটওয়ার্কের সুবিধা ও স্বতঃস্ফূর্ত এই প্ল্যাটফর্ম সহজেই তথ্য আদান-প্রদানকে আমাদের অধিগত করেছে।

ট্রাক্সলার এর মতে, “Mobile learning is defined as an educational provision, where the sole or dominant technologies are handheld or palmtop devices.

সাধারণভাবে ভিডিয়ো, অডিয়ো, ইমেজ, অ্যানিমেশন ও ইন্টারাক্টিভ পদ্ধতির মাধ্যমে সহজেই শিক্ষার্থী যেকোনো বিষয়ে জ্ঞান লাভ করতে পারে। যদিও এই পদ্ধতিতে শিক্ষালাভ যথেষ্ট ব্যয়বহুল, কম মেমরি স্টোরেজের ডিভাইসে প্রয়োজনীয় তথ্যসামগ্রী অনেক সময় ধারণ করা যায় না। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী নিজের ইচ্ছে ও চাহিদার দিকে গুরুত্ব দিতে পারেন।

বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড জেনার

১৭৯৬ সালের মে মাস ।   চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসের একটি অত্যন্ত স্মরণীয় মাস । ইংল্যান্ডের বার্কলিতে একজন চিকিৎসক একদিন লক্ষ্য করেন যে, বাড়ি বাড়ি গরুর দুধ দিয়ে বেড়ানো গোয়ালার দেহে স্মলপক্স অর্থাৎ গুটিবসন্ত রোগের সংক্রমণ হয়নি।
আশেপাশের মানুষজন গুটিবসন্তে আক্রান্ত হচ্ছে, কিন্তু প্রচন্ড সংক্রমণশালী এই গুটিবসন্ত মেয়েটিকে কিছুতেই সংক্রমণ করতে পারছে না। তখনকার দিনে শতবছর ধরে টিকে থাকা এ রোগে মানুষের মৃত্যুহার ছিলো অনেক বেশি। করোনা এর কাছে নস্যি! !গত শতাব্দীতেও প্রতি দশজনে তিনজনের মৃত্যু হতো, এতটাই ভয়ানক এক রোগ এই গুটিবসন্ত।
তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি এই মেয়েটিকে পরীক্ষা করে দেখবেন, কোনো একভাবে নিশ্চয়ই মেয়েটির শরীরে গুটিবসন্ত সৃষ্টিকারী ভ্যারিওলা ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা তৈরি হয়েছে।
যদি সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি পুনরায় তৈরি করা যায়, তবে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচানো যাবে।এই বিষয়টিকে খতিয়ে দেখতে একদিন মেয়েটির বাড়ি যান। তিনি দেখতে পান যে, মেয়েটির বাড়িতে গরুগুলো সবই গোবসন্তে আক্রান্ত। গুটিবসন্তের মতো গরুতেও একধরনের বসন্তরোগ হয়ে থাকে, এরই নাম ছিলো গোবসন্ত। গরুর শরীরেও তরলপূর্ণ ছোট ছোট গুটি দেখা যেতো।
তিনি বুঝতে পারেন যে, হয়তো কোনোভাবে গরুটির সংস্পর্শে থেকে মেয়েটির শরীরে গোবসন্ত সংক্রমিত হয়েছে, গোবসন্ত মানবদেহে কোনো রোগ তৈরি করতে পারেনি, একইসাথে গুটিবসন্তের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
ভাবলেন এই ধারণাটি তিনি নিজে পরীক্ষা করে দেখবেন। ৮ বছর বয়সী একটি বাচ্চা ছেলের দেহে তিনি একটু ক্ষতসৃষ্টি করে সেখানে গোবসন্তের ক্ষত থেকে সংগৃহীত তরল লাগিয়ে দেন। বাচ্চাটির ক্ষতস্থানটি তাৎক্ষণিক ভাবে ফুলে উঠলেও কিছুদিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যায় সবকিছু।
কিছুদিন পর বাচ্চাটির দেহে আবারো একইভাবে জীবাণু প্রবেশ করান। তবে এবার গোবসন্তের জীবাণু নয়, তরতাজা গুটিবসন্তের জীবাণু !! বাচ্চাটি অল্প অসুস্থ হয়ে কদিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠে, গুটিবসন্ত শিশুটিকে আর আক্রান্ত করতে পারছে না। এভাবে গুটিবসন্তের কবল হতে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব।
রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপণাকে নির্ভর করতে হয় মানবদেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর। মানবদেহের সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যবস্থা হলো তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। খুবই শক্তিশালী এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
নির্দিষ্ট অণুজীব যা দিয়ে প্রতিনিয়ত আমরা রোগে আক্রান্ত হই, কোনোভাবে যদি অণুজীবগুলোর সাথে দেহকে আগেই পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায়, তবেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি সেসব অণুজীবের বিরুদ্ধে কাজ করে সক্ষম হবে। মানব ইতিহাসের প্রথম টিকা গুটিবসন্ত টিকা আবিষ্কারের সময়, ঠিক এই ধারণাটিই কাজে লাগিয়েছিলেন সেই চিকিৎসক বিজ্ঞানী।
ভ্যারিওলা ভাইরাস বসন্ত রোগ সৃষ্টি করে, এর ভিন্ন দুইটি টাইপের (এই ভাইরাসের সর্বমোট ৪টি টাইপ রয়েছে) একটি থেকে গরুদের, আরেকটি থেকে মানবদেহে বসন্ত রোগ সৃষ্টি করে । গরুদের ভাইরাস মানবদেহে উপস্থিত থাকার কারণে অন্য টাইপটি বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারে না। আর গোবসন্তের জীবাণুও মানবদেহে রোগ তৈরিতে অক্ষম। কেবলমাত্র এই ধারণাকে ব্যবহার করেই তৈরি করা হয়েছে অন্যান্য রোগের টিকাগুলো। ১৮৮৫ সালে লুই পাস্তুর যখন জলাতঙ্কের প্রতিষেধক আবিষ্কার করেন , তিনিও এই পদ্ধতি অনুসরণ করেন।
গুটিবসন্তের বিরুদ্ধে এই টিকা আবিষ্কারের খবর দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সব এলাকায় চিকিৎসকরা একইভাবে মানুষকে টিকা প্রদান করতে শুরু করেন।
এই মহান চিকিৎসক বিজ্ঞানী হলেন এডওয়ার্ড জেনার (Edward Jenner ) ( ১৭ মে ১৭৪৯-২৬ জানুয়ারি ১৮২৩)।
যিনি গুটিবসন্ত রোগের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পথিকৃৎ, যা মানবজাতির প্রথম ভ্যাকসিন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক নতুন ইতিহাস তৈরি করলেন।
এডোয়ার্ড জেনার ( Edward Jenner ১৭ মে, ১৭৪৯ – ২৬ জানুয়ারি, ১৮২৩) ছিলেন একজন ইংরেজ চিকিৎসক এবং বৈজ্ঞানিক, যিনি গুটিবসন্ত রোগের ভ্যাকসিন আবিস্কারের পথিকৃৎ। তিনি   গ্লৌচেস্টারশায়ারের বার্কলেতে জন্মগ্রহণ করেন ।
তাঁর বাবা ছিলেন বার্কলের উপাচার্য,এই কারণে জেনারের প্রাথমিক শিক্ষা ভাল ভাবেই সম্পন্ন হয় । তিনি যখন স্কুলে পরতেন তখন তাকে স্মল পক্সের জন্য ভারিওলেসন> (আদিম টিকাদান পদ্ধতি) করা হয়, যা তার স্বাস্থ্যে সুদূর প্রভাব ফেলেছিল ।
১৪ বছর বয়সে তাকে শিক্ষানবিশ হিসেবে সার্জন ড্যানিয়েল লুডলর কাছে পাঠানো হয় যেখানে তিনি নিজে সার্জন হিসেবে প্রয়োজনীয় সমস্ত শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা লাভ করেন । ১৭৭০ সালে জন হান্টারের অধীনে সেন্ট জর্জ হাসপাতালে তিনি সার্জারি ও অ্যানাটমি বিভাগে যোগদান করেন ।
হান্টারই তাঁকে ন্যাচারাল হিস্ট্রির সাথে পরিচয় করিয়ে দেন এবং রয়াল সোসাইটিতে তাঁর নাম প্রস্তাব করেন । ১৭৭৭ সালের দিকে জেনার বার্কলেতে ফিরে আসেন এবং একজন সফল ডাক্তার এবং সার্জন হিসেবে মানবসেবায় নিজেকে সঁপে দেন ।
এডওয়ার্ড জেনার জাতিতে একজন ইংরেজ। তাঁর জন্ম ও কর্মস্থল ইংল্যান্ডের বার্কলিতে। বার্কলি থেকেই গুটিবসন্ত নিয়ে তার গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার শুরু।
যদিও ছাত্রজীবন থেকেই ভয়াবহ গুটিবসন্ত রোগটি সম্পর্কে তার মনে আগ্রহ ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়।নানা রকম প্রতিকূলতা ও নানা বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হন তিনি তাও তিনি নিজের সাধ্যমতো এগোতে থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত সফলতার মুখ দেখেন।
জেনার তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান ।
শুরুর দিকে রয়্যাল সোসাইটি তাঁর গবেষণাপত্রগুলি গ্রহণ করে নি । কিন্তু বিস্তর গবেষণা আর পরীক্ষা নিরীক্ষার পর তাঁর ২৩টি কেস এর ফলাফল প্রকাশ করা হয়, যার মধ্যে একটি কেস ছিল তাঁর ১১ বছরের ছেলে রবার্টের । তার কিছু সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল, কিছু ভুল; যদিও আধুনিক মাইক্রোবায়োলজি ও আনুবীক্ষন পদ্ধতি তার গবেষণা গুলো আরও নির্ভুল করে তুলতে পারত । শেষ পর্যন্ত ভ্যাকসিনেসন পদ্ধতি স্বীকৃতি পায়, এবং ১৮৪০ সালে ব্রিটিশ সরকার ভ্যারিওলেশন নিষিদ্ধ করে ও বিনামূল্যে ভ্যাকসিনেসন পদ্ধতির সুচনা করে ।
এই সাফল্যের খবর সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে এবং আমেরিকা, ফিলিপিন্স, মাকাও ও চীনে ফ্রাঞ্চকো জাভিয়ার ডি বাল্মিসের অধিনে বাল্মিস মিশনে হাজার হাজার লোককে স্মল পক্সএর টিকা দেওয়া হয় ।
জেনার এর অবিরত গবেষণা তাঁর সাধারণ ডাক্তারি পেশায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় । তার সহকর্মীরা এবং রাজা তাঁকে এ ব্যাপারে সাহায্য করে, এবং ১৮০২ সালে সংসদ এর পক্ষ থেকে তাঁকে ১০,০০০ পাউন্ড দেওয়া হয়, ভ্যাকসিনেসন পদ্ধতির ওপর আরও গবেষণা করার জন্য ।
১৮০৭ সালে রয়্যাল কলেজ অফ ফিজিসিয়ান তাঁর ভ্যাকসিনেসন পদ্ধতির সুদূর প্রসারি অবদানের কথা স্বীকার করলে তাঁকে আরও ২০,০০০ পাউন্ড প্রদান করা হয়
জেনার ছিলেন ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের খুবই প্রিয়ভাজন। নেপোলিয়ন নিজে টিকা নিলেন। তখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ জেনারকে সম্মানিত করতে লাগল।
বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হল। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, যে তারিখে এডওয়ার্ড জেনার বালক জেমস ফিপসকে গুটিবসন্তের টিকা দিয়েছিলেন (৪ মে), জার্মানি প্রতি বছর সেই দিনকে একটা জাতীয় পর্ব দিন হিসেবে ধার্য করল।
ডা. জেনার তার আবিষ্কারের পদ্ধতি লুকিয়ে রাখলেন না। পৃথিবীর নানা জায়গা থেকে নানা প্রশ্ন আসতে লাগল। তিনি ঠিকভাবে সব কথা বুঝিয়ে দিতে লাগলেন। অনেক দেশ আইন করে টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক করল।
১৮০২ সালে জেনার ‘অ্যামেরিকান একাডেমী অফ আর্টস অ্যান্ড সায়েন্স’ এবং
১৮০৬ সালে ‘রয়্যাল সুইডিশ একাডেমী অফ আর্টস অ্যান্ড সায়েন্স’ এর ফরেন অনারি মেম্বার হিসেবে নির্বাচিত হন । ১৮০৩ সালে জেনার ‘জেনারিয়ান সোসাইটি’র সভাপতি নির্বাচিত হন, যেটির মূল উদ্দেশ্য ছিল স্মল পক্স ভ্যাকসিনকে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া । ১৮০৮ সালে সরকারি পৃষ্ঠপোষকোতা নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় ন্যাশনাল ভ্যাকসিন স্টাব্লিসমেন্ট । কিন্তু জেনার ও কর্তৃপক্ষের মোধ্যে মনোমালিন্য দেখা দিলে তিনি পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেন ।
১৮১১ সালে তিনি আবার লন্ডন ফিরে বেশ কিছু স্মল পক্সের রোগীর দেখা পান, যারা আগে ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছিল । কিন্তু তিনি লক্ষ করেন রোগের তীব্রতা আগের থেকে অনেক কম ছিল । নাচারাল হিস্ট্রির ওপর তিনি তার গবেষণা চালিয়ে যান । অবশেষে ১৮২৩ সালে, তার জীবনের শেষ বর্ষে, তিনি তার ‘অবসারভাসন অন দা মাইগ্রেসন অফ বার্ড’ রয়্যাল সোসাইটিতে পেশ করেন ।
জেনারের আবিষ্কারে বিশ্বজুড়ে সাড়া পড়ে যায়। এমনকি তিনি মারা যাওয়ার পরও চলতে থাকে গবেষণা কার্যক্রম। স্বস্তি পায় মানুষ ।
তাঁর মৃত্যুর ৫৭ বছর পর ১৯৮০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা(WHO) ঘোষণা করে, গুটিবসন্ত রোগটি শতভাগ নির্মূল সম্ভব হয়েছে। শেষবার এ রোগে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গিয়েছিল ১৯৭৭ সালে।
এভাবেই আবিষ্কৃত হয় প্রাণঘাতী মারাত্মক ছোঁয়াচে গুটিবসন্ত রোগের টিকা। আর এই আবিষ্কারের সঙ্গে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে আছে এডওয়ার্ড জেনারের নাম।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয় – প্রতিকারের চেয়ে কোনো রোগকে প্রতিরোধ করতে পারাটাই হল সবচেয়ে উত্তম।
ডাঃ জেনার আবিষ্কৃত প্রতিরোধ ব্যবস্থা অনুসরণ করে গুটিবসন্ত রোগকে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিতাড়িত করতে প্রায় ২০০ বছর লেগে যায়। এই সময়ে বিশ্বে আনুমানিক ৩০ কোটি লোকের মৃত্যু হয় এই মারণব্যাধিতে !!
বিজ্ঞানী ও গবেষকরা কেউ আজ বসে নেই। বিশ্বজুড়ে দাপিয়ে বেড়ানো করোনা ভাইরাসের(Covid 19)এর আগ্রাসী থাবায় জনজীবন আজ বিপন্ন হয়ে পড়েছে। সবকিছুই আজ স্থবির, স্তব্ধ।
আমাদের আশা, মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ পোলিও, হাম, যক্ষা, হেপাটাইটিস-বি, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকারসহ যাবতীয় রোগের মতোই করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনও সহসা মানুষের হাতের নাগালে চলে আসবে।
সারা বিশ্বের বিজ্ঞানী ও গবেষকরা নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সে দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছি আমরা ।পৃথিবীর অনেক দেশে অনেক বিজ্ঞানী ও গবেষক করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের একেবারে শেষ পর্যায়ে চলে এসেছেন। তবে পুরোপুরি স্পষ্ট নয় বিশ্বের কোন প্রান্তে , কোন বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম চিৎকার করে উঠবেন ইউরেকা ইউরেকা বলে! ! বিশ্ব তবুও আশায় বুক বেঁধে আছে। যদি উদিত হন কোনো জেনার !!!
 মহান বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড জেনারের কে  বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

©

Panchanan Mandal  পঞ্চানন মন্ডল

তথ্যসূত্র

পৃথিবীর প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক পেনিসিলিন আবিষ্কারের গল্প

নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ও পেনিসিলিন আবিষ্কার গল্প
****************************************************************************
“১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বরের ২৮ তারিখে ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর আমার প্ল্যান কোনোভাবেই এমন ছিলো না যে আমি পৃথিবীর প্রথম ব্যাকটেরিয়া-হত্যাকারী বা প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করে চিকিৎসার জগতে বিপ্লব নিয়ে আসবো। কিন্তু হয়তো, ঠিক সেটাই আমি করে ফেলেছি।”
এভাবেই এক চিঠিতে পেনিসিলিন আবিষ্কারের নেপথ্যের গল্পটা লিখে রেখে গেছেন নোবেলজয়ী চিকিৎসাবিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্লেমিং (Sir Alexander Fleming) (১৮৮১-১৯৫৫)।
আজ থেকে ৯২ বছর আগের একটি দিনে একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে আকস্মিক দুর্ঘটনাক্রমে তাঁর ল্যাবরেটরিতে আবিষ্কৃত হয়েছিল পৃথিবীর প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক পেনিসিলিন।
আলেকজান্ডার ফ্লেমিং এর জন্ম ১৮৮১ সালের ৬ই আগষ্ট স্কটল্যান্ডের অর্ন্তগত লকফিল্ড নামক এক পাহাড়ী গ্রামে।
বাবা ছিলেন একজন কৃষক ।
আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। দারিদ্রের মধ্যেই ছেলেবেলা কাটে ফ্লেমিং এর। যখন তার বয়স ৭ বছর, তখন তিনি বাবাকে হারান।
অভাবের জন্য প্রাইমারী স্কুলের গন্ডিটুকুও শেষ করতে পারেন নি। যখন ফ্লেমিং এর বয়স ১৪, তখন তার ভাইয়েরা সকলে চলে এলো লন্ডন শহরে। তাদের দেখাশুনার ভার ছিল বোনের উপর।
কিছুদিন কাজের সন্ধানে ঘোরাঘুরি করার পর ১৬ বছর বয়সে এক জাহাজ কোম্পানিতে চাকরি পেলেন ফ্লেমিং, অফিসে ফাইফরমাশ খাটার কাজ।
কিছুদিন চাকরি করেই কেটে গেল। ফ্লেমিং এর এক কাকা ছিলেন নি:সন্তান। হঠাৎ তিনি মারা গেলেন। তার সব সম্পত্তি পেয়ে গেলেন ফ্লেমিং এর ভাইয়েরা।
ফ্লেমিং এর বড় ভাই টস এর পরামর্শ মতো ফ্লেমিং জাহাজ কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দিয়ে মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হলেন। ১৯০৮ সালে ডাক্তারির শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন। কারণ, সেনাবাহিনীতে খেলাধুলার সুযোগ ছিল সবচেয়ে বেশি!
কয়েক বছর সামরিক বাহিনীতে কাজ করার পর ইউরোপ জুড়ে শুরু হল ১ম বিশ্বযুদ্ধ। সে সময় ফ্লেমিং ফ্রান্সের সামরিক বাহিনীর ডাক্তার হিসেবে কাজ করছিলেন। তিনি ব্যাক্টেরিয়া নিয়ে যে গবেষণা করছিলেন, এখানেই প্রথম তার পরীক্ষা করার সুযোগ পেলেন।
হাসপাতালে প্রতিদিন অসংখ্য সৈনিক এসে ভর্তি হচ্ছিল। তাদের অনেকেরই ক্ষত ব্যাক্টেরিয়ায় দূষিত হয়ে উঠেছিল। ফ্লেমিং লক্ষ করলেন, যে সব অ্যান্টিসেপ্টিক ঔষধ চালু আছে তা কোন ভাবেই কার্যকরী হচ্ছে না। ক্ষত বেড়েই চলেছে।
যদি খুব বেশি পরিমাণে অ্যান্টিসেপ্টিক ব্যবহার করা হয়, সে ক্ষেত্রে ব্যাক্টেরিয়া কিছু পরিমাণে ধ্বংস হলেও দেহকোষগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফ্লেমিং উপলব্ধি করলেন, দেহের স্বাভাবিক শক্তিই একমাত্র এসব ব্যাক্টেরিয়াগুলো প্রতিরোধ করতে পারে, কিন্তু তার ক্ষমতাও সীমাবদ্ধ।
১৯১৮ সালে যুদ্ধ শেষ হলো, ২ মাস পর ইংল্যান্ডে ফিরে এলেন ফ্লেমিং। আন্তরিক প্রচেষ্টা স্বত্ত্বেও জীবাণুগুলোকে ধ্বংস করার মত কিছুই খুঁজে পেলেন না।
ইংল্যান্ডে ফিরে এসে তিনি সেন্ট মেরিজ মেডিকেল স্কুলে ব্যাক্টেরিয়োলোজির প্রফেসর হিসেবে যোগ দিলেন। এখানে পুরোপুরিভাবে ব্যাক্টেরিয়োলোজি নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সঠিকভাবে উপলব্ধি করলেন মানবদেহের কিছু নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে যা এ বহিরাগত জীবাণু প্রতিরোধ করতে পারে।
কিন্তু প্রত্যক্ষ কোন প্রমাণ পেলেন না। ১৯২১ সালে, একদিন ল্যাবরেটরিতে বসে কাজ করছিলেন ফ্লেমিং। কয়েকদিন ধরেই তার শরীরটা ভাল যাচ্ছিল না। সর্দি কাশিতে ভুগছিলেন। তিনি তখন প্লেটে জীবাণু কালচার নিয়ে কাজ করছিলেন, হঠাৎ প্রচন্ড হাঁচি এল। নিজেকে সামলাতে পারলেন না ফ্লেমিং।
প্লেটটা সরাবার আগেই নাক থেকে খানিকটা সর্দি এসে পড়ল প্লেটের উপর। পুরো জিনিসটি নষ্ট হয়ে গেল দেখে প্লেটটি একপাশে সরিয়ে রেখে নতুন একটা প্লেট নিয়ে কাজ শুরু করলেন। কাজ শেষ হয়ে গেলে বাড়ি ফিরে গেলেন ফ্লেমিং।
পরদিন ল্যাবরেটরিতে ঢুকেই টেবিলের একপাশে সরিয়ে রাখা প্লেটটির দিকে নজর পড়ল। ভাবলেন, প্লেটটি ধুয়ে কাজ শুরু করবেন। কিন্তু প্লেটটি তুলে ধরতেই চমকে উঠলেন। গতকাল প্লেট ভর্তি ছিল যে জীবাণু দিয়ে, সেগুলো আর নেই।
ভালো করে পরীক্ষা করতেই দেখলেন সব জীবাণুগুলো মারা গিয়েছে। চমকে উঠলেন ফ্লেমিং। কিসের শক্তিতে নষ্ট হলো এতগুলো জীবাণু?  ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ মনে পড়লো গতকাল খানিকটা সর্দি পড়েছিল প্লেটের উপর। তবে কি সর্দির মধ্যে এমন কোন উপাদান আছে যা এই জীবাণুগুলোকে ধ্বংস করতে পারে? পরপর কয়েকটি জীবাণু কালচার করা প্লেট টেনে নিয়ে তার উপর নাক ঝাড়লেন।
আলেকজান্ডার ফ্লেমিং
দেখা গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই জীবাণুগুলো নষ্ট হতে আরম্ভ করেছে। এই আবিষ্কারের উত্তেজনায় নানাভাবে পরীক্ষা শুরু করলেন ফ্লেমিং। দেখা গেল- চোখের জল, থুথুর জীবাণু ধ্বংস করার ক্ষমতা আছে। আর দেহ নির্গত এই প্রতিষেধক উপাদানটির নাম দিলেন লাইসোজাইম, যার অর্থ জীবাণু ধ্বংস করা। সাধারণ জীবাণুগুলোকে এটি ধ্বংস করলেও অধিকতর শক্তিশালী জীবাণুগুলোর ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়। তারপর আট বছর কেটে গেল।
একদিন লক্ষ্য করলেন, আকস্মিকভাবেই ঝড়ো বাতাসে খোলা জানালা দিয়ে ল্যাবরেটরির বাগান থেকে কিছু ঘাস পাতা উড়ে এসে পড়ল জীবাণু ভর্তি প্লেটের উপর। খানিক পরে প্লেটগুলো টেনে নিতেই দেখলেন জীবাণুর কালচারের মধ্যে স্পষ্ট পরিবর্তন।
মনে হলো, নিশ্চয়ই এই আগাছাগুলোর মধ্যে এমন কিছু আছে যার জন্যে পরিবর্তন ঘটল। ভালো করে পরীক্ষা করতেই লক্ষ্য করলেন আগাছাগুলোর উপর ছত্রাক জন্ম নিয়েছে। সেই ছত্রাকগুলো বেছে নিয়ে জীবাণুর উপর দিতেই জীবাণুগুলো ধ্বংস হয়ে গেল।
তিনি বুঝতে পারলেন, তার এতোদিনের সাধনা অবশেষে সিদ্ধি লাভ করলো। এই ছত্রাকগুলোর বৈজ্ঞানিক নাম পেনিসিলিয়াম নোটেটাম। তাই এর নাম দিলেন পেনিসিলিন। রসায়ন সম্মন্ধে জ্ঞান না থাকার কারণে পেনিসিলিন আবিষ্কার করলেও কীভাবে তাকে রাসায়নিক পদ্ধতিতে ঔষধ হিসেবে প্রস্তুত করা যায় তার কোন ধারণা ফ্লেমিং করে উঠতে পারেন নি।
চিকিৎসক হলেও জীবাণুতত্ত্বের দিকেই তাঁর আগ্রহ ছিল সব চেয়ে বেশি। তাই জীবাণু সম্পর্কিত বিভিন্ন দিক নিয়ে তিনি সারাজীবন গবেষণা করে গেছেন। ১৯২৮ সালে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং সর্বপ্রথম পেনিসিলিন আবিষ্কার করলেও একে মানবদেহে ব্যবহারের উপযোগী অবস্থায় নিয়ে আসেন দু’জন বিজ্ঞানী- হাওয়ার্ড ফ্লোরি (১৮৯৮-১৯৬৮) ও আর্নস্ট চেইন (১৯০৬-১৯৭৯)।
১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই পেনিসিলিনের উপযোগিতা তীব্রভাবে সকলে অনুভব করল।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাওয়ার্ড ফ্লোরির নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী কীভাবে পেনিসিলিনকে ঔষধে রূপান্তরিত করা যায় তা নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করলেন। ফ্লোরির সাথে ছিলেন রসায়নবিদ ড. চেইন। কয়েক মাস প্রচেষ্টার পর তারা সামান্য পরিমাণ পেনিসিলিন তৈরি করতে সক্ষম হলেন।
প্রথমে তারা কিছু জীব জন্তুর উপর পরীক্ষা করে আশাতীত ভালো ফল পেলেন। কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফল নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল মানুষের উপর পরীক্ষা। আকস্মিকভাবে সে সুযোগও এসে গেল।
একজন পুলিশ কর্মচারী মুখে সামান্য আঘাত পেয়েছিলেন। তাতে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল তা দূষিত হয়ে জীবাণু রক্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। ডাক্তাররা তার জীবনের সব আশা ত্যাগ করেছিলেন । ১৯৪১ সালের ২০ ফেব্র“য়ারী প্রফেসর ফ্লোরি স্থির করলেন এই মুত্যু পথযাত্রী মানুষটির উপরই পরীক্ষা করবেন পেনিসিলিন।
তাকে তিন ঘন্টা অন্তর চার বার পেনিসিলিন দেওয়া হল। ২৪ ঘন্টা পর দেখা গেল যার আরোগ্য লাভের কোন আশাই ছিল না, সে প্রায় সুস্থ হয়ে উঠেছে। এই ঘটনায় সকলেই উপলব্ধি করতে পারলো চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কি যুগান্তকারী প্রভাব বিস্তার করতে চলেছে পেনিসিলিন।
ডা: চেইন বিশেষ পদ্ধতিতে পেনিসিলনকে পাউডারে পরিণত করলেন এবং ডা: ফ্লোরি তা বিভিন্ন রোগীর উপর প্রয়োগ করলেন। কিন্তু যুদ্ধে হাজার হাজার আহত মানুষের চিকিৎসায় ল্যাবরেটরিতে প্রস্তুত পেনিসিলিন প্রয়োজনের তুলনায় ছিল নিতান্তই কম।
আমেরিকার Northern Regional Research ল্যাবরেটরি এ ব্যাপারে সাহায্য করতে এগিয়ে এলো। মানব কল্যাণে নিজের এ আবিষ্কারের ব্যাপক প্রয়োগ দেখে আনন্দে অভিভূত হয়ে উঠেছিলেন ফ্লেমিং। মানুষের কোলাহলের চেয়ে প্রকৃতির নি:সঙ্গতাই তাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করত।
১৯৪৩ সালে তিনি রয়েল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। ১৯৪৪ সালে ইংল্যান্ডের রাজ দরবারের তরফ থেকে তাকে নাইট উপাধি দেয়া হল। ১৯৪৫ সালে তিনি আমেরিকা গেলেন।
১৯৪৫ সালের শেষের দিকে তিনি ফরাসি সরকারের আমন্ত্রণে ফ্রান্সে গেলেন। সর্বত্র পেলেন তিনি বিপুল সংবর্ধনা। প্যারিসে থাকাকালীন তিনি জানতে পারলেন এ বছরের মানব কল্যাণে পেনিসিলিন আবিষ্কার এবং স্বার্থক প্রয়োগের জন্য নোবেল কমিটি চিকিৎসা বিদ্যায় ফ্লেমিং, ফ্লোরি ও ডা: চেইনকে একই সাথে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত করেছে। ফলে এই দু’জন বিজ্ঞানীও আলেকজান্ডার ফ্লেমিংয়ের সঙ্গে সম্মিলিত ভাবে ১৯৪৫ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। সম্মানিত হলো চিকিৎসা জগতের জন্য এক নতুন দিগন্তের আবিস্কার ।
ফ্রান্স থেকে ফিরে এসে তিনি আবার সেন্ট মেরি হাসপাতালে ব্যাক্টেরিয়োলজির গবেষণায় মনোযোগী হয়ে উঠেন। ৪ বছর পর তার স্ত্রী সারিন মারা যান। এ মৃত্যুতে মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন ফ্লেমিং। তার জীবনের এই বেদনার্ত মুহুর্তে পাশে এসে দাঁড়ালেন গ্রীক তরুণী আমালিয়া তারুকা।
আমালিয়া ফ্লেমিং এর সাথে ব্যাক্টেরিয়োলজি নিয়ে গবেষণা করতেন। ১৯৫৩ সালে দু‘জনে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হলেন। কিন্তু এই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হল না। ২ বছর পর ১৯৫৫ সালের ১১ মার্চ ৭৩ বছর বয়সে লন্ডনে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করলেন ফ্লেমিং।
মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হল এই পেনিসিলিন আবিষ্কার। যতদিন মানবজাতি থাকবে ততদিন আলেকজান্ডার ফ্লেমিং মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন।
 তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধা ও প্রনাম জানাই   🙏🙏

©পঞ্চানন মণ্ডল    পঞ্চানন মন্ডল