কি করে বুঝবেন আপনি কম ঘুমাচ্ছেন

কি করে বুঝবেন আপনি কম ঘুমাচ্ছেন

Dr. Opurbo Chowdhury
London, England

সুস্থ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতি চব্বিশ ঘন্টায় সাত থেকে আট ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন । এর সঠিক কোনো কারণ বিজ্ঞান এখনো জানে না । একমত হবার মতো সঠিক কারণটি না জানলেও পরীক্ষা এবং গবেষণা করে এই হিসেবটায় একমত হয়েছে । এর কমতি হলে শরীরে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয় ।

বাচ্চারা গড়ে ষোলো থেকে আঠারো ঘন্টা ঘুমায় । কিশোর কিশোরীদের দৈনিক ঘুমের প্রয়োজন দশ থেকে বারো ঘন্টা । এই সময় তাদের শরীরে কিছু পরিবর্তন হয় । ঘুমের সমস্যা শারীরিক পরিবর্তনগুলোর উপর প্রভাব ফেলে । বাবা মায়েদের উচিত সন্তানদের ভালো স্বাস্থ্যের জন্যে পর্যাপ্ত ঘুমের দিকটি লক্ষ্য রাখা । যদিও অনেক বাবা মা নিজেরাই রাতের পাখি, সন্তানদের কি করে ঠিক রাখবে আঁখি !

মানুষের জীবনের তিনভাগের এক ভাগ ঘুমে কাটে । তবে প্রাণীদের মধ্যে বিড়াল এবং বাদুড় সবচেয়ে বেশি ঘুমায় । ষোলো থেকে আঠারো ঘন্টা ।

কিন্তু প্রতিদিন হিসেবে করে দেখেন যে – ঠিকই তো আট-নয় ঘন্টা ঘুমিয়েছেন, কিন্তু ঘুম থেকে উঠে মনে হতে থাকে পর্যাপ্ত ঘুমাননি । দিনভর ক্লান্ত লাগছে, শরীর অযথা অলস লাগছে, মাথা ভার ভার হয়ে আছে, কোথাও মনোসংযোগ দিতে পারছেন না । হরহামেশাই এসব সমস্যা দিনের বেলা মোকাবেলা করছেন ।

আধুনিক নগর জীবনে ঘুম একটি প্রধান সমস্যা । বিশ্ব জুড়েই এই সমস্যা । উন্নত দেশগুলোতে প্রতি তিনজনের একজন ঘুম জনিত সমস্যায় ভুগছে । কম ঘুম এবং অতিরিক্ত ভুল খাওয়া এখন কোনো কোনো জাতির জাতীয় সমস্যা । ঘুমের সমস্যা এবং মোটা হয়ে যাওয়ার সমস্যা এখন অনেক রোগের চেয়েও বেশি বড় সমস্যা ।

বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছে আধুনিক জীবনে ঘুমের সমস্যার অন্যতম একটি কারণ – আলো । আলো দূষণ । দিনের বেলা শব্দ দূষণ এবং রাতের বেলা আলোর দূষণ । রাতের বেলা অতিরিক্ত আলোর প্রভাব । এখন বলা হয় শারীরিক সমস্যার চেয়ে আলোর দূষণ এখন ঘুমের অনেক সমস্যার কারণ ।

আধুনিক বিশ্বে সত্তর ভাগ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ঘুম জনিত কোনো একটি সমস্যায় ভুগছে ।

শুরুতে বলে নেই – কি করে বুঝবেন আপনার ঘুমটি ভালো হয় । ঘুমোতে যাওয়ার সাত থেকে দশ মিনিটের মধ্যে ঘুম এলে বুঝবেন আপনার ঘুমটি ভালো হয় এবং আপনার ঘুমের স্বাস্থ ভালো ।

কিন্তু কি করে বুঝবেন আপনার ঘুমের স্বাস্থ রীতিমতো অসুস্থ !

কি করে বুঝবেন আপনি কম ঘুমাচ্ছেন ?

➼ দিনভর হাই তুলবেন ।

➼ কোনো কাজ শুরু করার একটু পরেই ঝিমুনি পেয়ে বসবে ।

➼ অনেক ছোট বিষয়ে অযথা বিরক্ত হবেন ।

➼ ঘুম আসবে না, কিন্তু থেকে থেকে ঘুম ঘুম ভাব আসবে ।

➼ একটা কাজে বেশিক্ষন মনোসংযোগ দিতে পারবেন না ।

➼ কোনো কারণ ছাড়াই দুর্বল অনুভব করবেন ।

➼ দুশ্চিন্তার কোনো বিষয় না থাকলেও ছোটোখাটো বিষয়েও দুশ্চিন্তা পেয়ে বসবে ।

➼ পার্টনার কাছে এসে আদর করলেও আদর করতে ইচ্ছে করবে না ।

➼ ডায়াবেটিস থাকলে অযথা সুগার বেড়ে যাবে ।

➼ ঘুমের ক্রনিক ব্যাঘাতে শরীরের ইমিউনিটি কমে যাওয়ায় ঘন ঘন গলা ব্যথা, সর্দি, কাশি, এমনকি পেটের পীড়াতে আক্রান্ত হবেন সহজে ।

➼ দিনের বেলা ব্লাড প্রেসার বেড়ে যাবে ।

➼ কম খাচ্ছেন, তারপরেও দেখছেন ওজন বেড়ে যাচ্ছে শরীরের ।

➼ দৈনন্দিন অনেক কিছু অল্প সময়ের ব্যবধানে বার বার ভুলে যাবেন ।

➼ সহজে হাত থেকে এটা সেটা পড়ে যাবে, হাঁটতে গেলে হঠাৎ করে টলবেন, ব্যালেন্স হারাবেন সহজে ।

➼ দিনের বেলা শরীরে অযথা ব্যথা অনুভব করবেন ।

➼. দিনে অযথা মনে হবে পেট খালি এবং ঘন ঘন ক্ষুধা লাগবে ।

© অপূর্ব চৌধুরী ।

চিকিৎসক এবং লেখক ।

জন্ম বাংলাদেশ, বসবাস ইংল্যান্ড ।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা ডাক্তার কাদম্বিনী গাঙ্গুলী

কাদম্বিনী গাঙ্গুলী। ঊনবিংশ, বিংশ এমন কি এই একবিংশ শতকের নিরিখে একজন মহীয়সী নারী।যেযুগে নারীরা ছিল সমাজে চরমভাবে অবহেলিত, তাদের প্রাথমিক শিক্ষালাভের পথও যেখানে ছিল দিবাস্বপ্ন, সেখানে সেই একই যুগের একই সমাজে থেকে, জীবনে কিভাবে তিনি সফলতার সর্বোচ্চ শিখরে উঠলেন, অবলীলায় সামাজিক বিপত্তির সব বন্ধুর পথ পেরিয়ে অগ্রসর হলেন ? কিভাবে সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করলেন?
উনবিংশ শতকে চার দেয়ালের বাইরে বের হওয়া মেয়েদের জন্য ছিল দুঃসাধ্য।সেই সমাজের মেয়ে হয়ে চলমান প্রথা ভাঙেন কাদম্বিনী গাঙ্গুলী। হয়ে ওঠেন বাংলার প্রথম মহিলা চিকিৎসক। সাফল্যের পথটা মসৃন ছিল না তার, ছিল কাঁটায় ভরা। রক্তচক্ষু দেখিয়েছে তৎকালীন সমাজ। সেই রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অনেকটা পথ হেঁটেছেন কাদম্বিনী।
চিকিৎসক হয়েও কাদম্বিনীকে সইতে হয়েছে শত অবহেলা। সমাজের মানুষের ধারণা ছিল, একটা মেয়ে কিভাবে ডাক্তার হয়? নেতিবাচক ধারণা ভেঙে বারবার আঙুল তোলা মানুষগুলোর মন জয় করেছেন কাদম্বিনী গাঙ্গুলী।
একটা গল্প আছে- বড় বাড়ির সবার আদরের মেয়ে অসুস্থ। সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার আনতে ছুটল গাড়ি। গাড়ি থেকে যখন কাদম্বিনী নামলেন, বাড়ির সবাই বলে উঠল, ‘ওমা, ডাক্তার কই ? এ তো মেয়ে!’
এমনই হাজারো বাধাবিঘ্ন আর সফলতার গল্প আছে কাদম্বিনীর জীবনে।
কাদম্বিনী গাঙ্গুলী ১৮ জুলাই ১৮৬১ সালে বিহারের ভাগলপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা স্কুল শিক্ষক ব্রজকিশোর বসু।
ব্রিটিশ ভারতের প্রথম ২ জন নারী স্নাতকের একজন ছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, ইউরোপীয় চিকিৎসা শাস্ত্রে শিক্ষিত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নারী চিকিৎসক ছিলেন কাদম্বিনী গাঙ্গুলী।
উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে তিনি পাশ্চাত্য চিকিৎসায় ডিগ্রী অর্জন করেন এবং আনন্দীবাঈ যোশীর সঙ্গে তিনিও হয়ে ওঠেন ভারতের প্রথমদিককার একজন নারী চিকিৎসক।
কাদম্বিনী-গাঙ্গুলী
কাদম্বিনী গাঙ্গুলী

কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর জীবনী

ব্রাহ্ম সংস্কারক ব্রজকিশোর বসুর কন্যা কাদম্বিনীর জন্ম বিহারের ভাগলপুরে হলেও, তার মূল বাড়ি ছিল বর্তমান বাংলাদেশের বরিশালের চাঁদসি-তে। তার বাবা ভাগলপুর স্কুলের প্রধানশিক্ষক ছিলেন।
ব্রজকিশোর বসু অভয়চরণ মল্লিকের সঙ্গে ভাগলপুরে নারীদের অধিকারের আন্দোলন করেছিলেন। তারা নারীদের সংগঠন ভাগলপুর মহিলা সমিতি স্থাপন করেছিলেন ১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দে। এই ঘটনা ছিল ভারতে প্রথম।
পড়াশোনার জন্য তাঁর পিতা ব্রজকিশোর তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসেন। কাদম্বিনী তার পড়াশোনা আরম্ভ করেন বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়ে। এরপর বেথুন স্কুলে পড়ার সময়ে তিনি ১৮৭৮ সালে প্রথম নারী হিসাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে পাস করেন। তার দ্বারাই প্রভাবিত হয়ে বেথুন কলেজ প্রথম এফ.এ (ফার্স্ট আর্টস) এবং তারপর অন্যান্য স্নাতক শ্রেণি আরম্ভ করে।
কাদম্বিনী এবং চন্দ্রমুখী বসু বেথুন কলেজের প্রথম গ্র্যাজুয়েট হয়েছিলেন ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে। তারা বি.এ পাস করেছিলেন। তারা ছিলেন ভারতে এবং সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট।
গ্র্যাজুয়েট হবার পর কাদম্বিনী দেবী সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি ডাক্তারি পড়বেন। ১৮৮৩ সালে মেডিকেল কলেজে ঢোকার পরেই তিনি তার শিক্ষক দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীকে বিয়ে করেন। দ্বারকানাথ বিখ্যাত সমাজসংস্কারক ও মানবদরদী সাংবাদিক হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। যখন তিনি বিয়ে করে তখন ৩৯ বছর বয়েসের বিপত্নীক, কাদম্বিনীর বয়স তখন ছিল একুশ।
কাদম্বিনী ফাইন্যাল পরীক্ষায় সমস্ত লিখিত বিষয়ে পাস করলেও প্র্যাকটিক্যালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অকৃতকার্য হন । ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে তাকে জিবিএমসি (গ্র্যাজুয়েট অফ বেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজ) ডিগ্রি দেওয়া হয়।
তিনি ছিলেন প্রথম ভারতীয় নারী, যিনি পাশ্চাত্য চিকিৎসারীতিতে চিকিৎসা করবার অনুমতি পান। তাছাড়া মেডিক্যাল কলেজে পড়াকালীন তিনি সরকারের স্কলারশিপ পান, যা ছিল মাসে ২০ টাকা।
তিনি পাঁচ বছর মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনা করে বিলেত যান। বিলেত যাবার আগে ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কিছুদিন লেডি ডাফরিন মহিলা হাসপাতালে মাসিক ৩০০ টাকা বেতনে কাজ করেছিলেন।
১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে বোম্বে শহরে কংগ্রেসের পঞ্চম অধিবেশনে প্রথম যে ছয় জন নারী প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন, কাদম্বিনী ছিলেন তাদের অন্যতম একজন। পরের বছর তিনি কলকাতার কংগ্রেসের ষষ্ঠ অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন। কাদম্বিনী ছিলেন কংগ্রেসের প্রথম মহিলা বক্তা। কাদম্বিনী গান্ধীজীর সহকর্মী হেনরি পোলক প্রতিষ্ঠিত ট্রানসভাল ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম সভাপতি এবং ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় অনুষ্ঠিত মহিলা সম্মেলনের সদস্য ছিলেন।
১৯১৪ সালে তিনি কলকাতায় সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এই অধিবেশন মহাত্মা গান্ধীর সম্মানের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল।
কাদম্বিনী চা বাগানের শ্রমিকদের শোষণের বিষয়ে অবগত ছিলেন। তিনি তার স্বামীর দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করেন। তার স্বামী আসামের চা বাগানের শ্রমিকদের কাজে লাগানোর পদ্ধতির নিন্দা করেছিলেন।
কবি কামিনী রায়ের সঙ্গে কাদম্বিনী দেবী ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে বিহার এবং ওড়িশার নারীশ্রমিকদের অবস্থা তদন্তের জন্য সরকার দ্বারা নিযুক্ত হয়েছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবন

সন্তানদের জন্য সংসারের জন্যও তাকে বেশ সময় দিতে হত। তিনি সূচিশিল্পেও নিপুণা ছিলেন।
বিখ্যাত আমেরিকান ইতিহাসবিদ ডেভিড কফ লিখেছেন, “গাঙ্গুলির স্ত্রী কাদম্বিনী ছিলেন তার সময়ের সবচেয়ে মহীয়সী এবং স্বাধীন ব্রাহ্ম নারী। তৎকালীন বাঙালি সমাজের অন্যান্য ব্রাহ্ম এবং খ্রিস্টান নারীদের চেয়েও তিনি অগ্রবর্তী ছিলেন। সব বাধার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ হিসেবে নিজেকে জানার তার এই ক্ষমতা তাকে সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজে নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলা জনগোষ্ঠীর কাছে অনুপ্রেরণার উৎসে পরিণত করে। “

সামাজিক বাধা ও উত্তরণের সাফল্য

তিনি হিন্দু রক্ষনশীল সমাজের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। পেশা জীবনেও বহু ব্যাপারে বাংলার প্রথম নারী হিসেবে রেকর্ড করা কাদম্বিনীকে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। তাকে অসম্মান জনক কথা বলেছিলেন এক সম্পাদক মহেশচন্দ্র পাল।
তখনকার বঙ্গবাসী নামে সাময়িক পত্রিকার ডাকসাঁইটে সম্পাদক মহেশচন্দ্র পাল একটি কার্টুন ছেপে ডা. কাদম্বিনীকে ‘স্বৈরিণী’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ কাদম্বিনী নাকি মোটেই ঘরোয়া নন। ঘর-সংসারের দিকে, ছেলেমেয়ের দিকে তার নাকি মন নেই, নিষ্ঠাও নেই। এতগুলো সন্তানের মা হওয়া সত্ত্বেও তিনি নাকি মাতৃধর্ম পালন করছেন না। এর ওপর আবার সমাজসেবা, স্বদেশী করে বেড়াচ্ছেন, সভাসমিতি করছেন বাইরে। সুতরাং বঙ্গবাসী পত্রিকায় একটা কার্টুন এঁকে দেখানো হলো, ডা. কাদম্বিনী স্বামী দ্বারকানাথের নাকে দড়ি দিয়ে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন।
কিন্তু ছেড়ে দেবার পাত্রী নন কাদম্বিনী কিংবা তার স্বামী। মামলা হলো। বঙ্গবাসী পত্রিকার সম্পাদক মহেশচন্দ্র পালের ১০০ টাকা জরিমানা আর ৬ মাসের জেল হলো। সেই সময় এই ধরনের মামলা করা, বিশেষ করে একপ্রতিপত্তিশালী কাগজের সম্পাদকের বিরুদ্ধে কোনো নারীর মানহানির মামলা করাটা মোটেই সহজ ছিল না।
চিকিৎসক হিসেবে একদিন এক রোগী দেখতে তার বাড়ি যান কাদম্বিনী গাঙ্গুলী। গাড়ি থেকে নামার পর ওই বাড়ির লোকজন বলছিলো ‘ডাক্তার কই? এ তো মেয়ে!’ সমাজের এই ধরনের মন্তব্যের শিকারও হতে হয়েছিল তাকে। এক কথায় অনেক বাধা অতিক্রম করেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার প্রথম নারী চিকিৎসক।
কাদম্বিনীর নাম এতদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গিয়েছিল যে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল তাঁর বন্ধুকে দেওয়া এক পত্রে জানতে চেয়ে লিখেছিলেন, “কে এই মিসেস গাঙ্গুলি, আমায় কিছু জানাতে পারো? সে নাকি এর মধ্যেই ফার্স্ট লাইসেনসিয়েট ইন মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি পাশ করে ফেলেছে আর আগামী মার্চ মাসে ফাইনাল পরীক্ষা দেবে। এই তরুণী বিয়ে করে ফেলেছে, ডাক্তার হবে ঠিক করার পরে! তার পর অন্তত একটি সন্তানের জন্ম দিয়েছে, যদি না দুটো জন্মে থাকে। কিন্তু ছুটি নিয়েছিল মাত্র ১৩ দিন, আর শুনছি নাকি একটাও লেকচার মিস করেনি!”
তবে সব কিছুর উপরে ছিলেন ‘চিকিৎসক কাদম্বিনী’। নেপালের রাজা জঙ বাহাদুরের মা এক বার খুব অসুস্থ হলেন। শেষ চেষ্টা হিসেবে কাদম্বিনীকে ডেকে পাঠানো হল। তাঁর ওষুধে রাজমাতা সুস্থ হলেন। কাদম্বিনীকে আলাদা প্রাসাদে থাকতে দেওয়া হয়েছিল। সোনা-রুপোর থালাবাসনে খেতে দেওয়া হত।
ফেরার সময়ে রাজমাতাকে সারিয়ে তোলার পুরস্কার হিসেবে প্রচুর অর্থ, দামি পাথর বসানো সোনার গহনা, মুক্তোর মালা, রুপোর বাসন, তামা-পিতল-হাতির দাঁতের জিনিস আর একটি সাদা রঙের গোলগাল, জ্যান্ত টাট্টু ঘোড়া দেওয়া হয়েছিল। সেই ঘোড়ায় টানা গাড়িতে চেপেই তিনি কলকাতার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে রোগী দেখতে ছুটতেন। রাস্তায় যাওয়ার সময়টুকু অনবরত লেস বুনে যেতেন! যে দক্ষতায় অস্ত্রোপচারে ছুরি চালাতেন, সেই দক্ষতাতেই তৈরি করতে পারতেন অপূর্ব সব লেসের নকশা। ‘যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে’ প্রবাদকে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি করে, সময় ও

সমালোচনাকে পদানত করেছিলেন কাদম্বিনী!

জীবনের শেষ দিনটাতেও কাদম্বিনী রোগীর বাড়ি গেছেন। জটিল অস্ত্রোপচার করেছেন। ঘরে এসে পরিতৃপ্ত কাদম্বিনী পুত্রবধুকে বলেছিলেন, “সার্থক ও সুন্দর দিন ছিল সেটা। তাঁর এত ভাল লাগছিল যে তিনি শূন্যে উড়ে বেড়াতে চাইছিলেন।”
সাবলম্বী, স্বাধীনচেতা কাদম্বিনী সবসময় বলতেন তিনি কারো কাছে এমনকি নিজ পুত্রেরও গলগ্রহ হয়ে থাকতে চান না। কর্মাবস্থায় তাই মরতে চেয়েছিলেন তিনি। হয়েওছিল তাই, পুত্রবধূর সাথে কথা বলার কিছুক্ষণ পরই স্নান করতে গিয়ে কঠিন সেরিব্রাল স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান এই মহিলা ডাক্তার।
মহীয়সী নারী কাদম্বিনী গাঙ্গুলি ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের ৩ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। তার হাত ধরেই আজকের চিকিৎসাসেবা প্রদানের সুযোগ হয়েছে অগণিত নারীদের।
নিজেকে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত করে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখেছে নারীরা। প্রমাণ করতে শিখেছে পুরুষের চাইতে নারীরা কোনো অংশেই কম নয়। বরং নারী-পুরুষের সমান চেষ্টাই সমাজ ও দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
মহিয়সী নারী কাদম্বিনী গাঙ্গুলীকে আমরা শ্রদ্ধা জানাই।

পঞ্চানন মন্ডল পঞ্চানন মন্ডল

কম্পিউটারের জনক কে ?

কম্পিউটারের জনক কে ?

প্রশ্নটি বিতর্কিত । আসলে বছরের পর বছর ক্রমোন্নতির এক সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কম্পিউটার আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। আসলে শুধু একজন নয়, অনেকের অবদানেই ঋদ্ধ এই কম্পিউটার!

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, সর্বপ্রথম কম্পিউটার শব্দটি দ্বারা কোনো যন্ত্রকে বোঝাতো না। বরং যারা হিসাব-নিকাশের কাজ করতো, তাদের বোঝাতো।

কম্পিউটার শব্দটির প্রথম ব্যবহার পাওয়া যায় ১৬১৩ সালে রিচার্ড ব্র্যাথওয়েইটের লিখিত একটি বইয়ে। শুরুতে আদতে এর দ্বারা কোনো যন্ত্রকেই বোঝাতো না, এটি ছিল একটি চাকরির পদবির নাম।

কম্পিউটার ছিল এমন একজন ব্যক্তি, যে কি না হিসাব-নিকাশের কাজ করতো; কখনো যন্ত্রের সাহায্যে, কখনো বা সাহায্য ছাড়াই! এই পদবী অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত চলতে থাকে, যার পর থেকে এর দ্বারা মানুষকে না বুঝিয়ে যন্ত্রকে বোঝানো শুরু হয়।

আধুনিক কম্পিউটারের ইতিহাস আলোচনায় কমপক্ষে ব্যাবেজের সময় থেকে বলতে হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুততা আর নির্ভুলতা খুবই প্রয়োজনীয়; তাই সামরিক খাতেই জটিল হিসাব-নিকাশের যন্ত্র প্রথম ব্যবহৃত হয়।

এমনই সমস্যা দূরীকরণে চার্লস ব্যাবেজ ১৮২২ সালে রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটিতে একটি চিঠি লিখলেন। চার্লস ব্যাবেজ ‘ডিফারেন্স ইঞ্জিন’ নামে সম্পূর্ণ নতুন এক জটিল যন্ত্রের প্রস্তাব করেন, যা বহুপদীর সমাধান করতে পারতো। এই বহুপদী সমীকরণগুলোর সাহায্যে লগারিদমীয় এবং ত্রিকোণমিতিক সমস্যার সমাধানও করা যেত।

১৮২৩ সালে ব্যাবেজ এই যন্ত্র তৈরি করা শুরু করেন। দুই দশক ধরে ২৫,০০০ যন্ত্রাংশের সমন্বয়ে তৈরি এই যন্ত্রের ওজন দাঁড়ায় ১৫ টনেরও বেশি ! কিন্তু কোনো কারণে , প্রজেক্টটি বাতিল হয়। কিন্তু ১৯৯১ সালে ঐতিহাসিকগণ ব্যাবেজের মডেল অনুযায়ী ডিফারেন্স ইঞ্জিন তৈরি করতে সক্ষম হন, যা কাজও করে!

ডিফারেন্স ইঞ্জিন তৈরির সময়ই ব্যাবেজ আরও জটিল ‘অ্যানালিটিকাল ইঞ্জিন’ তৈরির কথা চিন্তা করেন। ডিফারেন্স ইঞ্জিন ছিল একটি জেনারেল পারপাস কম্পিউটার। শুধু একটি কাজ নয়, এর দ্বারা অনেকগুলো কাজ করা যেত। এতে ডেটা প্রবেশ করানো এবং ক্রমান্বয়ে তা সম্পাদন করা যেত, এমনকি এতে মেমোরি এবং আদি প্রিন্টারও ছিল।

অ্যানালিটিকাল ইঞ্জিন ছিল সময়ের থেকে এগিয়ে, এবং একে কখনোই পুরোপুরি তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ইতিমধ্যেই ইংরেজ গণিতবিদ অ্যাডা লাভলেস ইতিহাসে প্রথম কমান্ড লেখেন, যার জন্য তাকে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম প্রোগ্রামার বলা হয়। তার মতে একটি নতুন, বিশাল পরিসরে ব্যবহার উপযোগী একটি শক্তিশালী ভাষা তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে ব্যবহার করা যাবে।

অ্যানালিটিকাল ইঞ্জিন আরও অনেক প্রথম প্রজন্মের ইঞ্জিনিয়ারদের উৎসাহী করে তোলে, যারা কি না এই যন্ত্রের আরও উৎকর্ষ সাধন করেন। এ কারণেই ব্যাবেজকে ‘ফাদার অফ কম্পিউটিং’ বলা হয়।

 

কম্পিউটারের-জনক

 

প্রযুক্তির ইতিহাসের একজন অন্যতম স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব চার্লস ব্যাবেজ। ১৭৯২ সালের ২৬ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের লন্ডন শহরে জন্ম নেওয়া ব্যাবেজ একাধারে একজন গণিতবিদ, দার্শনিক, আবিষ্কারক ও যন্ত্রপ্রকৌশলী।

কর্মজীবনের শুরুতে ১৮২৮ সালে তিনি লুকাসিয়ান প্রফেসর হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ১৮৩৯ সাল পর্যন্ত এ পদে আসীন ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক হন। তিনি গবেষণার কাজে ব্যস্ত থাকতে বেশি পছন্দ করতেন।

বেঞ্জামিন ব্যাবেজ ও বেটসি প্লামলি টিপের সন্তান চার্লস ব্যাবেজ । ১৮১৪ সালের ২৫ জুলাই তিনি জর্জিয়া হোয়াইটমোরকে বিয়ে করেন।

তিনি ডিফারেন্স ইঞ্জিন ও অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন নামের দুটি যান্ত্রিক কম্পিউটার তৈরি করেন। তাঁর তৈরি অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন যান্ত্রিকভাবে গাণিতিক অপারেশন সম্পাদন করতে পারত এবং এর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য আজকের কম্পিউটারের ডিজাইনে এখনো গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থের অভাবে ব্যাবেজ তাঁর প্রকল্পটি সম্পন্ন করতে পারেননি। তবে ১৮২২ সালে তাঁর তৈরি ও লিখে যাওয়া বর্ণনা অনুযায়ী ডিফারেন্স ইঞ্জিনের আদলেই ১৯৯১ সালে একটি ইঞ্জিন তৈরি করা হয় এবং সেটি সঠিকভাবে কাজ করে।

বর্তমানে তাঁর উদ্ভাবিত ডিজাইনের কম্পিউটারকে কেন্দ্র করেই আরো জটিল ও আধুনিক কম্পিউটার তৈরি হচ্ছে। তাঁর সেই যান্ত্রিক কম্পিউটারের ডিজাইন এখনো লন্ডন সায়েন্স মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হয়। ১৮৭১ সালের ১৮ অক্টোবর ৭৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই। 🙏

 

@ পঞ্চানন মণ্ডল পঞ্চানন মন্ডল